গুণীদের মতিভ্রম বরের চিংড়িভ্রম

মছিউদ্দৌলা জাহাঙ্গীর

3

লিখাটি একটি গল্প দিয়ে শুরু করি, দেশের গুণীদের সমাবেশ হচ্ছে বিভিন্ন জেলা হতে গুণীরা এসেছেন, সভা শেষ চট্টগ্রামের তিনি এসে পৌঁছতে পারেন নি। সকলে কনভেনশন হল ছেড়ে কনজাম্পশন হলের দিকে এগুচ্ছেন অর্থাৎ গুঞ্জন কক্ষ থেকে ভোজন কক্ষে আসা শুরু করলেন। ঠিক সে মুহূর্তে চট্টগ্রামের গুণী মশায় এসে হাজির, দেরীতে হলেও উপস্থিত তো হয়েছেন, ফলে খাবার টেবিলে গিয়ে বসলেন সবার সাথে। তাঁর আবার একটি বিশেষত্ব আছে চোখ দুটি মাশাল্লাহ বড় সুন্দর, দুটি দু’রকম একটির সাথে অপরটির মিল নেই। দেখছেন আপনাকে মনে হবে আমাকে দেখছেন আসলে আপনাকেই দেখছেন সোজা কথায় যাকে বলে ট্যারা। খাবার হাতে না চামচ দিয়ে খেতে হবে তাই বড় সুন্দর সুন্দর চামচ সরবরাহ করা হয়েছে, চামচগুলো সব সোনা দিয়ে তৈরি। ঐ যে বলেনা, সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করা, এরা তা করেছে কিনা জানিনা তবে আজ তারা সোনার চামচ মুখে দিয়ে খাবার গ্রহণ করবে। এখন সোনার চামচ দেখে নোয়াখালীর গুণীজনের মনে হয় বেশ লোভে ধরেছে ফলে চামচ একটি গোপনে তিনি কোটের পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেন। কেউ দেখেনি ফলে নির্দোষ ভালো মানুষের মতো বসে রইলেন, ঘূর্ণাক্ষরেও আঁচ করতে পারেননি যে টেরা তাঁকেই দেখেছিলেন। কাজ সারার আগে ভালো করে দেখেও নিয়ে ছিলেন, কেউ দেখেনি টেরা তাকিয়ে ছিলেন আক্কাসের দিকে। আর ওখানেই তিনি মারটা খেয়ে গেলেন, টেরা আক্কাসকে নয় উনাকেই দেখেছিলেন তিনি বুঝেননি।
খাবার-দাবার চলে এসেছে এখনই আস্বাদন শুরু হবে ঠিক তখনই টেরা উঠে দাঁড়াল; বন্ধুরা স্যরি আমি আসতে করেছি একটু দেরী তাই আপনারা কি বলেছেন শুনতে পারিনি নিজেও আমি কিছু আপনাদের শুনাতে পারিনি। এখন আমি আপনাদের একটি ম্যাজিক তথা যাদু দেখাতে চাই যদি আপনারা রাজি থাকেন। সকলে তখন হাত তালি দিয়ে তাঁকে সমর্থন জানালেন একটি চামচ তুলে নিয়ে তিনি; দেখুন চামচটি আমি আমার কোটের পকেটে ঢুকালাম এবার তা আমি অন্য জনের পকেট থেকে বের করবো। শুনে সবাই তুমুল করতালি দিয়ে আবার উৎসাহ জানালেন উৎসাহ পেয়ে টেরা নিজ আসন ছেড়ে ছুটে গেলেন নোয়াখালীর কাছে আর তাঁর পকেট থেকে চামচটি বের করে সবাইকে দেখালেন। সাথে সাথে আবার তালি টেরা সগৌরবে নিজ আসনে ফিরে এলেন। নোয়াখালীর ভদ্রলোক মনে মনে; চোরের উপর বাটপারী করলি, হারামজাদা তুই তো আক্কাইচ্যারে না আমারে’না দেখছিলি আহারে আমি বুঝিনি। ভাগ্য তার খারাপ ঐদিকে সবার সামনে দিয়ে চামচ চুরি করে টেরা বুক ফুলিয়ে বেরিয়ে গেল সাথে কত সম্মান নোয়াখাইল্যার অন্তর জ্বলে অনল প্রমাণ। আসলে করতে জানলে চুরিও একটি দারুণ আর্ট তথা শিল্প, বস্তুত এটি হলো গল্পের কথা, গল্পে অনেক কিছুই হয় বাস্তবে যা সম্ভব নয়। ছোটবেলার সে চামচ চুরির গল্প বা কৌতুকটি অনেক আগে ভুলে গিয়েছিলাম, পাকিস্তানের শিল্প মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিবের মানিব্যাগ চুরির ঘটনায় গল্পটি ফের মনে পড়ে গেল।
কদিন আগে কাগজে বেরিয়েছে পাকিস্তান সফরে আসা কুয়েতি বাণিজ্য প্রতিনিধি দলের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের মানিব্যাগ সে দেশের শিল্প মন্ত্রণা-লয়ের যুগ্মসচিব সাহেব মেরে দিয়েছেন! কথা হলো সচিব তথা আমলা যদি এমন হামলা চালান মামলা তো তবে আর সামলানো যাবেনা কারণ আমলাতন্ত্রনির্ভর দেশতো চালান আমলারা। তাই তো চুরির খবর প্রকাশ হতেই নিম্নস্তরের কর্মচারী তথা পিয়ন, চাপরাশি, দারোয়ানদের জিজ্ঞাসাবাদ ও দেহ তল্লাশি করা হয়, সচিবদের কথা কেউ মাথা’ই আনেন নি। যা কিছু হারায় গিন্নী বলেন, কেষ্ট বেটাই চোর আসলে কথা ঠিক, চুরি যা করে কেবল অফিসের পিয়ন আর বাড়ির দারোয়ান, সাহেব সব সময় নির্দোষ। তল্লাশির পরও চুরির বিষয়টি আউট না হওয়ায় কুয়েতি প্রতিনিধি দলের শক্ত প্রতিবাদের মুখে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ সিসি ক্যামেরা তল্লাশি করতে বাধ্য হলেন। আর তাতেই থলের বিড়াল বেরিয়ে এলো, কেঁচো খুঁড়তে একেবারে সাপ, খাল কেটে যেন কুমির নিয়ে এল সিসি ক্যামেরা। বড় চেষ্টা করেছিল পাকিস্তানি আমলারা ধামাচাপা দিতে কিন্তু পারে নি। হায়রে সিসি ক্যামেরা, মনে হয় সেটিও টেরা ছিল তাই সচিব মহোদয় বুঝতে পারেননি ব্যাটা তাঁকে দেখছিল না আক্কাসকে দেখছিল। তবে সমস্যা নাই বড় লোকদের জন্য এক দরজা বন্ধ হলে আরো দশ দরজা খুলে যায়, যেমন- খান বাহাদুরদের জন্যে সাত খুন মাপ। ঠিক তেমনি সচিব সাহেবকে ডাক্তারের কাছে নেওয়া হবে ডাক্তার ব্যবস্থা-পত্র দেবেন এটি তাঁর দোষ নয় রোগ। মানসিক রোগ বলে কঠিন একটি নাম বলে দেবেন এ রোগ হলে এমন হয় কিছু দেখলেই চুরি করতে ইচ্ছে করে এমন এক গাদা ব্যাখ্যা দিয়ে ডাক্তার ঔষধ লিখে দিবেন। ব্যস সচিব মাপ, অবশ্য এমন একটি অভ্যাস আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতি মহোদয়েরও ছিল তিনি নিজে বলেছেন কথাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে।
এম পি থাকাকালে হামিদ স্যার তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় যেতেন কথা বলার ফাঁকে হঠাৎ উঠে মন্ত্রী কখনো ভেতর রুমে যেতেন। টেবিলে পড়ে থাকা মন্ত্রীর বিদেশি সিগারেটের বাক্স থেকে চার-পাঁচটি শলাকা তখন তিনি সরিয়ে ফেলতেন। এদিকে মার্কেটগুলোতে বড়লোকদের বউ-বেটিরা দেখবেন সুন্দর সুন্দর দোকানগুলোতে ঢুকে, দোকানির সাথে দরদাম করে আর তার অলক্ষ্যে দামি দামি বস্তুগুলো হাত ব্যাগে ভরে। সেটিও একটি কৌশল, দেখলে মস্করা না দেখলে চুরি করে দোকানিকে সর্বস্বান্ত করে কেটে পড়ে। ধরা পড়লে দোষ নয় রোগ ভুলে করে ফেলেছে, অবশ্য এমন ভুলে যাওয়া সুবিধাজনক রোগ আরেকটি আছে তা হলো ঘুমের মধ্যে হাঁটা বড়ই মজার রোগ। যার আছে সে ছক্কা মারে আর কি অবশ্য সে মারে না, মারে যে নাটক করতে পারে সে অর্থাৎ এ রোগটির অভিনয় করা আর কি। এই যেমন সুন্দরী বিয়াইনকে দেখেই বিয়াই তো ফিট, বেড়ে গেছে তার বুকের হার্টবিট, গভীর রাতে পৌঁছে গেলেন বিয়াইনের বিছানায় ধরা পড়ে এবার চোখ বন্ধ করে হাঁটা শুরু করে দিলেন। বিষয় বিয়াইয়ের ঘুমের ভেতর হাঁটা রোগ আছে ফলে সাত খুন মাপ। নিন্দুকরা বলে সম্ভবত বেয়াইনের সাথে বে-আইনি কামের নিয়ত ছিল। সিনেমায় দেখা যায় নায়ক ঘুমের মধ্যে নায়িকার বিছানায় চলে যায়, পাশের বাড়ির দেবর সুন্দরী ভাবীর ঘরে, দেখলে মশকারি না দেখলে চুরি, ধরা পড়ে গেলে ঘুমের মধ্যে হাঁটা ধরে। হতে পারে রোগের কিংবা ভোগের তাড়নায় দু-একটি ছিঁচকে-ফুচকে কাম তারা করে ফেলে তা নাহয় সওয়া গেল। কিন্তু গলদা চিংড়ির ফান্দে পড়ে জামাই শ্বশুরের সাথে যে গলদ কামটা করে বসল তা কেমন করে সই?
বিয়ের আসরে কনেপক্ষ বরপক্ষের পাতে গলদা চিংড়ি দেয় নাই সেই ক্ষোভে বিক্ষুব্ধ হয়ে বর ছুটে গিয়ে শ্বশুরের সাথে ঝগড়া লাগিয়ে দিল! ঘটনা ঘটেছে এই চট্টগ্রামের বুকে তা’ও আবার অলিকুল শিরমণি মোহছেন আউলিয়ার পরশে ধন্য পুণ্যভূমি আনোয়ারাতে। এখন কেমন করে সই বলুন, জামাই বাবাজি তুমি এসেছ বিয়ে করতে তুমি থাকবে কনের চিন্তায় বিভোর। তোমাকে কে বলেছে চিংড়ির চিন্তায় বেঘোর হতে, তোমাদের পাশেই রয়েছে সাগর চিংড়ি কি কখনো খাও নাই? তা ছাড়া কি আছে ঐ গলদা চিংড়িতে শুধুমাত্র মাথাটা ছাড়া, গোটা দেহটাই তো তার গলদ খায় যারা তারা সবাই বলদ। না আছে কোন স্বাদ না আছে কোন পুষ্টি গোটা দেহটা তার রোগের বাসা তবে খেতে কেন এত করেছ আশা? উল্টাপাল্টা সব কাজ করে শেষে তিন লক্ষ টাকা আরো জরিমানা গুণতে হলো, ভালো হয়েছে না কাজটা? বরের আচরণ দেখে কনেপক্ষ মেয়ে দিতে অসম্মত হলেন ফলে সালিশ হলো সালিশে সিদ্ধান্ত হল দেন-মোহরের টাকার বাইরে তিন লক্ষ টাকা অতিরিক্ত দিতে হবে এবং তা নগদ। আর শ্বশুরের কাছে বরকে ক্ষমা চাইতে হয়েছে বাহ্ উচিৎ বিচার। খুব খুশি হলাম, সালিশকারকদের ধন্যবাদ সঠিক বিচার করাতে, কনেপক্ষকে ধন্যবাদ তাঁরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মেয়েকে আটকে ফেলেছেন। না হলে ব্যাটা আরো সাহস পেয়ে যেত, যেমন কুকুর তেমন মুগুর না হলে চলেনা। আচ্ছা বিয়েতে এত খাবারের দরকার কি? একটি মাছ, দুইটি মাংস আর একটি সব্জি হলেই তো যথেষ্ট, কি দরকার চৌদ্দ-পনের পদের তরকারী করার? কেউ কি খেতে পারে এত খাবার? যেটুক পারে খায় বাকীগুলো ডাস্টবিনে যায়। শুনেছি সৌদি আরবে নাকি ট্রাকে ট্রাকে উচ্ছিষ্ট খাবার ডাস্টবিনে ফেলা হয়। আশ্চর্য পাশে সিরিয়া, ইয়েমেন, ইথিওপিয়া, সোমালিয়া- আহ্ কি দুর্ভিক্ষ সেখানে বুক ফেটে যায়, হৃদয়বিদীর্ণ করা ক্রন্দনে চোখ ভেসে যায় কঙ্কালসার শিশু আর মানুষগুলোকে দেখে।
একদিকে সৌদি আরব শত শত টন খাবার ডাস্টবিনে ফেলছে, বিয়ে বা উৎসবে আমরাও প্রচুর খাবার নষ্ট করছি আর অন্যদিকে দুর্ভিক্ষকবলিত দেশগুলোতে লক্ষ লক্ষ ছেলে, বুড়ো, শিশু না খেয়ে মরছে। জঘন্য বিষয়। ইসলাম কোনদিন এমনটি খাবারের অপচয় পছন্দ করে না। শিশুরা পুকুরে ঢিল ছুঁড়ছে আর দলে দলে ব্যাঙ মারা পড়ছে শিশুরা বলছে আমরা খেলা করছি, বুড়ো ব্যাঙ বলে তোমাদের জন্য যা খেলা তা আমাদের জন্যে মৃত্যুর কারণ। ঠিক তেমন আমাদের বিলাসিতা ইথিওপিয়া, ইয়ামেন, সিরিয়াবাসীদের জন্য তা মৃত্যুর কারণ। ছোট বেলায় শুনতাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে খাদ্য বাজার চাঙ্গা রাখতে হাজার হাজার টন খাদ্য সাগরে নিয়ে ফেলত। একদিকে খাদ্যাভাবে বিশ্বে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যাচ্ছিল অন্যদিকে খাবারের দাম চাঙ্গা রাখতে যুক্তরাষ্ট্র শত শত টন খাবার সাগরে ফেলত- কি নিষ্ঠুরতা, কি নৃশংসতা! কথাটি যদি সত্য হয় আমরা তবে কোন ভালো কাজটি করছি? আমরাও তো সে একই নিষ্ঠুরতা করছি, প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে নিজে পেট পুরে খাবার গ্রহণ করো না নবীজি (সঃ)’র পরিস্কার হাদিস। তাতে কি আমরা আছি? সেই সাথে বিয়েতে লক্ষ লক্ষ টাকার যৌতুক নেওয়া হয় এগুলো তো সব অমানবিকতা। আমরা চাই সমাজ এসব হতে মুক্ত হোক। আসুন সকল অপসংস্কৃতি হতে আমরা বের হয়ে আসি। আদর্শ শিক্ষা গ্রহণ করি নৈতিক অবক্ষয় রোধ করি, দেশ, সমাজ, পৃথিবীকে ভালোবাসতে শিখি এবং সবার উপর ভালোবাসতে শিখি মানুষকে।

লেখক : কলামিস্ট