বিশ্ব পরিমাপ দিবস আজ

কাপড়ে শুভঙ্করের ফাঁকি মিটারে কিনে গজে বিক্রি

এম এ হোসাইন

26

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরিমাপক এককে বিক্রি হওয়ার কথা কাপড়। বাজারে পরিমাপক একক বাদ দিয়ে ভিন্ন কৌশলে বিক্রি হচ্ছে কাপড়। মেট্রিক পদ্ধতিতে মিটার হিসাবে কাপড় কেনা-বেচা বাধ্যতামূলক হলেও মিটারের পরিবর্তে গজ হিসাবে কাপড় বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। আর এতেই রয়েছে শুভংকরের ফাঁকি। প্রতি ৫ মিটারে কম দেওয়া হচ্ছে এক মিটার কাপড়। এমন কারসাজি করা হলেও পরিমাপ ও ওজন নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ বিএসটিআই নিরব দর্শকের ভূমিকায় আছে। মাঝেমধ্যে অভিযানের নামে লোক দেখানো কার্যক্রম চালালেও কাপড়ের বাজারে কোনোধরনের তদারকি নেই বিএসটিআই’র।
আজ ২০ মে, বিশ্ব পরিমাপ দিবস। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি কাজের সাথে মাপজোখের ব্যাপার জড়িত থাকে। কোনো কিছুর পরিমাণ নির্ণয় করা হলো পরিমাপ। পরিমাপ করার জন্য কোনো একটা কিছুর সাথে তুলনা করতে হয়। এজন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আদর্শ ঠিক করা আছে। আন্তর্জাতিক দৈর্ঘ্য পরিমাপের আদর্শ একক হচ্ছে মিটার। কাপড় বিক্রির ক্ষেত্রে মিটার পদ্ধতি প্রয়োগ হওয়ার কথা। টেইলার্স থেকে শুরু করে কাপড়ের খুচরা দোকান, পাইকারি দোকান এমনকি ফ্যাক্টরিতেও মিটার হিসাবেই কাপড় বিক্রির নিয়ম রয়েছে। অথচ এই নিয়মের তোয়াক্কা না করে সর্বক্ষেত্রে গজ হিসাবে কাপড় বিক্রি হচ্ছে। এতে সরল মনে ভোক্তারা কাপড় কিনে প্রতারিত হচ্ছেন।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ক্যাব চট্টগ্রামের সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, কাপড় কেনা হয় মিটার হিসাবে। আন্তর্জাতিক একক হিসাবে মিটারেই সারা বিশ্বে কাপড় বিক্রি হয়। অথচ আমাদের এখানে মিটারে কিনে কাপড় বিক্রি করা হয় গজে। এ ক্ষেত্রে সু² কারসাজির আশ্রয় নেওয়া হয়। প্রতি ৫ মিটার কাপড় বিক্রিতে গজের হিসাবে এক মিটার কম দেওয়া হয়। এটি শুভংকরের ফাঁকি। বিএসটিআইকে এ বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। একক অনুযায়ী ভোক্তা যাতে কাপড় কিনতে পারেন সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কর্মাস এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, কাপড়ের বাজার নিয়ে আমার আইডিয়া নেই। কাপড়ের ব্যবসা আমি করিনি। তবে গজের চেয়ে মিটার বড়। সরকারি যেটা নিয়ম আছে সে অনুযায়ী কাপড় বিক্রি করা উচিত। মিটারে কিনে গজে বিক্রি করা উচিত নয়।
সংসদে ‘ওজন ও পরিমাপ মানদন্ড আইন, ২০১৮’ পাস হওয়ার পর তা বাস্তবায়নে মাঠে নামে বিএসটিআই। কাপড়ের মাপে দৈর্ঘ্যরে একক মিটার পদ্ধতি প্রয়োগের জন্য কাপড় ব্যবসায়ীদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করে বিএসটিআই। এসব বৈঠকের তেমন অগ্রগতি স্বয়ং বিএসটিআইও দেখতে পায়নি মাঠ পর্যায়ে। নিরাশার এমন চিত্র ফুটে উঠে ইসলামপুর বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির কাছে পাঠানো বিএসটিআইয়ের একটি পত্রে। গত মার্চের ১০ তারিখে পাঠানো এ পত্রে কাপড় কেনা-বেচাসহ দৈর্ঘীয় পরিমাপে গজ, ফুট, গিরার পরিবর্তে বাধ্যতামূলকভাবে মিটার, সেন্টিমিটার ব্যবহার করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। পত্রে বিএসটিআইয়ের সাথে ইসলামপুর বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির কয়েকটি সভায় ৭টি সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, ‘ঢাকা মহানগরীসহ সারাদেশে কাপড়ের দোকান পরিদর্শনকালে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কিছু কিছু ব্যবসায়ী কাপড় পরিমাপে মিটার ব্যবহার করলেও অধিকাংশ ব্যবসায়ী গজের ব্যবহার অব্যাহত রেখেছেন। অনেক ক্ষেত্রেই মিটার ব্যবহার নিশ্চিত করতে বলা হলেও ঢাকাসহ সারা দেশেই ইসলামপুর থেকে গজে কাপড় ক্রয়ের ক্যাশ মেমো প্রদর্শন করছেন। ফলে কাপড় ব্যবসায়ীরা মিটার ব্যবহারে সচেতন হচ্ছেন না। যা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’ চিঠিতে কাপড়ের পরিমাপ মিটারে উল্লেখপূর্বক ক্যাশ মেমো প্রদান করার নির্দেশনা প্রদান করা হয।
টেরিবাজার ব্যবাসায়ী কল্যাণ সিমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ হোসেন বলেন, সমিতির সবাইকে বলে দেওয়া হয়েছে মিটারে কাপড় বিক্রি করার জন্য। কিন্তু সমস্যা হলো পাইকারিতে, আমরা কিনে আনি গজে, সেটা মিটারে বিক্রি করতে গেলে দাম বেড়ে যায়। অন্যান্য পদ্ধতির মতো কাপড়ে মিটার পদ্ধতিও আস্তে আস্তে চালু হয়ে যাচ্ছে। ভোক্তারা এখনো গজ হিসাবে কাপড় চায়। আগামী বছরের মধ্যে আশা করি পুরোপুরি চালু হয়ে যাবে।
বিএসটিআইয়ের মামলা প্রসঙ্গে মোহাম্মদ হোসেন বলেন, যে দোকানগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে সেগুলোতে মিটার ও গাজ দুটোই ছিলো। তারা মিটারে বললে মিটারে দেয়, গজে বললে গজে দেয়।
‘ওজন ও পরিমাপ মানদন্ড আইন, ২০১৮’ অনুযায়ী ব্যবসা বা বাণিজ্যে, কোনো লেনদেন বা মালামাল সরবরাহের কাজে মেট্রিক পদ্ধতির অনুসরণ ব্যতীত অন্য কোনো পদ্ধতির ওজন বা পরিমাপক ব্যবহার করলে তিনি অনূর্ধ্ব ৬ মাসের কারাদন্ড অথবা অনূর্ধ্ব ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন। যদি কোনো ব্যক্তি পুনরায় একই অপরাধ করেন, তা হলে তিনি উক্ত অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যে দন্ড রয়েছে তার দ্বিগুণ দন্ডে দন্ডিত হবেন।
বিএসটিআই চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক (মেট) মোহাম্মদ মাযহার বলেন, মিটার পদ্ধতি ব্যবহার করতে নিয়মিত বাজারে অভিযান চলছে, প্রতিমাসেই মামলা করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সমস্যা দেখাচ্ছেন। খুচরা আর পাইকারি ব্যবসায়ীরা একে অপরের দোষ দিচ্ছেন। গত দুইতিন মাসে অনেকগুলো মামলা হয়েছে। শুধু টেরিবাজারে ১২টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সারা পৃথিবীতে একই সিস্টেম। আমরা সের থেকে কেজিতে, গ্যালন থেকে লিটারে এসেছি। কিন্তু আমাদের এখানে কাপড়ের পরিমাপ একক বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। এখন আমরা খুব বেশি চেষ্টা করছি।