কোন পথে যাচ্ছে আসাম

কাজি রশিদ উদ্দিন

22

ভারতের সেনাপ্রধানের তো এসব কথা বলার কথা নয়। আসাম সম্বন্ধে ইতোপূর্বে লিখেছিলাম। বিষয়টি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে আজ কিছু তথ্য সংগ্রহ করে আবার বিস্তারিতভাবে লিখতে বসলাম। মনে হয় ভারতে সেনাপ্রধানের কোন্ কথা কোথায় বলতে হয় আর কোথায় তা বলা উচিৎ নয়- তা তিনি ভালোই জানে। তবে ইতিহাস-ভ‚গোল বোধ থাকলে এমনটি করার কথা নয়। কোনটা সামরিক অপারেশনাল নিবিড় রুমে গোপনে বসার কথা আর কোনটা পাবলিক মিটিংয়ে এমন জ্ঞানও যার নেই- এমন লোক হলেন ভারতের বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত। তিনি এবার নয়াদিল্লীতে ‘নর্থ ইস্ট রিজিয়ন অব ইন্ডিয়া ব্রিজিং গ্যাপ এন্ড সিকিউরিটি বর্ডাস’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তৃতাকালে কিছু মন্তব্য করে বিতর্কের ঝড় তুলেছেন। ভারতীয় নিরাপত্তা এস্ট্যাবলিশমেন্টের সিনিয়র ব্যক্তিরাও ওই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন।
‘প্রথম আলো’ পত্রিকার ভাষ্য নিয়েই বলা যাক। কারণ অনেকের অনুমান এ অনুবাদ ভাষ্যটি তুলনামূলক সহনীয় ও বিশ্বাসযোগ্য মনে হতে পারে। পত্রিকাটি লিখেছে, ‘ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ থেকে লোক ঢুকানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত। তার অভিযোগ এর পেছনে রয়েছে পাকিস্তান চীনের মদদে একটি ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবে ভারতের ওই এলাকাকে ‘অস্থির’ করে তুলতেই এ কাজ করা হচ্ছে’। এটা শুনে অনেকের মনে হতে পারে, শুনতে কেউ কোথাও ভুল করেছে কিনা। তাদের সন্দেহ দূর করার জন্য কলকাতার ‘আনন্দবাজার’ থেকে এ প্রসঙ্গে কিছু উদ্ধৃতি আনা যায়। এ ব্যাপারে আনন্দবাজারের বক্তব্য এরকম- ‘ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবেই সুপরিকল্পিতভাবে এমন করছে ভারতের পশ্চিম দিকের পড়শি দেশ এবং তাতে সমর্থন জোগাচ্ছে উত্তর সীমান্তের দেশটি, যাতে ওই অঞ্চলে গোলযোগ বজায় রাখা যায়। রাওয়াত আসলে ক‚টনৈতিক দায় এড়াতে সরাসরি ‘পাকিস্তান’ বলেননি, ইঙ্গিত করে। ভারতের পশ্চিম দিকের পড়শি দেশ বলেছেন, আর চীনও বলেননি এর বদলে বলেছেন ‘উত্তর সীমান্তের দেশটি।
রাওয়াত আরো বলেছেন, আসামসহ উত্তর-পূর্ব ভারত পাকিস্তান দখলে (ঞধশবহ ড়াবৎ) নিতে চায়। তাই বাংলাদেশ থেকে মুসলমানদের নিয়ে গিয়ে এরা আসামের জেলাগুলো ভরে ফেলছে। এখানে রাওয়াতের ‘দখল’ কথাটির অর্থ বুঝে নিতে হবে। ভ‚গোল হিসেবে আসামের জেলাগুলো কোনভাবেই পাকিস্তানের পড়শি নয়। ফলে পাকিস্তানের পড়শি হিসেবে দখল ধরনের কিছু করে ফেলার প্রশ্ন নেই। তবে পাকিস্তান থেকে রওনা দিয়ে সারা ভারতের সুদীর্ঘ বুক পেরিয়ে এরপর বাংলাদেশে ঢুকে তারও উত্তরে গেলে আসামের দেখা মিলতে পারে বিপিন রাওয়াতের এটা অজানা নয়। কিন্তু তিনি মনে করেন, একটি অঞ্চলে বা কয়েক জেলায় মুসলমানেরা সংখ্যায় বেড়ে গেলে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে গেলে, এর মানে হলো- ওই অঞ্চল পাকিস্তানের দখলে চলে যাওয়া, পাকিস্তান হয়ে যাওয়া। এটা খুবই অবাস্তব বক্তব্য। কোনো রাষ্ট্রের সেনাপ্রধান এভাবে হুজ টক করতে পারেন না। মুসলমান মানেই পাকিস্তান, মুসলমান মানেই ভারতের শত্রæ- এগুলো কী বলেন তিনি। মনে হয় এই অনুমানের কারণে তিনি পাকিস্তান-চীনের কথিত পরিকল্পনার ভেতরে বিপদ দেখেছেন। এটা বলছি না চীন বা পাকিস্তান ভারতের প্রতিপক্ষ নয় বা হতে পারে না। নানা স্বার্থ সংঘাত হতেই পারে। কিন্তু শুধু মুসলমান হওয়ার কারণে এরা শত্রæ, এগুলো মূর্খতা বললেও কম বলতে হয়। তবে হ্যা বিজিপির ভোটের রাজনীতি এমন হতেও পারে।
রাওয়াত নিজের কথাগুলো বলতে দুটো বিশেষ শব্দ ব্যবহার করেছেন। বলেছেন, এটা পরিকল্পিত মাইগ্রেশন (চষধহহবফ রসসরমৎধঃরড়হ) আর এভাবে চীন-পাকিস্তান এক ছায়াযুদ্ধ (চৎড়ীু ধিৎ) চালাচ্ছে। রাওয়াত একজন সেনাপ্রধান। ফলে ‘প্লান্ড ইমিগ্রেশন’ বা ‘প্রক্সিযুদ্ধের’ সামরিক অর্থ তিনি না বুঝে লেখেননি বা বলেননি। এগুলো তার সচেতনভাবে বেছে নেয়া শব্দ বলে আমাদের মানতেই হয়। তবে পাকিস্তানের সাথে বহু আগেই লক্ষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি। এই বর্বর সামরিক জান্তার সাথে আমাদের সমঝোতা, সহমর্মিতার কোনও প্রশ্নই উঠে না। ভারতের মিডিয়াও অনেকে বলছেন রাওয়াত আসাম নিয়ে মন্তব্য করতে গেলেন কেন ? বিশেষ করে আসামে বিদেশি অনুপ্রবেশকারী কারা এবং কতজন তা যখন সরেজমিনে সার্ভে করে দেখার কাজ চলছে এবং নিবন্ধন তালিকা প্রস্তুত হচ্ছে। তাছাড়া সম্প্রতি ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে আগামী জুন মাসের মধ্যে তালিকা চ‚ড়ান্তভাবে প্রকাশ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তবে আমাদের প্রশ্ন আরো গোড়ায়। রাওয়াত ভারতের মতো দেশের সেনাপ্রধান। এই প্রতিষ্ঠান বাই ডিফল্ট নিজগুলে ও নিজ স্বার্থে অরাজনৈতিক থাকার কথা। ফলে প্রমাণিত তথ্য বা উপাত্ত ছাড়া অনুমিত ও উস্কানিমূলক বক্তব্য সেনাপ্রধানের মুখ থেকে বের হওয়া খুবই বিপজ্জনক। তাই প্রশ্ন করতে, বাংলাদেশ থেকে স্রোতের মতো (ইনফ্লাক্স) এবং ‘মুসলমানেরা’ আসামে গিয়েছে বা যাচ্ছে- এই তথ্য তিনি কোথায় পেলেন ? একজন সেনাপ্রধান নেহাত অনুমাননির্ভর কথা বলেন কি করে ? একজন ভারতীয় সেনাপ্রধানের জানা থাকার কথা। বাংলাদেশে একটা সরকার আছে। কিন্তু আপনার কথা শুনে মনে হতে পারে, আপনি দাবি করছেন, আমাদের সরকারসহ আমরা জনগণ সবাই চীন-পাকিস্তানের চাবি দেওয়া একেকটা পুতুল, পাপেট। ভারতের মত দেশের একজন সেনাপ্রধান এ রূপ অর্বাচিন সুলভ বক্তব্য দিতে পারেন তা আমরা বুঝতে পারছি না।
আসলে বিজেপি বা বিপিন রাওয়াত যদি অহিন্থ কোনো ধর্মের জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে সমস্যা মনে করেন, তবে বুঝতে হবে তারা ভারতকে হিন্দুত্বের ভারত মনে করেন, এমনটাই কামনা করেন। বরং কোনো ধর্মের (যেমন মুসলমানের) জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে সমস্যা মনে করাই অসাংবিধানিক। ভারত যদি রাজনৈতিক সাম্যের দেশ হয়ে থাকে। ভারতে ধর্ম নির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকারের সাম্য যদি বিজেপি বা রাওয়াত মানেন, তাহলে তারা শুধু হিন্দুত্বের রাষ্ট্র চাইতে পারেন না। রাওয়াতের (ভারতের সেনাপ্রধান) উচিত হবে। আগে ভারতের সংবিধানে একথা লিখিয়ে নেয়া যে, এখানে নাগরিক নির্বিশেষে সবার অধিকার সমান নয়। আমরা এখন দেখার অপেক্ষায় আছি, মোদির বিজেপি কী তামাশা করে।
একটা কথা পরিষ্কার করে বলা যায়, বিজেপি জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে যখনই কোনো এক ভারত (যেমন হিন্দুত্বের ভারত) গড়তে চাইবেন আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি। ওই বৈষম্য ও বিভাজনই মহাবিপদ ডেকে আনবে। ১৯৪৭ সালে এটাই হয়েছিল যে মুসলমান ইসক্লুসিভ সমান মর্যাদার নাগরিক থাকবে। তারা কখনও ভারতের জন্য হুমকি হবে না।
আসাম নিয়ে এখন যেসব কথা হচ্ছে তাতে বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে না বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখা। রাখাইন মিয়ানমারের মুসলমানদের জন্য কসাইখানায় পরিণত হয়েছে। আসামেও ঘটতে পারে। বিজেপি বলছে এসব বাংলাভাষি মুসলমান নাকি আসামে গেছে বেআইনিভাবে; কিন্তু এটা কী করে সম্ভব। কারণ, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে থাকে কড়া পাহাড়ায় ভারতীয় সীমান্ত প্রহরিরা। তাদের চোখে ধুলা দিয়ে কী করে এত বাংলাভাষি মুসলমান আসামে প্রবেশ করতে পারল। সেটা খুবই প্রশ্নসাপেক্ষ। অন্যদিকে ভারতের এক প্রদেশ থেকে আরেক প্রদেশে মানুষ সহজেই যেতে পারে। এক্ষেত্রে কোনো আইনগত বাধা নেই। পশ্চিমবঙ্গের সাথে আছে আসামের সাধারণ সীমান্ত। পশ্চিম বাংলা থেকে বাংলাভাষি মানুষ, তা যে মুসলমানই হোক আর হিন্দু হোক আসামে যেতে পারে বিনা বিধায়। কিভাবে বলা যেতে পারে যে, বাংলাভাষি মুসলমানরা এসেছে বর্তমান বাংলাদেশ থেকে? পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আসাম থেকে বাংলাভাষা বিতাড়নের বিরোধিতা করে বলেছেন, এর ফলাফল ভয়াবহ হবে। এর বিপক্ষে আসামের বিজিপি সরকার নাকি মামলা করেছে।
ভারতের সেনাপ্রধান আসামে বাংলাভাষি মুসলমানের অনুপ্রবেশ নিয়ে বলেছেন, এর মূলে আছে পাকিস্তান ও চীনের ষড়যন্ত্র। এ সম্বন্ধে আমরা আগে আলোচনা করেছি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে সহযোগিতা করার কোনো প্রশ্ন ওঠে না। অন্যদিকে আসাম ও চীন প্রায় লাগোয়া। চীন ইচ্ছা করলেই উলফাদের মদদ জুগিয়ে পরিস্থিতি অনেক ঘোলাটে করতে পারে। বাংলাভাষী মুসলমানদের দিয়ে যা কখনো সম্ভব নয়। সুতরাং চীন পাকিস্তানের সহায়তায় বাংলাভাষি মুসলমানদের বাংলাদেশ থেকে আসামে পাঠাচ্ছে এটি কোনো যুক্তিতেই ধোপে টিকেনা।
মনে পড়ছে ইশপের গল্প। ভাটিতে পানি খেয়ে উজানে পানি ঘোলা করবার গল্প। জানিনা ভারতের সেনাপতি আসলে কি চাচ্ছেন। যদি তিনি মনে করে থাকেন যে, এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে কেননা ভারত বিরাট শক্তিধর দেশ হলেও বাংলাদেশকে আক্রমণ করলে বিরাট একটা যুদ্ধ বিগ্রহ দানা বেঁধে যেতে পারে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খুব একটা কম হবে না।
১৯৭১ সালের পরিস্থিতি এখন আর বিরাজ করছে না। ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই বলেছিলেন বাইরের আক্রমণের হাত থেকে পাকিস্তানের অখন্ডতাকে রক্ষা করার জন্য চীন প্রতিশ্রæতিবদ্ধ। কিন্তু চীন শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্বাক্ষরিত যুদ্ধ এড়াতে চান। ১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। শান্তি-মৈত্রী-সহযোগিতা চুক্তি। আসলে সেটা ছিল একটি সামরিক চুক্তি। চীন ভারতের সাথে যুদ্ধে জড়ালে সোভিয়েত ইউনিয়ন চীনকে আক্রমণ করতে পারত, চীনের উত্তর সীমান্তে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন এখন আর নেই। রাশিয়া এখন আর ভারতবান্ধব রাষ্ট্র নয়। বরং রাশিয়া হয়ে উঠতে চাচ্ছে চীনবান্ধব।
যাকে বলে ২৭ কিলোমিটার (১৭ মাইল) চওড়া। এই করিডোরের মধ্যে দিয়েই স্থাপিত হতে পারছে ভারতের মূল ভ‚খন্ড থেকে পূর্ব ভারতের যোগযোগ ব্যবস্থা। শিলিগুড়ি করিডোন চীন সীমান্ত থেকে ১৩০ কিলোমিটার (৮০ মাইল) দূরে অবস্থিত। চীন যদি তিব্বতের চুম্বি উপত্যাকা থেকে আক্রমণ করে এই করিডোন দখল করে নিতে পারে, তবে আসামের সাথে ভারতের যোগাযোগ কেমন থাকতে পারে বাংলাদেশের মধ্যদিয়ে। একসময় নেপাল ছিল ভারতবান্ধব দেশ। কিন্তু এখন সে পরিণত হয়েছে এটি চীন বান্ধন দেশে। বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান এমন যে ভারত তাকে এখনই সহজে কব্জা করতে মনে হয় সক্ষম হবে না।
কেননা বাংলাদেশ এককভাবে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করবে না। ১৯৭১-এ যুদ্ধে ভারত জয়ী হয়েছিল কারণ তাতে বাংলাদেশের মানুষে একটি বিরাট সমর্থন ছিল। কিন্তু এখনকার পরিবেশ ও পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাধারণত গণতান্ত্রিক দেশে পররাষ্ট্র বিষয়ক নীতির ক্ষেত্রে সেনাপতিরা মুখ খোলেন না। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না, প্রধান সেনাপতিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো কথা বলতে। সেনাবাহিনী এভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ছে কেন। কেননা আসামের জনমত বদলে যাওয়া সম্ভব। তারা এড়াতে চাইতে পারে চীনের সাথে কোনও প্রকারের সংঘর্ষ। ব্যাপারটি আমাদের কাছে বেশ ঘোলাটে মনে হয়। মোদি সাহেব নিশ্চুপ কেন ?

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট