মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮

খাতায় যেন বন্দি না থাকে

5

মাদকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হুঁশিয়ারি ও অভিযান পরিচালনার নির্দেশনার পর সারাদেশে কঠোর অবস্থানে যায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। চলতি বছরের মে মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করেন। পুলিশ ও র‌্যাব তিনমাসের অধিক দেশজুড়ে এ সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করেছিল। যদিও অভিযান এখনও চলমান রয়েছে বলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বলছে। বস্তুত প্রথম তিনমাস যেভাবে সক্রিয়ভাবে চলছিল এখন তেমনটি দৃশ্যমান নয়। অভিযানের প্রথমদিকে অর্ধশতাধিক মাদক ব্যবসায়ী পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ওই সময় মাদকসহ সহস্রাধিক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবিকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু ইয়াবাসহ গ্রেফতারের পর অপরাধীদের শাস্তি নিয়ে আইনি জটিলতা সৃষ্টি হতে থাকে। কারণ দেশের চলমান আইনে ইয়াবা নামক কোন মাদকের নাম বা ইয়াবা কোন ধরনের মাদক তারও কোন উল্লেখ নেই। ফলে ইয়াবা অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ছিল। এসব সমস্যা সমাধানে সরকার ইয়াবাকে আইনি ধারায় মাদক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে এর ব্যবসা, পরিবহন, বিপনন ও ব্যবহারের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ এর খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়। অনুমোদিত আইনে ইয়াবা (অ্যামফিটামিন) পরিবহন, কেনাবেচা, ব্যবসা, সংরক্ষণ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, হস্তান্তর, সরবরাহ ইত্যাদি অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করতে হবে। অবশ্য ইয়াবার পরিমাণ অনুযায়ী সাজা কমবেশি দেওয়া হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই আইনের অধীনে অপরাধ সংঘটনে অর্থ বিনিয়োগ, সরবরাহ, মদদ ও পৃষ্ঠপোষকতা করলেও একই ধরনের শাস্তি পেতে হবে। সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ এর খসড়ার অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রস্তাবিত আইনে হেরোইন ও কোকেন উদ্ভুত মাদকদ্রব্যের জন্যও ইয়াবার মতোই কঠোর শাস্তি রাখা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, ৫ গ্রামের বেশি ইয়াবা পরিবহন, মজুদ, বিপণন ও সেবনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড। আর ২৫ গ্রামের বেশি হেরোইন, কোকেনসহ সমজাতীয় মাদকদ্রব্যের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তিও মৃত্যুদন্ড। আগের আইনে মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল ২ থেকে ১৫ বছরের কারাদন্ড। আমরা মন্ত্রী পরিষদের অনুমোদিত খসড়া আইনটির প্রতি সম্পূর্ণ সহমত পোষণ করছি। কারণ ইয়াবা নামক মাদকটি আমাদের পরিবার, সমাজকে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে গেছে। ইয়াবা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল নতুন প্রজন্মের বিশাল একটি অংশ। শুধু তাই নয়, ইয়াবা কেনার অর্থ জোগাড় করতে গিয়েই কিশোর-তরুণরা ব্যাপকভাবে নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এ সুযোগে মাদক ব্যবসায়ী, সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্র খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজিসহ নানা কাজে তাদের ব্যবহার করতে থাকে। মাদকের এই নেশার জালে একবার জড়িয়ে পড়লে কেউ আর সহজে বেরিয়ে আসতে পারে না। ফলে মাদকসেবিরা দিনে দিনে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। দেশের সর্বত্র সন্ত্রাসী কার্যক্রম, স্কুল-কলেজগামী মেয়েদের নানাভাবে উত্ত্যক্ত করা, গুলি বা ছুরিকাঘাতে হত্যা কিংবা সড়ক দুর্ঘটনার আধিক্যের পেছনেও মাদকাসক্তির ভূমিকা অন্যতম। এ অবস্থায় সরকার মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের পর সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে যে আইন মন্ত্রী পরিষদে পাস করছে-তা সময়োপযোগী ও যথার্থ। তবে এ আইন সংসদে পাস হওয়ার পর তা যেন যথাযথভাবে কার্যকর হয়-সেদিকে নজর দিতে হবে সংশ্লিষ্টদের। মাদকের ভয়াল থাবা থেকে দেশকে বাঁচাতে এমনটি আইন আরো অনেক আগে প্রণয়ন করা প্রয়োজন ছিল। দেরিতে হলেও যে আইনটি অনুমোদন লাভ করল, তা যেন অন্য সাধারণ আইনের ন্যায় ‘খাতায় আছে গোয়ালে নেই’ অবস্থা না হয় সেদিকে মনোযোগ দিতে হবে। আমরা আশা করি, মাদক ব্যবসায়ী বা সিন্ডিকেট যতই শক্তিশালী হোক, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে আর কোন বাধা থাকবে না। তবে আইনের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নীতিনৈতিকতার উন্মেষ ঘটাতে হবে। যারা ইতিমধ্যেই মাদকাসক্ত হয়েছে, তাদেরও সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সুস্থধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। বাড়াতে হবে মাদক নিরাময় কেন্দ্রের সংখ্যা। সর্বোপরি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করে যার যার অবস্থান থেকে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই করে এই যুদ্ধে জয়ী হতেই হবে।