কী নিয়মে শিশু শিক্ষা

মাহমুদুল হক আনসারী

12

শিশু শিক্ষায় হরেক রকম শিক্ষা প্রতিষ্টান দেখা যায়। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রাইমারী শিক্ষা, ইবদেতায়ী মাদ্রাসা শিক্ষা, কেজি স্কুলের নামে হরেক রকম শিশু শিক্ষা সমাজে বিদ্যমান আছে। কাউমি মাদ্রাসা ভিত্তিক শিক্ষা বোর্ড কর্তৃক নূরানী মাদ্রাসা অজ গাঁ গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে এ শিক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। কাউমি মাদ্রাসার আদর্শভিত্তিক সিলেবাস, আরবী, বাংলা, ইংরেজী, গণিতসহ তাদের আদর্শভিত্তিক শিক্ষা কারিকুলাম তৈরী করে সমাজকে আদর্শিক ও শিক্ষায় গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। বর্তমান সরকার কাউমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ দওরায়ে হাদিসকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি দেয়ায় তাদের মধ্যে কিছুটা প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে। তবে তাদের শিক্ষার যে কারিকুলাম সেটার কোনো পরিবর্তন দৃশ্যমান নয়। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের সনদের মান দেয়ার কথা ও সিদ্ধান্ত হলেও রাষ্ট্রের কোনো নিয়মনীতি তারা অনুসরণ করছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশে স্বাধীনতার আগে ও পরে কাউমি মাদ্রাসা শিক্ষার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে এক সময় কাউমি শিক্ষায় বাংলা, ইংরেজী, গণিতের কোনো অস্তিত্ব ছিলো না। পর্যায়ক্রমে এখন তাদের শিক্ষা কার্যক্রমে এসব বিষয় যুক্ত হয়েছে। আরবী, উর্দুকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে বাংলা, ইংরেজী, গণিত, বিজ্ঞানে তাদের শিক্ষার্থীরা বহুদিনের জন্য পিছিয়ে পড়েছিল। কাউমি মাদ্রাসার সনদ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়া অন্য কোনো দেশে তাদের সনদের মর্যাদা ছিলো না। এ বিষয়টি কাউমি ধারার শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্টদের বুঝে আসায় ধীরে ধীরে তারা মাতৃভাষা বাংলার সাথে ইংরেজী, গণিত, বিজ্ঞানসহ অন্যান্য ভাষা শিক্ষায় অগ্রসর হতে দেখা যায়।
দেশে সরকারি বেসরকারি শিক্ষায় ও সিলেবাসে ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান। ইংলিশ মিডিয়াম শিশু স্কুল গুলোতে ইংরেজী ভাষাকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের নিজস্ব সিলেবাসে স্কুলগুলো পরিচালনা করে। কেজি স্কুল সমূহের পরিচালনাকারীদের মধ্যে একটা যুগসূত্র আছে। তারা তাদের নিজস্ব নিয়ম মোতাবেক এসব স্কুল পরিচালনা করে যাচ্ছে। এসব স্কুলের কতিপয় স্কুল সরকারের শিক্ষা অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়ে স্কুল পরিচালনা করলেও অসংখ্য শিশু শিক্ষা প্রতিষ্টান কোনো রাষ্ট্রীয় অথবা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া শিশু শিক্ষায় জড়িয়ে পড়ছে এমনটিও দেখা যায়। শিশু শিক্ষায় রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো ধরনের সমন্বয় জনগণ দেখছে না। যার যার খুশি খেয়াল মতো শিশু প্রতিষ্টান গড়ে তোলে শিক্ষার নামে নিজস্ব ও তাদের চিন্তা চেতনার আলোকে সিলেবাস তৈরী করে এসব স্কুলে শিক্ষা কার্যক্রম চলতে দেখা যায়। একেকটা স্কুলের ড্রেসের যেমন পার্থক্য সিলেবাসেও ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং উৎকন্ঠা ও উদ্বেগের বিষয় হলো একটা জাতি শিক্ষার নামে আগামী প্রজন্মকে দ্বিধা বিভক্ত কওে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একটি পরিবারের এক সন্তান কেজি স্কুলে পড়ে তার চিন্তা চেতনা পাঠ্যক্রম এক রকম। অন্যদিকে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষায় যে শিশু পড়ছে তার শিক্ষা চিন্তা চেতনা অন্যরকম।
সরকারি সিলেবাসে বাংলাদেশ মাদ্রাসা বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে ইবদেতায়ী শিক্ষা কার্যক্রম যারা গ্রহণ করছে তারা আরেক রকম। কাউমি মাদ্রাসার যারা পড়ছে তারা আরেক ভিন্ন মতাদর্শ চিন্তা চেতনা ও সিলেবাস নিয়ে পড়ে তাদের ধ্যান ধারণা আরেক রকম। বলা বাহুল্য একটা পরিবারের পাঁচ সন্তানের পড়ালেখায় ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্টান ভিন্ন ধরনের চিন্তা চেতনায় মত পার্থক্য ও নানামুখী শিক্ষা সংস্কৃতিতে তৈরী হচ্ছে। ফলে দেখা যায় পাঁচ সন্তানের মধ্যে চিন্তা চেতনায় কোনো মিল খঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একেক প্রতিষ্টানের ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা আদর্শে গড়ে ওঠা এসব সন্তানরা নানামুখী চিন্তা চেতনায় ভিন্ন ভিন্নভাবে গড়ে উঠছে। এ প্রভাব পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও পড়তে দেখছি। তাহলে শিক্ষার মাধ্যমে জাতীয় ঐক্য শৃংখলা উন্নয়ন অগ্রগতি কী করে সম্ভব সেটা অন্তত পক্ষে অন্য কেউ বুঝলেও আমার বুঝে আসে না। দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চলে এ ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা চেতনায় দেখা যায়।
উন্নত কান্ট্রিগুলোতে সমাজ ও জাতিকে বিভক্ত করার মতো শিক্ষা ও ধর্মীয় বিভাজন মূলক শিক্ষার দেয়া ও গ্রহণের সংবাদ আমার জানা নেই। তাহলে আমাদের মতো পিছিয়ে থাকা দেশগুলোতে ঠিক কী উদ্দেশ্যে শিক্ষার নামে নানামুখী শিক্ষা প্রতিষ্টান গড়ে তোলে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষায় কেনো বিভাজন আর বিভক্ত বুঝতে অবাক লাগে। দেশের সরকার বুঝে হোক অথবা না বুঝে হলেও এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখছে না বলে আমার বিশ্বাস। ফলে আজকে শিশু শিক্ষায় দেশবাসী কোনো শৃংখলা দেখছে না। যার যার মতো করে অলিগলিতে প্রতিষ্টান গড়ে তোলে এসব শিশু শিক্ষা প্রতিষ্টান চালাচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত এসব প্রতিষ্টানে ক্ষণে ক্ষণে নানা অঘটন দুর্ঘটনার সংবাদ প্রচার মিডিয়ায় দেখা যায়। স্বাধীন সার্বভৌম দেশে নাগরিক হিসেবে জনগণের যেমনি অধিকার আছে, একই ভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ম মেনে শিশু প্রতিষ্টান পরিচালনা করাও নাগরিকের অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। এ কর্তব্য যারা প্রতিষ্টান পরিচালনা করছে তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। অনিয়ন্ত্রিতভাবে শিশু শিক্ষার নামে অহরহ ধর্মীয় আবরণ দিয়ে অথবা বিদেশী সিলেবাসে গড়ে ওঠা কেজি স্কুলগুলো কোন নিয়মে স্বাধীন রাষ্ট্রে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে সেটা আমার কাছে পরিষ্কার নয়। অনিয়ন্ত্রিত এসব প্রতিষ্টানে অহরহ দুর্ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে। ১১ এপ্রিল চট্টগ্রামের বায়েজিদ থানার ওয়াজেদীয়া এলাকায় একটি কাউমি মাদ্রাসায় একজন ছাত্রকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুবরণ করার সংবাদ চট্টগ্রামসহ সারাদেশে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ১০ থেকে ১২ বছরের এ শিশু শিক্ষার্থী ঠিক কী কারণে ফাঁসিতে ঝুলে তার মৃত্যু হল সেটা এখনো ধোয়াশায় রয়েছে। স্থানীয়ভাবে নানা জনের নিকট নানা মন্তব্য বক্তব্য শোনা গেলেও ইস্যুটাকে নিয়ে সামাজিক সংগঠন প্রতিষ্টানের বিরোদ্ধে শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করেছে। আসলে কী কারণে ওই ছাত্রের মৃত্যু সে বিষয় অবগত নই। কথা হলো শিক্ষা প্রতিষ্টানের রাষ্ট্রীয় সব ধরনের নিয়মনীতি মেনে এসব মাদ্রাসা গড়ে উঠে নি এবং উঠছে না। তাহলে একটা স্বাধীন দেশে ঘটনা দুর্ঘটনার জন্য রাষ্ট্র দায় এড়াতে পারে না। যদি তাই হয় তাহলে কেন রাষ্ট্র এসব অগোছালো অনিয়ন্ত্রিত শিশু প্রতিষ্টানের বিরোদ্ধে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবস্থা করছে না সেখানেই আমার কথা।
শিক্ষা পবিত্র একটি জাতীয় নাগরিক অধিকার। এ অধিকারের সুযোগ গ্রহণ করে যদি কোনো নাগরিক রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক শৃংখলা ভঙ্গ করে অপরাধ করে সেটা রাষ্ট্রদ্রোহী ফোজদারী অপরাধের মধ্যে গণ্য হবে। রাষ্ট্র কেন এসব শিশু প্রতিষ্টানকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসছে না সেখানেই আমার উৎকন্ঠা। জাতিকে শৃংখলায় আনতে হলে শিক্ষায় বিশৃংখল ও দ্বিধা বিভক্ত শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। শিশু শিক্ষার নামে অনিয়ন্ত্রিত এসব প্রতিষ্টানকে যতদ্রুত সময়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে ততই জাতির মঙ্গল ও সফলতা আসবে। অন্যথায় পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত বিভাজন আর দুর্ঘটনা ও অঘটন বন্ধ করা সম্ভব হবে না। গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে গুরুত্বের সাথে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের দাবি রাখছে দেশের অভিভাবক মহল।