কেমন আছেন বেসরকারী চাকুরীজীবীরা প্রয়োজন জীবনধারণ উপযোগী বেতন

23

আ ব ম খোরশিদ আলম খান

আবদুল গফুর (ছদ্মনাম) একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে দারোয়ান তথা গার্ডের চাকরি করেন। স্ত্রী, দুই ছেলে, তিন মেয়ে নিয়ে সাত জনের সংসার। আবদুল গফুরের মাসিক বেতন ৯ হাজার টাকা। কাজের সময় ৮ ঘণ্টা। তবে বাড়তি রোজগারের প্রয়োজনে প্রায় ১৪/১৫ ঘণ্টা ডিউটি করেন। এতে মোটামুটি ১৪/১৫ হাজার টাকা আয় হয়। তিনজন পড়ে বাসার পাশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বড় ছেলে পড়ে উচ্চ বিদ্যালয়ে। বস্তি এলাকার চেয়ে একটু উন্নত হলেও বাসায় সব সময় পানি পাওয়া যায় না। সকালে এক ঘণ্টা পানি আসে। ২৪ ঘণ্টা ব্যবহারের জন্য পানি ড্রামে ধরে রাখতে হয়। বাসায় এক বার্নারের একটি গ্যাসের চুলা আছে। প্রতি মাসে ৯২৫ টাকা গ্যাসের দাম দিতে হয়। ছেলে মেয়েদের পড়াশোনায় আবদুল গফুরের অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। অভাব ও টানাটানির সংসার। বড় ছেলে আরিফ শহরের একটি অখ্যাত স্কুলে ৭ম শ্রেণিতে পড়লেও সামনে যে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারবে এর কোনো ভরসা পাচ্ছে না। কারণ অভাবের সংসার। অভাবী দরিদ্র পিতার ঘরে জন্ম নেয়ায় উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয় বড় ছেলে আরিফের। ৭ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে তার আর পড়াশোনা করা হয় না। সে একটি কুলিং কর্নারে ১২শত টাকা বেতনে চাকরি নেয়। অভাবী পিতার সংসারের ভার এতে একটু হাল্কা হয়। তবুও আরও তিন সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে আবদুল গফুরের গলদঘর্ম অবস্থা। খেয়ে দেয়ে বেঁচে থাকবেন, নাকি ঘর ভাড়া দেবেন, নাকি সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বহন করবেনÑ সারাক্ষণ এই দুঃস্বপ্ন ঘিরে থাকে আবদুল গফুরের মাঝে। দ্বিতীয় সন্তান আফরোজা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এবার ৫ম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা দেবে। তার বয়স এখন ১১ বছর। বড় ছেলের বয়স ১৩ বছর। তৃতীয় সন্তান নাজমা পড়ে তৃতীয় শ্রেণিতে। দ্বিতীয় সন্তান কালাম পড়ে প্রথম শ্রেণিতে। সবার ছোট কুলসুমার বয়স এক বছর। সন্তানদের দেখাশোনা করতে গিয়ে স্ত্রীর পক্ষেও কোনো চাকরি করা সম্ভব হচ্ছে না। দারোয়ানের চাকরি করে আবদুল গফুর যে নয় হাজার টাকা বেতন পান এবং বাড়তি ডিউটি করে আরো ৪/৫ হাজার টাকা পান তাতে তাঁর সংসার চলে না। এই শহরে ৭জনের সংসার টেনেটুনে চালাতেও কমপক্ষে ২২/২৫ হাজার টাকা দরকার। কিন্তু আবদুল গফুর সর্বসাকুল্যে পান ১৪/১৫ হাজার টাকা। এই টাকায় তার অভাব যায় না। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। সারাদিন দুশ্চিন্তায় কাটে আবদুল গফুরের দিন। স্ত্রী লায়লা বেগম খুব ল²ী মেয়ে। অভাবের সংসার কোনো মতে টেনে টুনে চালিয়ে নিতে সে স্বামীকে বেশ সহযোগিতা করেন। কীভাবে দশ টাকা বাঁচানো যায়, কীভাবে সংসারের খরচ সামাল দেয়া যায়Ñ স্বামী-স্ত্রী বোঝাপড়া করে চলেন। তবুও কী অভাব বা সংসারের দুঃখ-দুর্দশা ঘুচে তাদের!
আবদুল গফুরের পরিবারের জীবন থমকে দাঁড়ালেও, সংসার চালিয়ে নিতে যথেষ্ট তাদের বেগ পেতে হলেও তারা যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে, মালিকেরা ডুবে থাকে কাড়ি কাড়ি টাকায়। দিন দিন তারা ফুলে ফেঁপে বড়লোক হচ্ছে, তারা রাজপথে কোটি টাকা দামের গাড়ি হাঁকান, বড় বড় দালান কোঠা-প্রাসাদে আলীশান জীবন কাটে এই বিপুল বিত্তবান মালিকদের। বড় লোকেরা সন্তানদেরকে উচ্চ শিক্ষিত করেন। বিপুল টাকার বিনিময়ে দেশে-বিদেশে সন্তানদের তারা জজ-ব্যারিস্টারি পড়ান। অথচ দুঃখজনক যে, এদের প্রতিষ্ঠানেই অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ৮/১০/১২ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করে অত্যন্ত মানবেতর জীবন যাপন করেন। মালিকদের একটু মায়া হয় না। অধীনস্থ কর্মকর্তা কর্মচারীরা যে কীভাবে কতো কষ্টে জীবন পার করছেন তা তাঁরা ভাবেন না। এতো অল্প বেতনে যে জীবন পার করা যায় না, তা যে মালিকেরা বুঝেন না তা নয়। ঠিকই তারা বুঝেন। কিন্তু অতি মুনাফার লোভে, দিনে দিনে কোটিপতি এবং আরও কোটিপতি হওয়ার মানসিকতা তাদেরকে গভীরভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। গরিবরা বাঁচুকÑমরুক তাতে তাদের কি যায়-আসে! স্বার্থপরতা, অমানবতা, নিষ্ঠুরতা এর চাইতে আর কি হতে পারে! মালিকপক্ষ কী একটু মানবিক ও সহানুভূতিশীল হতে পারেন না? পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা দিন পার করছেন আরো মানবেতর অবস্থায়। সেখানেও নেই উপযুক্ত বেতন। ৮/১০/১২ হাজার টাকা বেতনে যে একটি পরিবার বা সংসার চলে না, তা কেন বুঝতে চান না মালিকপক্ষ! তাঁরা কোটি কোটি টাকার মালিক। ১০ হাজার টাকার বেতনের স্থলে ২০ হাজার টাকা বেতন দিলে তাদের তেমন ক্ষতি হবে না। তবে শত কোটি টাকা বা হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যেতে একটু বেশি সময় লাগবে, ততোদিন তাঁরা কেন অপেক্ষা করবেন? উপযুক্ত বেতন ভাতা পেলে অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একটু হাসি-খুশিতে সচ্ছল জীবন যাপন করতে পারেন। তেমনি এতে মালিক পক্ষের মানবিক দায়িত্ববোধের পরিচয়ও মেলে।
এখানে আরেকটি প্রসঙ্গ টানা যায়। আপনার শিল্প কারখানা বা প্রতিষ্ঠানে খরচপাতি বাদ দিয়ে প্রতি মাসে কোটি টাকা লাভ হয়, আপনি চল্লিশ লাখ টাকা নিজে রেখে বেতন ভাতা বাবদ ষাট লাখ টাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রদান করলে তাই তো হবে প্রকৃত মানবতা ও মনুষ্যত্বের পরিচয়। এটাই তো হবে একজন নিষ্ঠাবান, দরদী ও সৎব্যবসায়ীর আসল পরিচয়। আপনি মাসে কোটি টাকা আয় করলেন, কর্মকর্তা কর্মচারীদের ঠকিয়ে মাসে নামে মাত্র দশ লাখ টাকা বেতন ভাতা বাবদ দিলেন। নব্বই ভাগ লাভ আপনি নিজেই রেখে দিলেন এটি কী ইনসাফ হলো? এতে কী নির্দয়তা ও নিষ্ঠুরতা প্রকাশ পায় না?
আপনি একটি দশতলা ভবনের মালিক। মাসে তিন লাখ টাকা ভাড়া পান। আপনি একজন বা দুইজন দারোয়ান রেখেছেন, তাদের কতো টাকা বেতন দিচ্ছেন? যারা ২৪ ঘণ্টা আপনার ভবন পাহারা দিচ্ছে, দিনে রাতে ডিউটি করছেÑ আপনি কতো বেতন দিচ্ছেন তাদের? এই ভবন বাবদ মাসে আয় আপনার তিন লাখ টাকা। অথচ দুইজন প্রহরী বা দারোয়ানকে আপনি মাসে দিচ্ছেন মাত্র ৮/৯ হাজার টাকা করে ১৮/২০ হাজার টাকা। কিন্তু কেন? এই দুইজনের বেতন কী জীবন ধারণ উপযোগী ৪০/৫০ হাজার টাকা হতে পারে না? জনপ্রতি ২০/২৫ হাজার টাকা বেতন পেলে প্রহরীর পরিবারটি মোটামুটি সচ্ছলভাবে চলতে পারবে। এতে মালিক হিসেবে আপনারও বড় কোনো ক্ষতি হবে না। দিন-রাত ডিউটি করে তিন লাখ টাকা যারা মাসে আপনাকে আয় করে দিচ্ছেন তাদের জন্য ৪০/৫০ হাজার টাকা বেতন নির্ধারণই হলো যৌক্তিক এবং সত্যিকার ইনসাফ। এর ব্যতিক্রম হলে আপনাকে বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। তাদের ওপর মারাত্মক জুলুম হবে। পরকালেও আপনাকে জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হবে। আপনার লোভ এবং নিষ্ঠুরতার জন্য অধীনস্থ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা মানবেতর জীবন যাপন করবে তা কখনো কাম্য হতে পারে না। অধীনস্থ কর্মকর্তা কর্মচারীদের উপযুক্ত বেতন ভাতা না দেয়া অবশ্যই জুলুম এবং চরম অমানবতার শামিলÑ তা যেন আপনি ভুলে না যান। বেতন বৈষম্য বা কম বেতন প্রদান শ্রম শোষণের উজ্জ্বলতর একটি দিক।
দেশের সরকারিভাবে মালিক শ্রমিক আইনেও শ্রমিক কর্মচারীদেরকে যৌক্তিক জীবন ধারণ উপযোগী বেতন ভাতা দেওয়ার নির্দেশনা আছে। এমনকি উৎপাদনের একটি লভ্যাংশও শ্রমিকরা পাওয়ার দাবি রাখে, তাও আইনে আছে। বর্তমানে দেশে কয়টি শিল্প কারখানায় উৎপাদিত আয়ের লভ্যাংশ শ্রমিকদের দেওয়া হচ্ছে? যেখানে মাসিক উপযুক্ত বেতন ভাতা প্রদানেও নির্দয়ভাবে ঠকানো হচ্ছে, সেখানে আবার উৎপাদিত পণ্যের লাভের হিস্যা দেওয়া হবে, তা তো দুরাশাই মাত্র। ইসলামী জীবন বিধানেও মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলা আছে। কর্মকর্তা কর্মচারীদের উপযুক্ত বেতন দেয়াই ইসলামী নির্দেশনা। জীবন ধারণ উপযোগী বেতন না দিলে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে মালিক পক্ষ যেন চরম শোষণই করলেন অধীনস্থদের ওপর। শ্রম শোষণের চেয়ে বড় অন্যায় ও নির্মমতা আর হতে পারে না। মালিক পক্ষের নির্দয়তা ও নিষ্ঠুরতায় শ্রমিক শ্রেণি আজ অবহেলিত, নিষ্পেষিত ও নানাভাবে অমানবিকতার শিকার। এটি আর চলতে দেওয়া যায় না। সম্মানিত মালিক পক্ষের প্রতি বিনীত অনুরোধ, আপনারা একটু মানবিক হোন। শত কোটি টাকার মালিক হোন, ক্ষতি নেই। কিন্তু অধীনস্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে যথাযথ যৌক্তিক ও জীবন ধারণ উপযোগী বেতন দিন। যাতে তারা মোটামুটি দিন চালিয়ে দিতে পারে। আপনার একটু মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তাদের দুঃখ-কষ্টের বোঝা হাল্কা হতে পারে। ভোগে আনন্দ ও সুখ নেই। পরস্পর সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে চলা উচিত। ত্যাগেই আছে প্রকৃত সুখ- এটি আপনারা নিশ্চয়ই জানেন। মালিক-শ্রমিক সবাই হাসিখুশিতে থাকুন।
লেখক : সাংবাদিক, ইসলামী চিন্তাবিদ