ঘরের পুরাতন ধুলোবালি থেকে এলার্জি

অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস

26

পরিচ্ছন্ন বাড়িতেও ধুলো এলার্জি সাধারণ ঘটনা : বছরব্যাপী মানুষ ভোগে নাক থেকে পানি ঝড়ায়, চোখ চুলকানি, চোখ থেকে পানি ঝড়ায়। তার কারণ ঘরের ধুলোর জীবানু। ধুলোর কারণে এ্যাজমা রোগীদের শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়, নিঃশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে কাশি হয়।
ঘরের ধুলো থেকে এলার্জি হয় কেন : ঘরের ধুলো প্রকৃতপক্ষে অনেকেগুলো জিনিসের মিশ্রণ। এর উপাদানগুলো কম-বেশি হতে পারে এক ঘর থেকে আরেক ঘরের ফর্নিচারের প্রকারভেদে, ঘর তৈরির উপাদানের কারণে, পোষা প্রাণীর উপস্থিতির কারণে, আর্দ্রতার কারণে। ধুলোর মধ্যে থাকতে পারে সুতোর আঁশ, মানবদেহের ত্বকের মৃত কোষ, প্রাণীর লোম, আনুবীক্ষণিক জীবানু, তেলাপোকার প্রতঙ্গ, ছত্রাকের জীবানু, খাদ্যকনা এবং আরও অনেক পরিত্যক্ত ক্ষুদ্র জিনিস। এগুলোর মধ্যে প্রাণীর লোম, তেলাপোকা এবং ধুলোর জীবানু হচ্ছে প্রধান তিন বিপজ্জনক বস্তু। কোন ব্যক্তি এগুলোর যে কোনটির কারণে ভোগতে পারে এবং তিনি যখন ধুলোর সংস্পর্শে আসে, তখন এলার্জিক প্রতিক্রিয়া ঘটে ।

ধুলোর এলার্জি হলে কি বলা চলে যে এটি একটি নোংরা বাড়ি : না নোংরা বাড়ির কারণে এলার্জি সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। যদিও স্বাভাবিক ঘর পরিস্কারের প্রক্রিয়া ধুলোর এলার্জি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ ধুলোর সকল উপাদান এভাবে দূর করা সম্ভব নয়।
যেমন আপনি ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে যত চেষ্টাই করেন না কেন, কার্পেট, মাদুড় এবং বালিশ থেকে ধুলোর জীবানু দূর করতে পারবেন না বরং এতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে পড়তে পারে।
ধুলোর জীবাণুগুলো কী কী : অতি ক্ষদ্র আনুবীক্ষনিক এই প্রাণীগুলো আটপায়ের অ্যারাকনাইড় পরিবারের অন্তর্গত। আঁটুলি পোকা এবং চিগার একই পরিবারভুক্ত। এগুলো শক্ত দেহের অধিকারী। এরা ৭০০ ফারেনহাইট বা তার উচ্চ তাপমাত্রায় ভালোভাবে বাঁচতে পারে। ৭৫-৮০ শতাংশ আর্দ্রতাই এদের পছন্দ। আর্দ্রতা ৪০-৫০ শতাংশের কম হলে এদের বংশ বৃদ্ধি হয় না। শুষ্ক আবহাওয়ায় এদের দেখা যায় না ।
দেখা গেছে শতকরা ১০ ভাগ মানুষ এদের কারণে আক্রান্ত হয়। এ্যাজমা রোগীদের মধ্যে শতকরা ৯০ জনই এদের সংস্পর্শে এলে এলার্জি প্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হয় ।
এই জীবানুদের দেখ মুখমন্ডলের সংস্পর্শে এলে মানুষের এলার্জি হয়। এদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বালিশে, মাদুরে, কার্পেটের ভাজে এবং আসবাবপত্রের তলায়। ঝাড়– দিলে বা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার প্রয়োগ করলে এরা বাতাসে ভাসতে থাকে অথবা হেটে হেটে অন্যপ্রান্তে সবে যায়। এলার্জি রোগীদের শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে এবং উপসর্গ বাড়িয়ে দেয়। প্রকৃতপক্ষে যে ব্যক্তি দিনে ৮ ঘণ্টা ঘুমান তার নাক জীবনের এক-তৃতীয়াংশ সময় বালিশে বাসা বেধে থাকা জীবানুগুলোর প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে থাকে। এক প্রান্তের ধুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৯ হাজার পর্যন্ত জীবানু থাকতে পারে। গড়ে এই সংখ্যা প্রতি গ্রামে ১০ হাজার। প্রত্যেক জীবানু দিনে ১০টি নতুন সৃষ্টি করে। এদের বেঁচে থাকার মেয়াদ ৩০ দিন।
এদের খাদ্য মূলত পশুর লোম এবং ত্বকের মৃত কোষ। সুতরাং যেখানে মানুষের বাস , সেখানেই এদের বসবাস। এরা কামড়ায় না. অন্য কোন রোগ ছড়ায় না এবং মানুষের শরীরে বাাসা বাঁধে না।
এরা শুধু সেই মানুষগুলো প্রতি ক্ষতিকর যাদের এই জীবানুদের প্রতি এলার্জি রয়েছে। সাধারণত বাড়িতে যেসব জীবানুরোধ ব্যবহার করা হয়, সেগুলো দিয়ে এদের অপসারণ করা যায় না। ফলে ঘরে ধুলোর জীবাণুর পরিমাণ কমানো সম্ভব হয় না ।

ঘরে ধুলোতে ছত্রাক থাকে কেন ?
ছত্রাক থাকে সাধারণ বাইরের বাতাস। তবে যে কোন বাড়িতেই ছত্রাক কলোনি তৈরি হওয়া সম্ভব। বাড়ির বাসিন্দারা হয়তো দেয়ালো ছত্রাকের কলোনি দেখতে পায় না কিন্তু সেটি ঠিকই তৈরি হতে থাকে। দুটি জিনিস ঘরের মধ্যে ছত্রাকের কলোনি গড়তে বিশেষ ভূমিকা রাখে। (১) বেশি আর্দ্রতা শতকরা ৫০ এর বেশি। পানির পাইপে ক্ষুদ্র ফুটা বা যে কোনো পানির প্রবাহ এতে ভূমিকা রাখে। (২) দেয়ালে কোন বোর্ড থাকলে বা স্যাঁতস্যাঁতে আসবাব থাকলে সেখানে ছত্রাক জন্মায়। ছত্রাকের স্পোর কাপড়ের মাধ্যমে ছড়ায় । এই স্পোর থেকে সুনির্দিষ্ট জীবনচক্রের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ছত্রাক তৈরি হয় অনুকূল পরিবেশে । যেসব রোগীর ছত্রাকে এলার্জি আছে, তারা ছত্রাক অধ্যুষিত বাড়িতে থাকলে নিশ্চিতভাবে ছত্রাকজনিত এলার্জির শিকার হন। কারণ তারা নিঃশ্বাসের সঙ্গে ছত্রাক গলাধ করণ করেন।
ঘরের ধুলোতে তেলাপোকা থাকে কি?
তেলাকোপার বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ ঘরের ধুলোতে মিশে থাকে। বিশেষ করে পুরোনো বাড়ি ও ফ্লাটবাড়ি যেখানে বিভিন্ন ফ্লাটে বিভিন্ন পরিবার বাস করে, সেখানে তেলাপোকা নির্মূল করা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। এলার্জি আক্রান্ত ব্যক্তি বিশেষ করে এ্যাজমা রোগী এই ধরনের বাড়িতে গেলে তার উপসর্গ বেড়ে যায়। বেঁচে থাকা ও বংশবিস্তার করার জন্য তেলাপোকার দরকার খাদ্য ও আর্দ্রতা। এগুলো থেকে বঞ্চিত করতে তেলাপোকার হাত থেকে কিছুটা রক্ষা পাওয়া যায়।
ঘরের ধুলোর এলার্জি কি মৌসুমি?
দেখা গেছে আমেরিকাতে ধুলোর জীবাণুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হয় জুলাই-আগস্ট মাসে। ডিসেম্বর পর্যন্ত এই উচ্চ সংখ্যা বজায় থাকে। বসন্তের শেষের দিকে ধুলোর জীবাণু ঘটিত এলার্জির সংখ্যা সবচেয়ে কম থাকে আমেরিকায়। এই ধরনের কিছু রোগী জানিয়েছেন, তাদের উপসর্গ সবচেয়ে বেশি হয় শীতকালে। এর কারণ হচ্ছে মৃত জীবাণু এবং জীবিত জীবাণুদের বর্জ্য উভয়ই এলার্জি প্রতিক্রিয়া বাড়িয়ে দেয়। বিভিন্ন মৌসুমে ছত্রাকের পরিমানেও কমবেশি ঘটে। দেখা যায় গ্রীষ্মের সময় তেলাপোকার পরিমান বেশি হয়।
বাতাসে ধুলোকণার পরিমাণ বেশি হয়। আর গ্রীষ্মকালে মানুষ বাড়িতে সচরাচর বেশি সময় কাটায় বলে এই সময়ে এলার্জির উপসর্গও বৃদ্ধি পায়।
কীভাবে বুঝবেন যে আপনার ধুলোজনিত এলার্জি রয়েছে : এক্ষেত্রে আপনাকে এলার্জি বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে হবে। তিনি আপনার উপসর্গগুলো লক্ষ্য করবেন, আপনার গৃহ ও কর্মস্থলের পরিবেশ সম্পর্কে জানতে চাইবেন। প্রশ্ন করবেন আপনার অভ্যাস, পারিবারিক রোগের ইতিহাস, উপসর্গ কমা বাড়ার প্রবনতা, পোষা প্রাণীর ধরন সম্পর্কে। তারপরে তিনি আপনার শরীরে একটি পরীক্ষা করবেন যার নাম স্কিন-প্রিক টেস্ট। সেই সঙ্গে রক্ত পরিক্ষারও প্রয়োজন হতে পারে।

এই ধরনের এলার্জির উপসর্গ কমাতে কি করবেন :
তিনটি মৌলিক চিকিৎসার ধাপ রয়েছেঃ
ক্স ধুলোর জীবাণু থেকে দূরে থাকা
ক্স চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ
ক্স ইমিউনোথেরাপি
কীভাবে ধুলোর জীবাণু থেকে দুরে থাকবেন : পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের আগে আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে যে ঠিক কোন ধরনের ধুলো উপাদান থেকে আপনি এলার্জিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। ধুলোর জীবানু পরিপূর্ণভাবে অপসারণ করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। তবে আপনি কিছু পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারেন, যাতে পরিমানটা অন্তত কম থাকে। এলার্জি বিশষজ্ঞ এ ব্যাপারে আপনাকে পরামর্শ দিতে পারেন।
শোবার ঘরের দিকে বিশেষ নজর দিন : গড়পড়তা হিসেবে মানুষ তার জীবনের এক-তৃতীয়াংশ সময় কাটায় বেডরুমে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ধুলোর জীবাণুর পরিমাণ বেশি থাকে শোবার ঘরে। এজন্য ধুলো-এলার্জিতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে শোবার ঘরের দিকে বেশি মনযোগ দিতে হবে।
ক্স বেছে নিন এমন শোবার জিনিসপত্র যেগুলো ধুয়ে পরিষ্কার করা যায় এবং যাতে এলার্জি পরিমাণ কম থাকে। বালিশে ফোম বা তুলো ব্যবহার না করে সিনথেটিক জিনিস ব্যবহার করুন। সপ্তাহে অনন্ত একবার বিছানাপত্র ধুয়ে রেখে শুকিয়ে নিন।
ক্স সম্ভব হলে বেডরুমে এয়ারকন্ডিশনার ও আর্দ্রতারোধক যন্ত্র ব্যবহার করুন। আর্দ্রতা কম থাকলে জীবাণু ও তেলাপোকার বংশবিস্তার রোধ হবে।
ক্স জানালায় সুক্ষ্ম কাপড়ের ফিল্টার ব্যবহার করতে পারেন। এগুলো ঘন ঘন বদলাতে হবে। কাপর চোপড় ক্লোজেটে রাখুন। ক্লোজেটের ঢাকনা বন্ধ রাখবেন।
ক্স ঘরে কোনো মৃত প্রাণী বা প্রাণীর অংশ থাকলে অবিলম্বে বাইরে ফেলে দিন ।
ক্স শোবার ঘরে কখনও পোশা প্রাণীকে ঢুকতে দেবেন না।
মেঝের ধুলো কমানো :
ক্স নিয়মিত বিরতিতে ঘর পরিষ্কার করুন। মেঝে মোছার সময় স্যাঁতস্যাঁতে ও তৈলাক্ত কাপর ব্যবহার করবেন না। ঘর পরিষ্কারের সয়ম মুখে মাস্ক ব্যবহার করুন।
ক্স শোবার ঘরে কার্পেট ব্যবহার না করাই উত্তম। ব্যবহার করলেও এমন ধরনের কার্পেট নেবেন যেগুলোর আশ সুবিন্যস্ত। ক্স যেসব জিনিস ও আসবাবপত্র নিয়মিত পরিষ্কার করা সম্ভব নয়, সেগুলো বেডরুমে না রেখে অন্যত্র সরিয়ে ফেলুন।
ঘরের বাতাসের ধুলো কমানো :
এমন ধরনের এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার করুন যার দ্বারা ঘরের আর্দ্রতা শতকরা ৫০ ভাগের নিচে রাখা সম্ভব।
এসি-র ফিল্টার নিয়মিত পরিষ্কার করুন প্রয়োজনে ঘন ঘন ফিল্টার পরিবর্তন করতে হবে। তবে মনে রাখবেন যে ধুলোর জীবাণু বেশিক্ষণ বাতাসে থাকতে পারে না । তাই মেঝে ও দেয়াল পরিষ্কারের দিকেই আপনাকে বেশি নজর দিতে হবে।
লেখক : হলিস্টিক এন্ড এ্যাজমা সেন্টার, জামাল খাঁন