কিশোর অপরাধ ও আইন পর্যালোচনা

17

লিটন দাশ গুপ্ত

কিশোর অপরাধ বিষয়ক এই লেখাটি অনেকদিন যাবৎ লিখব ভাবছিলাম কয়েকবার লেখার উদ্যোগও নিয়েছিলাম। কিন্তু সময় পরিবেশ অলসতা ব্যস্ততা ইত্যাদির কারণে লেখা হয়ে উঠেনি। কিন্তু গত কয়দিন আগে গাজীপুর জেলায় মা ও দুইমেয়েকে রেপসহ চারজনকে হত্যার ঘটনায় ‘পারভেজ’ নামে এক বখাটে কিশোর জড়িত থাকায়, ক্ষুব্ধ হয়ে বাধ্য হয়ে আজকে সেই লেখায় গতি সঞ্চারিত হয়। যে কথাটি বলছিলাম; গত মাসের শেষের দিকে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলায় রেদোয়ান হোসেন নামের এক প্রবাসীর বাড়িতে ঘটে যাওয়া ঘটনা। ঐ প্রবাসীর স্ত্রী স্মৃতি আক্তার ফাতেমা (ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক) ও তার দুই মেয়ে এক ছেলেকে নিয়ে সুখে ও শান্তিতে বসবাস করে আসছে নিজ বাড়ি জৈনাবাজার এলাকায়। ঘটনার দিন পারভেজ নামে এক বখাটে, সন্ধ্যার পর কোন এক সময় ওয়াশরুমের ভেন্টিলেটর ভেঙ্গে, বাসায় ঢুকে দীর্ঘ সময় খাটের নীচে লুকিয়ে থাকে। এমনিতে গ্রামীণ পরিবেশ তাছাড়া করোনার পরিস্থিতি, তাই অন্যদিনকার মত রাত দশটার দিকে উক্ত সদস্যগণ ঘুমাতে যায় যার যার মত করে। বখাটে পারভেজ রাত বারোটার দিকে খাটের নীচ থেকে বের হয়ে প্রথমে ঘুমন্ত অবস্থায় স্মৃতি আক্তার এর কক্ষে গিয়ে মাথায় আঘাত হানে, পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে দুইমেয়ের কক্ষে ও পরে ৮ বছর বয়সী ছেলের উপর আক্রমণ করে। অর্ধমৃত অবস্থায় মা-মেয়ে তিনজনকে ‘রেপ’ করেছে বলে সে স্বীকার উক্তি দিয়েছে। প্রায় সাড়ে পাঁচঘন্টা ব্যাপী ধীরে ধীরে সে ঠান্ডা মাথায় ঐ বাসায় তান্ডব চালায়। আসার সময় ‘বোটি’ দিয়ে তাদের মৃত্যু নিশ্চিত করতে সবার গলা কেটে দেয়। তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী দুটি স্বর্ণের চেইন ও মাটির নীচ থেকে দুটি মোবাইল সেট উদ্ধার করা হয়। এই হচ্ছে সেই দিনের ঘটনা।
এখন কথা হচ্ছে এই সেই ছেলেটি, গত ’১৮ সালে একই এলাকায় ‘নীলিমা’ নামে ৭ বছরের একটি মেয়েকে রেপ করে একই কায়দায় হত্যা করেছিল। তখন নাকি তার বয়স ১৭ বছর হওয়ায় কিশোর সংশোধনাগারে প্রেরণ করা হয়। সেখান থেকে মুক্তি পেয়ে আবারো নৃসংশ এই অবর্ণনীয় অপরাধ ঘটালো। শুধু পারভেজ নামে ঐ ছেলেটি নয়, এই রকম কতশত অপরাধের পর, তাদেরকে বয়স কম হবার দরুন কিশোর সংশোধনাগারে পাঠিয়ে সংশোধন করে আনা হয়, পরে কিন্তু কয়দিন যেতে না যেতেই আবার বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িয়ে যায়।
আবার এই সকল অপরাধ ঘটনার পিছনে জড়িত থাকে তথাকথিত বড়ভাই; যারা বয়ঃসন্ধিকাল চলা অবস্থায় কিশোরদের টার্গেট করে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করে। আবার তথাকথিত ঐ সকল বড় ভাইয়েরা কোন একটি রাজনৈতিক দলের পিছনে থেকে, রাজনীতিকে আত্মরক্ষার ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে। সুযোগ সন্ধানী সমাজ বিরোধী ঐ সকল বড় ভাইয়ের কোন আদর্শ থাকেনা। আর এদের সহযোগিতার সুযোগ নিয়ে ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী ছেলেরা চুরি ডাকাতি, ধর্ষণ খুন হত্যা, মাদক পাচার, ছিনতাই অপহরণ, ইভটিজিং অস্ত্রবহন, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার সহ এমন কোন খারাপ কাজ বা অপরাধ নেই যেখানে তারা জড়িয়ে যাচ্ছেনা। আগে মনে করতাম, দরিদ্র শ্রেণির কিশোর-রা অর্থাভাবে কিংবা নি¤œ মধ্যবিত্ত পরিবারের কিশোর-রা অর্থলোভে এমন অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছে; বাস্তবে কিন্তু তা নয়। অনেক বড় ধনী উচ্চশিক্ষিত উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানও জড়িয়ে যাচ্ছে। তার মানে নিশ্চয় আমাদের ক্রটিপূর্ণ সামাজিক প্রেক্ষাপট, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ, পিতামাতার অসর্তকতা আর অসচেতনাই প্রধানত দায়ী।
এবার প্রাক্তন আইনবিষয়ের ছাত্র হিসাবে, আইনসংক্রান্ত কিছু বিশ্লেষণ না করলে নয়- জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে বলা হয়েছে ১৮ বছরের নীচে প্রত্যেক মানবসন্তানই শিশু। তবে নিয়মঅনুযায়ী এই ১৮ বছর হিসাব করা হয় মাতৃগর্ভে ভ্রƒণ সৃষ্টি থেকে। এছাড়া এই বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে সমগ্র বিশ্বের পরিবেশ পরিস্থিতি, শৈশব-কৈশোর সময়কাল ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে। এই দিকে দন্ডবিধি ১৮৬০ এর ৪র্থ অধ্যায়ের ৮২ ধারায় বলা হয়েছে, নয় বছরেরর নীচে কোন শিশুর কোন কার্য, এবং ৮৩ ধারায় বলা হয়েছে নয় বছরের বেশী ও বারো বছরের নিচে অপরিণত বোধশক্তি সম্পন্ন শিশুর কার্যসমূহ সাধারণ ব্যতিক্রম হওয়ায় বিচারশক্তি রহিতকরণ হয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশে ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের নীচে সবাই শিশু। এই আঠারো বছরের নীচে প্রত্যেক শিশুর সংগঠিত অপরাধকে কিশোর অপরাধ হিসাবে গণ্য করা হয়ে থাকে। এই আইনের ১৫ ধারায় বলা হয়েছে ১৮ বছরের নীচে অপরাধী শিশুকে প্রাপ্তবয়স্ক অভিযুক্তের সাথে একই কক্ষে রেখে বিচার করা যাবেনা। ১৭(৪) ধারা অনুযায়ী শিশু আদালত অবশ্যই সাধারণ আদালত থেকে ভিন্ন হতে হবে। আর ৩১(২) ধারায় বলা হয়েছে শিশু অপরাধের বিচারে বিচারক, শিশুর বয়স শারীরিক মানসিক অবস্থা, শিক্ষা সামাজিক পারিবারিক অর্থনৈতিকসহ অন্যান্য কারণ বিবেচনায় নিতে হবে।
পার্শ্ববতী দুটি দেশ ভারত মায়ানমারে ৭ থেকে ১৪ বছর পর্যন্ত কিশোর অপরাধী হিসাবে গণ্য করা হয়ে থাকে। কেবল ৭ বছরের নিচে হলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে বিবেচিত নয়। আমাদের দেশে শিশু আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের নীচে, অন্যায় অনিয়মের সাথে সংশ্লিষ্ট কিশোর-কিশোরী অপরাধী হিসাবে শাস্তির পরিবর্তে ‘শান্তিতে’ সংশোধনের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। আর এই বয়সী অপরাধীদের সংশোধনের জন্যে গাজীপুর টঙ্গীতে একটি, যশোর পুলেরহাটে একটিসহ মোট দুটি কিশোর সংশোধন ও পুনর্বাসণ কেন্দ্র রয়েছে। এইছাড়া গাজীপুর কোনাবাড়িতে একটি কিশোরী অপরাধীর জন্যে সংশোধন ও উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে। এইগুলো সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন সমাজ সেবা অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত। এখানে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখাযায় মোট কিশোরের প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ খুন-রেপ মামলার আসামী, আর বাকীসব অন্যান্য অপরাধ মামলার সাথে জড়িত। অপরাধীর বয়স অধিকাংশ ক্ষেত্রে বয়স ১৩ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে। এখন আমার কথা হচ্ছে কিশোর অপরাধীদের সংশোধনের সুযোগ দেয়ার যে ব্যবস্থা আছে, তা ঠিক আছে এতে কোন সমস্যা নেই। তবে এই ক্ষেত্রে সমস্যা মনে হচ্ছে অপরাধির বয়স। তাই আমার প্রস্তাব থাকবে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিশোর অপরাধীর বয়স সর্বোচ্চ সীমা ১৪ বছর পর্যন্ত করা। একইসাথে ধর্ষণ খুন হত্যা এসিড নিক্ষেপের মত বড় ধরণের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কিশোর অপরাধীদের স্বাভাবিক প্রচলিত আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এরপর ছোটখাটো অন্যান্য অপরাধগুলোর জন্যে সংশোধনের সুযোগ দেয়া যেতে পারে।
এই বিষয়ে অনেকেই বলতে পারে, কৈশোর সময়ে অপরাধ প্রবণতা বয়ঃসন্ধিকালের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য; শাস্তির আওতায় আনা হলে শিশু-কিশোর অধিকার লঙ্ঘন হবে। এদেরকে স্পষ্ট ভাবে বলতে চাই, একটি শিশুর অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে, একাধিক পরিবারের মানবাধিকার ও বেঁচে থাকার অধিকার শেষ হতে দেয়া যায়না। তাছাড়া আমি কিশোর সংশোধনের বিপক্ষে বলছিনা। লঘু অপরাধের জন্যে শাস্তি মুক্ত সংশোধনাগারে নেয়া যাবে। আর গুরুতর কিশোর অপরাধীকে সংশোধনের জন্যে পাঠিয়ে অতীতে বিশেষ কোন প্রকার পরিবর্তন হয়নি। তাছাড়া শাস্তি না হওয়ায় তারা আরো উৎসাহিত হয়েছে। যার প্রমাণ, সংশোধন হয়ে আসার পর পুনরায় অপরাধের সাথে জড়িয়ে যাওয়ার ঘটনাসমূহ। একইসাথে এটাও বলতে চাই, শৈশবসময় আর কৈশোরকাল হচ্ছে আগামীদিনের স্বপ্নীল প্রত্যাশিত প্রজন্ম অন্বেষণের আলোকবর্তিকাস্বরূপ; ভবিষ্যৎ জীবন, সমাজ দেশ গঠনের জন্যে প্রস্তুতির আদর্শ সময়। কিন্তু ত্রুটিপূর্ণ সমাজব্যবস্থা ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ, পরিবারের অসচেতনতা ইত্যাদি তাদেরকে মহাকাশের কৃষ্ণগহ্বরে নিক্ষেপ করে দিচ্ছে। সেই বিষয়েও আমাদেরকে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
লেখক: সাহিত্যিক ও শিক্ষক