কিডনি রোগ নিয়ে কিছু কথা

13

মানবদেহে সবার সাধারণত দুটো কিডনি বা বৃক্ক থাকে; তবে জন্মগতভাবে কারো কারো একটি কিডনিও থাকতে পারে। একটি কিডনি নিয়ে মানুষ স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারে। কিডনি দেহের বিভিন্ন বিপাকীয় বর্জ্য দেহ থেকে প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়। কিডনিতে কর্টেক্স আর মেডুলা নামক দুটো অংশ আছে এবং নেফ্রন নামক গঠনগত আর কার্জগত একক আছে। নেফ্রন দেহে চাকুনি যন্ত্র হিসেবে কাজ করে। দেহের বর্জ্য নিষ্কাশন ছাড়াও কিডনি আরো কিছু কাজ করে, যেমনÑ দেহে লবণ ও পানির ভারসাম্য রক্ষা, বøাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণ, অ¤øাক্ষারের ভারসাম্য রক্ষা, ভিটামিন-ডি ও রক্তকোষ তৈরিতে সাহায্য করা ইত্যাদি।
কেইস স্টাডি এক : মি. হোসেন; বয়স ৩৫, অধূমপায়ী। গত কয়েকমাস ধরে তার দুর্বলতা আর মাথা ব্যাথা। স্থানীয় ডাক্তারের কাছে গেলে তিনি তাকে বললেন যে তার উচ্চরক্তচাপ হয়েছে। তিনি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানালেন তার কিডনিতে সমস্যা আছে। তারপর রোগী এই লেখকের কাছে এসেছেন তার অবস্থা বুঝার জন্য আর কি করা যায় তা জানার জন্য। দেখা গেল তার রক্তাসল্পতা আছে আর রক্তচাপ বেশি। কিডনির আল্ট্রাসনোগ্রাম খারাফ রিপোর্ট দিল আর রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা অনেক বেশি পাওয়া গেল। এসব কিছুই রোগীর জন্য দুঃসংবাদ।
কেইস স্টাডি দুই : নান্টুর বয়স ১১; তার হাতে-পায়ে কিছু চুলকানি আছে। কয়েকদিন ধরে সেগুলি পেকে যাওয়া শুরু করল আর এর পর তার মাথাব্যথা শুরু হল, প্রস্রাব কমে গেল আর লালচে আকার ধারণ করল। শরীর ফুলে গেল বিশেষ করে মুখ ফুলে গেল। এরমধ্যে একবার খিচুনী হলে তাকে ডাক্তারের কাছে নেয়া হল আর তিনি তাকে জরুরি ভিত্তিতে হাস্পাতালে ভর্তি করতে বললেন।
আলোচনা : প্রগ্রাব হল কিডনি রোগের বিভিন্ন উপসর্গ প্রকাশের প্রধান মাধ্যম। প্রস্রাব কম হওয়া বা একেবারে বন্ধ হয়ে যাওয়া, বারে বারে প্রস্রাব হওয়া আর রাতে বেশি প্রস্রাব হওয়া, প্রশ্রাবের রং লাল হওয়া, ফেনাযুক্ত বা সাদাটে প্রস্রাব হওয়া ইত্যাদি কিডনি রোগের লক্ষণ হতে পারে।
কোমড় থেকে শুরু করে তল পেট ব্যথা আর প্রস্রাব করার সময় জ্বালাপোড়া, কিডনি বা রেচন অঙ্গের রোগের জন্য হতে পারে।
রক্তশূন্যতা, রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া, মাথাব্যথা, বমিবমি ভাব বা বমি হওয়া ইত্যাদি উপসর্গ কিডনি রোগে হতে পারে। কম বয়সী ছেলে-মেয়েদের চামড়ার ফুসকুড়ি হবার পর শরীর-মুখ ফুলে যাওয়া, রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া আর প্রস্রাব কম হওয়া বা না হওয়া কিডনি রোগের লক্ষণ।
কিডনি রোগ দীর্ঘ মেয়াদের (ক্রনিক) বা স্বল্পমেয়াদের (একিউট) হতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদের কিডনি রোগ বা ক্রনিক রেনাল ফেইলিউর হল এমন একটা অবস্থা যেখানে রোগীর দুটো কিডনিই ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে পড়ে। রোগীর রক্তসল্পতা দেখা দেয় আর রক্তচাপ বাড়তে থাকে। সেরাম ক্রিয়েটিনিন নামক বিপাকীয় বর্জ্য রক্তে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। এই রোগের শেষ অবস্থায় ডায়ালাইসিস করতে হয় অথবা কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হয়। দুটোই বেশ ব্যয়বহুল। সপ্তাহে দুই বা তিনবার ডায়ালাইসিস করে এসব রোগী আনেক দিন বেঁচে থাকতে পারে। তবে কিডনি প্রতিস্থাপন এই রোগের আধুনিকতম চিকিৎসা ব্যবস্থা। বর্তমানে বাংলাদেশে সফলভাবে কিডনি প্রতিস্থাপন হচ্ছে।
কিডনি দিয়ে অতিরিক্ত প্রোটিন বা আমিষজাতীয় পদার্থ যেমন- এলবুমিন বের হয়ে জেতে পারে। মাত্রাতিরিক্ত প্রোটিন বের হলে শরীর ফুলে যেতে পারে- যাকে নেফ্রটিক সিন্ড্রোম বলে। বাচ্চা অবস্থায় এরোগ হলে এর পরিনাম সাধারণত ভাল হয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে নির্দিষ্ট ওষুধে অনেক বাচ্চার এই রোগ সম্পূর্ণ ভাল হয়। কিন্তু প্রাপ্ত বয়স্কদের হলে অনেক ভোগান্তি হয়।
বাচ্চাদের চামড়ায় জীবাণুঘটিত ক্ষত বা ফুসকুড়ি হবার পর কখনো কখনো কিডনি আক্রান্ত হয়। বাচ্চাদের প্রস্রাবের রং লাল হয়, প্রস্রাব কম হয়, শরীর ফুলে যায় আর রক্তচাপ বেড়ে যায়। এটাকে পোস্ট স্ট্রেপ্টোকক্কাল গেøামেরুলোনেফ্রাইটিস বলে। এক্ষেত্রে দ্রæত হাস্পাতালে ভর্তি আর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা নিতে হবে।
প্রচুর ব্যথার ওষুধ খেলে কখনো কখনো কিডনি আক্রান্ত হয়। তাই ব্যথার ওষুধ সেবন করার সময় একটু সাবধানী হতে হবে। আর অতি প্রয়োজন না হলে ব্যথার ওষুধ সেবন বন্ধ রাখতে হবে অথবা ডাক্তারের পরামর্শমত চলতে হবে।
কিডনিতে পাথর আর টিউমার হয় যা সার্জারি বা শল্য চিকিৎসায় সমাধানযোগ্য।
ফিরে দেখা : প্রথম রোগীর দীর্ঘমেয়দী কিডনি কার্যকর (ক্রনিক রেনাল ফাইলিউর) রোগ হয়েছে। তাকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত¡াবধানে নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হবে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে আর পরবর্তিতে ডায়ালাইসিস বা কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
দ্বিতীয় রোগীর পোস্ট স্ট্রেপ্টোকক্কাল গেদ্বামেরুলোনেফ্রাইটিস হয়েছে। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা করতে হবে আর প্রস্রাব হবার ওষুধ দিতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান, ত্বকের যতœ নেয়া, ব্যথার ওষুধ সেবনে সাবধানী হওয়া আর কবিরাজ বা হেকিমের অবৈজ্ঞানিক ওষুধের মিশ্রণ সেবন থেকে বিরত থাকলে কিডনি অনেকাংশে সুস্থ থাকবে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল