চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ প্রতিরোধ সংশ্লিষ্টদের পদক্ষেপ জরুরি

29

গতকাল শনিবার দৈনিক পূর্বদেশের শীর্ষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চট্টগ্রাম মহানগরীতে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ বেড়েছে। সেই সাথে জেলার ১৪ উপজেলা, কক্সবাজার ও পার্বত্য জেলায় এই রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। গত তিন মাসে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ নগরীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে শতাধিক রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এসব এলাকায় ডেঙ্গু জ্বর এখন দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও সিভিল সার্জন অফিস ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও জনগণকে সচেতন করতে চোখে পড়ার মত কোনো উদ্যোগ নেয়নি। মশা নিধনে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন নগরবাসী। এ প্রতিবেদনের আগে গত অক্টোবরে দৈনিক পূর্বদেশের সম্পাদকীয়তে ঢাকায় আশংকাজনত ডেঙ্গুর প্রকোপ বৃদ্ধি ও মৃত্যুর ঘটনার আলোকে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর পাদুর্ভাব নিয়ে আগাম সতর্ক করা হয়েছিল। সম্পাদকীয়তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলা হয়েছিল সময় থাকতে যেন ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, বিষয়টি পাঠকের কাছে গ্রহণীয়তা পেলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কর্ণগোছরিভুত হয় নি। ফলে এডিশ মশা তাদের বংশবৃদ্ধিসহ ডেঙ্গু জীবাণু ছড়িয়ে দিচ্ছে চট্টগ্রামবাসীর শরীরে। এতে শিশু, নারী, বৃদ্ধ সকলই আক্রান্ত হচ্ছে। অতীতে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তে অনেকের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
সাধারণত আমরা জানি, বর্ষার শুরু থেকে শরতের শেষ পর্যন্ত নানা কারণে মশার উপদ্রব বাড়ে। এসময় খাল-বিল, নালা-নর্দমা, সড়কের খানাখন্দক, জলাশয়, টায়ার, ফুলের টব, ঘরের ছাদে জমানো পানি ইত্যাদিতে মশা বাসা বাঁধে। এখান থেকে এডিস মশা বা ডেঙ্গুর জন্ম হয়। সিটি কর্পোরেশন সাধারণত এসময় মশা নিধনে ক্রাস প্রোগ্রাম নিয়ে থাকে। কিন্তু এবার এ ধরনের কোন কার্যক্রম দৃশ্যমান হয়নি। অথচ মশার উপদ্রবে নগরবাসী অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। আমরা এও জানি, মশা নিধনের জন্য সিটি কর্পোরেশনের নির্দিষ্ট বাজেট থাকে। বছরের পর বছর এ বাজেট বাড়তে থাকে। দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত পৃথক একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত অর্থ বছরের তুলনায় এবার (২০১৮-২০১৯) মশা নিধনে বরাদ্দ বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৬ গুণ। মশা নিধন কার্যক্রমে গতি আনতে চসিক-এ চালু হয়েছে কলসেন্টার। কিন্তু মশা নিধনে কোন কামান যেমন নাগরবাসীর দেখা মেলেনি তেমনি কলসেন্টার নিয়েও রয়েছে নগরবাসীর নানা অভিযোগ। চসিক পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তার হিসাব অনুযায়ী ১২০ জন কর্মী প্রতিদিন ৪১টি ওয়ার্ডে মশক নিধন কার্যক্রম চালাচ্ছে। কিন্তু এত মশক নিধক কোথায় গিয়ে ঔষধ ছিটান তা খুঁজে বের করা দায়। অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের সর্বত্রই এখন মশার উৎপাত। এসব ওয়ার্ডের প্রত্যন্ত এলাকা ও নালা-নর্দমা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন না রাখায় মশার উৎপাত বেড়েছে। মশার যন্ত্রণায় শান্তিতে কাজকর্ম করা তো দ‚রের কথা ঠিকমতো স্থির হয়ে বসা পর্যন্ত যাচ্ছে না। নগরবাসীর অভিযোগ, মশার উপদ্রব থামাতে চসিক কোটি টাকার ওষুধ কেনার কথা বললেও তা প্রয়োগের কোনো কার্যক্রম চোখে পড়ে না। এতে নগরবাসীর স্বাভাবিক কার্যক্রমের পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়াও চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী মশা কাউকে কামড়ালে ওই ব্যক্তি কয়েকদিনের মধ্যে জ্বরে আক্রান্ত হয়। এভাবে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির দেহে ডেঙ্গুর জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে। এই জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তির বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এতে রোগীর কষ্ট আরও বেড়ে যায়।
গত কয়েক বছর ধরে মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বেড়েই চলেছে এবং আক্রান্তদের সীমাহীন কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে মশা নিধনে বরাদ্দকৃত অর্থ নয়ছয় হয় কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার। অভিযোগ রয়েছে, মশক নিধনে যারা দায়িত্ব পালন করেন, তাদের বিভিন্ন এলাকায় কালেভদ্রে দেখা না গেলেও সমাজের বিত্তবান বা প্রভাশালীদের ঘরে বাইরে ঔষধ ছিটিয়ে তাদের দায়িত্ব শেষ করে। সাধারণত বিভিন্ন জায়গায় পড়ে থাকা খোলা পাত্রে ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, ফ্ল্যাটবাড়ির বারান্দা, নালা-নর্দমা, জলাশয় প্রভৃতি স্থানে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে। কাজেই এসব জায়গায় ঔষধ আগে ছিটাতে হবে। এছাড়া উল্লেখিত জায়গায় যাতে দীর্ঘদিন পানি জমে না থাকে সেই বিষয়ে নাগরিকরা সতর্ক থাকলে সহজেই এ মশার বিস্তার রোধ করা যায়। আমরা মনে করি, ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ ও আক্রান্ত ব্যক্তির করণীয় কী, এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো দরকার। নগরবাসীকে মশার উপদ্রব থেকে মুক্তি দেয়ার দায়িত্ব সিভিল সার্জন অফিস ও সিটি কর্পোরেশনের। কোন কারণে এ রোগের বিস্তার ঘটলে এর দায় সিভিল সার্জন অফিস ও সিটি কর্পোরেশনের উপর বর্তাবে। সুতরাং আমরা আবারও বলছি, সময় থাকতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবে- এমনটি প্রত্যাশা আমাদের।