গুণিন

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

11

বহুকাল আগে কলকাতার সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায় একটি ফিচার নিবন্ধ পড়েছিলাম। তাতে টাটা কোম্পানির এক সময়কার বিখ্যাত জেনারেল ম্যানেজার রুশি মোদি সম্পর্কে আলোচনা ছিলো। লেখক তাঁর লেখার শিরোনাম দিয়েছিলেন ‘ওঝা’। রুশি মোদির জন্যই লেখক ‘ওঝা’ শব্দটি চয়ন করেন। মোদিকে মনে করা হতো ব্যবস্থাপনার গুরু। যেসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনাগত ত্রুটির কারণে মার খাচ্ছিলো, লোকসান গুণতে গুণতে অক্কা পাওয়ার উপক্রম হতো, সেসব প্রতিষ্ঠানের ভরাডুবি ঠেকানোর জন্য রুশি মোদির ডাক পড়তো।
বার্জার পেইন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরীকে নিয়ে এই লেখাটি তৈরি করতে গিয়ে আমার রুশি মোদির কথা মনে পড়ে গেলো। রুপালী চৌধুরীকে আমি ‘বিপণন বিশারদ’ উপাধিতে ভ‚ষিত করতে চাই।
কেন রূপালীকে আলোচনার বিষয়বস্তু হিসেবে বেছে নিলাম, সেটা এবার বলি। রূপালী চৌধুরী প্রথম নারী, যিনি বাংলাদেশে বহুজাতিক কোম্পানিগুলির মধ্যে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ অলংকৃত করেছেন। লিঙ্গ বৈষম্যের দেশে একজন নারীর এই কীর্তি চেঁচিয়ে বলার মতো বিষয়। তিনি ২০১৭-১৮ আয়বর্ষে চট্টগ্রাম বিভাগের সর্বোচ্চ করদাতা হিসাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সম্মাননা লাভ করেন। তিনি ২০০৪ সালে পরিচালনা পর্ষদে পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসাবে ২০০৮ সালে তিনি দায়িত্ব নেয়ার সময় বার্জারের বিক্রয় ছিল ৪৫০ কোটি টাকা যা ২০১৮ সালে দাঁড়ায় প্রায় ১৬৫০ কোটি টাকা। সর্বশেষ অর্থবছরে বার্জার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ৪৩০ কোটি টাকা প্রদান করে।
তিনি বৈচিত্র্যে বিশ্বাস করেন। তিনি পরিবেশবান্ধব পণ্যগুলির (Breathe Easy পেইন্ট, পরিবেশ বান্ধব পণ্য) মাধ্যমে কোম্পানির পণ্যসম্ভারে বৈচিত্র্য আনতে সক্ষম হন।
তিনি আইবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তিনি ১৯৮৪ সালে বহুজাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল এবং রাসায়নিক সংস্থা সিবা গেইগী (বাংলাদেশ) লিমিটেডের সাথে তার কর্মজীবন শুরু করেন, সিনিয়র অফিসার-পরিকল্পনা এবং নিয়ন্ত্রণ হিসাবে এবং প্রায় সাড়ে ছয় বছর চাকরি করেন। ১৯৯০ সালে সিবা গেইগী (বাংলাদেশ) লিমিটেড ছেড়ে আসার সময় তিনি ব্র্যান্ড ম্যানেজার ছিলেন।
বার্জার অনেক দিনের প্রতিষ্ঠান, শুনতে পাই বৈশ্বিক হিসেবে তার বয়স নাকি দুই শতাব্দী পূর্ণ করেছে। বাংলাদেশেও বার্জারের আগমনের পর কম দিন তো হলো না। মশিহ্ উল করিম সাহেবকে দিয়েই আমরা বহুকাল বার্জারকে চিনেছি। আর এখন যিনি আমাদের বার্জারকে চেনাচ্ছেন, তাঁর নাম রূপালী চৌধুরী। বার্জারের সঙ্গে রূপালীর নামের কোথাও সাদৃশ্য আছে। রূপালী রূপের ব্যঞ্জনা আনে, বার্জারও তো সেই রূপেরই উপাসনা করে। বার্জার মানে আমরা বুঝি রঙের ভুবন, নিত্য নতুন রঙের সহর্ষ উল্লাস, নানা রঙের বর্ণালী। আমাদের ঘরবাড়ি, অফিস-আদালত রঙে রঙে রাঙিয়ে তুলতে না পারলে আমাদের মনে তৃপ্তি আসে না, কল্পনা পাখাও মেলতে পারে না।
বাংলাদেশে রঙ শিল্পে আধুনিকতা আনে বার্জার; এতেই শেষ নয়, তাতে নানা মাত্রা যোগ করে শিল্পে উত্তরণ ঘটায় রঙিন ভুবনের। খুব বেশি না হলেও দেশীয় রং শিল্পে একেবারে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ।
বার্জার এখন আরো পরিণত; রঙে নানা বৈচিত্র্য, কল্পনার বিস্তার ও শৈল্পিক রুচির সমাহারে বার্জার অনন্য উচ্চতায় উপনীত। এইটি রূপালী যুগের অবদান। রূপালী বার্জারের এমডি হওয়ার পর উপর্যুপরি দু’বার ফরেন ইনভেস্টরস্ চেম্বারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। রূপালীর এই অর্জন শুধু তাঁর নিজের নয়, তাঁর প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান বার্জারের জন্যও বিরল সম্মান।
পেছনে তাকিয়ে রূপালীর কর্মজীবন এক ঝলক দেখে নেয়া যাক। ২০০৮ সালের পয়লা জানুয়ারি রূপালী চৌধুরীকে পদোন্নতি দিয়ে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিযুক্ত করা হয়। তিনি বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশ লিমিটেডের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান জেনসন অ্যান্ড নিকলসন (বাংলাদেশ) লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকও ছিলেন।
কোন জাদু বা অলৌকিক ক্ষমতাবলে রূপালী চৌধুরী কর্মজীবনে ক্রমোন্নতি এবং ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করেননি। তাহলে কী সেই মন্ত্রগুপ্তি, যা তাঁকে পেশাজীবনের সর্বোচ্চ পদে আসীন হতে সাহায্য করেছে? রূপালীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বিনয়ে বিগলিত হয়ে যান। বলেন, ‘শ্রম, অধ্যবসায়, একনিষ্ঠার সঙ্গে আমি আমার কাজ করেছি। তা পুরোপুরি পালন করতে আমি কখনো গাফিলতি করিনি। আর আমি সবসময় আমার দৃষ্টিকে সামনের দিকে প্রসারিত রেখেছি।’
বার্জার-এর এই মহান ভিশনারি পনতার নীতি, আপনার কাজ এবং মানুষকে ভালোবাসা। আবেগ ছাড়া কর্মজীবনে উন্নতি করা যায় না। অন্যদিকে জনগণ প্রেম ও যত্ন ছাড়া নেতৃত্ব মেনে নেবে না।” রূপালী সৃজনশীলভাবে প্রয়োগ করেন মার্কেটিং কৌশল। তাঁর মতে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে একটি দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য ‘ম্যানেজমেন্ট টিম’ তৈরি করা। সুতরাং বার্জারের সাফল্যের পিছনে বেশিরভাগ কৃতিত্ব এই দক্ষ ম্যানেজমেন্ট টিমেরই।
মেধার প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে চাইলে তিনি বলেন, বারো আনা শ্রম, মেধার কাজ চার আনা। এটা বিনয় ছাড়া আর কিছু নয়। রূপালী অবশ্যই একজন প্রতিভাময়ী নারী, মেধাবী এক্সিকিউটিভ। শ্রম, অধ্যবসায়-এসব আছে, কিন্তু তিনি যে প্রতিভা দিয়েই এতটা পথ হেঁটে এসেছেন তাতে আমার কোন সন্দেহ নেই।
তবে যে গুণ বা দক্ষতা দিয়ে রূপালী বাজিমাৎ করেছেন, সেটি হলো বিপণন কৌশল। ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে এক সময় শুধু উৎপাদন ও হিসাব-নিকাশই ছিলো মুখ্য। তারপর জোর পড়লো ম্যানেজমেন্ট, অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ওপর। কিছুকাল যেতে না যেতে এসে গেলো বিপণন বা মার্কেটিং-এর যুগ। রূপালী এই বিষয়টি ভালোভাবেই রপ্ত করেছেন। তাঁকে মার্কেটিংএর গুণিন বা ওঝা বলা যেতে পারে। বিপণনই সেই মন্ত্র যা শিল্প-প্রতিষ্ঠানকে উন্নতির শীর্ষদেশে পৌঁছে দিতে পারে। রূপালী চৌধুরী উচ্চস্তরের চুক্তিতে প্রধান আলোচক হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠেন এবং কোম্পানির কিছু বড় পোর্টফোলিও জয় করতে সহায়তা করেন। রূপালী চৌধুরী ১৯৯০ সালে বার্জার পেইন্টস্ বাংলাদেশ লিমিটেডে প্ল্যানিং ম্যানেজার হিসাবে যোগদান করেন এবং তার কর্মজীবনে তিনি বিপণন, বিক্রয়, বিতরণ, পরিকল্পনা ও সিস্টেমের মতো বিভিন্ন বিভাগে কাজ করেন।
রূপালী চৌধুরী আমাদের চট্টগ্রামের গৌরব; পটিয়া উপজেলার বাঁকখালীর পলল মৃত্তিকার সন্তান। তাঁর পিতা ডা. প্রিয়দর্শন চৌধুরী ছিলেন পটিয়ার স্বনামধন্য এমবিবিএস ডাক্তার এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াঙ্গনের সর্বজনমান্য ব্যক্তিত্ব। রূপালীর অগ্রজ ড. শ্যামল বিকাশ চৌধুরী আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত পানি বিশেষজ্ঞ। তাঁর স্বামী আবদুল হকও একজন সুখ্যাত ব্যবস্থাপনা ও বিপণন বিশেষজ্ঞ; সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহী তিনি। ব্যস্ত কর্মজীবনের পাশাপাশি আবদুল হক কবি এবং ঔপন্যাসিক হিসাবে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। ‘সিদ্ধার্থ হক’ নামে তিনি লেখালেখি করে থাকেন।
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীণ সাংবাদিক