কাঠুরিয়া ও দৈত্য

দশম শ্রেণি, জলসুখা কৃষ্ণ গোবিন্দ পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়, আজমিরিগঞ্জ, হবিগঞ্জ, সিলেট।

মিনহাজ উদ্দীন শরীফ

5

জলসুখা গ্রামে বাস করে এক গরীব কাঠুরিয়া। তাঁর স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলে নিয়ে ছোট্ট অভাবের সংসার। অভাবের তাড়নায় ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করাতে পারেনি। ঠিক মতো দু’বেলা ডাল ভাতই খাওয়ানোর কাঠুরের সামর্থ্য নেই বললেই চলে।কাঠুরিয়া রোজ বনের মরা বৃক্ষ কেটে বাজারে বিক্রি করে এক বেলা ডাল ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা করে। আরেক বেলা উপোস থেকে কাটিয়ে দেয়। কাঠুরে একদিন একটু দেরি করে বনে যায়। গিয়ে দেখে চতুর্দিকে পাখির অনাবিল গুঞ্জন। বনের প্রত্যেকটা গাছে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। কাঠুরিয়া এদিকে ওদিকে তাকায়, দেখে কোনো গাছ পাখি বিহীন আছে কি না! কিন্তু না, বনের সব গাছ পাখিদের দখলে। কাঠুরিয়া গাছের নিচে বসে বিষয়টা নিয়ে ভাবছে। ঠিক তখন এক দৈত্য এলো কাঠুরের সামনে। বিশাল আকারের দেহ! যে কেউ দেখে প্রথমে ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাবে। কাঠুরিয়া দৈত্য’টাকে দেখেই অজ্ঞান হয়ে গেলো। কাঠুরিয়ার কোনো সাড়াশব্দ নেই বলে দৈত্য কাছে গিয়ে ডাকে। -ও কাঠুরে উঠো। আমি তো তোমার কোনো ক্ষতি করিনি। তাহলে তুমি এভাবে পড়ে আছো ক্যান? কাঠুরে তো অজ্ঞান তাই দৈত্যের কোনো কথা শুনতে পায়নি। দৈত্য মন্ত্র পাঠ করে বনের একটা পুকুরের কাছে নিয়ে যায়। তারপর চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়। কাঠুরের জ্ঞান ফিরে আসে। কাঠুরিয়া আবার চেঁচামেচি করে বলতে লাগলো, আমাকে ছেড়ে দাও আমি আর এই বনে কাঠ কাটতে আসবো না। দৈত্য হুংকার করে বলে তুমি কেনো আর কাঠ কাটতে আসবে না?
কাঠুরিয়া বলে, বনের সকল পশুপাখি তোমাকে ভয় পেয়ে ছুটোছুটি করে মিটিং করছে। তাই আমিও ভয় পেয়েছি তোমাকে। আমাকে ছেড়ে দাও। আমার কিছু হলে স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে দুটো অনাহারে মারা যাবে। দৈত্য বলে, আমি কি দেখতে এতটাই খারাপ। যার জন্য সবাই আমাকে ভয় পায়! কাঠুরিয়া বলল, তুমি এই বনের সবচেয়ে বড় প্রাণী। তাই দেখতে ভয় লাগে। দৈত্য কাঠুরিয়াকে কয়, আমি কী তোমার কোনো ক্ষতি করেছি? কাঠুরিয়া বলে, এখনও করো নি! সে বলে আমার দেহ দেখে হয়তো ভয় পাচ্ছ। কিন্তু আমি কারো ক্ষতি করি না। আমি পূর্বে করতি জঙ্গলে থাকতাম। সেখানে আমার উস্তাদ ছিলো। তার কাছেই থাকতাম। সে বজ্রপাতে মারা যাওয়ার কারণে সেই জঙ্গলে ত্যাগ করে এখানে চলে এসেছি কয়েক দিন আগে। কাঠুরিয়া এখন নিঃসন্দেহে বিশ্বাস করলো দৈত্য’টা যে কারো ক্ষতি করে না। তাই দৈত্যের প্রতি কাঠুরিয়ার ভালোবাসা জন্মেছে মনে। দৈত্য বলে, কাঠুরিয়া আমার জীবনে অনেক কষ্ট। তুমি শুনলে চোখের পানি ধরে রাখতে পারবে না।
কাঠুরিয়া বলে, তোমার আবার কিসের কষ্ট? তোমার অনেক শক্তি আছে আবার যখন যেটা মনে আসে সেটাই করতে পারো। এটা তো বড় একটা গুণ। আমার তো এমন কোনো কিছু নাই। কাঠুরিয়ার সাথে দৈত্যের বেশ ভালো বন্ধত্ব গড়ে ওঠে অল্প সময়ের মধ্যেই। কারণ দৈত্যটা ছিলো খুব ভালো ও মিশুক ধরনের। দৈত্য কাঠুরের সাথে মনের সব কথা শেয়ার করলো। কাঠুরিয়া ও এক এক করে জীবনের সব গল্প শুনালো। কাঠুরিয়া দৈত্যকে কয় বন্ধু অনেক কথাবার্তা বললাম। এখন কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করে বাড়িতে চাইল-ডাইল নিয়ে যেতে হবে। দৈত্য বলে সূর্যতো কিছুক্ষণ পর ডুবে যাবে। এতো কম সময়ের মধ্যে কিভাবে এতো কাজ শেষ করবে? কাঠুরিয়া উত্তর দিলো, আল্লাহ সহায় থাকলে আমি ঠিক সময়েই সামলে নেবো। তুমি চিন্তা করো না কেমন!
দৈত্য বলে আচ্ছা। আমিও আছি তোমার কাছেই বিপদ হলে ডেকো। কাঠুরিয়া বলে, ঠিক আছে বন্ধু। কাঠুরিয়া দু’চার মিনিট বনে হেঁটে কোনো মরা বৃক্ষ পেলো না। সন্ধ্যা হতে ও বেশি সময় বাকি নেই। কাঠুরিয়া পাগলের মতো খুঁজে চলছে কিন্তু কোনো মরা বৃক্ষের সন্ধান পেলো না। কাঠুরিয়ার কুড়ালটি লোহার ও পুরনো বলে তাজা বৃক্ষ কাটে না কুড়াল ভেঙে যাবে বলে। এটাই সম্বল। এটা ভেঙে গেলে না খেয়ে মরতে হবে, এইসব কথা ভেবে। বাধ্য হয় কাঠুরিয়া দৈত্যকে ডাক দিলো। দৈত্য ও হাজির ডাক দেওয়া সঙ্গে সঙ্গে।
কাঠুরিয়া বলে, বন্ধু কোনো মরা বৃক্ষ পেলাম না। তাই আজকে কাঠ কাটা ও হবে না। চাউল ডাইলও বাড়িতে নেয়া হবে না। আজ রাতটুকু উপোস থেকে কাটাতে হবে। দৈত্য বলে, আমার জন্য আজ এমন হয়েছে। আমি কি তোমার কোনো সাহায্য করতে পারি? কাঠুরিয়া বলে, তোমার কারণে কিছু হয়নি! তুমি ক্যান্ সাহায্য করবে? দৈত্য চমৎকার একটা উত্তর দিলো। বন্ধুর বিপদে তো বন্ধুকেই এগিয়ে আসতে হবে। আমি তোমার বন্ধু। প্রয়োজনে জীবন দিয়ে হলেও তোমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করবো। কাঠুরিয়া খুব খুশি হয়েছে দৈত্যের কথা শোনে। দৈত্য বলে, বন্ধু কি সাহায্য লাগবে? কাঠুরিয়া বলল, বন্ধু আজকে কিছু চাউল ডাইল আর লোহার একটা নতুন কুড়াল। যাতে বিশাল বড় বৃক্ষগুলো কাটতে পারি। দৈত্য যাদু দিয়ে কাঠুরের কথামতো চাউল-ডাইল ও কুড়াল দিলো। কাঠুরিয়া এসব পেয়ে দৈত্যের থেকে বিদায় নিয়ে খুশি মনে বাড়িতে চলে আসে। এভাবেই দৈত্যের সাহায্যে ধীরে ধীরে কাঠুরিয়ার অভাবের দিন দূর হয়ে গেল।