ঘরমুখো মানুষের ঈদ যাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন হোক

32

সাধারণ জনগণের কাছে দেশের উন্নয়নের দৃশ্যমান দৃষ্টান্ত সড়কের উন্নয়ন। বর্তমান সরকারের আমলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে বা হচ্ছে-এ কথা কারো অস্বীকার করার উপায় নেই। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণ,উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সবকটি মহাসড়ক বা বাইপার্স সড়কের উন্নয়ন অভাবিত। কিন্তু সেই তুলনায় এসব সড়কে চলা গণপরিবহনের কোন প্রত্যাশিত উন্নয়ন হচ্ছে না। গণপরিবহণের চালক থেকে হেল্পার সকলেই বিস্তৃত সড়কে নেমে নিজেদের মনে করছে, তারাই দেশের রাজা, প্রয়োজনে সব প্রজাদের চাকার নিচে পিষিয়ে মারবে। গত কয়েক বছরের সড়কের চিত্র এমনটিই দৃশ্যমান ছিল আমাদের কাছে। বিশেষ করে, যখন ঈদ উৎসব আসে তখন সড়কের গণপরিবহনের বেপরোয়াভাব আরো যেন উতলে উঠে। যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী গত তিন ঈদে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৮শ মানুষ। এর মধ্যে ২০১৮ সালে ঈদুল ফিতরে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৩৩৯ জন।
বিশেষজ্ঞরা সড়ক দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চালকের অদক্ষতা ও বেপরোয়া যানবাহন চালানোর পাশাপাশি ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, সড়ক ও সেতুর নাজুক অবস্থাকেও চিহ্নিত করেছেন। যানবাহন সড়কে বের করার আগে চাকা বা ইঞ্জিন ঠিক আছে কি না, সেটা পরীক্ষা করা যে বাধ্যতামূলক, তা অনেক পরিবহন সংস্থা ও চালকই মানেন না। ঈদের সময় সড়কে নৈরাজ্য আরও বেড়ে যায়। অধিক মুনাফার লোভে পরিবহন সংস্থাগুলো চালকদের অনেক বেশি কর্মঘণ্টা কাজ করতে বাধ্য করে। এ ছাড়া এ সময়ে ফিটনেসবিহীন যানবাহনও বেশি সড়কে নামানো হয়।
ঈদ বা অন্য কোনো পার্বণে স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে যে কয়েক গুণ বেশি মানুষ চলাচল করেন, তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে কর্তৃপক্ষ ভাবিত বলে মনে হয় না। ঈদের আগে কিছু ট্রেনের বগি বাড়িয়ে, কিছু ভাঙা সড়কে চুনকাম করে, মহাসড়কে যান চলাচলের বিষয়ে কিছু নির্দেশনা দিয়েই তারা দায়িত্ব শেষ করে। ফলে ঈদের সময়ে যাত্রীসাধারণ শুধু অবর্ণনীয় দুর্ভোগেরই শিকার হন না, বহু পরিবারে ঈদের আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়।
বাংলাদেশে তিনটি প্রধান গণপরিবহন যথাক্রমে সড়ক, ট্রেন ও নৌপথেই বেশি মানুষ চলাচল করে। এবার ঈদ উপলক্ষে ইতিমধ্যে বাস ও লঞ্চের আগাম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে গত ২২ মে থেকে। দৈনিক পূর্বদেশের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ট্রেনের টিকিট যেমন কালোবাজারে দেদারছে বিক্রি হচ্ছে, তেমন বাসের টিকিটের ভাড়া কয়েকগুণ বেশি গোণা হচ্ছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, ঈদুল ফিতরের আগে তিন দিন সড়ক-মহাসড়কে ট্রাক, লরি ও কাভার্ড ভ্যান চলাচল বন্ধ থাকবে। সড়ক ও মহাসড়ক ও সেতু বিভাগের সচিব জানিয়েছেন, জনগণের ঈদযাত্রা নির্বিঘœ করতে সব শ্রেণির মহাসড়কের চলমান মেরামতকাজ ঈদের সাত দিন আগে শেষ করা হবে। এ ছাড়া সড়ক-মহাসড়কে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত কাজ করবে।
বাস্তবতা হলো প্রতিবছর ঈদের আগে এ ধরনের ঘোষণা দেওয়া হলেও দুর্ঘটনা রোধ করা যায় নি। ঈদের সময়ে যে কয়েক গুণ যাত্রী চলাচল বেড়ে যাবে, তাদের সামাল দিতে প্রয়োজন টেকসই ও কার্যকর পদক্ষেপ। বর্ধিত যাত্রীদের কথা মাথায় রেখে বাস, ট্রেন ও লঞ্চের সংখ্যা বাড়াতে হবে, তাই বলে ফিটনেসহীন যানবাহন সড়কে নামানো যাবে না। ঈদের সময় পরিবহনমালিকদের মধ্যে যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখা যায়, তা–ও বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে, লঞ্চ, স্টিমার ও ফেরি চলাচলের ক্ষেত্রে বাড়তি সাবধানতা প্রয়োজন। কারণ এখন কালবৈশাখির ছোবল অস্বভাবিক বেড়ে গেছে। আমরা আশা করি, ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের প্রধান উৎসব ঈদকে উপলক্ষ করে নাড়ির টানে বাড়িতে যাওয়া মানুষগুলো নিরাপদ সগক পেরিয়েই আপনজনের সাক্ষাতে মিলিত হবে। এক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।