ক্যামেরার জাদুকর শাহনেওয়াজ

আবীর চক্রবর্তী

235

গতানুগতিক কোন দৃশ্য ধারণ নয়, মনের ভাষা খুঁজে পেতেই তাঁর সাধনা। বাস্তবে আমরা যা দেখি, তার পেছনেও যে ইতিহাস লুকিয়ে থাকে- তা সযতেœ ক্যামেরার লেন্সে ধারণ করতে ভালোবাসেন তিনি। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মো. শাহনেওয়াজ খাঁন তাই পরিচিতি পেয়েছেন তথ্যচিত্রের আলোকচিত্রী ও ক্যামেরার জাদুকর হিসেবে।
চট্টগ্রামের গোসাইলডাঙ্গায় বেড়ে ওঠা বিজ্ঞানের ছাত্র শাহনেওয়াজকে গবেষণাগারের অণুবীক্ষণ যন্ত্র কিংবা টেস্টটিউবে দ্রবণ তৈরির কাজ যতটা না আকর্ষণ করেছে, তার চেয়ে বেশি টেনেছে সেই ক্যামেরা। তাই ২০০৪ সালে যোগ দেন বরেণ্য আলোকচিত্রী শোয়েব ফারুকীর ফটোব্যাংক গ্যালারিতে। খুব দ্রæত সময়ে আয়ত্ব করে নেন ছবি ধারণের কলাকৌশল। এরপর সঙ্গ লাভ করেন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী শহীদুল আলম ও কাউন্টার ফটো ডিরেক্টর সাইফুল হক অমিসহ দেশের স্বনামধন্য চিত্রশিল্পীদের। তাঁদের সংস্পর্শে এসে শাহনেওয়াজ খাঁন প্রবেশ করেন আলোকচিত্র শিল্পের গহীনে। এরপর আর পেছন ফিরে থাকাতে হয়নি। দেশ-দেশান্তরে ঘুরে তিনি লাভ করেছেন বিচিত্র অভিজ্ঞতা। নৈসর্গিক দৃশ্য কিংবা আয়োজন করে অথবা ঘটনার প্রয়োজনে শুধু ছবি তোলা নয়, এক একটি ছবি হতে পারে ইতিহাস; সেই ধারণা থেকে তিনি নব উদ্যমে শুরু করেন তথ্যসমৃদ্ধ ঘটনাবহুল চিত্র ধারণের কাজ। ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের অন্তর্গত লাদাখ অঞ্চলের উপজাতি, স¤প্রতি বাংলাদেশের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী, কল-কারখানার শিশু শ্রমিক এবং জীবন সায়াহ্নে আসা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জীবনচিত্র ধারণ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ। এসব চিত্রে ফুটে উঠেছে অবহেলিত জনগোষ্ঠীর অব্যক্ত কথামালা। সাফল্যের ঝুঁলিতে যোগ হয়েছে অসংখ্য সম্মাননা। তিনি পেয়েছেন বিশ্বের নামকরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ৫০টি আন্তর্জাতিক অ্যাওয়ার্ড। এর মধ্যে রয়েছে-ল্যান প্যারি স্কলারশিপ, অ্যালেক্সিয়া স্টুডেন্ট গ্রান্ট, দুইবার আন্দ্রেই স্টেনিন প্রেস অ্যাওয়ার্ড, দুইবার আসাহিশিমবুন গোল্ড মেডেল, বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি (বিপিএস) গ্রান্ড, দুইবার ফটোশেয়ার অ্যাওয়ার্ড, আল মাঈদিন টিভি অ্যাওয়ার্ড, তিনবার ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো জুপ সোয়ার্ট মাস্টারক্লাস এবং দুইবার ইউনিসেফ ফটো অব দ্য ইয়ার। তাঁর চিত্র প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা সিএনএন, সানডে টাইমস্, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, ফটো এভিডেন্স, আই অব ফটোগ্রাফি, টাইম লাইটবক্স, পি-৩, আইস ওপেন, ইবিএস, স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন, হোয়াট ম্যাগাজিন, দি কোয়াইট অ্যামেরিকান, ভিউ ফাইন্ড, রিসোর্স ম্যাগাজিন, রাশিয়া টুডে, বাংলাদেশের ঢাকা ব্রিবিউন এবং ফটোগ্রাফিক মিউজিয়াম অব হিউম্যানিটি, দি ফোবলোগ্রাফার, ইন্টারেকশন, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার অব ফটোগ্রাফি (আইসিপি), আইটাইম, মনোভিশনস্, ব্যাংকক পোস্ট, চায়না ডেইলিতে। এছাড়া তাঁর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে বিশ্বের ৩৫টি দেশে। এর মধ্যে রয়েছে-সমারসেট হাউস অব লন্ডন, হাউস অব লর্ডস ইন লন্ডন, রয়েল জিওগ্রাফিক সোসাইটি ইন লন্ডন, ইউএন এইচকিউ ইন নিউইয়র্ক, সিটি সেন্টার ইন ফ্রাংকফুট-জার্মানী, নরমা-অ্যারোপোর্তো ডি ক্যাটানিয়া ইন ইটালী, ল্যুমিরি ব্রাদার্স সেন্টার অব ফটোগ্রাফি-মস্কো, জাস্ট এনাদার ফটো ফ্যাস্টিভ্যাল, সনি স্কয়ার এইওয়াইসি, আদ্দিস ফটো ফেস্ট ইন ইথিওপিয়া ইত্যাদি।
সুলেখক ও মানবাধিকার কর্মী মো. শাহনেওয়াজ খাঁন নিজের স্বপ্ন ছড়িয়ে দিতে বেছে নিয়েছেন নিজের জন্মস্থানকেই। ২০১৬ সালের ৪ মার্চ নগরীর আগ্রাবাদের চৌমুহনীতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভোহ্ ইনস্টিটিউট’। ‘ভোহ্’-এর অর্থ ভয়েস অব হিউম্যানিটি এন্ড হোপ। এই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং ডিরেক্টর তিনি। আলোকচিত্র শিল্পের চিরচেনা জগত থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে তিনি চালু করেছেন বেসিক ফটোগ্রাফি কোর্স, বেসিক ফটোগ্রাফি ওয়ার্কশপ, এডভান্স ফটোগ্রাফি কোর্স, স্টোরি টেলিং কোর্স, স্টোরি টেলিং ওয়ার্কশপ, মেন্টরশিপ কোর্স, প্রফেশনাল কোর্স, মাস্টার ক্লাস এবং ৯টি বিষয়ের ওপর ওয়ার্কশপ। এগুলো হচ্ছে- পোট্রেট ফটোগ্রাফি, ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফি, ফটো সাংবাদিকতা, ওয়েডিং ফটোগ্রাফি, লেন্ডস্কেপ ফটোগ্রাফি, স্ট্রিট ফটোগ্রাফি, কম্পোজিশন, ফটোশপ এবং গবেষণা।
শাহনেওয়াজ খাঁন জানালেন, আলো বা অন্য কোনো রকম তড়িৎ চুম্বকীয় বিচ্ছুরণকে কাজে লাগিয়ে টেকসই ছবি সৃষ্টি করার শিল্প, বিজ্ঞান ও পদ্ধতিকে বলে আলোকচিত্র শিল্প। ফটো অর্থ ‘আলো’ আর গ্রাফ হচ্ছে ‘অঙ্কন’। অর্থাৎ ‘আলো দিয়ে আঁকা।’ এই শিল্পের প্রধান অলংকার হচ্ছে-শিষ্টাচার। নীতি নৈতিকতা বিসর্জন দেয়া মানে আলোকচিত্র শিল্পকে অবমাননা করা। প্রত্যেকটি ছবির একটা ইতিহাস থাকে, আর সেটা তুলে আনাই হচ্ছে চিত্রগ্রাহকের কাজ। সস্তা জনপ্রিয়তার আশায় গৎবাঁধা ছবি তোলায় কোন কৃতিত্ব নেই। ভালো দৃশ্য ধারণের জন্য যেমন ব্যবহারিক জ্ঞান প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন আলোকচিত্র সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান আহরণ।
বাংলাদেশের প্রথম নারী আলোকচিত্রী সাইদা খানমের অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে এই মহিয়সী আলোকচিত্রী ঢাকার আজিমপুর এলাকায় অস্ত্র হাতে প্রশিক্ষণরত নারীদের ছবি তোলেন। ক্যামেরার সঙ্গে তাঁর সংসার ছিল প্রায় ৬০ বছরের। এরপর ঢাকায় নারীরা আলোকচিত্রী হিসেবে ক্যামেরার সাথে সখ্য গড়ে তুললেও চট্টগ্রামে তেমন আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়নি। তবে বর্তমান সময়ে চট্টগ্রামের মেয়েরাও আলোকচিত্র শিল্পের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন, এটা আমাদের জন্য সুসংবাদ।
শীঘ্রই ৩৫জন শিল্পীর তোলা ছবি নিয়ে চট্টগ্রামে ১ম আন্তর্জাতিক চিত্র প্রদর্শনী (ভোহ্ ফটো ফেস্ট-২০১৮) আয়োজনের কথাও জানালেন শাহনেওয়াজ। বললেন, প্রদর্শনীতে প্রত্যেক শিল্পীর ৩-৫টি ছবিতে তৈরি করা এক একটি গল্প জানান দিবে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের। সেখানে স্থান পাবে সময়ের আলোচিত ১৪ বছরের ফিলিস্তিনি বালক ফাওজিকে চোখ বেঁধে ২৪ জন ইসরায়েলি সৈনিক কর্তৃক নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যও। দেখা মিলবে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের। ইতিমধ্যে জমা পড়েছে বিশ্ববিখ্যাত অনেক ছবি। বিচারক হিসেবে থাকবেন লেবাননের সামার মোদাদ, নিউইয়র্কের ভ্যাটলানা বেচভানোভা, অ্যালেক্সিয়া ফাউন্ডেশনের এইলিন মিগনোনি, ইতালির বারবারা সিলভি। নগরীর জামালখান, চকবাজার, নেভাল-২, পতেঙ্গা সৈকত, সিআরবি, ফটোব্যাংক গ্যালারিসহ বিভিন্ন স্থানে সপ্তাহব্যাপী চলবে এই প্রদর্শনী। প্রচারবিমুখ মো. শাহনেওয়াজ খাঁন বলেন, আলোকচিত্র মানবতার জয়গান গায়-এ বিষয়টা আমরা সবাইকে বুঝাতে চাই। আমরা আলোকচিত্র শিল্পের বিপ্লবের জন্য কাজ করছি। এই আলোকচিত্রের মাধ্যমেই চট্টগ্রামকে সারা বিশ্বের কাছে নতুন করে পরিচিত করতে চাই।