কারাগারে সন্ত্রাসী অমিত হত্যা

রিমান্ড শেষে রিপনের জবানবন্দি

নিজস্ব প্রতিবেদক

21

পাঁচদিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে কারাভ্যন্তরে যুবলীগ নামধারী সন্ত্রাসী অমিত মুহুরীকে ইটের আঘাতে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন আসামি রিপন নাথ। অমিতকে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যার কারণ হিসেবে জবানবন্দিতে তার কথা ও আচরণে নিজের মধ্যে অপমানবোধ ও ক্ষোভ সঞ্চারিত হওয়ার কথা বলেছেন ছোট অপরাধের অভিযোগে প্রথমবারের মত কারাগারে এসে খুনের মত ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়ানো রিপন।
আদালতে নিযুক্ত নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (প্রসিকিউশন) কাজী সাহাবুদ্দিন আহমেদ জানান, কারাভ্যন্তরে অমিত হত্যা মামলার তদন্তকারী সংস্থা নগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা গতকাল মঙ্গলবার আসামি রিপন নাথকে অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম মহিউদ্দিন মুরাদের আদালতে হাজির করেন। আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়ার কথা জানালে বিচারক তার খাস কামরায় ১৬৪ ধারায় আসামির জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এরপর তাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক আজিজ আহমদ জানান, জবানবন্দিতে আসামি রিপন একাই ইটের আঘাতে অমিতকে হত্যার দায় স্বীকার করেছে। রিপন বলেছে, রাতে অমিত তাকে পায়ের কাছে ঘুমাতে বললে তার মধ্যে অপমানবোধ হয়। সে সময় অমিত তাকে জোর করে এবং ভয় দেখায়। এতে তার খুব রাগ হয়। এরপর অমিত ঘুমিয়ে পড়লে রাগের মাথায় সে ইট দিয়ে অমিতের মাথায় আঘাত করে হত্যার কথা জানিয়েছে।
আসামির জবানবন্দির মধ্য দিয়ে মামলার তদন্তে অগ্রগতি হলেও আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি রয়েছে জানিয়ে ইন্সপেক্টর আজিজ বলেন, চার্জশিট দেয়ার আগে আসামির জবানবন্দির বক্তব্যও পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। প্রত্যক্ষদর্শী ও সাক্ষীদের বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যতা কতটুকু মিল বা অমিল রয়েছে সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষেই চার্জশিট তৈরি করে আদালতে জমা দেয়া হবে।
এর আগে গত ৩ জুন মামলার তদন্তকারী সংস্থা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দাখিল করা ১০ দিনের রিমান্ড আবেদনের শুনানি করে পাঁচদিন মঞ্জুর করেন অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম মহিউদ্দিন মুরাদ। এরপর ঈদের পরদিন অর্থাৎ গত বৃহস্পতিবার কারাগার থেকে আসামি রিপন নাথকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিজেদের হেফাজতে নেয় ডিবি। গত তিন দিন ধরে তাকে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ডিবি কর্মকর্তারা দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। এরইমধ্যে মামলার আলামত হিসেবে কারাগার থেকে হত্যাকাÐে ব্যবহৃত ভাঙা ইট ও রক্তমাখা কম্বলও জব্দ করা হয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঘটনার দিন দুপুরেই আসামি রিপন নাথকে ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ছয় নম্বর কক্ষে স্থানান্তর করা হয়। ওই কক্ষে আগে থেকেই ছিলেন সন্ত্রাসী অমিত মুহুরী ও বেলাল। এছাড়া, দেলোয়ার নামে আরেক আসামিও ছয় নম্বর কক্ষে ছিলেন; যিনি জামিন লাভ করায় ওইদিন কারাগার থেকে মুক্তি পান। দেলোয়ারের মুক্তির পর রিপনকে ওই কক্ষে স্থানান্তর করা হয়। দুপুরে ওই কক্ষে আসার পর দুর্ব্যবহার কিংবা ঝগড়াঝাটির জের ধরে কয়েকঘন্টা পার না হতেই আসামি রিপন নাথ মধ্য রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় কম্বল মুড়িয়ে ভাঙা ইট দিয়ে শুধুমাত্র মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে অমিতকে হত্যা করবেন- এমনটা বিশ্বাস করা কঠিন। আঘাতের ধরণ দেখেই যে কারও মনে হতে পারে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ীই অমিত মুহুরীকে হত্যা করা হয়েছে। নইলে আসামি রিপন ঘুমন্ত অবস্থায় অমিতকে শুধুমাত্র মাথার পেছনে কেন আঘাত করবেন? হত্যার উদ্দেশ্য ছাড়া তো কারও মাথায় আঘাত করার কথা নয়। সিসি ক্যামেরার পাশাপাশি কারারক্ষীদের সার্বক্ষণিক বাড়তি নজরদারির মধ্যে থাকা সেলের ভেতরে সংঘটিত হত্যাকাÐটি যে পূর্বপরিকল্পিত সেই সন্দেহ জোরালো হওয়ার নানাবিধ কারণ রয়েছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন। সেলের ভেতরে সুরক্ষিত জায়গায় খুনের ঘটনা ঘটায় তাতে আর কারও সম্পৃক্ততার অভিযোগ খতিয়ে দেখাটাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অবশ্য অমিতের বাবা অরুণ মুহুরী ঘটনার পর থেকেই হত্যাকাÐের সাথে কারা প্রশাসন ও বাইরের কেউ জড়িত থাকতে পারে বলে অভিযোগ করে আসছেন।
উল্লেখ্য, গত ২৯ মে রাতে কেন্দ্রীয় কারাগারের ৩২ নম্বর সেলের ছয় নম্বর কক্ষে মধ্যরাতে ঘুমন্ত অবস্থায় ইটের টুকরো দিয়ে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী অমিত মুহুরীর মাথার পেছনে আঘাত করার কথা জানায় কারা কর্তৃপক্ষ। অমিতের কক্ষে ওইদিন দুপুরে আসা আরেক বন্দী রিপন নাথ এ ঘটনা ঘটিয়েছেন বলেও দাবি তাদের। হাসপাতালে অমিতের মৃত্যুর পর জেলার নাশির আহমেদ বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। একদিন পর মামলার তদন্তভার দেয়া হয় নগর গোয়েন্দা পুলিশকে। ডিবির পরিদর্শক আজিজ আহমেদ মামলা তদন্তের দয়িত্ব পান। সীতাকুÐ উপজেলার মৃত নারায়ণ চন্দ্র নাথের ছেলে রিপন পাহাড়তলীর সাগরিকা এলাকার অর্গানিক জিন্স নামের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। অশোভন আচরণের জন্য তাকে ওই কারখানা থেকে ছাঁটাই করা হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ছুরি হাতে ওই কারখানায় ঢুকে কয়েকজন কর্মীকে জিম্মি করার অভিযোগে গত ৯ এপ্রিল রিপনকে গ্রেপ্তার করে পাহাড়তলী থানা পুলিশ। ওই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা হয়। জীবনে প্রথম কারাবাসে অভ্যস্ত হওয়ার মধ্যেই রিপন লোমহর্ষক একাধিক হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারের সুরক্ষিত ৩২ নম্বর সেলে অন্তরীণ দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী অমিত মুহুরীকে মাথায় ইট দিয়ে উপর্যূপরি আঘাতে হত্যার মধ্য দিয়ে খুনের মত ভয়ঙ্কর অপরাধের খাতায় নিজের নাম লেখালেন। অপরদিকে, রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে কয়েকবছরে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীতে পরিণত হওয়া যুবলীগ নামধারী অমিত মুহুরী নন্দনকাননে নিজের বাসায় ডেকে নিয়ে বন্ধু ইমরানুল করিম ইমনকে হত্যা করে লাশ ড্রামে ভরে রাণীর দিঘিতে ফেলে দেয়ার অভিযোগে ২০১৭ সালের ২সেপ্টেম্বর কুমিল্লার একটি মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র থেকে ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে তৃতীয় দফায় কারাগারে যান। এর বাইরেও অমিতের বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে রেলের দরপত্র নিয়ে জোড়া খুন ও পুলিশের ওপর হামলাসহ নানা অভিযোগে অন্তত ১৩টি মামলা রয়েছে।