গুজবের গজবে আছি আজব আজাবে

99

আজ হতে ৪২/৪৩ বছর আগে আমাদের পাড়ায় ১টি ছাগলের ৩টি বাচ্চা হয়েছিল, তম্মধ্যে ১টির মুখ সামান্য গোল। তাতেই রটে গেলো ঘাসিয়ার পাড়ায় ছাগলের থেকে মানুষের বাচ্চা হয়েছে! গুজব বাতাসের আগে ছড়ায়, এখন আলোর গতিতে ছড়াচ্ছে কারণ নেট, মোবাইলের যুগ। যে কোন খবর দেশের এমাথা ওমাথা হতে দুমিনিট লাগে না। ইতোমধ্যে তা দেখেছি, কল্লাকাটা, ছেলেধরা, চাঁদে মানব চেহারা, ইত্যাদি। গুজবের কারণে দেশে অনেক গজবও নেমেছে তাই কিছুদিন বড় আজাবের মধ্যে ছিলাম। গত ৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম- ৮’র সাংসদ মঈনুদ্দিন খান বাদল মারা গেলেন। শুরু হয়ে গেল তাঁকে নিয়ে নতুন বিতর্ক। একদম আস্তিক-নাস্তিক সংঘাত, ফেবু, মিডিয়া রীতিমত ঝড় তুলেছে। তিনি তো গেলেনই আল্লাহ্র কাছে তাহলে একজন মৃতব্যক্তিকে নিয়ে এই বিতর্কের কোন মানে হয়? আসলে মৃতব্যক্তিকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করা ভালো নয়, আল্লাহ্ তাঁকে বেহেস্ত নছিব করুন, তাঁর আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি, আমিন। বস্তুতঃ মানুষ যতবড় নাস্তিকই হোক মৃত্যুর আগে দেখি আস্তিক হয়ে যায়, ভয়েÑ হাহাহাহা। কিন্তু সেখানে পুরা ব্যতিক্রম দেখলাম এস ডাব্লিউ হকিং!
আল্লারে আল্লাহ্ বড়ই ডেঞ্জেরাস আইটেম, সারাজীবন ছিলেন গোটা অবশ, মরার আগে বললেন কোন ঈশ্বর নাই! দেখলেন কি সাহস? সারা জীবন বেহুঁশ থাকার পরও তার অন্তরে খোদার ডর আসেনি। দোয়া করি আল্লাহ্ সকলকে ন্যায় ও কল্যাণের পথ দেখান, আমিন। তবে ঘটনা তা না, ঘটনা হচ্ছে গুজব। ছিলাম কোথায় এলাম কোথায়? চলুন গুজবেই ফিরে যাই। আসলে বেশ কিছুদিন ধরে মূত্র বিষয়ক এক জটিলতার মধ্যে পড়ে গেছি। এখন সেটিকে গুজব বলব না আজব বলব ভেবে পাচ্ছিনা,ভাবতে ভাবতে গজব শুরু হয়ে যাচ্ছে। আমাদের পাশের দেশ ভারত, যাকে বলা যায় আমাদের এই অঞ্চলের একটি আদর্শ রাষ্ট্র। বলা যায় ক্ষেত্র বিশেষে তাকে আমরা অনুসরণও করি। বেশ কিছুদিন যাবৎ লক্ষ্য করছি, এই আদর্শ রাষ্ট্রটি গো-মূত্র নিয়ে, এক আজব তাণ্ডব শুরু করেছে। গো-মূত্র এই, গো-মূত্র সেই, সেটি অমৃত, সেটি স্বর্গীয়, ৩৬০ রোগের প্রতিষেধক আছে তাতে। গো-মূত্র কীর্তন চলছে সেখানে, অতি পবিত্র সলিল। আবার তারও বহু আগে দেখলাম ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুরারজি দেশাইকে নিজ-মূত্র সেবন করতে। সম্ভবত এসব দেখে অতিসম্প্রতি উত্তর প্রদেশের একমন্ত্রী বাবুরাম চাচা তাঁর নিজের মুতকে পবিত্র ভাবা শুরু করেছেন। ফলে তিনি সে পবিত্র বারি তাঁর স্ত্রী নিতু চাচীর দেহে বর্ষণ করা শুরু করেছেন। কিন্তু চাচী তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করলেন, মনে হয় চাচী পতিব্রতা নন।
বসে বসে ভাবছি বিষয় কি, ভারতে মুতের এত কদর কেন? অন্তরে তো ভয় ঢুকে গেছে কারণ আমাদের দেশের সবাই যেভাবে ভারতকে অনুসরণ করা শুরু করেছে, মহিলা বিষয়ক সিরিয়াল তো একটাও বাদ যায় না। সারাদিন খালি সবাই টিভির সামনে, কেবল ভারতীয় চ্যানেল। আশ্চর্য পুঁচকে পুঁচকে ছেলেমেয়েরা পর্যন্ত কেবল হিন্দিতে কথা বলে নিজের মাতৃভাষা ভুলে গেছে! এখন যদি মুত নিয়ে সে কাণ্ড শুরু হয়ে যায় ঘরে ঘরে তাহলে তো মহাবিপদ। কারণ আমাদের ধর্মে তো মুত হারাম, অতএব বুঝুন শুরু হবে কি ব্যারাম। অবস্থা যখন তেমন চরম, দুধ নিয়ে শুনা গেল তখন এক খবর মহাগরম। শুনে দিলে শান্তি লাগল অতি পরম। সেটিও এসেছে ভারত হতে, পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি প্রধান দিলীপ ঘোষ ঘোষণা করেছেন গরুর দুধে সোনা আছে। শুনে তো আমরা হয়ে গেলাম খোশ। বাঁচা গেল দুধের কাছে এবার মার খেয়েছে মুত। আমাদের ধর্মেও রয়েছে দুধের একটি পবিত্রতম অবস্থান। আশারবাণী শুনিয়ে ঘোষ আমাদের করে দিলেন খোশ। সুতরাং এবার কেটে যাবে মূত্রকাণ্ডের সব দোষ। দারুণ এক ব্যাখ্যাও তিনি উপস্থাপন করেছেন সোনা নিয়ে, বলা যায় দুধের ঘোষ থিওরি বা ‘স্বর্ণ তত্ত্ব’। মাশাল্লাহ্ কি চমৎকার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, গরুর কুঁজে স্বর্ণনাড়ি থাকে। সূর্যের আলো পড়লে, সেখান থেকে সোনা তৈরী হয়। বরাবর সালোকসংশ্লেষণ পদ্ধতি, পাতার ক্লোরোফিল নামক রঞ্জকে সূর্যের আলো পড়লে, সেখান থেকে উদ্ভিদ খাদ্য প্রস্তুত করে। খাপে খাপ বাইন্যার মাপ, মিলে গেছে ঠিকঠাক। বিশাল এক তত্ত্ব দিলীপ কাকা আবিস্কার করে ফেলেছেন বাহ্।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে দেশে প্রচুর ডাকাতি সংঘটিত হয়েছিল। সিনিয়র সিটিজেন যারা আছেন তাঁরা অবশ্যই একথা জানেন। ধনীরা কেবল নিজেদের দরিদ্র দেখাতেন ডাকাতের ভয়ে। আবার তখন বিভিন্ন সরকারী সংস্থাকর্তৃক তদন্তও চলত ঘরে-বাইরে। তাই সম্পদশালীরা সম্পদ গোপন করতেন, সম্পদের হিসাব গোপন করতেন, সম্পদের খবরও গোপন করতেন। কেন গোপন করতেন সে কথা সবাই বুঝেন, বলা নিষ্প্রয়োজন। সে গোপন করার স্বভাব আমাদের এখনও রয়েছে। কারণ কেউ চায় না চিচিং ফাঁক করতে তাই সবাই সম্পদ গোপন করে। কিন্তু ঘোষকাকা তো গরুর সিক্রেট ওপেন করে দিলেন। গরুর চিচিং তো গোটা ফাঁক করে দিলেন! গরুর গুপ্তধনের রহস্য পুরা ফাঁস হয়ে গেল। কিছু দিন আগে ফাঁক হলো হীরার চিচিং, এখন হলো সোনার চিচিং। ঠিক আছে হীরার চিচিং ফাঁক হলো সমস্যা নাই কারণ সেটি মাটির দেড়শ মাইল নীচে, যেতে খবর আছে। কিন্তু সোনা তো একদম হাতের কাছে গরুর কুঁজের নীচে। এখন সোনার ডিম পাড়া হাঁসের ন্যায় মানুষ সব সোনা একত্রে পেতে যদি গরু জবেহ শুরুকরে, তবে তো কারবালা হয়ে যাবে। যে তত্ত¡ ঘোষকাকা দিলেন, এখন গুজব তো বড়ই ডেঞ্জেরাস, তার নজির আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে। দিলীপ কাকা যা দিলেন তা গুজব না আজব বুঝতে পারছিনা। কিন্তু উল্টাপুল্টা যদি কিছু ঘটে তাহলে গজব আর আজাব একসাথে নামবে সন্দেহ নাই, হাহাহাহা।
এখন প্রশ্ন কাকা এ তত্ত্ব কেন দিলেন? তবে কাকার তত্ত্ব বিজ্ঞানের সাথে যেমন মিলেছে, ইতিহাসের সাথে তেমন মিলেছে। ইতিহাসে আছে সোনার ডিমপাড়া পাতিহাঁসের কথা, এখন আমরা জেনেছি সোনা ফলানো গরুর কথা। সুতরাং কাকার তত্ত্ব ইতিহাস, বিজ্ঞান সবদিক থেকে ঠিক আছে। কিন্তু তিনি তত্ত্ব দিতে এ সময়কে বেছে নিলেন কেন? বিশেষ করে চতুর্দিকে যখন মুত তত্ত্বের জয়জয়কার, সে সময় তিনি হঠাৎ দুধ তত্ত্ব কেন হাজির করলেন? তাহলে কি মুত তত্ত্ব কোন মার খাচ্ছে নাকি? হতেও পারে, কারণ নিতুচাচী যেভাবে চাচার মুতের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেছেন মনে তো হয় মুতের দিন শেষ। এখন গরু নিয়ে যখন রাজনীতি, সবকিছুকে অপমান করা যায় কিন্তু গরুর মান কিছুতেই ম্লান করা যায় না। মুত দিয়ে না পারলে দুধ দিয়ে হলে গরুর মান বাঁচাতে হবে। তাই মনে হয় দিলীপ কাকা মুততত্ত্বের বদলে দুধতত্ত্ব হাজির করলেন। কাকা নেতা তাই বুদ্ধি আছে, কিন্তু কাকার চেয়ে এখন বেশী বুদ্ধিমান দেখছি জনতা। কাকা মনে করেছিলেন স্বর্ণত্ত্বত্তেবর কারণে জনতা আরো বেশী করে গরুর সেবা করবে, কিন্তু জনতা সেই খের খেলে না। কাকার তত্ত্ব প্র্রচার হওয়ার সাথে সাথে জনতা গরু বন্ধক রেখে ঋণ চাইতে শুরু করেছে। তাদের শ্লোগান ‘সোনা নিন ঋণ দিন,’ হাহাহাহা। চালাকরাজার বোকা প্রজা।
রাজা প্রজাদের শুক্রবারে মাছ ধরতে নিষেধ করলেন। ভীষণ রাজভক্ত প্রজা, রাজাজ্ঞা ন্যূনতম অমান্য করেনি। শুক্রবারে কখনো মাছ ধরেনি, কেবল নদীতে গিয়ে চারদিকে ঘেরাওটা দিয়ে আসে। শনিবার সকালে গিয়ে সুন্দর করে মাছ ধরে নিয়ে আসে। কি চমৎকার রাজাজ্ঞা পালন, রাজাকে বড়ই সম্মান করে! আমাদের দিলীপকাকার দুগ্ধতত্তে¡রও অবস্থা তা হয়েছে। কথা আছে, ‘কিছু মানুষকে সবসময়ের জন্য বোকা বানানো যায়। সবমানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানানো যায়, কিন্তু সব মানুষকে সবসময়ের জন্য বোকা বানানো যায় না।’ ভারত বিশাল এক রাষ্ট্র, শতকোটির উপর মানুষ, এত মানুষ বোকা বানানো সহজনা। কিন্তু দুঃখের কথা হল ভারতে কুসংস্কার বেশী, হাজার বছর আগে আল বিরুনীও একথা বলেছিলেন, তাই সেখানে গুরুরা সহজে শিকার ধরতে পারে। গেল ৮ ডিসেম্বর দেখলাম নিত্যানন্দ নামে এক ধর্মগুরু, সে নাকি শিব। রে ভগবানÑ দুর্গার স্বামী! সে কৈলাস পর্বতে থাকে, তার অনুসারীরা কেউ কখনোই মৃত্যুবরণ করবে না। মাগো কি কথা! ইতোমধ্যে অনেকেই টোপ গিলে ফেলেছে, দাওয়ার আছর শুরু হয়ে গেছে। একমাত্র ভারত বলেই তা সম্ভব হয়েছে, টোপ গেলাতে পেরেছে। অবশ্য খালি ভারত না, গোটা উপমহাদেশেই এ ভূত আছে। তাই এখানে রাজনীতিবিদরা ‘বেগর কুমে সদরি’ তথা বিনা মূলধনে ব্যবসা করতে পারে। এজন্যই এখানে গুরুরা শুধু নয়, গরুরাও ভগবান বনে যায়।
আমাদের পাড়ার সেই ছাগল ছানাটি একদিন মাত্র বেঁচেছিল, যেদিন হয়েছে তার পরদিন মরে গেছে। তার দেহের কোন অংশের সাথে মানবদেহের কোন অংশের বিন্দুমাত্র মিল ছিল না। তারপরও দেখতে আসা অনেকের কাছে লেগেছিল সে পুরা মানুষ! চাঁদে কোন মানবমুখ ছিল না, তথাপি অনেকে তা দেখেছে। কারণ তার মনের বিশ্বাস তার চোখে এসে জমা হয়েছে, ফলে যা নাই তা’ও সে দেখে। আমাদের মসজিদের তৎকালীন ইমাম সাহেবও সেই মুখ দেখেছিলেন চাঁদে, হাহাহাহা। সুতরাং গুজব তেমন একটি আজগুবি বিধ্বংসী শক্তি।
লেখক : কলামিস্ট