ঘাসফড়িং ও রোহিত এবং পাখি

রোমানুর রোমান

3

চমৎকার সব স্মৃতিকথাই রোহিতের। ছোটবেলার অনুভূতি। ফুল পাখিদের সাথে খেলাধুলা। গাছে চড়া, পাখি ধরা। পাখির খাবার ঘাসফড়িং ও পোকামাকড় খুঁজে খুঁজে, ধরতে ধরতে ঘুরে বেড়ানো।
সব গল্পই আমার সাথে শেয়ার করতো সে। ভালো লাগত শুনে। এই গল্পটি যখন শুনি, শুধু ভালো লাগাই না! হাসতে হাসতে গড়া-গড়ি।
বয়স ছয়-সাত হতে না হতেই তার বাবা তাকে পাঠিয়ে দেয় শহরে। খালার বাসায় থাকে পড়ালেখার জন্য। এখন রোহিত ছোট নেই। একটু বড় হয়েছে। ফুল পাখিদের সাথে আর খেলা হয় না তার। ভুলেই গেছে ওসব। কিশোর বয়স। তাছাড়া শহরের কোলাহল। পড়ালেখার ফাঁকে-ফাঁকে ক্রিকেট ও ফুটবল খেলাটাই এখন মুখ্য।
খাওয়া-দাওয়া, লেখাপড়া, খেলাধুলা এই তার কাজ।
দীর্ঘদিন গ্রামে যাওয়া হয় না। এবার পুজোর ছুটিতে গ্রামে যাবে বলে ভাবলো। সপ্তাহখানেক ছুটি যখন পেলো, খালাকে বলে চলে গেল গ্রামের বাড়ি।
গ্রামটা আর আগের মতো নেই। থাকবেই বা কি করে সে নিজেও তো আগের মতো নেই। কত্ত ছোট ছিল তখন। যখন খাওয়া আর খেলা ছাড়া কোন কাজই ছিল না। তখন আর এখন কী করে এক হয়?
নতুন করে গ্রামের সব কিছু ঘুরে দেখার ইচ্ছা হয় তার। বাজারে যায়, ঘুরে-ফিরে কোন বন্ধু নাই। এখানে ওখানে ঘুরে ফাঁকা লাগে রোহিতের। সন্ধ্যা হতে না হতেই আঁধারের ঘনঘটা। গ্রামে বিদ্যুৎ নেই। রাস্তা দিয়ে ফেরার পথে আলো আঁধারে পাশের জঙ্গলের বাঁশ-ঝাড়ে পাখির ফুরুৎ করে উড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে ছমছম করে গাঁ।
অথচ ছোট্টবেলায় এখানেই পাখি ধরেছিল সে। ভাবে,
ছোট্টবেলায় বন্ধি খাঁচায়
পুষতাম কতো পাখি,
ঘাসফড়িংও ধরে দিতাম
আদর করে ডাকি।
কী ভীতুটাই না হয়েছে এখন! মনে হয় যেন কখনো গ্রামেই ছিল না সে।
হেমন্তকাল। নতুন ধানপাকা শুরু হয়েছে। দু’দিন পর বাবা তাকে বলল, জমিতে একটু ধান কাটার বাকি আছে। কাল দুজনে কাটবো। এ কথা শুনে সে ভয় পায়! মনে মনে ভাবে আমি কি পারব? কোনদিন কাটিনি! ধ্যাৎ মনটাই কেমন কেমন লাগছে।
তার বাবাও ভাবে শহরে থেকে থেকে কি কালচার যে শিখেছে! একটু গ্রামেরও শিখুক, কাজ করুক দুটা দিন।
কিন্তু রোহিত বলে, তুমিই কাটো বাবা ওইটুকু। বাবা বলে আমি কাল হাটে যাবো আলু কিনতে। তাই তোকে একটু দেখিয়ে দিয়ে যাবো। তুই কাটতে পারবি। সময় লাগবে না বেশি। এই ঘন্টাখানেক কাটলেই হয়ে যাবে।
– না, মানে বাবা আমার তো কাটার অভ্যাস নেই।
– কেন রে! ছোটবেলায় তো কাটতেই পারতিস না অথচ আমার ধান কাটা দেখে কাচতে নিয়ে, বাবা আমিও কাটবো, আমিও কাটবো করে কত জালিয়েছিস। সে কথা কি তোর মনে নেই? এখন বড় হয়েছিস। কাজ শেখো একটু।
– আচ্ছা কাটবো।
পরের দিন ধান কাটতে বাবার সাথে কাঁচতে হাতে গেল মাঠে। মাঠে সোনালি ধান। নিচে সবুজ ঘাস, ঘাসে ফড়িং এর বাস। কেঁচো, পোকামাকড় ইত্যাদি মাটিতে বা ধানের পাতার ভাজে-ভাজে। এই ক্ষুদ্র প্রাণীগুলো দু’একটা দেখেই রোহিত ভয়ে কাতর।
বাবা বলে, প্যান্ট খুলে লুঙ্গি পরে আসতি। বসে কাটতে সমস্যা হতো না।
রোহিত বলে, লাগবে না। প্যান্ট থাকলেও পারবো।
– সেন্ডেল রেখে কাটা শুরু কর।
এইবার খাইছি! কখন কোন পোকা কোথায় ঢুকে কামড় দেয় সেই ভয়ে লুঙ্গি পরিনি। আবার খালি পায়ে কাটলে তো পায়ে কিলবিল করবে। বাবা রে! বাবা।
কি আর করা বাবার কাছে তো ভীতুর পরিচয় দেয়া য়ায় না, পেস্টিজের ব্যাপার।
খালি পায়েই নামতে হলো তাকে। ধান কাটতে শুরু করলো। এভাবে, ওভাবে, এভাবে বলে বাবা একটু পরামর্শ দিল। তারপর চলে গেলো।
কি আর কঠিন কাজ! কাটা শুর করতে না করতে পাখিদের মেলা। যেহেতু হেমন্ত কাল। শীতের আগমনী বার্তা। পাখিদেরও আমদানি বেড়েছে। ধান কাটার ফলে পোকাগুলো বাইরে রের হচ্ছে। তাই পাখিদের কাড়াকাড়ি আর কিচিরমিচির ডাকে কান ঝালাপালা রোহিতের। কতদিন পর এই শব্দ শোনা।
ধান কাটছে সে। হঠাৎ পায়ের তালুতে কিলবিল করে গেলো একটা কেঁচো। ওরে বাবা! এটা কি? বলে উঠলো সে।
দেখে, কেঁচো। বুকে থুথু দিয়ে কাটা শুরু করলো আবার।
খানিক বাদে লাফ দিয়ে ঘাড়ে পড়লো একটা ঘাসফড়িং। আর কী না কী মনে করে ভয়ে কাঁচতে ফেলে হাত দিয়ে ঝাড়তে ঝাড়তে উল্টোপাজি রোহিত। ভয় যেন তার পিছু ছাড়ছেই না, বেড়েই চলেছে দ্বিগুণ হারে। গায়ের লোম দাড়িয়ে গেছে।
তারপর দেখে এতো একটা ঘাসফড়িং।
সে ভাবে, কী ভীতুটাই না হয়ে গেছি। গ্রামের পাখিগুলোও আমার চেয়ে সাহসী। ধরে ধরে খাচ্ছে কেঁচো, ঘাসফড়িং ।