কোরবানি সামনে রেখে মসলার বাজার সরগরম

ইকবাল হোসেন

57

রমজানের ঈদের পর মুসলমানদের আরেক অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আযহা। এক মাসেরও কম সময় বাকি রয়েছে ঈদুল আযহার। আর কোরবানিকে সামনে রেখে খাতুনগঞ্জে সরগরম হয়ে উঠেছে মসলার বাজার। গত বছরের চেয়ে এবার এলাচির দরে ঝাঁজ বাড়লেও কমেছে গোলমরিচের দাম।
কোরবানির গোশত রান্নায় অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ হলো গরম মসলা। খাবার মুখরোচক করতে নানা ধরণ আর মানের মসলা রয়েছে। চিকন জিরা, মিষ্টি জিরা থেকে শুরু করে লবঙ্গ, এলাচি, দারুচিনি, গোলমরিচই বেশি ব্যবহার হয় কোরবানির পশুর গোশত রান্নায়। তবে এবার বাজারে পর্যাপ্ত মজুদের কারণে কোরবানিকে সামনে রেখে চট্টগ্রামে শান্তই থাকছে মসলার পাইকারি বাজার।
জানা গেছে, দেশের অন্যতম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাই এলাকাতে ২০-২৫ জন মসলা আমদানিকারক রয়েছেন। খাতুনগঞ্জের ইলিয়াছ মার্কেট, জাফর মার্কেট ও নবী মার্কেট মসলার জন্য পরিচিত। প্রতিবছর কোরবানি মৌসুমে ৩ লাখ টন পেঁয়াজ, দেড় লাখ টন রসুন, ২ লাখ টন আদা, ১ লাখ টন হলুদ, ২০০ টন জিরা, ২০০ টন দারুচিনি, ৪০০ টন এলাচি বিক্রি হয়ে থাকে।
ব্যবসায়ীরা জানান, গরম মসলার ৯০ ভাগই আমদানি করে চাহিদা মেটাতে হয়। খাতুনগঞ্জের মসলা ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বছরের সব সময়ই নানা রকমের মসলা বিকিকিনি হলেও কোরবানিকে সামনে রেখে বাজারে চাহিদা বেড়ে যায়। মরিচ, ধনিয়া, হলুদের পাশাপাশি চিকন জিরা, মিষ্টি জিরা, গোলমরিচ, লবঙ্গ, দারুচিনি, পোস্তদানা মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে চিকন জিরা, মিষ্টি জিরা, গোলমরিচ, লবঙ্গ, দারুচিনি, জায়ফল, পোস্তদানা ‘গরম মসলা’ হিসেবে ব্যবহার হয়। এমনিতেই কোরবানিতে মসলার সাথে পেঁয়াজ, রসুন, আদারও অতিরিক্ত চাহিদা থাকে।
তাছাড়া কোরবানিতে চট্টগ্রামে বেশি পশু জবাই করা হয় বলে দেশের অন্যান্য জেলার চেয়ে চট্টগ্রামে মসলার চাহিদা থাকে বেশি।
ব্যবসায়ীরা জানান, ভারত, সিরিয়া ও তুরস্ক থেকে চিকন জিরা আমদানি হয়ে থাকে। এবার বাজারে ভারতীয় জিরাই বেশি। এবার চিকন জিরার দর গত বছরের চেয়ে প্রতিকেজিতে ২০-৪০ টাকা কম। খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে গত বৃহস্পতিবার ভারতীয় চিকন জিরা বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ৩২০-৩২২ টাকায়। তবে ১৫দিন আগেও এ জিরা বিক্রি হয়েছে ৩৩০-৩৫ টাকায়। এক বছর আগে এ জিরার মূল্য ছিল প্রতিকেজি ৩৫০-৬০ টাকা।
সিরিয়ান জিরা বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৩৬০-৩৭০ টাকায়। এবছর সিরিয়ায় যুদ্ধবিধ্বস্ত হওয়ার কারণে উৎপাদন কম হওয়াতে বাংলাদেশে আমদানি হয়নি। এছাড়া নতুন উৎপাদিত জিরা কোরবানির আগে বাজারে আসার সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে গত বছরের সিরিয়ান জিরা বিক্রি হচ্ছে। তুরষ্ক থেকে আমদানি হওয়া চিকন জিরা বাজারের সবচেয়ে ভালমানের জিরা। এ জিরা বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ৩৮০-৩৮৫ টাকায়। এক বছর আগেও কেজিপ্রতি এ জিরা বিক্রি হয়েছে ৪০০ টাকার বেশি দরে।
মিষ্টি জিরা আমদানি হয় ভারত, পাকিস্তান ও মিশর থেকে। খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে প্রতিকেজি ভারতীয় মিষ্টি জিরা বিক্রি হচ্ছে ১০০-১০৫ টাকায়, পাকিস্তানী জিরাও একইদামে বিক্রি হলেও মিশর থেকে আমদানি হওয়া মিষ্টি জিরা বিক্রি হচ্ছে ১০৮-১০৯ টাকা কেজিতে। এসব জিরার দাম এক বছর আগেও প্রতিকেজিতে ২০ টাকা বেশি ছিল।
গরম মসলার মধ্যে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদান হচ্ছে এলাচি। বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন ক্যাটাগরি ও মানের এলাচি আমদানি হয় দেশে। বাংলাদেশে আমদানি হওয়া সব এলাচিই আসে গুয়েতেমালা থেকে। ‘জেপিবি’, ‘আরএস-জাম্বো’, ‘জেবিসি’, ‘এলএমজি’, ‘এসএমজি’ ও ‘এসবি’ নামের এলাচি রয়েছে। ‘জেপিবি’, ‘আরএস-জাম্বো’ হচ্ছে অপেক্ষাকৃত উৎকৃষ্ট মানের (গ্রেড-১), ‘জেবিসি’, ‘এলএমজি’ হলো মধ্যমানের (গ্রেড-২) এবং ‘এসএমজি’ ও ‘এসবি’ হচ্ছে অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের (গ্রেড-৩) এলাচি। গত বছরের চেয়ে এবছর প্রায় সব এলাচিই কেজিতে ১২০-২৫০ টাকা দাম বেড়েছে।
বাজারে ‘জেপিবি’ এলাচি বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজিতে ১৭২০-১৭৩০ টাকা। ১৫দিনের ব্যবধানে বাজার কমেছে। ১৫দিন আগে এসব এলাচির দাম ছিল কেজিতে ১৭৭০-১৭৯০ টাকা। এক বছর আগে এসব এলাচি বিক্রি হয়েছে প্রতিকেজি ১৬০০ টাকার নীচে। ‘আরএস-জাম্বো’ এলাচি বিক্রি হচ্ছে ১৭০০ টাকা কেজিতে। ১৫দিন আগে এসব এলাচির দাম কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেশি ছিল। তবে গত বছর দাম ছিল প্রতিকেজি ১৫৫০ টাকার নীচে।
‘জেবিসি’ এলাচি বিক্রি হচ্ছে ১৫৫০ টাকা কেজিতে। দুই সপ্তাহ আগে প্রতিকেজিতে ৩০-৪০ টাকা বেশি ছিল এসব এলাচির দাম। এক বছর আগে এসব এলাচির দাম ছিল কেজি ১৩০০ টাকার কম। বর্তমানে ‘এলএমজি’ এলাচি বিক্রি হচ্ছে কেজি ১৫৩৫ টাকা দরে।
‘এসএমজি’ এলাচি বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ১৪০০ টাকায়। সপ্তাহ দুয়েক আগেও এসব এলাচির দাম কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেশি ছিল। তবে এক বছর আগে এসব এলাচি বিক্রি হয়েছে ১২০০ টাকার নীচে। ‘এসবি’ এলাচি কেজিতে ১৪৫০ টাকায় বিক্রি হলেও একবছর আগে এসব এলাচির দাম কেজিতে ২০০ টাকা কম ছিল।
ব্যবসায়ীরা জানান, বাংলাদেশে চায়না ও ভিয়েতনাম থেকে আসে দারুচিনি। ২৫ কেজি ও ১০ কেজি বস্তা হিসেবে দারুচিনি বিক্রি হয়। চায়না থেকে আসা ১০ কেজি বস্তার দারুচিনি বিক্রি হচ্ছে ২৬৫-২৭০ টাকা কেজিতে। ১৫দিন আগে এসব দারুচিনির দাম কেজিতে ২০ টাকা বেশি ছিল। তবে এক বছর আগে ছিল কেজি ২৫০-২৬০ টাকার মতো। তবে ২৫ কেজি বস্তার চায়না দারুচিনির দাম কিছুটা কম। এসব দারুচিনি বিক্রি হচ্ছে ২২৫ টাকা কেজি দরে। একই দারুচিনি ১৫দিন আগেও ২৫০-২৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। একবছর আগে এসব দারুচিনি ১৯০-২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছিল। বাজারে ভিয়েতনামের দারুচিনি বিক্রি হচ্ছে গ্রেডভেদে ২৩৫-২৬০ টাকা কেজিতে।
ইন্দোনেশিয়া, মাদাগাস্কার ও ব্রাজিল থেকে আসে লবঙ্গ। স্থানীয় ভাষায় লবঙ্গকে লং হিসেবেই সবাই চেনে। বাজারে বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ান লবঙ্গ প্রতিকেজি ১০০০ টাকা, মাদাগাস্কার থেকে আসা লবঙ্গ ৮৪০-৮৬০ টাকা কেজি এবং ব্রাজিল থেকে আমদানি হওয়া লবঙ্গ ৮২০-৮৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। গত বছরও একই দরে বিক্রি হয়েছে গরম মসলার এ উপাদানটি।
বছরের ব্যবধানে বাজারে সবচেয়ে বেশি দাম কমেছে গোলমরিচের। শুধুমাত্র ভিয়েতনাম থেকে গোলমরিচ আমদানি হয়। ভিয়েতনামে এবার গোলমরিচের উৎপাদন ভাল হওয়াতে আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং রেট ক্রমান্বয়ে কমে যায়। বাজারে গত বছর গ্রেডভেদে ৭৫০-৮০০ টাকা কেজিতে গোলমরিচ বিক্রি হলেও বর্তমানে বাজারে ‘এ’ গ্রেডের গোলমরিচ প্রতিকেজি ৪৫০ টাকা, ‘বি’ গ্রেড ৪১০-৪২০ টাকা এবং ‘সি’ গ্রেডের গোলমরিচ ৩৯০-৪০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।
নবী মার্কেটের এম এম ট্রেডার্সের স্বত্ত¡াধিকারী পংকজ সেন বলেন, ‘বাজারে গত বছরের তুলনায় এবার গোলমরিচের দাম প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। গত বছর আমদানি করা ৭৫০ টাকার গোলমরিচ এখন ৪২০-৪৫০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। যারা গোলমরিচ আমদানি করেছে তাদের বড় অংকের লোকসান গুণতে হয়েছে।’
আরেক মসলা ব্যবসায়ী মো. বাদশা বলেন, ‘বাজারে এলাচির দাম বেশি থাকলেও প্রায় সব ধরণের গরম মসলার দাম কম। কোরবানিকে সামনে রেখে এখন বাজারে প্রচুর গরম মসলার চাহিদা বেড়েছে। তবে বাজার স্বাভাবিক রয়েছে।’
এদিকে খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে ভারতীয় মিষ্টি ঝাল জাতের মরিচ বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ১৫৫-১৬০ টাকায়, ভারতীয় ঝাল মরিচ ১৭৫-১৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। দেশীয় হাটহাজারি জাতের মরিচ ১৯০ টাকায়, কুমিল্লার ঝাল মরিচ বিক্রি হচ্ছে প্রতিকেজি ১৪৫-১৫০ টাকায়।
বাজারে মানভেদে ধনিয়া বিক্রি হয়েছে ৮৫ থেকে ১১০ টাকায়। বাজারে ফরিদপুর থেকে আসা ধনিয়া বিক্রি হচ্ছে ৯৫-১১০ টাকা কেজিতে। চলতি বছর ইথিওপিয়া থেকেও ধনিয়া আমদানি হয়েছে। এসব ধনিয়া বিক্রি হচ্ছে ৮৫-৯০ টাকা কেজি দরে।
অন্যদিকে খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে ভারতীয় ও দেশিয় দুই ধরণের হলুদ পাওয়া যাচ্ছে। তন্মধ্যে দেশিয় পাহাড়ী হলুদ মানভেদে বিক্রি হয়েছে প্রতিকেজি ১০০-১১০ টাকায় এবং ভারতীয় হলুদ বিক্রি হচ্ছে ১০৮-১১০ টাকা কেজিতে।
খাতুনগঞ্জের পাইকারি মসলা ব্যবসায়ী মো. সেকান্দর জানান, ‘কোরবানি ছাড়াও বছরের সব সময় মরিচ মসলার চাহিদা থাকে। প্রতিদিনই মরিচ মসল্লার বাজার উঠানামা করে। তবে এবার বাজার স্বাভাবিক রয়েছে।’
তবে ব্যবসায়ীরা জানান, বাংলাদেশে পোস্তদানা উৎপাদনও হয় না, আমদানিও হয় না। ভারত থেকে চোরাই পথে আসা পোস্ত দিয়েই চাহিদা মেটানো হয়।