গ্রীন ও ক্লিন সিটির স্বপ্ন এবং নগরবাসীর প্রাপ্তি

ইমু আহমেদ

20

দু’বন্ধু পায়ে পায়ে হেঁটে ডা. খাস্তগীর স্কুলের সামনে এসে দাঁড়ায়। দিনটি ছিল শুক্রবার সন্ধ্যা। স্কুলের সামনে তখন গানের অনুষ্ঠান চলছিল। গান শুনতে শুনতে তারা স্কুলের সীমানা দেয়ালে গড়ে তোলা মুক্তিযুুদ্ধকেন্দ্রিক ম্যুরাল ও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি দেখলেন। বহুদিন পর জামাল খান এলাকায় এসে তারা চোখ-মন জুড়িয়ে নিলেন; মুগ্ধ হলেন। দেখতে দেখতে তারা পরস্পর বলাবলি করলেন, এই ম্যুরাল ও সবুজ বৃক্ষ-গুল্ম লাগিয়ে এলাকাটি কি সুন্দর না করা হয়েছে। বৃক্ষ সমুদয় হাওয়ার তালে নাচছে, ঠিক যেন ত¤িœ তরুণী শাড়ির সবুজ আঁচল ওড়াচ্ছে আর বলছে দেখোÑ কী আনন্দ-আলো। সেন্টমেরীস স্কুলের সামনে এসে তারা আরো হতবাক। সেখানে দেয়াল গাত্রে স্থাপন করা হয়েছে বিশ্ব ও দেশ খ্যাত মনীষীদের কয়েক জনের নামসহ অবয়ব। যাঁদের আলোয় আমরা আলোকিত হই। সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনায় আমরা এখনো তাঁদের কর্মে আশ্রয়-প্রশ্রয় খুঁজি। এসব দেখে কে না মুগ্ধ হবে, কে না উদ্বেল হবে আনন্দ বেদনায়।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন শুধু জামাল খান এলাকায় নয়, ওখান থেকে আসকার দিঘি যাওয়ার পথে রাস্তার ধারে স্থাপন করেছে এ্যাক্যুরিয়াম। সেখানে মাছের খেলা শিশুদের তো বটেই, যাতায়াতকারী পথচারীদের দিয়ে থাকে অপার আনন্দ। শিশুদের বিভিন্ন মাছ চেনারও একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাছাড়া আসকার দিঘি, আন্দরকিল্লা, জামাল খান, এয়ারপোর্ট রোড,বারিক বিল্ডিং মোড়, রেডিসন বøু মোড়, জিইসি মোড়, টাইগার পাস রোডসহ মোড়,কাজির দেউড়ি, লাভলেন, লালখান বাজার গোল চত্বরে বসানো হয়েছে বিমূর্ত ভাস্কর্য। স্টেডিয়াম ও আউটার স্টেডিয়াম এলাকাকে সাজানো হয়েছে নান্দনিক সৌন্দর্যে। আউটার স্টেডিয়ামের এক অংশ জুড়ে নির্মাণ করা হয়েছে সুইমিং পুল। এ সবের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের সৌন্দর্য প্রীতি, যা মানুষকে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করে চলেছে। প্রবর্তক মোড়ে প্রখ্যাত শিল্পী আইউব বাচ্চু স্মরণে স্থাপিত রূপালী গীটার ও সন্ধ্যায় মনোমুগ্ধকর আলোর খেলা বেশ উপভোগ্য। শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর সড়কে নৌকার উপর স্থাপন করা হয়েছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এভাবে নগরের সড়ক বিভাজন ও মোড়সমূহে গড়ে তুলছে সবুজ বেস্টনী । কাজ শেষ হলে চট্টগ্রাম সত্যিকার অর্থেই গ্রীন ও তিলোত্তমা নগরে পরিণত হবে।
নগরে এক সময় যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলা হতো। সে গার্হস্থ্য ময়লায় কুকুর বিড়াল খাবারের সন্ধানে নেমে সেগুলোকে সারা রাস্তায় করে দিত। ফলে দুর্গন্ধে রাস্তায় হাঁটাই দুষ্কর হত। বিষয়টিকে শৃঙ্খলায় ফেরানোর জন্য সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ডোর টু ডোর প্রকল্পের আওতায় নগর বাসীর ঘরে ঘরে ৯ লক্ষ প্লাস্টিক বিন প্রদানের ব্যবস্থা করেন। যেগুলো সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীরা গিয়ে সংগ্রহ করার পর নির্দিষ্ট স্থানে রাখেন এবং তা কর্পোরেশনের গাড়ি যোগে রাতের বেলা অপসারণ করা হয়। বিল বোর্ড ও হোর্ডিং-এ শহরের আকাশ ঢেকে গিয়েছিল। সেগুলো অপসারণ করে নগরবাসীকে স্বস্তি দেয়ার বিষয়টিও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরের অধিকাংশ রাস্তা ও গলিতে মেরামত কাজ ও ফুটপাত নির্মাণ দ্রæত গতিতে এগিয়ে চলেছে। সমানে চলছে সড়ক বিভাজনে সৌন্দর্যবর্ধন কাজও।
আশা করা যায়, অচিরেই চট্টগ্রাম শহর বাংলাদেশের মধ্যে একটি দৃষ্টিনন্দন ও স্মার্ট সিটিতে পরিণত হবে। তার জন্য টিকসই উন্নয়ন প্রয়োজন বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। নয় তো লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাবে।
সিটি কর্পোরেশন বর্তমানে শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতেও ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বলে জানা গেছে। তারা এক চল্লিশটি ওয়ার্ডে অবস্থিত বেশ কিছু স্কুল ও কলেজ সংস্কার করেছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হ”্ছে মধ্যম হালিশহর আহমদ মিয়া সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়,পাঠানটুলী সিটি কর্পোরেশন বালক উচ্চ বিদ্যালয়, পাথরঘাটা সিটি কর্পোরেশন বালক উচ্চ বিদ্যালয়, কদম মোবারক সিটি কর্পোরেশন উচ্চ বালক বিদ্যালয়,পোস্তারপাড় সিটি কর্পোরেশন মহিলা কলেজ,পতেঙ্গা সিটি কর্পোরেশন মহিলা কলেজ, ডাক্তার জাকির হোসেন সিটি কর্পোরেশন হোমিও প্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, গোসাইলডাঙ্গা কে বি
এ এইচ দোভাষ সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এর নতুন ভবন নির্মাণ । এছাড়া শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের অর্থায়নে নির্মাণ কাজ চলছে জামালখান কুসুম কুমারী সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়,অপর্ণাচরণ সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ,কৃষ্ণকুমারী সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, গুল-এজহার বালিকা উচ্চ বিদ্যায়, পাথরঘাটা মেনকা সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, কাপাসগোলা মহিলা কলেজ,আলকরণ নুর আহমদ সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, লামা বাজার বালক বলুয়ারদিঘি বালক উচ্চ বিদ্যালয়,পূর্ব বাকলিয়া সিটি কর্পোরেশন উচ্চ বিদ্যালয় প্রভৃতি। এতে ছাত্র-ছাত্রীরা সুন্দর পরিবেশ ও উন্নত ব্যবস্থাপনায় শিক্ষা লাভ করতে পারবে।
বর্তমানে শহরে সিটি কর্পোরেশনের ৫৬ টি স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও ৭ টি হাসপাতাল রয়েছে।এছাড়া মেয়র হেলর্থ কেয়ার কার্ড এর মাধ্যমে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে ৪১ হাজার দরিদ্র জনগোষ্ঠির জন্য বিনা মূল্যে ২৪ ধরণের স্বাস্থ্য সেবা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়।পাঠ পিপাসু মানুষের জন্য লালদিঘির দক্ষিণ পাড়ে অবস্থিত চসিক এর জরাজীর্র্ণ লাইব্রেরি ভবনটি নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে। এতে গবেষণামূলকসহ মূল্যবান গ্রন্থসহ বিভিন্ন বিষয়ে বই স্থান পাবে। যাতে নগরের বই প্রেমিরা ও ছাত্র-ছাত্রীরা বিনা খরচে প্রয়োজনীয় বই পড়তে পারবে। নগরীর জলাবদ্ধতা দূরীকরণের জন্য চসিক প্রণীত খাল খনন প্রস্তাবে সরকার অনুমতি ও প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে এবং তিন বছরেরও অধিককাল আগে তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয় হয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে। প্রথম দিকে ঢাল তলোয়ার না থাকা যোদ্ধার মত খুঁড়িয়ে চললেও বর্তমানে সামরিক বাহিনীর চট্টগ্রাম কমান্ডের সার্বিক সহায়তায় খাল খনন কাজ দ্রæত এগিয়ে চলেছে। সিটি কর্পোরেশন নগরের নালা-নর্দমা,গলি ও রাস্তা ইত্যাদি পরিষ্কার ও সংস্কারে হাত দিয়েছে। সারা শহরেই এখন তা দৃশ্যমান।
সিটি কর্পোরেশন অপর এক প্রকল্পের আওতায় প্রায় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে খনন করছে বারইপাড়াÑমাইজপাড়া খাল। এটি চাক্তাই খাল থেকে শুরু করে মাইজপাড়া দিয়ে বলিরহাট হয়ে কর্ণফুলিতে মিলবে। এসব কাজ শেষ হলে বৃহত্তর বাকলিয়াসহ চকবাজার, শুলকবহর,পশ্চিম ষোলশহর, পূর্বষোলশহর,মোহরা ও চান্দগাঁ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন হবে বলে আশাকরা যাচ্ছে।
চট্টগ্রামে প্রশাসনের নীরবতায় ভূমি দস্যুরা হরহামেশাই পাহাড় কেটে যাচ্ছে। এসব কাটা পাহাড়ের বালি বৃষ্টির পানির তোড়ে নালা, খাল ও জলাশয়ে পড়ে এবং এসব ভরাট হয়ে যায়। তাছাড়া নগরবাসীরাও জলাবদ্ধতার দায় এড়াতে পারেন না। কেননা অধিকাংশ মানুষ যেখানে সেখানে, নালা-খাল-জলাশয়ে গৃহস্থালী আবর্জনা, ময়লা ইত্যাদি ছুঁড়ে দিয়ে ভরাট করে থাকে। ফলে পানি চলাচলে বাধার সৃষ্টি হয়। এতে পথচারি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। নগরে ছড়ায় নানা রোগ ব্যাধি। এ ব্যাপারে জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। নগরে আইটি পার্ক নির্মাণ সময়ের দাবি। এ পার্ক নির্মাণে ইতিমধ্যে চসিক জমি বরাদ্দ করেছে বলেও জানা গেছে এবং শিঘ্রই কাজ শুরু হবে বলে আশাকরা যাচ্ছে।
মেয়র এর প্রস্তাবের ভিত্তিতে চট্টগ্রামে মেট্রোরেল চালুর একটি প্রকল্প সরকারের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে। এটি করা গেলে চট্টগ্রাম শহরে যানজট নিরসনের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতকারী জনমানুষের কষ্ট লাঘব হবে বলেই অভিজ্ঞমহলের ধারণা। শহরে মশক নিধনেও চসিক প্রভূত কাজ করেছে। সে কারণেই গত বছর ডেঙ্গু রোগ সারা দেশে মহামারি আকার ধারণ করলেও চট্টগ্রাম মহানগরী ছিল অনেকটাই শঙ্কামুক্ত।
চট্টগ্রামে এক সময় একুশে ফের্রুয়ারিকে সামনে রেখে কয়েকটি বই মেলা হতো। সে কারণে চট্টগ্রামের পাঠক এসব মেলা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনের প্রচেষ্টা ও উদ্দ্যোগের ফলে সিটি কর্পোরেশনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় গত বছর থেকে এক ছাতার নীচে সকলে সম্মিলিতভাবে এ মেলা আয়োজনের সুযোগ পেয়েছে। তাই বর্তমানে জিমনেশিয়াম মাঠে তা জমে উঠেছে আশাতিতভাবে, প্রকাশক ও পাঠকদের সহযোগিতায়। নগরীর সাংস্কৃতিক কর্মকাÐের উন্নয়নেও তাঁর ভূমিকা অপরিসীম। এসব উন্নয়ন ও প্রকল্পের কুশিলব হচ্ছেন বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। তাঁর দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্বের কারণেই এসব উন্নয়ন ও কর্মযজ্ঞ সম্ভব হয়েছে এবং হবে বলে নগরবাসী মনে করে। আগামীতে সুযোগ পেলে তিনি চট্টগ্রামকে যে একটি আধুনিক, উন্নত, গ্রীন ও ক্লিন সিটিতে রূপান্তর করতে পারবেন, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

লেখক: পরিচালক, (প্রস), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।