গুণগত শিক্ষা, শিক্ষক এবং পাঠদান কলাকৌশল

ড. মো. আব্দুল হালিম

230

দলীয় কাজ বা জোড়ায় কাজ করার জন্য সুবিধাজনকভাবে শিক্ষার্থীদের আসনবিন্যাস। জেন্ডার সচেতনতা অনুসরণে আসন বিন্যাস। ছেলে ও মেয়েদের পৃথক সারিতে না বসিয়ে পাশাপাশি এবং মিলেমিশে বসার সুযোগ তৈরি করতে হবে। দলীয়ভাবে বা জোড়ায় কাজ করার সময় তারা যেন পারস্পরিক ভাব-বিনিময়ের সুযোগ পায়। এ ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। শ্রেণিতে অল্প মেধা ও বেশি মেধা বা কম মনোযোগী শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পারিক ভাব-বিনিয়ম অত্যন্ত জরুরি একটি পদক্ষেপ। এ উদ্দেশ্যে উভয় প্রকৃতির শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি এবং মিলেমিশে বসার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
শিক্ষণ-শিখন কৌশল : শিক্ষণ শেখানো একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ। কাজটি শ্রেণিকক্ষে যিনি যত সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে পারেন, তিনি তত দক্ষ শিক্ষক। আর এজন্য শিক্ষককে পাঠদানের পূর্বে পাঠদানের কলাকৌশল সম্পর্কে গভীরভাবে জ্ঞান অর্জন করতে হবে এটাই কাম্য। শিক্ষার্থীর সত্রিুয়তার উপর পাঠদানের আধুনিক কলাকৌশল নির্ভরশীল। যিনি শিক্ষার্থীর সক্রিয়তা অর্জনে বেশি পারদর্শী তিনি তত ভালো শিক্ষক। বিষয়বস্তুর উপর শিক্ষকের পান্ডিত্য ও দক্ষতার ওপর পাঠদান কলাকৌশল যেমন নির্ভর করে, তেমনি শিক্ষার্থীর বয়স, মেধা, আগ্রহ ও গ্রহণ ক্ষমতার ওপর ও পাঠদানের কলাকৌশল নির্ভর করে। আধুনিক উপকরণ সমৃদ্ধ উন্নত পরিবেশ ও উচ্চ বৃদ্ধির শিক্ষার্থীর জন্য শ্রেণি পাঠদানের যে কলাকৌশল হবে অনুন্নত পরিবেশ ও দূর্বল পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীর জন্য নিশ্চয়ই আলাদা কলাকৌশল প্রয়োগ করতে হবে। তাই একজন যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষককে শ্রেণি পাঠদানের পূর্ব চিন্তা করতে হবে তিনি কাদেরকে পাঠদান করবেন, শেখাবেন? কেন শেখাবেন? কি শেখাবেন? কিভাবে শেখাবেন? কখন শেখাবেন? এবং কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? এ সমস্যা থেকে উত্তরনের জন্য একজন যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক শ্রেণি পাঠদানের ক্ষেত্রে নিম্মোক্ত কৌশল প্রয়োগ করতে পারেন- শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করবেন। শিক্ষার্থীরা পাঠে অংশগ্রহণ করবে। এ ক্ষেত্রে তাদের বয়স মেধা ও গ্রহণ ক্ষমতা বিবেচনায় আনতে হবে। তাই শিক্ষককে জানতে হবে তিনি কোন শ্রেণির শিক্ষার্থীকে পাঠদান করছেন।
পাঠদানের শিখনফল কি হবে এসব শিক্ষককে অনুধাবন করতে হবে; পাঠদানের বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীর গ্রহণ উপযোগী হতে হবে। বয়সের তুলনায় জটিল বিষয় হলে তারা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে কোন পদ্ধতি প্রয়োগ করবেন তা পূর্বে থেকে নির্ধারণ করতে হবে।পাঠদানে মাঝে মাঝে বৈচিত্র্য আনতে হবে। শিক্ষক কখন পাঠদান করবেন এবং কত সময় যাবৎ পাঠদান করবেন এটা পূর্ব নির্ধারিত হতে হবে। একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীর সার্বিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা জানতে হবে। শিখনফল অর্জিত হয়েছে কিনা শিক্ষক মূল্যায়নের মাধ্যমে বিচার করবেন।
শ্রেণি ব্যবস্থাপনা : গতানুগতিক ধারায় শিক্ষকই শ্রেণিকক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। কিন্তু আধুনিক শিক্ষণ ও শ্রেণিকক্ষ পাঠদান ব্যবস্থাপনায় (এ প্রবন্ধের শেষের দিকে আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতিতে পাঠদান ব্যবস্থাপনার কিছু কৌশল আলোচনা করা হয়েছে)। শিক্ষক শিক্ষার্থী উভয়ের অংশগ্রহণের মাধ্যমে পাঠদান করা হয়ে থাকে। পাঠ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে একজন শিক্ষক কিভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করবেন, শিখন-শেখানো কার্যাবলি কেমন হবে, যথাযথ উপকরণের ব্যবহার কেমন করে করবেন, মূল্যায়ণ কিভাবে করবেন তা জানা আবশ্যক এবং নিম্মোক্ত বর্ণনা অনুযায়ী ফলপ্রসূ পাঠদান করা যেতে পারে-
শিক্ষকের প্রস্তুতি : (ক) পাঠ পরিকল্পনা প্রণয়ন করবেন (খ) শ্রেণি ব্যবস্থাপনা ও শ্রেণি বিন্যাস করবেন (গ) বিষয় বস্তুর সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও প্রেষণা সৃষ্টি করবেন।
শিখন- শেখানো কার্যাবলি : (ক) বিষয়বস্তু উপস্থাপন/আলোচনা করবেন আকর্ষণীয়ভাবে, প্রশ্ন উত্তরের মাধ্যমে (খ) সব শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে (গ) বিষয় সংশ্লিষ্ট জ্ঞানের গভীরতা থাকতে হবে (ঘ) যথাযথ শিখন-কৌশলের ব্যবহার করতে হবে। (ঙ) পাঠে একঘেয়েমি পরিহার করে পাঠদানে বৈচিত্র্য আনতে হবে (চ) পাঠের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে (ছ) প্রশ্ন করার কৌশল, ধারাবাহিকতা ক্রমোচ্চ কাঠিন্যমান রক্ষা করতে হবে (জ) শ্রেণিতে শিক্ষার্থীরা সাড়া প্রদান করবে। শিক্ষক ফিডব্যাক দিবেন (ঝ) শিক্ষক শিক্ষর্থীর পারস্পারিক ক্রিয়া অত্যন্ত আকর্ষণীয় হবে (ঞ) শিক্ষকের প্রফুল্লতা ও রসবোধ থাকতে হবে (ট) শ্রেণি উপযোগী কণ্ঠস্বর ও উচ্চারণের বিশুদ্ধতা থাকতে হবে (ঠ) শ্রেণি উপযোগী কণ্ঠস্বর ও উচ্চারণের বিশুদ্ধতা থাকতে হবে (ড) শ্রেণি কক্ষে চলাচল ও দৈহিক ভাষার প্রয়োগ করবেন।
উপকরণের ব্যবহার : (ক) সঠিক সময়ে উপকরণ প্রদর্শন করবেন (খ) ব্যবহৃত উপকরণের যথার্থতা থাকবে (গ) প্রদর্শনের পর উপকরণ সরিয়ে রাখবেন (ঘ) চকবোর্ডের/হোয়াইট বোর্ডের যথাযথ ব্যবহার করবেন।
মূল্যায়ন : (ক) শিখন ফলের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ প্রশ্নের প্রয়োগ করবেন (খ) প্রত্যাশিত শিখনফল অর্জনে সফলতা পরিমাপ করবেন (গ) প্রয়োজনে বাড়ির কাজ প্রদান করবেন (ঘ) সময় ব্যবস্থাপনা মেনে চলবেন (ঙ) ধন্যবাদ দিয়ে ক্লাস শেষ করবেন।
সুষ্ঠু শিক্ষাদান পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য : সুষ্ঠু, বিজ্ঞানভিত্তিক ও যুক্তিপূর্ণ শিক্ষাদান পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। প্রশ্ন আসে, কি কি বৈশিষ্ট থাকলে শিক্ষাদান পদ্ধতিকে সার্থক বলা যায়? এর উত্তরে বলা যায়- পদ্ধতি হবে লক্ষ্য ভিত্তিক। প্রথমে লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিয়ে লক্ষ্যের অনুকূলে বিষয়বস্তু উপস্থাপন ও লক্ষ্যে পোঁছাবার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সর্বশেষ লক্ষ্য অর্জন নির্ণয়ের জন্য যথাযথ মূল্যায়ন পদ্ধতি প্রয়োগকে একটি সুষ্ঠু রূপদান করে। সুষ্ঠু নীতির উপর ভিত্তি করে সুপরিকল্পিত পদ্ধতি প্রয়োগ হতে হবে।
শিক্ষাদান পদ্ধতি : সুষ্ঠু শিক্ষাদান পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য জানা থাকলে একজন শিক্ষকের শিক্ষাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ হয়। কারণ পাঠদানের কলাকৌশলের মধ্যে অন্যতম উপাদান হল শিক্ষাদান পদ্ধতি। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে সক্রিয় করেন এবং তথ্য সরবারাহ ও বিনিময় করেন। শিক্ষাদান পদ্ধতি একদিকে বিজ্ঞানধর্মী এবং অপদিকে সৃজনশীল শিল্পকলা। এ দুয়ের মাঝে সংযোগ সাধনের মধ্যে রয়েছে পদ্ধতি প্রয়োগের সার্থকতা।
অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে শিক্ষক- শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞাতা কাজে লাগিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করেন। দলীয় কাজ, দলীয় আলোচনা, ব্রেইন স্ট্রর্মিং, প্রশ্ন উত্তর, ইত্যাদি এ পদ্ধতির উপাদান। অংশগ্রহণমূলক পদ্ধতিতে শিক্ষাদানে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং দ্বিমুখী যোগাযোগের মাধ্যমে শিক্ষাদান পরিচালিত হয়।
মিথষ্ক্রিয়ামূলক পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীকে হাতে কলমে শিক্ষা দেওয়া হয়। বিজ্ঞান বিষয়ক ব্যবহারিক ক্লাশে এ পদ্ধতি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং আকর্ষণীয় কারণ এ পদ্ধতিতে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক আলাপ আলোচনাকে গুরূত্ব দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীর মধ্যে উৎসাহ, সাহস ও উদ্দীপনা সৃষ্টি হয় এবং পাঠে আগ্রহী হয়ে ওঠে।
সহযোগিতামূলক পদ্ধতি : সহযোগিতামূলক পদ্ধতিতে শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার একটি উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করবেন। শিক্ষণ-শিখন যাবতীয় কর্মকা- পরিচালনা করবে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষক এখানে ঋধপরষরঃধঃড়ৎ বা গড়ফবৎধঃড়ৎ হিসেবে তাদের পাঠদানে সহায়তা করেন মাত্র। এ পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে তাদের চিন্তা, চেতনা, জ্ঞান, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করে প্রদত্ত সমস্যা বিশ্লেষণ করতে পারে।
শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক পদ্ধতি : এ পদ্ধতিতে শিক্ষক কতটুকু জানেন সেটা বড় কথা নয়, শিক্ষার্থী কতটুকু জেনেছে বা জানার মধ্যে কোনো ক্রটি আছে কিনা সেটা বড় কথা। পাঠদানে শিক্ষকের অংশগ্রহণ থাকে (৫-১০ শতাংশ ) সহায়কের। কোথাও কোনো ভুলক্রটি হলে শিক্ষক শুধু ভুল সংশোধন করেন। পাঠদান শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ ৯০-৯৫ শতাংশ।
উপসংহার : শিক্ষণ-শিখন কার্যক্রম একটি উন্নত ধরনের শিল্প। শিক্ষকতা একটি পেশা নয় এটি একটি ব্রত। এই মহান পেশায় যারা নিয়োজিত তাদের চৌকস ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের হতে হবে। একজন সফল শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গরূপে অনুধাবন করবেন। সময় সম্পর্কে সচেতন থাকবেন। শ্রেণির পরিবেশ ও শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থাকে ভালভাবে উপলব্ধি করবেন। শিক্ষণ-শিখন কার্যক্রম সুুন্দরভাবে পরিচালনা জন্য তিনি বহুবিধ কৌশল সম্পর্কে জানবেন। পদ্ধতি উদ্ভাবন করবেন। সর্বোপরি তিনি শিক্ষার্থীর মানসিক উৎকর্ষ বৃদ্ধির জন্য পাঠদানে বৈচিত্র আনবেন। তাহলে আশা করা যায় গুণগত শিক্ষা সম্পাদনের মাধ্যমে একটি নৈতিকতা, মূল্যবোধ সম্পন্ন সুন্দর জাতি গঠনের দীর্ঘ্য দিনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।
(সমাপ্ত)