কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে কুঠিরশিল্প

8

প্লাষ্টিক সামগ্রীর সহজলভ্যতা, প্রয়োজনীয় পুঁজির অভাব, উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় বাঁশশিল্প এখন হারিয়ে যাচ্ছে। এ শিল্পের উপর নির্ভরশীল লোকজন এখন মানবেতর জীবনযাপন করছে। এক সময় প্রতিটি বাড়িতেই বাঁশের তৈরি এসব জিনিসপত্রের ব্যবহার ছিল। বর্তমান প্লাষ্টিকের তৈরি জিনিসপত্র এসব পণ্যের স্থান দখল করে নিয়েছে। দামও কম। ফলে প্লাষ্টিকের তৈরি এসব জিনিসপত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে মুখ থুবড়ে পড়ছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ কুঠির শিল্প।
ক্রেতার অভাব আর এ শিল্পের মূল উপকরণ বাঁশের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে কুঠির শিল্পীরা তাদের পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। তারপরও অনেকেই নিরুপায় হয়েই বাপ-দাদার এ পেশা টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এক সময় আবহমান গ্রামবাংলার ঐতিহ্য শিল্প ছিল বাঁশ শিল্প। এ শিল্পের সাথে এখনও জড়িত রয়েছে উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামের কয়েক হাজার ঋষি স¤প্রদায়ের মানুষ।
এক সময় ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ স¤প্রদায়ের লোকেরা রাস্তার ধারে অথবা বাড়ির আঙ্গিনায় বসে বাঁশের চটা দিয়ে চাটাই, কুলা, ডালা, চাঙ্গারি, ঢালন, মাছ রাখা খালই, ঝুড়ি, মোড়া, ঝাঁকা, মুরগির খাঁচা, চালনসহ বিভিন্ন জিনিষপত্র তৈরির কাজ করতো। গৃহবধূরাও ঘরের কাজ শেষে এসব জিনিস তৈরি করতো। তাদের তৈরি এসব হাটে-বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতো। এলাকার চাহিদা মিটিয়ে সরবরাহ করা হতো দেশের বিভিন্ন জেলায়।
বাঁশ শিল্পী সাগর ঋষি, অসিম ঋষি, বিশ্ব ঋষি জানান, এক সময় গ্রামগঞ্জের ঘরে ঘরে বাঁশের তৈরি এসব সামগ্রীর খুবই কদর ছিল। এখন সে স্থান দখল করে নিয়েছে সস্তা দরের প্লাষ্টিকের তৈরি নানা রঙের জিনিসপত্র। ফলে বাঁশের তৈরি জিনিসপত্র তেমন আর বিক্রি হয় না। তবে এখনও অনেক সৌখিন মানুষ আছে যারা আমাদের তৈরি এসব জিনিষ কিনতে চায়। এ কাজে আগের মত আর লাভ হয় না। তবুও খেয়ে না খেয়ে অন্যান্য কাজের পাশাপাশি বাপ-দাদার এ পেশা ধরে রেখেছি।
তারা আরো বলেন, আগে গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই বাঁশঝাড় ছিল। তাতে নিজেদের চাহিদা মিটিয়েও বছরে অনেক টাকার বাঁশ বিক্রি করতো। তখন বাঁশের দামও ছিল কম। ৩/৪ বছর আগেও মাঝারি ধরনের একটি বাঁশের মূল্য ছিল ৭০ থেকে ৮০ টাকা। বর্তমানে বাঁশঝাড় কমে যাওয়ায় দামও বেড়েছে অনেক। বর্তমানে একটি বাঁশ বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকায়। কিন্তু সে অনুপাতে বাঁশের তৈরি এসব পণ্যের মূল্য বাড়েনি। এতে বাঁশের তৈরি এসব জিনিসপত্র বিক্রি করে লাভ কম হওয়ায় এ শিল্পে আগ্রহ হারাচ্ছে মানুষ।
কুঠির শিল্পীরা মনে করেন, আবহমান গ্রামবাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে এ বাঁশ শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা দরকার। তাই এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের বাঁশ চাষে জনগণকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।