খিচুনি রোগ : মাথা ঠান্ডা রাখুন

ডা. রজত শংকর রায় বিশ্বাস

101

‘খিচুনি’ বা ‘সিজার’ হল রোগের উপসর্গ বা লক্ষণ। যা স্নায়ুতন্ত্রের অতিরিক্ত, অস্বাভাবিক আর নিয়মিত স্নায়ুতরঙ্গ নির্গমনের কারণে হয়। সারাজীবনে সাধারণ মানুষের খিচুনি হবার প্রবণতা ৫% তবে বাচ্চা আর বয়স্কদের এর হার একটু বেশি। ‘মৃগীরোগ’ বা ‘এপিলেপ্সি’ হল একের অধিক অপ্ররোচিত বারবার খিচুনি হবার প্রবণতা। ইউরোপিয়ান দেশসমূহে এর হার ০.৫% কিন্তু বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশে এর হার বিভিন্ন কারণে একটু বেশি।

কেইস স্টাডি এক : শিশু প্রিতমের বয়স ৩। একদিন তার খুব জ্বর আসল, যা প্রায় ১০৫ক্ক। জ্বর আসার দশ মিনিটের মধ্যে (তার মায়ের ভাষায়) সে কেমন যেন করতে লাগল! দাঁত কপাটী দিল, শরীর শক্ত হয়ে গেল ও হাত পা প্রচন্ডভাবে আন্দোলিত হল। তারপর সে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। পরে দেখা গেল প্রিতম খিচুনি চলাকালীন প্রস্রাব করে দিয়েছে। এই ঘটনা দুই- তিন মিনিটের মত ছিল। পরিবারের লোকজন প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেল। কি না কি হয়েছে এই ভেবে আর প্রচন্ড চিৎকার-চেঁচামেচি করতে লাগল।

কেইস স্টাডি দুই : মি. বোরহান, বয়স ২৮। তার এক বছর আগে ১০ দিনের ব্যাবধানে দুইবার খিচুনি হয়। মাথার স্ক্যান আর ইইজি পরীক্ষা করার পর ডাক্তার বলেছে তার মৃগী রোগ হয়েছে। ডাক্তার তাকে বলেছে তাকে নিয়মিত আর দির্ঘমেয়াদে ওষুধ খেতে হবে এবং কিছু নিয়ম কানুন মানতে হবে।

আলোচনা : বার বার খিচুনি হোওয়াই মৃগী রোগ। কিছু রোগী বেহুস হয় আবার কেউ বেহুস হয় না। সেরেব্রাল করটেক্স বা মস্তিষ্কের কিছু দরকারি নিউরোট্রান্সমিটার বা স্নায়ু রসের ভারসাম্য নষ্ট হলে মৃগী রোগ হতে পারে। মস্তিষ্কের কোন স্থানে টিউমার হলে, রক্ত জমলে বা আঘাত পরবর্তি ক্ষত থাকলে ওখান থেকে মৃগী রোগের উৎপত্তি হতে পারে। মৃগী রোগ খিচুনি ছাড়াও বিভিন্নভাবে দেখা যেতে পারে যাকে নন কনভালসিভ এপিলেপ্সি বলে।

বাচ্চাদের জ্বরের সময় খিচুনি হতে পারে। প্রথম বারে মস্তিষ্কে প্রদাহ কিনা তা নিশ্চিত হতে হবে, যদি তা না থাকে আর জ্বর আসলে আবারো খিচুনি হয় তাহলে এটা ‘ফেব্রাইল কনভালশন’। খিচুনি বাচ্চার জন্য ক্ষতিকর কারণ প্রতিবার খিচুনিতে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ বা নিউরণ নষ্ট হয় আর তা পরবর্তিতে বাচ্চাকে বুদ্ধিহীন করে ফেলে। বড়দের প্রথম বার খিচুনি হবার পর মাথার স্ক্যান, ইইজি ইত্যাদি করা হয় আর প্রয়োজনীয় রক্ত পরীক্ষাও করা হয়।
অনেক সময় আসলে খিচুনি নাকি খিচুনির মত ঝাঁকুনি তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। তাই যার সামনে খিচুনি হয় তার থেকে সঠিক বর্ণনা নেওয়াটা জরুরি। অনেক সময় ডাক্তাররা রোগীর লোককে খিচুনি চলাকালীন মোবাইলে ভিডিও তুলতে বলেন যাতে প্রকৃত অবস্থা অনুধাবন করা যায়।
খিচুনি হলে প্রত্যক্ষদর্শীরা আতংকগ্রস্থ হয়ে পড়ে, ভয়ে চিৎকার করে উঠে। তাই খিচুনির সময় মাথা ঠান্ডা রাখা জরুরি। এ সময় রোগীর পাশে যে থাকবেন তিনিই সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী। খিচুনি চলাকালীন সময়ে শুধু প্রাথমিক চিকিৎসা এবং সাধারণ জ্ঞানের প্রয়োগ করতে হবে। রোগীকে আগুন, পানি, ধারালো বস্তু, আসবাবপত্র রোগীর নিকট থেকে সরিয়ে আনতে হবে। দাঁড়ানো বা বসা অবস্থায় খিচুনিতে আক্রান্ত হলে তাকে আলতো করে ধরে মেঝেতে শুইয়ে দিতে হবে এবং রোগীর মাথার নিচে বালিশ বা নরম কোন কাপড় অথবা ফোম জাতীয় কিছু দিতে হবে। খিচুনি স্বাভাবিকভাবে শেষ হতে দিতে হবে।
খিচুনি বন্ধ করার জন্য রোগীকে চেপে ধরা যাবে না। রোগীর মুখে জোর করে আঙুল বা অন্য কিছু ঢোকানোর চেষ্টা করা যাবে না। রোগীর জিহ্বায় দাঁত দিয়ে কামড় লাগলেও খিচুনিরত অবস্থায় তা ছাড়ানোর জন্য জোরাজুরি করা উচিত নয়।
রোগীর গলায় টাই বাধা থাকলে বা বেল্ট পড়া থাকলে তা খুলে দিতে হবে। জামাকাপড় ঢিলে করে দিতে হবে। খিচুনি যদি ৫ মিনিটের বেশি স্থায়ী হয়, কিংবা রোগীর একবার খিচুনির পর জ্ঞান ফেরার আগেই দ্বিতীয় খিচুনি হয়ে তাহলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে
জ্বরজনীত খিচুনি বা ফেব্রাইল কনভালশান এর সময় কি করতে হবে তা সাধারণত মা-বাবাকে ডাক্তাররা শিখিয়ে দেন। জ্বর আসলেই বাচ্চাকে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ দিতে হবে আর ওজন অনুযায়ী ডায়াজেপাম খাওয়াতে হবে। তার পরও খিচুনি হলে পায়ুপথে কিভাবে ডায়াজেপাম ইঞ্জেকশান দিতে হয় তা সাধারণত ডাক্তাররা মাকে শিখিয়ে দেন। এরূপ খিচুনি সাধারণত পাঁচ বছর বয়স প্রান্ত থাকে যা শুনে মা-বাবারা একটু আশ্বস্থ হন।

ফিরে দেখা : প্রথম রোগী জ্বরজনিত খিচুনি বা ফেব্রাইল কনভালশান এ আক্রান্ত। এ ক্ষেত্রে মা-বাবাকে খুবই সতর্ক থাকতে হবে। জ্বর আসার প্রথমেই মুখে অথবা পায়ুপথে প্যারাসিটামল দিতে হবে, আর ডায়াজেপাম বাচ্চার ওজন অনুযায়ী বা ডাক্তারের দেয়া পরিমাণমতো দিতে হবে এবং তা শুরু করলে দুই থেকে তিন দিন চালাতে হয়। মনে রাখতে হবে ডায়াজেপাম কখনো কখনো শ্বসনক্রিয়া বন্ধ করে দিতে পারে তবে তা- খুবই দুর্লভ ব্যাপার। রিস্ক- বেনিফিট চিন্তা করে এই ওষুধ রোগীকে দেয়া হয়। কারণ এটাই সমকালীন বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা ব্যাবস্থা। দ্বিতীয় রোগীর মৃগী রোগ হয়েছে। তাকে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে। মৃগী রোগের ধরন অনুযায়ী তাকে কমপক্ষে একটানা দুই বছর ওষুধ খেতে হবে এবং যদি খিচুনি আর না হয় ডাক্তার ধীরে ধীরে ওষুধ বন্ধ করে দিবেন। মৃগী রোগে ব্যবহৃত প্রায় সব ওষুদেরই তীব্র থেকে স্বল্প মাত্রার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে তবে তা জেনে-শুনেই রোগীদের ওষুধ খেতে হয়।
সমাজে মৃগী রোগ নিয়ে কুসংস্কার আছে। খিচুনি চলাকালীন শুকানো জুতা, তাবিজ ধারণ করা ইত্যাদির কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই। সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় আর সঠিক ওষুধ নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী সেবন করলে এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল