চট্টগ্রামের পরিকল্পিত উন্নয়ন ও বিবিধ প্রসঙ্গ

মুশফিক হোসাইন

10

বিগত ২৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক মিলনায়তনে অধ্যাপক (প্রকৌশলী) এম আলী আশরাফ প্রণীত চট্টগ্রাম নগরীর পরিকল্পিত উন্নয়ন: সমস্যা ও সম্ভবনা বিষয়ক গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। প্রফেসর ড. অনুপম সেন, প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, প্রফেসর ড. রফিকুল আলম, জনাব এম এ মালেক, জনাব আবুল মোসেন, জনাব ডা. ম রমিজ উদ্দিন চৌধুরী, প্রফেসর সরওয়ার জাহান প্রমুখ আলোচনায় অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি কোন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না। নিরেট একটি বইয়ের প্রকাশনা উৎসব। কিন্তু লক্ষ্যনীয় যে, অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম প্রেমিক ও বোদ্ধাস্রোতায় কানায় কানায় ভরপুর ছিল। অনুষ্ঠানটি প্রিন্ট মিডিয়া এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলে। ঢাকা চট্টগ্রামের সকল দৈনিকে তার ছবিসহ সংবাদ ছাপা হয়। আমি উক্ত গ্রন্থটির একটি বিষদ রিভিউ চট্টগ্রামের দৈনিকে প্রেরণ করি। আমার লেখার শিরোনাম ‘চট্টগ্রামের উন্নয়নের বাঁশীওয়ালার দিস্তান ছিল’। দুর্ভাগ্যবশতঃ বিভাগীয় সম্পাদক দিস্তানের মানে বোঝেন নি। কিংবা বোঝেও না বোঝার ভান করে লেখেন, বাঁশীওয়ালার কথা। তাতেও কোন অসুবিধে হওয়ার কথা না। মনে হয়, তিনি ঈর্ষাবশতঃ পুরো লেখাটি কাটসাট করে ছোট একটি সংস্করণ প্রকাশ করেন। যাতে অধ্যাপক এম আলী আশরাফের বক্তব্য এবং তার পর্যালোচনা সম্পূর্ণভাবে অসমর্থিত হয়ে বিকলাঙ্গ রূপ নেয়। এটা অবশ্য রুগ্ন মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য মহানগরের পরিবেশ পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন আলোচনায় একটি বক্তব্য বরাবরই শোনা যায় যে, ‘অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে শহরগুলোর বর্তমান অবস্থা বা হাল। এই দুরাবস্থার জন্য সকলেই পরিকল্পনাহীনতার কথা বলে থাকেন। একথাটা পুরোপুরি সত্য না হলেও বলা যায় আংশিক সত্য। ঢাকা, চট্টগ্রাম তথা দেশের অন্যান্য মহানগর/শহরের জন্য বিভিন্ন সময়ে যথাযথ নগর পরিকল্পনা রচিত ও অনুমোদিত হয়েছিল। উদাহরণ বলা যায়, রাজউক, চউক ইত্যাদি। এ সকল প্রতিষ্ঠান নগর উন্নয়নের জন্য প্রণীত পরিকল্পনার বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় প্রতিষ্ঠানও বটে। এদের তত্ত্বাবধানে পরিকল্পনাসমূহ বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। আবার অনেক ক্ষেত্রে সিটি কর্পোরেশনগুলো ও নিত্য-নতুন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষমতাপ্রাপ্ত। তারপরও নাগরিক সমাজ বলে থাকেন ‘অপরিকল্পিত নগরায়নই সকল দুরবস্থার জন্য দায়ী।’ আসলে পরিকল্পনা অভাব নয়, বরং পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়নের অভাবই মূল কারণ। তার সাথে অন্যান্য প্রসঙ্গ ও বিবেচনার দাবি রাখে। যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো, রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাব, প্রভাবশালী মহলও কায়েমী স্বার্থবাদীদের দৌরাত্ম্য ও সরকারি সংস্থা সমূহের দুর্নীতির প্রাবল্য। আবার পরিখল্পনার দুবলতা ও পরিকল্পনার বাস্তবানের কারিগরী সমস্যা ও বিশেষ বিবেচনা রাখে।
অপরিকল্পতিভাবে চট্টগ্রাম নগরীর বেড়ে উঠছে। অথচ দুই হাজার বছরের এই নগর তার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে যেভাবে নান্দনিক রূপ নিয়ে বেড়ে উঠার কথা সেভাবে বেড়ে ওঠেনি। নগরের অপার সৌন্দর্য হলো তার টিলা ও পাহাড়। যা ব্যক্তি ও সরকারিভাবে নানা কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। একটি নান্দনিক শহরের পর্যটন ভেলু অপরিসীম। আমরা তা গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি। বরঞ্চ দ্বিতীয় রাজধানীর পালক জুড়ে দিয়ে পরিহাস করে চলেছি। বাংলাদেশের প্রধান বন্দর চট্টগ্রাম হওয়ার কারণে হাজার হাজার বছর ধরে নানা বর্ণের নানা ধর্মের গোত্রের মানুষ এখানে জমায়েত হয়েছে। তাই এখানকার মানুষের মাঝে তার প্রভাব স্পষ্ট। চট্টগ্রামের ভাষা সংস্কৃতি ও সামাজিক আচরণে তা প্রতীয়মান। এই বৈচিত্র্যমÐিত গুণাবলীতে সমন্বিত করে চট্টগ্রামকে গড়ে তোলা যায় নি। ঐতিহাসিকভাবে চট্টগ্রাম চিটাগং হিসাবে খ্যাত। অনেক বিদেশি বন্ধুরা বাংলাদেশ না চিনলেও চিটাগংকে চেনে। তাই চট্টগ্রাম মানে বাংলাদেশ। চট্টগ্রামকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের উন্নতি কামনা করা বাতুলতা মাত্র।
চট্টগ্রামের বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন নির্বাচিত হওয়ার পর ঘোষণা দিয়েছিলেন ‘চট্টগ্রাম সবুজে সাজবে’। তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর আকাশচুম্বী বিল বোর্ড তাঁর দলীয় নেতাকর্মীদের প্রবল বিরোধীতার মুখে অত্যন্ত সাহসের সাথে অপসারণ করে নজির স্থাপন করেছেন। এই বিল বোর্ডের কারণে এক সময় চট্টগ্রামের আকাশ দেখা যেত না। বিলবোর্ডের কারণে নগরবাসী পাহাড় ও প্রকৃতির ঘ্রাণ কী নগরবাসী পেয়েছেন? মোটেই না। মেয়র নাছির নির্বাচিত হওয়ার পর দৃঢ় সাহসে প্রথমেই দলীয় নেতাদের তোয়াক্কা না করে বিলবোর্ড মুক্ত করেন। বিলবোর্ডমুক্ত চট্টগ্রাম দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুকরণীয় হয়ে আছে। তিনি প্রশংসিতও হয়েছেন। অতপর চট্টগ্রামের দুঃখ জলাবদ্ধতা দূর করার লক্ষ্যে নগরের প্রায় সকল নালা নর্দমা সংস্কার শুরু করেন। অতপর তাঁর উদ্যোগে নগরে সবুজায়নের কাজ শুরু হয়। প্রথমেই জামালখান ওয়ার্ড দিয়ে শুরু হলেও বর্তমানে সমস্ত নগর জুড়ে এ কাজ চলছে। ঐ যে বললাম একজনের দেখাদেখি সমস্ত নগরে তা ছড়িয়ে পড়ে। জামালখান এলাকায় সৌন্দর্য্য বন্ধন ও সবুজায়নে কী কী ত্রæটি বিচ্যুতি ছিল, তা অন্যরা পর্যবেক্ষণপূর্বক যথাযথ পরিকল্পনা নিয়ে সবুজায়ন ও সৌন্দর্য বর্ধনের কাজটি যদি করা হতো তাহলে চট্টগ্রাম আসলেই একটি দেখার মতো নগরী হয়ে উঠত। এক্ষেত্রে যদি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যক্তি সংস্থা থেকে প্রতিযোগিতামূলকভাবে পরিকল্পনা দরপত্র গ্রহণ করা হত। তাহলে সৌন্দর্য্য পরিকল্পনায় বৈচিত্র্য যেমন আসত, তেমনি নান্দিনকতাও প্রকাশ পেত। জামালখানে বৃক্ষরোপণ করার সময় সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করেছিলাম সড়ক দ্বীপে এমন ধরনের গাছ লাগাতে, যা প্রতি মওসুমে ফুল ফোটে, যারা বেশি দেশীয় এবং দিনের বিভিন্ন সময়ে সৌরভ ছড়িয়ে নগরবাসীর মনে প্রফুল্লতা এনে দিবে। আমাদের দেশীয় অনেক গাছ আছে উচ্চতায় বাড়ে না, আবার বিভিন্ন সময় ফুল ফল দেয়। দেশীয় ফুল ফল আমাদের দেশীয় পাখিরা পছন্দ করে। উদাহরণে বলা যায় জামালখান এলাকায় প্রচুর বটগাছ থাকায় তার ফল খাওয়ার জন্য কোকিল ভিড় করে। গড় মওসুমেও কোকিলের ডাক শোনা যায়। আবার গভীর রাতে পেঁচার ডাক যেমন শোনা যায় তেমনি সন্ধ্যার সময় বাকুড়েরা আসে দেবদারু ও বটের ফল খাওয়ার জন্য। একটি নগরে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিদ্যমান থাকলে, সেখানে জীববৈচিত্র্য থাকে। সামঞ্জস্যমূলক জীববৈচিত্র্য থাকার কারণে মানবজীবন সুন্দর ও সাবলীল হয়ে থাকে। এখানে উল্লেখ্য যে, সম্প্রতি প্রফেসর বদরুল আমীন ভুঁইয়ার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন চট্টগ্রাম শহরের জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন। উন্নত বিশ্বের শহর ও নগরগুলোতে জীববৈচিত্র্যের শুমারি হয়ে থাকে। এতে করে একটি শহরের জীবন যাত্রা ও পরিবেশ বিষয়ক ভারসাম্য নির্ণয় করা সম্ভব নয়।
যা বলছিলাম চট্টগ্রাম নগরে সর্বত্র এখন সৌন্দর্য্য বর্ধনের কাজ চলছে। এরি মাঝে এলইডি বাতি লাগানোর জন্য রাস্তা, ফুটপাত, নালা নর্দমায় বড় বড় সিমেন্টের বøক বসানো হল। এতে করে বর্ষার পানি চলাচলে যেমন বাধাপ্রাপ্ত হতে থাকে তেমনি সড়কে অহেতুক বিড়ম্বনা দেখা দেয়। গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, এতে সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশল দপ্তর থেকে এলএডি বাতি স্থাপন প্রকল্পের নানা অসংগতির জন্য লিখিত অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। এর মাঝে আবার নতুন করে শুরু হয় নালানর্দমা পুননির্মাণের কাজ। বলা যায়, মেয়র মহোদয় নির্বাচিত হওয়ার পর নালা নর্দমা একবার মেরামত করার পর বছরখানেক পর আবার নতুন করে নালানর্দমা নির্মাণের রহস্য বোধদয় নয়। একই প্রকল্পে দুবার কাজ করে অর্থ ও শ্রম ব্যয় করা কি অপচয় নয়? প্রথমেই যদি পরিকল্পনা করে দুইবার না করে একবার কাজটি করা হলে অর্থ অপচয় যেমন হত না, তেমনি নগরবাসী দুইবার নালা নর্দমা করার ভোগান্তি থেকে রক্ষা পেতেন।
সম্প্রতি কোতোয়ালী, ফিরিঙ্গ