গ্রাম ছিল শান্ত নগরে উত্তেজনা

নিজস্ব প্রতিবেদক ও রাজু দে, বোয়ালখালী

প্রথম বার ভোট দিতে গিয়েই বেসামাল অবস্থার মুখোমুখি হন রোকসানা আক্তার। নগরীর চান্দগাঁও এনএমসি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল ১০টার দিকে নৌকার প্রার্থী ও ধানের শীষের প্রার্থীর কর্মীদের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলেও ভয়ে কেন্দ্র ছেড়ে যান রোকসানা। বিভিন্ন কেন্দ্রে এরকম অনেক ভোটারের যেমন ভোট দেয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি, তেমনি নতুন কেউ কেউ ভোট দিয়ে হয়েছেন মহাখুশি।
গতকাল চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও-পাঁচলাইশ) আসনের উপ-নির্বাচনে নগরীর কেন্দ্রগুলোতে দফায় দফায় উত্তেজনা ছিল। প্রতিটি কেন্দ্রেই সর্বশক্তি নিয়ে দাপট দেখিয়েছে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা।
অন্যদিকে অনেকটা দিশাহীন অবস্থাতেই ভোটের মাঠে ছিল বিএনপি। প্রতিটি কেন্দ্রের ভেতর-বাইরে গলায় নৌকা প্রতীক প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা উপস্থিত থাকলেও বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের দেখা মিলেছে কম। নগরীতে চান্দগাঁও ও মোহরার কয়েকটি কেন্দ্রে বিএনপি সমর্থকদের দেখা গেলেও বোয়ালখালীতে বিএনপি প্রার্থীর এজেন্ট ও পোস্টারের দেখা মিলেনি। নগরীর পাঁচ ওয়ার্ডে ১১টার আগেই বিএনপি প্রার্থীর এজেন্ট ও ভোটারদের বের করে দেয়ার অভিযোগ তুলেছে বিএনপির নেতাকর্মীরা।
চান্দগাঁও এনএমসি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রিজাইডিং অফিসার আলী ইমাম বলেন, কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ হয়েছে। কেন্দ্রের বাইরে ঝামেলা হলেও সেগুলো আমাদের বিষয় না। মোট পাঁচ হাজার ৯১০ জন ভোটারের মধ্যে ৩০ শতাংশ ভোটগ্রহণ হয়েছে।
সকাল ৯টায় ভোট গ্রহণ শুরুর পর বহদ্দারহাটের এখলাছুর রহমান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোছলেম উদ্দিন আহমেদ ও বিএনপি প্রার্থী আবু সুফিয়ানের মধ্যে দেখা হয়। দুই প্রার্থী এসময় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে হাস্যজ্জ্বলভাবে কোলাকুলি করেন।
সকাল ১০টার দিকে বিএনপি প্রার্থী আবু সুফিয়ান চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় সিডিএ পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিতে যান। ভোট দিয়ে বের হওয়ার সময় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন নেতাকর্মী সুফিয়ানকে বাধা দেন।
তখন সুফিয়ান নিজেই সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, আমিতো অবরুদ্ধ। পরে পুলিশ গিয়ে সুফিয়ানকে উদ্ধার করেন।
সকাল ৯টা ২০ মিনিটে নগরীর বাকলিয়া নূরনগর এলাকায় মজিদিয়া ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটাররা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এক মাদ্রাসায় দুই কেন্দ্রে মোট ভোটারের মধ্যে পুরুষ ২৩৪৮ জন এবং মহিলা ২৫৫৪ জন। পুরুষ কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মো. সালাহউদ্দিন বলেন, ‘খুব সুন্দরভাবে ইভিএম এ ভোট হচ্ছে। কারও কোন অভিযোগ নেই।’
রাবেয়া-বশর ইনস্টিটিউটের সামনে গিয়ে দেখা যায়, নৌকা এবং ধানের শীষের সমর্থকদের পৃথক জটলা। দুপক্ষ কেন্দ্রের দুইদিকে অবস্থান নিয়েছে। এ কেন্দ্রে ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মারধর করে বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টদের বের করার অভিযোগ তুলেছেন ভোটাররা। ভোটগ্রহণ শুরুর আগে সেখানে ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। চান্দগাঁও মোহরার দুটি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে কয়েকদফা উত্তেজনা দেখা দেয়। এ সময় একটি কেন্দ্রে উভয় পক্ষের মধ্যে মারামারির ঘটনাও ঘটে। এতে কয়েকজন ছাত্রলীগ কর্মী আহত হন।
এদিকে বোয়ালখালী উপজেলায় ভোটের আগে উত্তাপ ছড়ালেও নির্বাচনের দিন পরিবেশ ছিল শান্ত। কুয়াশা ঘেরা সকাল থেকেই ভোটারদের উপস্থিতিতে সরব হয়ে উঠে কেন্দ্রগুলো। কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিয়েছেন ভোটাররা।
গতকাল সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত উপজেলার ৬৯টি কেন্দ্রে প্রথমবারের মতো ইভিএমে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোটাররা ভোট দিতে গিয়ে নিজের ছবি সম্বলিত জাতীয় পরিচয়পত্র দেখতে পেয়েছেন মেশিনে। এ নিয়েই আলোচনায় সরব ছিলেন তারা।
সরজমিন দেখা যায়, সকাল থেকে উপজেলার প্রতিটি কেন্দ্রে ছিল আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর কড়া নিরাপত্তা। কেন্দ্রের আশেপাশে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রায় কেন্দ্রে বিএনপি ও অন্যান্য প্রার্থীর কর্মী সমর্থকদের দেখা মেলেনি। নির্বাচনী এজেন্টের উপস্থিতিও ছিল না অনেক কেন্দ্রে।
তবে সব শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে ভোট কেন্দ্রে বৃদ্ধা দীপ্তি বণিক (৭২), রিনা সরকার (৭১) ও আরতী সিকদার (৭১), রাবেয়া খাতুন (৭৮), আবুল হোসেনের (৮২) দেখা মেলে কয়েকটি কেন্দ্রে। তারা জানান, জীবন সায়াহ্নে এসে এবার প্রথম মেশিনে ভোট দিয়েছেন। নতুন এক স্মৃতি যোগ হল এবারের নির্বাচনে।
বিএনপি নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, ভোট কেন্দ্রে ভোটাররা আঙুলের ছাপ দিয়ে নিজের পরিচয় সনাক্ত করলেও ব্যালেটে ভোট দিয়েছেন আওয়ামী লীগের কর্মী সমর্থকরা। দুপুরের পর থেকে কেন্দ্রগুলোতে ভোটারের উপস্থিতি কমতে থাকে।
সকাল ১১টার দিকে গোমদন্ডী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় গিয়ে দেখা যায়, বিএনপি প্রার্থীর কোন এজেন্ট নেই। কোন স্থানে লাগানো হয়নি পোস্টার। পুরো কেন্দ্র আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের দখলে। এ কেন্দ্রের ২৭৫১ ভোটের মধ্যে ৩৫৭ ভোটগ্রহণ হয়েছে বলে জানান প্রিজাইডিং কর্মকর্তা বিল্লাল হোসেন।
১টার দিকে পূর্ণচন্দ্র সেন সরোয়াতলী উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ভোটার সংখ্যা খুব কম। ভোটারদের সাথেই আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কর্মী সমর্থকরা কেন্দ্রের ভেতর প্রবেশ করছেন। এ কেন্দ্রে ১৫৮৬ ভোটের মধ্যে ৫৪৬টি ভোট দেয়া হয়েছে বলে জানান প্রিজাইডিং কর্মকর্তা জিতেন্দ্র লাল দাশ।
সারোয়াতলী নুর মোহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের বিএনপি প্রার্থীর এজেন্ট মোহাম্মদ আবুল মনসুর অভিযোগ করেন, সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ভোট কেন্দ্রে গেলে আওয়ামী লীগ সমর্থিক নেতাকর্মীরা তাকে মারধর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছে। তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন।
চরণদ্বীপ সিকদারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিকেল ৩টার দিকে দেখা গেছে, ভোটারের লাইন ছিলো প্রায় ফাঁকা। প্রিজাইডিং অফিসার গৌতম রায় জানান, ৭৩৬ ভোট কাস্ট হয়েছে। ওই কেন্দ্রে ভোটার রয়েছেন ২হাজার ৭৩০জন।
নির্বাচনের আগে বোয়ালখালী প্রচার প্রচারণায় বাধা দেওয়া, পোস্টার-ব্যানার ছেঁড়া, ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিসংযোগের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করে আসছিলেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদ্বয়।
তবে এ ধরনের কোন অপ্রীতিকর ঘটনা নির্বাচনের দিন ঘটেনি বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আছিয়া খাতুন। তিনি বলেন, উপজেলার প্রতিটি কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত ১জন জুডিশিয়াল ম্যজিস্ট্রেটসহ ১০ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, বিজিবি, পুলিশ, আনসার, এপিবিএন, র‌্যাবসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন সর্তক অবস্থানে ছিলেন। যেখানেই ঘটনার খবর পেয়েছি সেখানেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছি।