ঘুম ভেঙেছিল প্রবাসী নারীর কান্নার আওয়াজে

শাফিনেওয়াজ শিপু

31

বলতে গেলে আধা ঘুম তখনই চলে গেল। বাকি আধা ঘুম একেবারে উড়ে গেলো যখন তার উত্তর পেলাম। খুব অস্বাভাবিক ছিলো উত্তরটা।
ভাবির উত্তরে যতটুকু বুঝলাম যে, এই নারী দিবস আমাদের পালন করা উচিত নয়। কারণ ভাবির ভাষ্যমতে, এই পৃথিবীতে সংসার নাকি পুরুষদের জন্য টিকে থাকে!
টাকাই জীবনে সব এবং সংসারের জন্য এই টাকা রোজগার করে আনেন পুরুষরা। সংসারে পুরুষ অত্যাচার করুক আর নাই করুক, কোনো কিছুরই প্রতিবাদ করা উচিৎ নয়! খুব অবাক হয়ে আমি ভাবির কথাগুলো শুনছিলাম ওই মুহূর্তে।
ভাবি বলতে লাগলেন, ‘কোনো মুসলিম নারীর এই ধরনের দিবস পালন করা উচিত নয়। কারণ নারীরা এমনভাবে চলাফেরা করবে যাতে অন্য পুরুষরা দেখতে না পায়।’ শুধু তাই নয়, তিনি আরো বললেন, ‘পুরুষরা তো তাদের জন্য পুরুষ দিবস দাবি করে না। তাহলে আমরা নারীরা প্রতিক্ষণে নারী দিবস নারী দিবস করে কেন চিৎকার করি?’
ভাবি এবার আমার দিকে একটা কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘শিপু, তোমার কি মনে হয় না এই নারী দিবস সুশীল সমাজের জন্য একটা শো-অফ?’
আমি তার প্রশ্নের উত্তরে বললাম, ‘পুরুষরা নারীদের মতো শারিরীক ও মানসিকভাবে অত্যাচারিত হয় না। তাহলে তারা (পুরুষরা) কীভাবে এই দিবস দাবি করে? এই দিবস পালনের মাধ্যমে আমরা নারীদের অধিকার ও অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হতে পারি।’
আমার উত্তর শেষ করে বুঝলাম যে, কথাগুলো খামাখা অপচয় হলো। ভাবিকে আসলে বয়ান দিয়ে কোনো লাভ হবে না। কারণ তিনি ইতোমধ্যে ‘অন্য জগতে’ বসবাস করা শুরু করছেন।
আমার মনে হতে লাগলো, তিনি আসলে তার অবস্থান থেকে সত্য কথাগুলোই বলেছেন। কারণ পরিবারের মাত্র তিনজন মানুষ নিয়ে ভাবির জগতটা একেবারে ছোট। এই সুযোগে সেখানে আরেকটা যে জিনিস তার পরিবারে ও মনে জায়গা নিয়ে বসেছে সেটা হলো ‘ধর্ম’। এই ধর্মের অজুহাতে তিনি ইদানিং বেশকিছু বিষয় নিয়ে ‘অতি-আচার’ পালন করছেন। তার চিন্তা ভাবনায় সেগুলো প্রভাব ফেলছে।
এখানে যুক্তরাজ্যে অনেক বাঙালি পরিবার আছেন। এখানে বাঙালি নারীরা তাদের স্বামীদের দ্বারা অত্যাচারিত হয়েও কোনো প্রতিবাদ করেন না। কারণ তাদের মতে তিনবেলা খাবার ও এই দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করাটাই তাদের জন্য অনেক বড় আর্শীবাদ! ভাবির সঙ্গে এই ফোনালাপের পর এক পরিবারের কথা মনে পড়ে গেল আজ। পরিবারটির সঙ্গে আমরা ভাড়াটে হিসেবে ছিলাম প্রায় নয় মাস। ভালোই দিন কাটছিল। একদিন হঠাৎ করে রাত তিনটায় ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছে প্রচন্ড কান্নার আওয়াজে। আমি ও আমার বোন তখন পর্যন্ত বুঝতে পারিনি, এই কান্নার আওয়াজ কই হতে আসছে? যাই হোক, পরে বুঝলাম যে কান্নাটা আমাদের বাসাতেই। আমাদের বাড়িওয়ালা বাড়িওয়ালিকে প্রচন্ড মারছেন। আড়ি পেতে যতটুকু বুঝলাম, অত্যাচারের কারণ হলো কেন পুরুষটিকে ধূমপান করার জন্য টাকা দেওয়া হলো না!
এমনিতে বাড়িওয়ালা লোকটি সারাদিন বাসায় পরে থাকেন। কোন আয়-রোজগার করেন না। তার মধ্যে আমরা দেওয়ালের ওপাশ থেকে তার দাম্ভিকতায় ভরা কথাগুলো শুনছিলাম। চিৎকার- চেঁচামেচি ও কান্নার আওয়াজ শুনতে শুনতে মনে হলো, আসলে কোন দেশে আছি? যুক্তরাজ্যে নাকি এখনও বাংলাদেশে!
পরের দিন আমার ছোটবোন সাহস করে বাড়িওয়ালির কাছে গেলো। বললো, আপনাকে যদি আবার এভাবে অত্যাচারিত হতে দেখি তাহলে আমরা পুলিশ ডাকবো। উনি তো আপনাকে খুনও করে ফেলতে পারেন! তাছাড়া আপানাদের সন্তানরা কী শিখবে এসব দেখে।
কিন্তু খুব মর্মাহত হলাম বাড়িওয়ালি আপার উত্তর শুনে। তিনি বললেন, ‘দেখো সংসারটা টিকিয়ে রাখছি শুধু সন্তানদের কথা চিন্তা করে। তা না হলে ওরা ধ্বংস হয়ে যাবে। এর চেয়ে অত্যাচার সহ্য করে যাওয়াই ভালো।’
খুব অবাক হলাম এই ভেবে যে, এই নারী পরিবারের কথা চিন্তা করে সব সহ্য করে যাচ্ছেন। আর পুরুষটি বারবার সেই সুযোগ ব্যবহার করছেন।
যুক্তরাজ্যে অনেক বাঙালি পরিবারে এমন নারীরা আছেন। ‘বিদেশে আছি তো ভালো আছি’ এইরকম একটা আপাত সান্তনা নিজেকে দিয়ে তারা মুখবুজে সমস্ত অত্যাচার সহ্য করছেন। নিজের সুখের কথা ভুলে গিয়ে শুধু পরিবার টিকিয়ে রাখার কথা চিন্তা করছেন।
ঠিক এই ধরনের নারীদের জন্য ‘নারী দিবস’ একেবারে মূল্যহীন। ভাবির কথার যুক্তি এখানেই। কারণ তারা ভালো করে জানেন যে, প্রতিবাদ করলে সন্তানদের মানুষ করা যাবে না। সংসারও ভেঙে যেতে পারে!
বাংলাদেশ পেরিয়ে আজ আমরা উন্নত দেশে বসবাস করছি ঠিকই, কিন্তু বিবেক ও মন-মানসিকতা এখনো পরিবর্তন করতে পারিনি। যার কারণে নারীরা শুধু যে দেশে অত্যাচারিত তা নয়, বিদেশে এসেও অত্যাচারিত। ‘নারী দিবস’ এর কী মূল্য আছে তাদের কাছে!