খাবার দোকানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও ভেজাল অভিযান অব্যাহত থাক

9

‘বাতির নিচে আঁধার’ এমন বচনের সাথে আমাদের জানা দীর্ঘদিনের। দেড়শ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম পৌরসভার কার্যালয় যে আন্দরকিল্লায় ছিল দেড়শ বছর পরেও সেখানে। ভবন নির্মাণের জন্য সাময়িকভাবে কার্যালয় সরানো হলেও আশা করা হচ্ছে ভবিষ্যতেও আন্দরকিল্লায় নগর ভবন বহাল থাকবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, যে নগর ভবনকে ঘিরে চট্টগ্রামবাসীর আশা-আকাক্সক্ষা সেই ভবনের আশেপাশে নানা সংকটে ভরপুর। অবৈধ হকার, অবৈধ কাঁচা বাজার, ফরমালিনসহ নানা রাসায়নিক দ্রব্যমিশ্রিত ভেজালে ভরা খাদ্যদ্রব্য, ফলমূল,মাছ-মাংস, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য ও বিষাক্ত রং মিশ্রিত খাবার যা সাধারণ হোটেল থেকে শুরু করে অভিজাত রেস্টুরেন্ট পর্যন্ত চলছে। এছাড়া যানজট, অবৈধ টমটম ও অবৈধ মটর রিকশাতো আছেই। খবরের কাগজে অথবা ইলেকট্রিক মিডিয়ায় এসব বিষয়ে মাঝেমধ্যে সংবাদ প্রচার হলে কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে এবং গরম গরম বেশকিছু অভিযান চালিয়ে চমক সৃষ্টি করলেও বাস্তবে যে লাউ সেই কদুই থেকে যায়। আন্দরকিল্লাবাসীর হতাশার এ দীর্ঘাশ্বাসে অনেকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে সম্প্রতি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী মেজিস্ট্রেটের বেশকিছু উদ্যোগে। এ জন্য অবশ্যই সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও নির্বাহী মেজিস্ট্রেটসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ ধন্যবাদ ও প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।
গত মঙ্গলবার আন্দরকিল্লা মোমিন রোডের ঐতিহ্যবাহী দস্তগীর হোটেলে অভিযান চালিয়ে তাদের ঐতিহ্যমÐিত প্রধান খাবার নেহেরীতে দড়ি ও গরুর নাড়িভুঁড়ি পাওয়া, রান্নাঘর ও দোকানে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দেখে অনেকটা চমকে উঠেন সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী মেজিস্ট্রেট আফিয়া আখতার ও স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট জাহানারা ফেরদৌস। শুধু তাই নয়, এ হোটেলে গ্রাহকদের সাথে ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কর্মচারিদের খারাপ আচরণের বিষয়ও মেজিস্ট্রেটদ্বয় জানতে পারেন। এ অবস্থায় নির্বাহী মেজিস্ট্রেট তাৎক্ষণিক এ হোটেল কর্তৃপক্ষকে অর্ধলক্ষাধিক টাকা জরিমানাসহ সতর্ক করে দেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের আর কোন পরিবেশ যেন না থাকে। একইদিনে দস্তগীর হোটেলের বিপরীতে মোগল (চাইনিজ) হোটেলেও অভিযান চালানো হয়। এতে আরো ভয়াবহ অবস্থা দেখে মেজিস্ট্রেটদ্বয় তাদের একলাখ টাকার জরিমানা করেন। এ অভিযানের দুইদিন পর গত বৃহস্পতিবার জামালখান রোডের অভিজাত রেস্তোরাঁ দাওয়াত এবং শিকদারে অভিযান চালান সিটি মেজিস্টেটদ্বয়। অভিযানকালে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবারের উপকরণ সংরক্ষণ, পোড়া তেলে রান্না, রান্নাঘরের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, বাবুর্চি ও খাবার পরিবেশনের দায়িত্বে থাকা সহকারীদের ড্রেস কোড না থাকার কারণে দাওয়াত রেস্টুরেন্টকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এছাড়া একই ভবনের নিচতলায় অবস্থিত গ্রান্ড শিকদার হোটেলকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। দৈনিক পূর্বদেশে এ অভিযানের বর্ণনা দিতে গিয়ে উল্লেখ করা হয়, আকর্ষণীয় আলোকসজ্জা ও ব্যয়বহুল ‘গেট আপের’ রেস্টুরেন্ট জামালখানের দাওয়াত। একই ভবনে নিচে রয়েছে দি গ্র্যান্ড সিকদার হোটেল। দীর্ঘদিন ধরে অপরিষ্কার ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি করে ক্রেতাদের পরিবেশন করে আসছিল রেস্তোরাঁ দুইটি। বাইরের ‘ফিটফাট’ পরিবেশকে পুঁজি করে গ্রাহকের কাছ থেকে নিচ্ছে খাবারের অতিরিক্ত দাম। অনেকটা ‘বাইরে ফিটফাট, ভেতরে সদরঘাট’ প্রবাদের সাথে মিলে যায় রেস্তোরাঁ দুইটির বাস্তবচিত্র। রয়েছে খাবারের অতিরিক্ত দাম ও ক্রেতাদের সাথে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে গতকাল বৃহস্পতিবার রেস্তোরাঁ দুইটিতে অভিযান চালায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ৪ লাখ জরিমানা আদায় করেছেন আদালত। এছাড়াও স্বাস্থ্যকর পরিবেশে মানসম্পন্ন খাবার তৈরি করতে সতর্ক করেছেন আদালত পরিচালনাকারী ম্যাজিস্ট্রেট। আমরা মনে করি, সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী মেজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পরিচালিত এ ভ্রাম্যমাণ আদালত সময়োপযোগী কাজ করছে। তাদের এ অভিযান শুধু হোটেল বা রেস্তোরাঁয় নয়, বরং সকল কাঁচা বাজার, অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, ভেজাল, ফুটপাত দখলমুক্তির জন্যও পরিচালনা করা জরুরি। আমরা আশা করি, সিটি কর্পোরেশন এ ধরনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম অব্যাহত রাখলে নগরবাসী স্বস্তিতে বসবাস করতে সক্ষম হবে।