গ্রামের নাম সারোয়াতলী

ইঞ্জিনিয়ার সিঞ্চন ভৌমিক

32

“ধন্য ধন্য ধন্য মাগো সারোয়াতলী তুমি
সগৌরবে বলি মাগো, আমার জন্মভূমি।”
মানব ধর্ম আমাকে শিখিয়েছেন, ‘‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সি” অর্থাৎ মা আর মাতৃভূমি স্বর্গের চেয়েও পবিত্র। এই পৃথিবীতে মায়ের মতো নিখাদ খাঁটি প্রেম ভালোবাসার মানুষ আর কেউ হতে পারে না। একজন মানুষের সবচেয়ে বেশি আপনজন হচ্ছেন মা। এটাই চিরন্তন সত্য। এর পরবর্তী হচ্ছে জন্মভূমি, তৃষ্ণায় জল দেয় ক্ষুধায় আহার, কষ্টে ভালোবাসা, হতাশায় স্বপ্ন দেখায়। ভাবলে যেখানেই থাকি না কেন ছুটে যায় মন আকুল করা কত সুন্দর সেই আমাদের গ্রাম, নামটি তার সারোয়াতলী। মনীষীদের এই চিন্তা-চেতনা থেকে আমরা যাতে কেউ সরে না যায়। সত্যিকারের দেশপ্রেম যেন আমাদের ব্রত হয় সমাজে দেশে প্রতিষ্ঠিত করা খুবই দরকার। সত্যিকার বলতে আমাদেরকে প্রেমে সৎ হতে হবে। কেমন সৎ? জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর প্রতিটি বক্তব্যে সোনার মানুষের কথা বলেছেন। সোনার মানুষ হচ্ছে যার আত্মা সোনার মত পরিশুদ্ধ বা খাঁটি। যে সৎ, নিষ্ঠাবান, পরিশ্রমী যাকে চাইলে ক্ষয় করা যায় না। সেই মানুষ গড়ার চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। জাতির পিতার আদর্শের সেই মানুষ হতে হবে আমাদের। দৈনন্দিন জীবনে প্রতিটি কর্মে যাতে সৎ ও চরিত্রবান হই। বাসায় যেমন সৎ তেমনি কর্মক্ষেত্রে আমাদেরকে সৎ হতে হবে। মাতৃভূমিকে ভালোবাসতে হবে হৃদয় থেকে। যারা হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতে জানে তারাই মহৎ, তারাই যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে। এই কথাটি বলার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সৎ মানুষই একটা সুন্দর জাতি ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। তাঁর এই আদর্শ যেন আমাদের জীবন চলার পথে পাথেয় হয়। এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক – আমাদের গ্রামের নাম সারোয়াতলী। এটা একটা আন্দোলনের নাম। আমাদের গ্রাম কবিতায় কবি বন্দে আলী মিয়া বলেছেন ‘আমাদের ছোট গ্রাম মায়ের সমান, আলো দিয়ে, বায়ু দিয়ে বাঁচায়েছে প্রাণ। মাঠ ভরা ধান তার, জল ভরা দিঘী, চাঁদের কিরণ লেগে, করে ঝিকিমিকি।’
আমাদের সেই মাতৃতুল্য গ্রাম বহু ঘটনার কালের সাক্ষী। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব, অসংখ্য বিপ্লবী ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিধন্য এই বিপ্লবতীর্থ সারোয়াতলী গ্রাম। আর এই গ্রামের নামকে পরিবর্তন করে সম্ভবত ১৯৯১/৯২ সালের দিকে মরহুম চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ চৌধুরীর সময়ে অজ্ঞাত কারণে গ্রামের নামের সাথে মৌজার নামে কঞ্জুরী শব্দটি সংযোজন করে গ্রামের নামকরণ করে; যা আমাদের জন্য মোটেই কাম্য নয়। আমাদের গ্রামের গুরুজনদের মুখে শুনেছি, আমাদের গ্রামটি সারোয়াতলী নামে ছিল। আমিও ছোটবেলায় পড়েছি আমাদের গ্রামের নাম সারোয়াতলী। অনেক শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে অত্যন্ত কষ্টের সাথে আক্ষেপ করতে দেখেছি, যা পরবর্তীতে অনুভব করে আমিও কষ্ট পাই এবং গবেষণা করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখি, গ্রামটি সারোয়াতলী নামেই ছিল। ইতিহাসের কালের সাক্ষী হিসেবে
এখনো পরিচয় বহন করে প্রতিষ্ঠানগুলো :
১) পূর্ণচন্দ্র সেন সারোয়াতলী উচ্চ বিদ্যালয়, স্থাপিত- ১৮৮০ইং।
২) সারোয়াতলী ডাকঘর, স্থাপিত- ১৯০২ইং।
৩) দক্ষিণ সারোয়াতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, স্থাপিত- ১৯৫৭ইং।
তাই চিন্তা করলাম, পুনরায় কীভাবে আমাদের গ্রামের নাম সারোয়াতলী প্রতিষ্ঠিত করা যায়। এই গ্রামের নাম যদি পরিবর্তন করা না যায় তাহলে আমাদের অতীত ইতিহাস ঐতিহ্য সব একদিন নির্বাসিত হয়ে যাবে। হারিয়ে যাবে একটি সমাজ, একটি ইতিহাস। এর থেকে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে একটা কৌশল গ্রহণ করি। প্রথমে, ২০১২ সালে ৮ ও ৯নং ওয়ার্ডের জনসাধারণের গণস্বাক্ষর গ্রহণ করে ৮/১১/২০১২ সালে তৎকালীন চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদের কাছে একটি স্মারকলিপি প্রদান করি; যা পরবর্তীতে চেয়ারম্যান সাহেব মৌখিকভাবে প্রতিশ্রæতি প্রদান করে। কিন্তু কোন কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় ২০১৭ সালে ‘বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার স্মৃতি পরিষদ’ এর সদস্যদের নিয়ে পুনরায় অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করি। সারোয়াতলী গ্রামের জনসাধারণসহ দেশের সকল প্রগতিশীল মানুষ ‘বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার স্মৃতি পরিষদ’ এর আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করেন এবং ‘বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার স্মৃতি পরিষদ’ এর নেতৃবৃন্দকে অভিনন্দন জানান মুক্ত মনের মানুষেরা। সকলের মনে একই প্রশড়ব বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার এর জন্মস্থান চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার ৫নং সারোয়াতলী ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডে। অর্থাৎ সে গ্রামের নাম পরিবর্তন করে ‘‘কঞ্জুরী” নামকরণ করা হয়। তখন আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি যে, তারকেশ্বর দস্তিদার এর জন্মস্থানকে পুনরায় সারোয়াতলী গ্রামে রূপদান করতে না পারলে তারকেশ্বর দস্তিদারও একদিন বিস্তৃতির অথই তলে হারিয়ে যাবে এ দেশের ইতিহাস থেকে। তেমনি হারিয়ে যাবে নেতাজী সুভাষ বসুর শিক্ষক বেনী মাধব দাশ, বিপ্লবী বীর রামকৃষ্ণ বিশ্বাস, বিপ্লবী নেপাল দস্তিদার, বিপ্লবী সতীশ দস্তিদার, ব্যারিস্টার পূর্ণচন্দ্র সেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী বিধান কৃষ্ণ সেন, মো. সেকান্দর হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা মো. হোসেন, শিক্ষক আবদুল হক, সাবেক মেম্বার মনির আহমদ (চাঁদু), সাবেক মেম্বার মো. হারুন, মো. খলিলুর রহমান, মো. ইসহাক মাস্টার, ডা. ধর্মদর্শী মুৎসুদ্দী, শিক্ষক মণিন্দ্র লাল বড়ুয়া, মুক্তিযোদ্ধা বিন্দু ভূষণ বড়ুয়াসহ এই রকম অসংখ্য ইতিহাস সমৃদ্ধ ব্যক্তি ইতিহাসের পাতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন। তাই এই গ্রামের নামকে পুনরুদ্ধার করতে ০৮ ও ০৯নং ওয়ার্ডে বিশিষ্ট ঢোল বাদক অর্জুন জলদাশের মাধ্যমে ঢোল বাজানো হয় বিগত ১০/২/২০১৭ইং তারিখে আমাদের গ্রামের নাম সারোয়াতলী এই শ্লোগানে। উক্ত ঢোল বাদন অনুষ্ঠানে গ্রামের অসংখ্য মানুষ হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ সকলেই সাড়া দেয় এবং একমত পোষণ করেন। এর পরবর্তীতে আমরা খোলা চিঠি দিয়ে গ্রামের মানুষকে সজাগ করে দিই গ্রামের নাম লিখতে গিয়ে সারোয়াতলী ব্যতিরেকে অন্য কোন শব্দ না লেখার জন্য। এতে গ্রামের জনগণ আনন্দের সাথে খোলা চিঠি গ্রহণ করেন এবং অভিনন্দন জানান ‘বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার স্মৃতি পরিষদ’ কে। এই খোলা চিঠি ফেসবুকের মাধ্যমেও প্রকাশ করা হয়। এই খোলা চিঠি প্রদান অনুষ্ঠান বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ করা হয়। সাংবাদিক বন্ধুগণ বলেন, এই গ্রামের নাম প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাঁদের সহযোগিতা সবসময় অটল থাকবে।
খোলা চিঠিতে উল্লেখ ছিল যে, এই গ্রামে জন্মগ্রহণ করে এই গ্রামকে গৌরবময় ও সমৃদ্ধ করেছেন যাঁরা, তাঁদেরকে নিয়ে যত বই লিখা হয়েছে আজ পর্যন্ত সবগুলিতে তাঁদের পরিচয়ের স্বাক্ষর সারোয়াতলী নামেই অন্তর্ভুক্ত আছে। তাই আপনাদের কাছে আমরা খোলা চিঠি নিয়ে হাজির হয়েছিলাম যে, আপনারা যে কোন অবস্থাতেই আপনাদের অস্তিত্ব, আদর্শ, ইতিহাসকে ধরে রাখতে এবং কোন নবাগত সন্তানের জীবনে প্রথম পরিচয় করিয়ে দিতে সারোয়াতলী ব্যতিরেকে অন্য কোন শব্দ না লেখার জন্য এবং ঘোষণা করেছিলাম, জীবনের সর্বস্ব শক্তি দিয়ে আপনাদেরকে সাথে নিয়ে সারোয়াতলী’র ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রাখব। পরবর্তীতে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ‘বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার স্মৃতি পরিষদ’ এর পক্ষ থেকে আমি প্রেম চেয়ারম্যান বেলাল সাহেবের সাথে একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ করি এবং গ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের মনের কষ্টের কথা উপস্থাপন করি। চেয়ারম্যান সাহেব মনোযোগ সহকারে শুনেন এবং স্মারকলিপি প্রদান করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলেন। আমি এর মধ্যে গ্রামবাসীর সাথে যোগাযোগ করে চলমান বার্তার মাধ্যমে সবাইকে অবহিত করি এবং দীর্ঘ ১ মাস ফেসবুক আইডিতেও প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যায়। প্রায় ২০/২৫ জন গ্রামবাসীকে একত্রিত করে চেয়ারম্যান মহোদয়ের সদরঘাট অস্থায়ী কার্যালয়ে ফুলেল শুভেচ্ছা, স্মারকলিপি, বিপ্লবীদের আত্মজীবনীমূলক বই ‘‘মাস্টারদা সূর্য সেন ও সূর্য সাথীরা” ও বিপ্লবী স্মারক প্রদান করি। চেয়ারম্যান মহোদয় খুবই আনন্দের সাথে আমাদের স্মারকলিপি গ্রহণ করেন ২৭/১০/২০১৭ইং তারিখে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০/১০/২০১৭ইং ইউনিয়ন পরিষদের মাসিক সভায় চেয়ারম্যান মহোদয় বিষয়টি উপস্থাপন করেন। উক্ত সভায় সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদিত হয় গ্রামের নাম সারোয়াতলী। ঠিক একইভাবে বোয়ালখালী উপজেলার মাসিক সভায় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে এই আবেদন তুলে ধরেন চেয়ারম্যান আলহাজ বেলাল হোসেন সাহেব। উপস্থিত সকল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বোয়ালখালী উপজেলার চেয়ারম্যানসহ গত ১৬/১১/২০১৭ইং তারিখে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের উপস্থিতিতে সকলের সর্বসম্মতিতে বোয়ালখালী উপজেলার ৫নং সারোয়াতলী ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডকে দক্ষিণ সারোয়াতলী ও ৯নং ওয়ার্ডকে উত্তর সারোয়াতলী নামকরণের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। এই আনন্দ সংবাদে ‘বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার স্মৃতি পরিষদ’ ৮ ও ৯নং ওয়ার্ডের গ্রামের জনসাধারণের পক্ষে চেয়ারম্যানকে ৮নং ওয়ার্ডে ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮ইং তারিখে ঐতিহাসিক পদ্মপুকুর পাড় সংলগ্ন দক্ষিণ সারোয়াতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে নাগরিক সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। পরিশেষে বলতে চাই, এই আন্দোলনের পেছনে রয়েছেন যাঁরা, তাঁরা হচ্ছেন ০৮ ও ০৯নং ওয়ার্ডের জনসাধারণ ও সারা বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানুষ। যাঁরা অর্থ, শ্রম ও জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় দিয়ে পাশে ছিলেন তাদের সকলকে জানাচ্ছি ‘বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদার
স্মৃতি পরিষদ’ এর পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা। আজকের এই দিনে আমাদের শপথ নিতে হবে যে, সকলকে সজাগ থাকতে হবে। জীবনের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে এই অর্জনকে ধরে রাখতে হবে কেউ যেন ছিনিয়ে নিতে না পারে। কোন অপশক্তি যেন এর উপরে হস্তক্ষেপ করতে না পারে। এই অর্জনের পেছনে আমাদের সকলের শ্রম, মেধা, অর্থ ও মূল্যবান সময় রয়েছে। আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকেও জানিয়ে যাবো এই অর্জনের কথা।