গোপন হিমবাহ

করিম রেজা

76

বাসের কন্ডাক্টর আরো পাঁচ টাকা না নিয়ে ছাড়বেই না। একটা কথাই সে বারবার বলছে, ‘আফনের বাফের গাড়ি নাকি, দিবেন না ক্যান? এইটা সিটিং সার্ভিস। আরো পাঁচ ট্যাকা দ্যান।’ কিন্তু লাবিব তার কথায় অনড়। ফার্মগেট পর্যন্ত পনের টাকাই ভাড়া। সে এক টাকাও কম দেয়নি। রোজ কেয়ামত হয়ে গেলেও সে পনের টাকার চেয়ে এক টাকাও বেশি দিবে না। চুরি করে নয়, রক্ত পানি করে টাকা ইনকাম করে লাবিব, কন্ডাক্টরকে একথাও স্মরণ করিয়ে দিল।
ঢাকার সব লোকাল বাসের নিত্যদিনের এই একই চিত্র। আর সিটিং সার্ভিস হলো তাদের এক মহা প্রতারনার নাম। প্যাসেঞ্জার-কন্ডাক্টরের এই তর্কযুদ্ধ দেখলে মনে হবে দুটাকা-পাঁচ টাকার জন্য যেকোনো সময় খুনোখুনি ঘটে যেতে পারে। যদিও নিকট অতীতে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে শোনা যায় না। যারা এই শহরে একেবারেই নতুন বা নিতান্ত গো-বেচারা টাইপের তারা এসব ক্যাওয়াজে জড়াতে চায় না। কন্ডাক্টরের দাবী নীরবে মিটিয়ে ঝিম ধরে বসে থাকে। কেউ কেউ আবার এসব চিরন্তন ঝগড়া মেটাতে নিজের পকেট থেকে টাকা বের করে দিতে উদ্যত হয়। বেচারা হাতেম তাঈ তখন নিজের অজান্তেই নিজের গর্ত খুঁড়ে। দালাল অপবাদের ঝড় বয়ে যায় তখন তার মাথার ওপর। ঘুষখোর বা জোচ্চোর কি-না তা-ও সন্দেহ করে অনেকেই। অসহ্য গরম, নড়নচড়নহীন জগদ্দল জ্যাম আর খুনোখুনি মাত্রার এসব ঝগড়া নিয়েই বছরের পর বছর চলছে এই শহরের গণপরিবহণ জীবন। এতেই অভ্যস্ত সবাই।
তবে সুন্দরী নারী প্যাসেঞ্জারদের সাথে এসব কন্ডাক্টররা খুব একটা ঝামেলায় জড়ায় না। তারা যখন -‘মাম্মা, বাড়াবাড়ি কইরো না কইলাম’ বলে মুখের ওপর চেইন টেনে ব্যাগের মুখ বন্ধ করে দেয় তখন বেচারা কন্ডাক্টরের মুখে আর কথা বলার জোর থাকে না। ফারিয়া আজ তা-ই করল। যদিও সে পাঁচটাকা কম দিয়েছে। খুব বেয়াড়া টাইপের কন্ডাক্টর না হলে ফারিয়ার কাছ থেকে এই পাঁচ টাকা আদায় করা প্রায় অসম্ভবই বলা চলে। কন্ডাক্টর সাহস করে সেই পাঁচ টাকা দ্বিতীয়বার চেয়ে বসল।
-মাম্মা, তুমি কিন্তু বেশি বাড় বাইড়া যাইতাছ। সবার সাথেই আজ ঝগড়া লাগাইতেছ। আমি হইলাম এই রুটের ডেইলি প্যাসেঞ্জার, আর তুমি আমার সাথে করতাছ চালাকি।
-গরিবের প্যাডে লাত্থি দিয়েন না আফা। আর পাঁচটা ট্যাকা দেন। কন্ডাক্টরের ন্যায্য দাবী তারপরও শেষ হয় না। পরাজিত পুরুষকুল এসব দেখে টিপ্পনি কাটে। কিন্তু ফারিয়া এসবের থোড়াই কেয়ার করে। প্রতিদিন অফিসে যাওয়া-আসার পথে পাঁচ টাকা করে দশ টাকা রক্ষা করতে পারলে কুড়ি দিনে দুশ টাকা টিকে যায়। সে দু‘শ টাকায় অফিসে যাওয়া যায় আরো দশ দিন।
লাবিব এবং ফারিয়া একই অফিসে চাকরি করে। লাবিবের বাবা আনিসুল হক ছিলেন ডাকসাইটে উকিল। বাছ-বিচার করে মামলা নিতেন। তার হাতে মামলা মানে প্রায় নিশ্চিত জয়, এক সময় কিংবদন্তী হয়ে দাড়িয়েছিল এমন ধারনা। এর একটি খারাপ দিকও ছিল। অনেক রাঘব-বোয়াল মামলায় হেরে তার ক্ষতি করার জন্য কাড়িকাড়ি টাকা খরচ করতে কোনো দ্বিধা করত না। একবার যার ফল ভোগ করতে হয়েছিল লাবিবের চোট চাচা আরিফকে। আরিফুল হক ছিলেন একজন যশস্বী সাংবাদিক। দুঃসাহসীসব ক্রাইম রিপোর্ট করতেন। সেবার তার নামে দেশের বিভিন্ন আদালতে মামলার পর মামলা হতে লাগল। এক আদালত থেকে আরেক আদালতে ছুটতে ছুটতে তার কপর্দকশূন্য অবস্থা। শেষে জানা গেল অম্বর গ্রুপের মালিক নেপথ্যে থেকে এই আয়োজন করেছেন। কারণ জমিজমা সংক্রান্ত এক মামলায় তিনি আনিস সাহেবের বদৌলতে কোনো এক বিধবার কাছে হেরে গিয়েছেন। যার দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে আরিফকে। দুর্বিত্তদের রোষানল থেকে তারা দুভাই শেষ পর্যন্ত প্রাণে বাঁচতে পারেনি। বুড়িগঙ্গার নিষ্ঠুর কালো জল থেকে যেদিন আনিসুল হক এবং আরিফুল হকের লাশ ভেসে উঠেছিল সেদিনই দুমড়ে মুচড়ে ছারখার হয়ে গিয়েছিল লাবিবদের পরিপাটি গোছানো জীবন। তাই এখন পাঁচ টাকা বাঁচানোর জন্য দাঙ্গাবাজের মতো তাকে সকাল-সন্ধ্যা কন্ডাক্টরের সাথে চিৎকার করতে হয়।
উত্তরার এক লেডিজ হোস্টেলে থাকে ফারিয়া। চার বোনের মধ্যে সে সবার বড়। মেজ বোন আরিফা বছর সাতেক আগেই স্বয়ম্বরা হয়ে অভাবের সংসার ত্যাগ করেছিল। মা এবং অন্য দুবোন থাকে কুমিল্লা শহরে এক ভাড়া বাসায়। বাবা চাকরি করতেন চট্টগ্রাম শহরের এক স্টীল কারখানায়। কারখানার মেশিনে কাটা পড়ে যখন তিনি মারা গিয়েছেন তখন ছোটবোন সায়রার বয়স পাঁচবছর। তারপর থেকে সে একাই এই সংসার টেনে চলেছে।
ফারিয়া মিশুক প্রকৃতির মেয়ে। হেসে হেসে যেমন সবার সাথে মিলে মিশে থাকতে পারে তেমন প্রয়োজন হলে রুদ্রমূর্তিও ধারণ করতে পারে। এই শহরে তার মত স্বাধীন মেয়েদের টিকে থাকার জন্য কলাকৌশল যেমন দরকার, তেমনি উদ্ধত প্রতিবাদী ভাবমূর্তিও দরকার। হোস্টেল মালিকের লম্পট ছেলে এহসান তাকে প্রথম দিকে খুব উত্যক্ত করত। দূর থেকেই উত্যক্ত করত, গায়ে হাত দেওয়ার সাহস কখনো করেনি। যেদিন গায়ে হাত দিয়েছে সেদিন আর রক্ষা হয়নি তার। গাড়ি থেকে নেমে ফুটপাতের হালকা ভীড় পার হয়ে রিকশায় উঠতে হয়। এই ভীড়েই আগে থেকে ওত পেতে ছিল এহসান। নিতম্বে একটি শক্ত হাতের অস্তিত্ব টের পাওয়া মাত্রই ফারিয়া তৎক্ষণাৎ হামলে পড়ে তার ওপর। সেকেন্ডের মধ্যেই যেন ঘটে গেল সবকিছু। নেশাখোর শরীরের ভারসাম্য ঠিক রাখতে পারেনি। সেদিন স্রেফ দুটি লাথি খরচ করতে হয়েছিল তাকে। লাথির সাথে পরীক্ষিত গলার উদ্ধত কন্ঠস্বর। ব্যাস, বাকী সব কাজ সেরেছে রাস্তার চির প্রতিবাদী জনগণ। নারীর অপমান যারা কোনো কালেই নীরবে সহ্য করেনি।
ঢাকা শহরে বৃহ¯পতিবার সন্ধ্যা মানেই জগদ্দল নড়নচড়নহীন জ্যাম। বিশেষত এই ময়মনসিংহ রুটে। প্রায় দুঘন্টা যাবত খিলখেতে দাঁড়িয়ে আছে গাড়ি। সাধারণত এয়ারপোর্ট থেকে কোনো ভিভিআইপি আসলে এমন নিয়তির জ্যামে আটকে থাকতে হয়। মনে হচ্ছে এমন একটি অদৃশ্য জ্যামের ফাঁদে আটকে স্থবির হয়ে আছে ফারিয়ার পুরো জীবন। গত পাঁচ বছর ধরে যার কোনো নড়াচড়া নেই। বিয়ে নিয়ে সক্রিয়ভাবে সে কখনোই ভাবেনি। তার ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু হলো দুবোন এবং মা। মাস শেষে মায়ের কাছে ঠিকঠাক মতো টাকা পাঠাতে পারলেই তার সব চিন্তা শেষ। সায়মার বিএসসি শেষ হয়েছে, এখন রেজাল্টের অপেক্ষা। সায়রাকে কিছুদিন পর ঢাকাতেই নিয়ে আসবে। ফার্মগেটেই আছে অনেক কোচিং সেন্টার।
মেডিকেলে ভার্তি পরীক্ষা দিতে হলে কোথায় ভালো প্রস্তুতি নেওয়া যাবে তা ইতিমধ্যেই লাবিব তাকে জানিয়েছে। হঠাৎ লাবিবের কথাও মনে পড়ে গেল। ছেলেটা দারুণ কবিতাপ্রেমী। লাবিব কবিতা পছন্দ করে বলে ফারিয়াকেও কবিতা পছন্দ করতে হবে এমন কোনো দিব্যি দেয়নি কেউ। অথচ দেখা গেল গত বইমেলাতে ফারিয়ার কেনা সবকটি বই ছিল কবিতার। সেই বইগুলোর এতএত কবিতার মধ্যে ছোট্ট একটি কবিতা তার মনে বড়ো রকম দাগ কেটে গেছে–
কাকের ডাকে স্বপ্ন ভাঙে রোজ সকালে
স্বপ্নতো নয়, উড়াল পাখির কষ্ট উড়ে।
গলির মুখে নীলাকাশের বন্দি ফ্রেমে
আইবুড়ো এক করুণ নারীর কষ্ট আঁকে।
যাদের দিনের পর দিন কাটে নিরস প্রয়োজন মেটানোর তীব্র ছুটাছুটিতে, হিরার মতো স্ফটিক সুন্দর কবিতা আস্বাদনের সময় তাদের জীবনে থাকেই বা কোথায়! লাবিবের যেন সবকিছুই হিরার মতো সুন্দর, অন্তত ফারিয়ার তা-ই মনে হয়। তার কবিতাপ্রেম সুন্দর, কথা বলার ভঙ্গি সুন্দর, জীবনের প্রতি তীব্র অবহেলা, তা-ও সুন্দর। খুব গুছিয়ে কথা বলতে পারে লাবিব। প্রায়ই সুযোগ পেলে এক চটপটে সুন্দরী মেয়ের গল্প শোনায় তাকে। একাউন্সের কাজ দেরিতে শেষ হয় বলে তারা দুজন একই সময়ে অফিস থেকে বের হতে পারে না। কিন্তু যখন সুযোগ হয় তখন লাবিব কোনো প্রিয় নারীর গল্প শোনায়। মেয়েটির স্পষ্টবাদী আচরণ, প্রতিবাদী স্বভাব, কবিতায় অদক্ষতা আর জীবন সংগ্রামের সব উপাখ্যানই ফারিয়ার সাথে মিলে যায়। শুধু একটি জায়গায় মিলে না, তার বয়স। ‘গলির মুখে নীলাকাশের বন্দি ফ্রেমে/আইবুড়ো এক করুণ নারীর কষ্ট আঁকে।’ এসব চিন্তার মধ্যেই মায়ের ফোন বেজে উঠল।
: শোন্ মা, বিয়ের একটা প্রস্তাব আসছে।
.. শুনেই একটু লজ্জা পেয়ে গেছে ফারিয়া। যদিও তার বয়স এখন পঁয়ত্রিশ। বিয়ের জন্য এমন বাড়াবাড়ি কিছু নয়। অনেক উচ্চ শিক্ষিত মেয়ে ক্যারিয়ার সাজিয়ে এমন বয়সেই বিয়ে করে।
: ছেলে পুলিশে চাকরি করে। .. সাহসের একটি অদৃশ্য জোর অনুভব করল ফারিয়া বুকের ভিতর। এহসানকে শায়েস্তা করার পর থেকে সে সবসময় অজানা এক ভয়ে ত্রস্ত থাকে। কখন কি ঘটে যায়। গাড়িও একটু একটু নড়া চড়া শুরু করেছে। দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। ঠান্ডা বাতাস সেই বৃষ্টির আগমনী সংকেত জানিয়ে দিচ্ছে।
: ছেলেরা দুভাই, এক বইন। বইনের বিয়া হয়ে গ্যাছে। বাহ, চমৎকার তো! ফারিয়া মনে মনে ভাবলো, খুবই আদর্শ একটি পরিবার। এমন একটি পরিবারের স্বপ্নই সে দেখে। লাবিবেরও দুটি বোন আছে। সবার বড় বোনটির বিয়ে হয়েছিল লাবিবের বাবা বেঁচে থাকার সময়ই। ছোট বোনটির গতবছর। তারপরও কেন যেন লাবিবের বিয়ে করার কোনো তাড়া নেই।
কিন্তু ছেলের ছুটি কম, তাই তারা তাড়াহুড়ো করতাছে।
ফারিয়াও অফিস থেকে আচমকা বেশি ছুটি পাবে না। প্রয়োজনে মাস ছয়েক পর মধুচন্দ্রিমার ছুটি নেওয়া যাবে, ভাবতেই তার চেহারায় পূর্ণিমার রূপালী আভা খেলা করে গেল।
: ছেলের ছোট ভাই কলেজেই সায়মাকে প্রথম দেখছিল।
শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল ফারিয়ার। নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরেকবার জিজ্ঞাস করল।
: আজকে ছেলে এবং ছেলের মা আইসা সায়মার হাতে রিং পরাইয়া দিয়া গেল।
ফারিয়ার চোখ ভিজে যাচ্ছে। গাড়ি চলতে চলতে আবার কাউলার কাছাকাছি এসে থেমে গেল। বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি নেমেছে। ফারিয়ার এক জীবনের সব কান্না এতদিন বরফ হয়ে জমে ছিল।
বুকের গোপনে কোথাও লুকিয়ে থাকা সেই বরফখন্ডে আজ ধাক্কা লেগেছে। প্রচন্ড ধাক্কায় সেই গোপন হিমবাহ দুঃখিনী নদী হয়ে বয়ে চলল ফরিয়ার কপোল জুড়ে।