গ্যাসের দাম বৃদ্ধি : বাড়বে জনদুর্ভোগ সিদ্ধান্ত বিবেচনা জরুরি

12

আবারো গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। আবাসিক খাতে দুই চুলার খরচ ৮০০ টাকা থেকে বাড়ি ৯৭৫ টাকা আর এক চুলার খরচ ৭৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী পূর্বের দামের চেয়ে এবার ৩২.৮ শতাংশ গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই বৃদ্ধি স্বাভাবিকভাবেই জীবনযাত্রার ব্যয় আরো বাড়াবে। এতে যে সাধারণ ভোক্তাশ্রেণির দুর্ভোগ চরমে উঠবে সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।
গত রবিবার বিকালে এক সংবাদ সম্মেলনে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে বিইআরসি। তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গতকাল ১ জুলাই থেকে নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৭ দশমিক ৩৮ টাকা থেকে ২ দশমিক ৪২ টাকা বাড়িয়ে ৯ দশমিক ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সিএনজি গ্যাসের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি ঘনমিটার ৪৩ টাকা এবং বিদ্যুৎ ও সারের জন্য ৪ দশমিক ৪৫ টাকা।
ভোক্তা অধিকারের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিলে মূল্যবৃদ্ধির এই অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের দিকে যেতে হয় না। আমরা আশা করবো জনসাধারণের সার্বিক দুর্ভোগের বিষয়টি মাথায় রেখে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তা বিবেচনা করা হবে। তারও আগে চলমান গ্যাস সংকট দূর করতে হবে। জনহিতকর সরকারের এটিই দায়িত্ব। আমরা লক্ষ্য করে আসছি বিইআরসি দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির উদ্যোগের কথা জানিয়ে আসেছে, যার বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে বিরূপ প্রতিক্রিয়াও এসেছে। সর্বশেষ গত ১১ জুন থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত রাজধানীর কারওয়ান বাজারের ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মিলনায়তনে চলে শুনানি। শুনানি শেষে বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিইআরসি।
মূলত আমদানি করা তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) কারণে এ খাতের ব্যয় বেড়েছে। গত বছর পেট্রোবাংলা-এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি পাইপলাইনে যুক্ত হয়েছে। এ বছরের মাঝামাঝি সময়ে সামিটের এলএনজিও পাইপলাইনে যুক্ত হবে। সব মিলিয়ে চলতি বছর ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সমতুল্য এলএনজি গ্রিডে আসবে, যা বর্তমানে দেশে উৎপাদিত গ্যাসের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ব্যয়বহুল এ তরলীকৃত গ্যাসের দাম সমন্বয়ের জন্যই গ্রাহক পর্যায়ে দাম বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
আমরা বরাবরাই দেখেছি ভর্তুকির কথা বলে মূল্যবৃদ্ধির শর্টকাট পথে সরকার এগোয়। দুর্মূল্যের বাজারে এমনিতেই জনসাধারণের নাভিশ্বাস উঠেছে। অধিকাংশ যানবাহন এবং ট্রাক, লরি এখন গ্যাসচালিত। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ফলে যাত্রীভাড়া বাড়বে। বাড়বে পণ্য-দ্রব্য বহনের খরচও। অপরদিকে শিল্প-কারখানায় উৎপাদিত পন্যের দামও বৃদ্ধির আশংকা করা হচ্ছে। এর ফলে নিত্যপণ্যের বাজার আরও অস্থির হবে। এই বৃদ্ধির কুফল মানুষজনকে নানাভাবে ভোগাবে।
আমরা আরো একটি বিষয় রক্ষা করে আসছি, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ভর্তুকি কমানোর জন্য মূল্যবৃদ্ধির শর্টকাট রাস্তায় চলে। অথচ দুর্নীতি কমানো, সিস্টেমলস বন্ধ করাসহ নানাবিধ উপায়ে আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সেটি করা গেলে জনসাধারণকে আর বাড়তি পয়সা গুণতে হতো না। খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে দাম বাড়ালে শেষ পর্যন্ত এর সুফল পাওয়া যায় না। ভোক্তা অধিকারের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিলে মূল্যবৃদ্ধির এই অযৌক্তিক সিদ্ধান্তের দিকে যেতে হয় না। আমরা আশা করবো জনসাধারণের সার্বিক দুর্ভোগের বিষয়টি মাথায় রেখে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। তারও আগে চলমান গ্যাস সংকট দূর করতে হবে। জনহিতকর সরকারের এটিই দায়িত্ব।
মনে রাখা প্রয়োজন গ্যাস প্রাকৃতিক সম্পদ। এর মজুত অফুরন্ত নয়। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলতে পারছেন না কতদিনের গ্যাস মজুত আছে। তাছাড়া বাসাবাড়িতে ও শিল্পকারখানায়ও চাহিদামত গ্যাস সংযোগ দেয়া যাচ্ছে না। এখনো জ্বালানি নীতিও ঠিক হয়নি অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার নিয়ে। মূল্যবান গ্যাস প্রাইভেটকারের জ্বালানি হবে, গণপরিবহনে ব্যবহৃত হবে, চুলায় জ্বলবে, নাকি শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত হবে। তাছাড়া গ্যাস সরবরাহের পদ্ধতিই বা কি হবে পাইপলাইনের মাধ্যমে-নাকি সিলিন্ডারে- ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই বিষয়গুলোর দিকেও নজর দিতে হবে। এখন থেকেই কাজ করতে হবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য।