প্রশ্নপত্র ফাঁস

গন্তব্য কতদূর?

ইমরান এমি

30

গত কয়েক বছর ও চলতি বছরে লাগামহীনভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস আমাদের গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে নীতি নির্ধারকরা। যার কারণে পুরো জাতি ও অভিভাবক সমাজ হতাশায় নিমজ্জিত। কেন কির কারণে লামাহীনভাবে প্রশ্নফাঁস হচ্ছে তার কারণ না খুঁেজ দায়সারাভাব নীতিনির্ধারকদের, তারা সমস্যাটাকে সমস্যা মানতেই নারাজ!! আসলে সমস্যাকে যদি আমরা স্বীকার না করি, তাহলে সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে না, কথায় আছে সমস্যা চিহ্নিত হলেই অর্ধেক সমাধান হয়ে যায় এমনিতেই। একজন পরীক্ষার্থী পরীক্ষার হলে যাওয়ার সময় যদি জানে, তার কিছু সহপাঠী ইতিমধ্যে প্রশ্নপত্র পেয়ে গেছে, তাহলে তার ওপর কি পরিমাণ মানসিক চাপ তৈরি হয়, এটা নিশ্চয় উপলব্ধি করতে পারি আমরা।
পরীক্ষার হলে অসদুপায় অবলম্বন পাবলিক পরীক্ষার একটি দুর্বল দিক। নকল করা, পাশের জন থেকে দেখে লেখা, ক্ষেত্রবিশেষে উপস্থিত শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর বলে দেয়া ও বাইরে থেকে নকল সরবরাহ ইত্যাদি সমস্যা এক সময় প্রকট ছিল। পরীক্ষার হলে বাইরে থেকে আসা নকল অনেকাংশে কমে গেলেও বর্তমানে পরীক্ষার হলে ছাত্রদের নিজেদের মধ্যে ও ছাত্র-শিক্ষকদের পারস্পরিক সহযোগিতা ভালোভাবেই আছে বলে মনে হয়। বিশেষ করে নৈর্ব্যক্তিক অংশের উত্তরগুলো পরীক্ষার হলে অনেকটাই জানাজানি হয়ে যায়।
কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত যে কোনো পরীক্ষার প্রধান সমস্যা হল প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং এর সঙ্গে ফাঁসের গুজব। এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব যে শুধু গুজবই, ব্যাপারটা তা নয়। এটি অনেক সময় বাস্তবে পরিণত হয় এবং হচ্ছে। তাই যারা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে, পড়াশোনা তো আছেই, পাশাপাশি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ, ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও এই প্রশ্নফাঁসের গুজব তাকে আরও বেশি আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং পরীক্ষার্থীরা পড়াশুনা বাদ দিয়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র সংগ্রহেই বেশি আগ্রহী। এমনিতেই পড়াশুনাসহ পরীক্ষার চিন্তা, সঙ্গে যুক্ত হয় প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব, সব মিলিয়ে একজন শিক্ষার্থীর অবস্থা হয় অবর্ণনীয়। তাই আমরা সকলেই চাই, চিরতরে অবসান হোক এই প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ হওয়া, সঙ্গে এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজবও ছড়ানো বা রটানোরও কোনো রকম সুযোগ না থাকে তা ব্যবস্থার। কিন্তু সত্যি কি এই প্রশ্ন ফাঁস ও ফাঁসের গুজব বন্ধ করা সম্ভব? হ্যাঁ, অবশ্যই।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই ব্যাপারটিকে সময়ের প্রেক্ষিতে অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা হিসেবেই দেখা হয় আর সাধারণ ঘটনার সমাধানও অতিসাধারণ মানের শুধু প্রয়োজন সময়োপযোগী ব্যবস্থা।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার সমস্যার সমাধান করতে হলে প্রথমেই আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকে শুরু করে পরীক্ষার শুরুতে পরীক্ষার্থীদের হাতে যাওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিতে। তাহলেই দেখা যাবে কেন ও কীভাবে ফাঁস হচ্ছে এবং পাওয়া যাবে এই সমস্যার সমাধানও। প্রশ্নপত্র প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়া। প্রথমেই প্রশ্নপত্র বিভিন্ন শিক্ষকদের কাছ থেকে পাওয়ার পর তা মডারেশন করা হয়। এই কপিটি কম্পিউটারে টাইপ কবার পর পাঠানো হয় প্রেসে। প্রেসে লক্ষ লক্ষ কপি ছাপানোর পর তা প্যাকেটিং করে পাঠানো হয় নির্দিষ্ট এলাকাতে। বিভিন্ন অঞ্চলে সাধারণত এই প্রশ্নপত্র পরীক্ষার আগের দিনই পৌঁছানো হয়। পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হাজারো নিষ্ঠাবান মানুষ জড়িত থাকেন। প্রক্রিয়াতে যদিও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকে এবং সম্পাদন করা হয় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে, তারপরও বর্তমানের তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা যায় অনেকভাবেই। এই প্রক্রিয়ার রয়েছে দুর্বল দিকও। প্রথমেই টাইপের জায়গায়। প্রশ্নপত্র প্রথমে কম্পিউটারে টাইপ করা হয়। বর্তমানে এমন সব সফটওয়্যার পাওয়া যায় যার সাহায্যে ডিলিটকৃত ফাইল তো অবশ্যই, হার্ড ড্রাইভ, পেন ড্রাইভ বা মেমোরি কার্ড ফরম্যাট করার পরও সেই সব ফাইল বা ডাটা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব, অতি সহজেই। আর এখন প্রত্যেকের কাছে রয়েছে স্মার্ট মোবাইল ফোন।
একটি এসএমএস পাঠালে একসঙ্গে যতজনের নাম্বার ইনক্লুড করা আছে, সবার কাছে একসঙ্গে চলে যাবে। ইন্টারনেট ও ফেসবুক, সেটা তো তথ্যপ্রযুক্তির বৈপ্লবিক অধ্যায়ের আরেক নাম। কোনো ব্যক্তি বা কোনো পরীক্ষার্থী কোনোভাবে কোনো প্রশ্ন জানতে পারলে সেটা ফেসবুকে পোস্ট করলে কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ফ্রেন্ড লিস্টের সবাই জানতে পারছে। এভাবেই বিশেষ করে পরীক্ষার আগের রাতে একজন থেকে আরেকজন করতে করতে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে প্রায় দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে, যা একসময়ের প্রেক্ষাপটে শুধুই স্বপ্ন, সেটা বেশি দিন আগের কথা নয়। উপরন্তু, প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে তো বিভিন্ন পেইজ ও গ্রæপই খোলা হয়েছে যার সদস্য সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়িয়ে গিয়েছে, অর্থাৎ এদের যে কোনো একজনের একটি পোন্ট করার মাধ্যমে তা দেশ তো বটেই পৃথিবীব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে। তাহলে এর সমাধান কী? সমস্যার পথ ধরেই এর সমাধান সম্ভব। অর্থাৎ যেখান থেকে সমস্যার উৎপত্তি, সেখানেই সমস্যার সমাধান। হ্যাঁ, এই তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমেই প্রশ্নপত্র ফাঁস সমস্যার সমাধান করতে হবে। কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুলতে হবে। প্রশ্নপত্রগুলো যখন নির্দিষ্ট এলাকাতে এবং সেখানে সংরক্ষণ করা হয়, সে স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রক্ষকেরাই ভক্ষকের ভূমিকায় পালন হতে পারে এবং হওয়ার জন্য যথেষ্ট সুযোগ আছে। দু’তিনজন মিলে করলে সেখানে আলামত পাওয়াটাই অস্বাভাবিক এবং দোষীদের চিহ্নিত করে প্রমাণ করাটা অত্যন্ত দুরুহ। ঘটনাটি খুবই সাধারণ মানের। আমাদের সমাজে হাজারে দু-চার-পাঁচ জন অসৎ ব্যক্তি থাকবে না, এটা না ভাবাটাই অস্বাভাবিক। শুধুমাত্র এই অল্প কিছু মানুষের অসততা ও অপকর্মের কারণে পুরো ব্যবস্থাকে খারাপ ও কলুষিত বলা কোন ভাবেই উচিত না।
তেমনি হাজারো মানুষের সততা ও নিষ্ঠাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে অপমান করাও মেনে নেওয়া যায় না। সরকারের শিক্ষা ব্যবস্থা-কেন্দ্রিক সকল সাফল্য ¯øান হতে দেওয়া যায় না। এছাড়াও পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোনসেট নিয়ে পরীক্ষার্থীর প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়া সত্তে¡ও অনেকের লুকিয়ে মোবাইল নেয়ার প্রবণতা রয়েছে। এটি বন্ধ করতে হবে। পরীক্ষা পরিদর্শকরা হলে মোবাইল ফোনসেট নিয়ে যেন প্রবেশ না করে সে ব্যবস্থাও চালু করা দরকার। পরীক্ষার হলে বহিরাগত, অভিভাবক এবং রাজনীতি সংশ্লিষ্টদের প্রবেশ যাতে না ঘটে, সেই ব্যবস্থাও নেয়া যেতে পারে। পরীক্ষার হলে হিজাব পরিধানকারীদের কান খোলা রাখার নির্দেশনা থাকতে হবে।
সম্প্রতি এইচএসসির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করার আগাম ঘোষণা দিয়েছে একটি চক্র, এদের চিহ্নিত করে, প্রয়োজনে ঘোষণাকারী পেইজ, আইডি বিষয়ে ফেইসবুক কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে তা বন্ধ করতে হবে, সামগ্রিক নজরদারি ও সতর্কতা আরো বাড়াতে হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো সুযোগ যাতে না থাকে, সেই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণই প্রয়োজন অতি জরুরী। ভূলকে ভূল হিসাবে স্বীকার করে কীভাবে সমস্যার সমাধার করা যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে, মনে রাখতে হবে , যারা আজকের পরীক্ষার্থী তারাই আগামীর ভবিষ্যত, তাদের জীবন নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলা চিরতরে বন্ধ করতে হবে।