ক্রোধ সংবরণ মোমিনের কাজ

মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী

37

ক্রোধ মানুষের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি সাধন করে। ইসলামের দৃষ্টি ক্রোধান্বিত হওয়া মহাপাপ। মহান আল্লাহ পাক পবিত্র কোরানে ইরশাদ করেছেন ‘তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমার দিকে অগ্রসর হও এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও জমিনের ন্যায়, যা মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ নিয়ন্ত্রণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল; আল্লাহ সংকর্মপরায়নকারীদের ভালবাসেন’ (সূরা : ৩ : আয়াত : ১৩৩-১৩৪)।


আলোচ্য আয়াতে মহান আল্লাহপাক ইঙ্গিত করেছেন যে, আল্লাহ ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ মানার সাথে সাথে পালনকর্তার ক্ষমার দিকে এবং জান্নাতের দিকে অগ্রসর হতে বলা হয়েছে। এ লক্ষ্যে সৎকর্মের মাধ্যমেই ক্ষমা ও জান্নাতের দিকে অগ্রসর হতে বলা হয়েছে। এই বিশাল জান্নাতটি মুত্তাকিদের জন্য আর মুত্তাকি হলো যারা সচ্ছল অসচ্ছল যে অবস্থায় থাকুক ভালো কাজ করে এবং ক্রোধ সংবরণ করে মানুষকে ক্ষমা করেন।
ঈমাম বায়হাকী উল্লেখিত আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে হযরত আলী ইবনে হুসাইন (রা.)’র বিষ্ময় এক ঘটনা বর্ণনা করেছেন। হযরত আলী ইবনে হুসাইনের এক বাঁধী তাকে ওজু করানোর সময় পানির পাত্র হাত হতে পড়ে গিয়ে হযরত আলী ইবনে হুসাইন (রা.) হাতে পাড়ে যায়। পাত্রের পানির কারণে তাঁর কাপড় ভিজে যায়। বাঁদী তাঁর রাগ নিবারণ করতে কোরানের এই আয়াতটি পড়ে শোনাল। আয়াতটি শোনার সাথে সাথে আলী ইবনে হুসাইন (রা.)’র মন পুরোপুরি ক্রোধ মুক্ত হয়ে পড়লো এবং আয়াতের একটি একটি বাক্য শুনে তিনি বলতে লাগলেন, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম, আমি তোমাকে আজাদ করে দিলাম।
মানুষের কাছে কিছু দোষত্রæটি থাকে। মনীষীরা বলেছেন, ৭০% গুণ থাকলে ভালো লোক বলা যায়। অনেক মানুষকে দেখা যায় কারো দোষ দেখলে ক্রোধান্বিত হয়ে পড়েন। দোষ ক্ষমা করা মহান আল্লাহর প্রধান একটি গুণ। মানুষ ক্রোধান্বিত না হয়ে ক্ষমা করলে মহান আল্লাহ মহা পুরস্কার প্রদান করে থাকেন।
বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামে ইরশাদ করেছেন, কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ পাকের পক্ষ হতে ঘোষণা করা হবে, আল্লাহর কাছে কেউ পাওনা থাকলে দাঁড়াও। তখন তাঁরাই দাঁডাবে যারা দুনিয়াতে অপরের অত্যাচারীর প্রতিশোধ গ্রহণ করতে মারিয়া হয়ে পড়ে। হিংসা দিয়ে হিংসা নিবারণ করা যায় না। এক হিংসা আরেক হিংসার জন্ম দেয়। মহান আল্লাহ পাক মন্দকে ভালো দ্বারা প্রতিহত করতে বলেছেন। তাই অত্যাচারের প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষমা করা মহাপুণ্যের কাজ। ক্রোধান্বিত ব্যক্তি মানুষকে ক্ষমা করতে পারে না।
প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি জান্নাতে উঁচু মর্যাদাবান স্থান কামনা করবে, সে যেন অত্যাচারীকে ক্ষমা করেদেয়। পবিত্র কোরানে মহান আল্লাহ পাক অন্যায়কারীর প্রতিও অনুগ্রহ করার কথা ঘোষণা করা হয়েছে। অনুগ্রহ শত্রæ বন্ধুতে পরিণত হয়। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘মন্দকে অনুগ্রহ দ্বারা প্রতিরোধ কর এতে শত্রæ অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে পারে।
পবিত্র কোরানে আল্লাহ পাক আরো ঘোষণা করেছেন, ‘যে অপরার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে আপনি তাকে ক্ষমা করুন। যে তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে তার সাথে অনুগ্রহ দেখাও।
এক ব্যক্তি ঈমাম আজম আবু হানিফা (রহ.) কে প্রকাশ্যে গালমন্দ করলেন। ঈমাম সাহেব ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করলেন এবং প্রতিক্রিয়া দেখালেন না। ঘরে এসে তিনি কিছু স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে লোকটির দরজায় হাজির হয়ে বলরেন, আজ আপনি আমার প্রতি বড় অনুগ্রহ করেছেন। তোমার অর্জিত পুণ্য আমাকে দান করেছেন এর প্রতিদান স্বরূপ আপনি এসব স্বর্ণমুদ্রা অনুগ্রহ করুন। এধরনের চরিত্র ঈমাম সাহেবের নিকট দেখাত পেয়ে লোকটি লজ্জিত ও বিষ্মিত হলেন এবং তাও বা করে ঈমাম সাহেবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। এই ঘটনার পর লোকটি হযরত আবু হানিফা (রহ.)’র ভক্ত, ছাত্র এবং ভাবশিষ্যে পরিণত হয়ে বড় এক আলমে দ্বীনে পরিণত হরে দিলেন।
হযরত আবু হুরাইয়া (রা.) হতে বর্ণিত, প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি রাগ দেখানোর ক্ষমতা রাখা সত্তে¡ও রাগ হজম করলে তাঁর অন্তরে ঈমাম ও নিরাপত্তা দিয়ে আল্লাহ পাক পূর্ণ কার দিবেন।
হাদিসে কুদসীতে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন, ‘হে মানব সন্তান তোমরা আমাকে স্মরণ কর যখন ক্রোধ জাগ্রত হয়। আমিও তোমাদের স্মরণ করবো যখন আমি রাগান্বিত হবো। আমি তোমাদেরকে ধ্বংসশীলদের অন্তর্ভুক্ত করবো না। হযরত আবু হুরাইয়া (রা.) হতে বর্ণিত প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘কাউকে আছাড় দেওয়া বীরত্ব নয় এবং যে ব্যক্তিই বীর যে ক্রোধের সময় নিজকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবন ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ উন্মত পাঁচশত জন এবং আবদাল চল্লিশ জন, পাঁচশত শ্রেষ্ঠ উন্মত ও চল্লিশ অবদানের মধ্যে কম বেশি হবে না। যখন তাদের কেউ ইন্তেকাল করবে তখন নতুন একজন তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়। সাহাবায়ে কেরাম জানতে চাইলেন, হে আল্লাহর রাসুল ! তাদের কর্ম সম্পর্কে আমাদের জানান। নবীজী বললেন, তারা ক্ষমা করে দেয় তাদের ওপর যারা জুলুম করেছিল তাদেরকে এবং তাদের প্রতি অনুগ্রহ করে, যারা তাদের সাথে মন্দ ব্যবহার করেছিল তাদেরকেও সহানুভুতি দেখায় আল্লাহর পক্ষ হতে প্রদত্ত দেয়া সম্পদ দিয়ে।
হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমাকে মেরাজের রাতে জান্নাতের এক সমতল দালাল দেখানো হয়েছে। আমি জানতে চাইলাম, হে জিব্রাইল! এটি কার জন্য ? জিব্রাইল (আ.) বললেন, যারা ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করে এবং পরের ক্রুটি মার্জনা করে তাদের জন্য।
লেখক : কলাম লেখক ও রাজনীতিক