কিংবদন্তি আলমাহমুদ

মুহাম্মদ ইয়াকুব

14

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষ, কিংবদন্তি কবি আল মাহমুদ (১১ জুলাই ১৯৩৬ – ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯) স্বকীয় মহিমায় উদ্ভাসিত। নিজস্বতা সৃজনে অনন্য কবি আল মাহমুদ এপার ওপার দুই বাংলায়ই সমান পরিচিত ও জনপ্রিয়। ১৯৬৮ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সে কবি আল মাহমুদ ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার’ প্রাপ্ত হয়েছেন। সমালোচকদের বক্তব্য মোতাবেক ‘সোনালী কাবিন’, ‘কালের কলস’, ‘লোক-লোকান্তর’ এর পর যদি মায়াবীপর্দা দোলেনাও ওঠতো, যদি নতুন কোন কবিতা না লিখতেন অথবা সাহিত্যের অন্য কোন শাখায় পদার্পণ না করতেন, তবুও আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্যে সর্বকালের সেরা সাহিত্যিকদের তালিকায় প্রথম শ্রেণিতে থাকতেন।
১৯৭১ সালে কবি আল মাহমুদের সন্ধান চেয়ে অলইন্ডিয়া রেডিওতে ঘোষণা পাঠ করেন ভারতের বিখ্যাত বেতার উপস্থাপক দেব দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক জনপ্রিয় বিবেচিত হওয়ায় তাঁর তিনটি কাব্যগ্রন্থের সমন্বয়ে কলকাতার বিখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এর প্রত্যক্ষ তত্ত¡াবধানে প্রকাশিত হয় – আল মাহমুদের কবিতা।
সংবাদপত্রে লেখালেখির স‚ত্র ধরে কবি ঢাকা আসেন ১৯৫৪ সালে। ১৯৫৪ সাল অর্থাৎ ১৮ বছর বয়স থেকে তার কবিতা প্রকাশ পেতে থাকে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকা এবং কলকাতার নতুন সাহিত্য, চতুষ্কোণ, ময়ূখ ও কৃত্তিবাস ও বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত বিখ্যাত ‘কবিতা’ পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা-কলকাতার পাঠকদের কাছে তার নাম সুপরিচিতহয়ে ওঠে এবং তাকে নিয়ে আলোচনার স‚ত্রপাত হয়। আল মাহমুদ সাংবাদিক হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন এবং যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সরকার বিরোধী জাসদের পত্রিকা ‘গণকণ্ঠ’ সম্পাদনার দায়ে আল মাহমুদ প্রায় এক বছর কারাভোগ করেন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবিদের খুবই ভালোবাসতেন। তিনি কবি আল মাহমুদকে শিল্পকলায় চাকরী দেবার ইচ্ছা পোষণ করলে একজন ব্যক্তি আল মাহমুদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বঙ্গবন্ধু ঐ ব্যক্তির উপর ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, “কবিদের কোন ডিগ্রি লাগেনা”। জেল হতে মুক্তির পর বঙ্গবন্ধু কবি আল মাহমুদকে ডেকে পাঠান এবং শিল্পকলা একাডেমিতে চাকুরী গ্রহণ করতে আদেশ দেন। কবি সাংবাদিকতা পেশায় ফিরার ইচ্ছা ব্যক্ত করলেও বঙ্গবন্ধুর আদেশ অমান্য করতে পারেননি। দীর্ঘদিন চাকুরী করে ১৯৯৩ সালে শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।
কবি আহসান হাবীবের হাতে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে লোকজ উপাদান ব্যবহারের স‚চনা হলেও এতে ব্যাপকতা দান করে নিজস্বতা অর্জন করেছেন কবি আল মাহমুদ। আধুনিক শহর নির্ভর কবিতা হতে বের হয়ে এসে তিনি সৃষ্টি করেছেন আধুনিক পল্লিনির্ভর কবিতা। কবির কবিতাংশ,-
“আমরা যেখানে যাবো শুনেছি সেখানে নাকি নেই
বাঁচারমত জল, জলস্রোত, বর্ষণ হবে না।” (কালের কলস)
আধুনিক কবিতায় স্বতস্ফ‚র্তভাবে বিদেশি ও আঞ্চলিক শব্দের সফল প্রয়োগকারী কবি আল মাহমুদ। আধুনিক কবিতায় লোকজ উপাদান ব্যবহারে আল মাহমুদ অদ্বিতীয়। গ্রামঢু ঐতিহ্যের সাথে সম্পৃক্ততার সরল স্বীকারোক্তি দিয়ে সফল আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ করে লিখেছেন,-
“কোমল ধানের চারা রুয়ে দিতে গিয়ে
ভাবলাম, এ মৃত্তিকা প্রিয়তমা কিষাণী আমার।” (সোনালী কাবিন)
শ্রমিকের শ্রমের ম‚ল্য আমরা কেউই দিই না। অথচ শ্রমিকরাই বিদেশ হতে নিয়ে আসে আমাদের সুনাম। কবি আল মাহমুদ শ্রমিকদেরকে জাতীয় বীর আখ্যায়িত করার পাশাপাশি সাম্যবাদের বাণী উচ্চারণ করে লিখেছেন,-
“শ্রমিক সাম্যের মন্ত্রে কিরাতের উঠিয়েছে হাত
হিয়েন সাঙের দেশে শান্তি নামে দেখো প্রিয়তমা,
এশিয়ায় যারা আনে কর্মজীবী সাম্যের দাওয়াত
তাদের পোষাকে এঁটে দিই বীরের তকোমা।” (সোনালী কাবিন)
আল মাহমুদের কবিতায় দ্রোহ বা প্রতিবাদের বাণীও উচ্চারিত হয়েছে উচ্চকণ্ঠে। সিনিয়র কবিগণের সমালোচনা সাধারণত জুনিয়র কবিগণ করেন না বা করার সাহস পান না। সেই ক্ষেত্রে আল মাহমুদ কিন্তু সম্প‚র্ণ ব্যতিক্রম। পূর্বস‚রি কবিগণের দরবারি তোষামুদের বিপক্ষে দৃঢ়হস্তে কলম চালিয়েছেন। যুগে যুগে ছিল দরবারি কবিদের ব্যাপক প্রভাব। দরবারি তোষণকারী পদলেহনকারী কবিদের প্রতি প্রচন্ড ঘৃণা জানিয়ে আল মাহমুদের কঠোর বাক্যবাণ,-
“পূর্ব পুরুষেরা কবে ছিল কোনসম্রাটের দাস
বিবেক বিক্রি করে বানাতেন বাক্যের খোঁয়াড়
সেই অপবাদে আজও ফুঁসে উঠে বঙ্গের বাতাস
মুখ ঢাকে আলাওল-রোসাঙ্গের অশ্বের সোয়ার।” (সোনালী কাবিন)
মহাকবি আলাওলের নাম উল্লেখ করে কবি তাঁর পরিচয়ও নিশ্চিত করেছেন-রোসাঙ্গের অশ্বের সোয়ার! উল্লেখ্য, বাংলা সাহিত্যের ভাষায় আরকানকে রোসাঙ্গ বলা হয়।
শিশু সাহিত্যে কবি আল মাহমুদের তুলনা তিনি নিজেই। কবি লিখছেন,-
“আম্মা বলেন পড়রে সোনা
আব্বা বলেন মন দে,
পাঠে আমার মন বসে না
কাঁঠাল চাঁপার গন্ধে।”
উপমা প্রয়োগে আল মাহমুদ অনন্য। শিশুতোষ কবিতায়ও আল মাহমুদ চমৎকার উপমার প্রয়োগ করে লিখেছেন,-
“নারকেলের ঐ লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল
ডাবেরমত চাঁদ ওঠেছে ঠান্ডা ও গোলগাল।”
ভাষা সৈনিক কবি আল মাহমুদ ভাষা শহিদের রক্তের সুদ‚র প্রসারী গন্তব্য ও রক্ত প্রবাহের তীব্রতা চমৎকারভাবে বর্ণণা করেছেন,-
“ফেব্রুয়ারি ২১ তারিখ দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টিনামে বৃষ্টি কোথা বরকতের রক্ত।”

আমাদের দেশের সুশীল সমাজ বিশেষ একটি ধর্মের আচার অনুষ্ঠানের বিরোধীতা করে তৃপ্তি পান! এ প্রসংঙ্গে বিশিষ্ট বাঙালি সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন,-
ইসলামের বিরোধীতা করাই যেন সুশীল সমাজের কাজ। পাকিস্তানের পরমাণু বিজ্ঞানী ড. আব্দুস সালাম ঢাকা সফরে সুশীলদের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্যের শুরুতে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম বলায় সবাই একে অপরের মুখের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে! কারণ তারা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে, এতবড় একজন বিজ্ঞানী বক্তব্যের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলছেন! (সাক্ষাতকারের ভাব বক্তব্য)।
জীবনের প্রথমদিকে মার্কসবাদি নাস্তিকতাবাদে বিশ্বাসী হলেও জেল হতে মুক্তির পর কবি আল মাহমুদ আস্তিকতার দিকে প্রত্যাবর্তন করেন। ধর্মীয় চেতনায় গভীর বিশ্বাসের প্রভাব তাঁর সাহিত্যে দেখা দিলে অনেকেই ক্ষেপে যায়। প্রসংগক্রমে উল্লেখ্য, অপর অন্যতম প্রধান আধুনিক কবি সামশুর রাহমানও জীবনের শেষ বয়সে এসে পরকালীন চিন্তায় কিছু ধর্মীয় কবিতা রচনা করেছেন। কবিদের মধ্যে বিভিন্ন মতবাদে বিশ্বাসী কবি থাকবেন এটাই স্বাভাবিক। সমালোচকদের প্রতি প্রতিকবির বক্তব্য,-
“বৃষ্টির ছাঁটে শিহরিত হয় দেহ
কেউ বলে আমি কবি কিনা সন্দেহ!”
ম‚লু কবির আস্তিকতায় প্রত্যাবর্তন জেল জীবনে। ‘সোনালী কাবিন’ এ কবির যে বিশ্বাস প্রকাশিত হয়েছিল জেল পরবর্তী জীবনে সে বিশ্বাস সম্প‚র্ণ বিপরীত রূপ ধারণ করে। এ বিষয়ে কবি নিজে বলেছেন,-“আমি জেলখানায় বসে ত্রিশের কবি স্বভাবের বিপরীতমুখী বাক চাঞ্চল্য সৃষ্টিতে পারঙ্গম হয়েছিলাম।” (যেভাবে বেড়ে উঠি-আল মাহমুদ)
কবির বিশ্বাস পরিবর্তিত হলেও আত্মবিশ্বাস প্রবল। ‘প্রিয় শাহরিয়ার’ শিরোনামে এক প্রবন্ধে কবি বিশ্বাস পরিবর্তনের এক আবেগঘন বক্তব্য প্রদান করেন,-
‘একখন্ড পবিত্র কুরআন আমার স্ত্রী আমাকে জেলখানায় দিয়ে এলে আমিতা অর্থসহ অদ্যোপান্ত পাঠ করা শুরু করি। আর প্রথম পাঠেই আমার শরীর কেঁপে উঠে। এর আগে কোনগ্রন্থ পাঠে আমার মধ্যে এমন ভ‚মিকম্প সৃষ্টি হয়নি। যেন এক অলৌকিক নির্দেশে আমার মস্তক লুটিয়ে পড়ে। প্রিয় শাহরিয়ার এভাবেই এক বিভ্রান্তি থেকে আল্লাহ আমাকে ফিরিয়ে এনেছেন। এখন যদি আমার এই পবিত্র প্রত্যাবর্তনের কথা আমার কাব্যে উত্থাপন করি, শাহরিয়ার তুমি কি তা পড়বে না? (কবির আত্মবিশ্বাস-গ্রন্থের ‘প্রিয় শাহরিয়ার’ প্রবন্ধ হতে)
লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো, আরব্য রজনীর রাজহাঁস, বখতিয়ারের ঘোড়া, অদৃশ্য বাদীদের রান্না বান্না, অষ গধযসঁফ ওহ ঊহমষরংয, দিনযাপন, দ্বিতীয় ভাঙ্গন, একটি পাখি লেজ ঝোলা, পাখির কাছে ফুলের কাছে, আল মাহমুদের গল্প, গল্পসমগ্র, প্রেমের গল্প, যেভাবে বেড়ে উঠি, কিশোর সমগ্র, কবির আতœবিশ্বাস, কবিতা সমগ্র, কবিতা সমগ্র-২, পানকৌড়ির রক্ত, সৌরভের কাছে পরাজিত, গন্ধ বণিক, ময়‚রীর মুখ, না কোন শ‚ন্যতা মানিনা, নদীর ভেতরের নদী, প্রেম ও ভালোবাসার কবিতা, প্রেম প্রকৃতির দ্রোহ আর প্রার্থনা কবিতা, প্রেমের কবিতা সমগ্র, উপমহাদেশ, বিচ‚র্ণ আয়নায় কবির মুখ, উড়াল কাব্য, জলবেশ্যাসহ আল মাহমুদের অসংখ্য কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। কবি আল মাহমুদের জলবেশ্য ছোটগল্প অবলম্বনে ভারতে নির্মিত হয়েছে অসাধারণ একটি চলচিত্র। চলচিত্রটি ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পেতে সক্ষম হয়েছে। ‘ঐতিহ্য’ প্রকাশনী কবির সমগ্র সাহিত্য কর্ম ১১ খন্ডে প্রকাশ করেছে।
আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবিই নন, তিনি একাধারে একজন কিংবদন্তী ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, শিশু সাহিত্যিক ও সাংবাদিক। কবি আল মাহমুদ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখ লোক লোকান্তরে চলে গেলেও কালের কলস হয়ে বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।