কাজলা দিদির জোনাকিরা নিভুনিভু

মুশফিক হোসাইন

42

ষাটের দশকে আমাদের পাঠ্য ছিল কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর ‘কাজলা দিদি’ কবিতাটি। শৈশবে সন্ধ্যার পরপরই পড়তে বসতে হতো। তখনো চট্টগ্রাম শহরের অনেক এলাকায় জোনাকির আলো আমাদের আনন্দ দিত। জানালার ফাঁক দিয়ে দেখতাম হাস্নাহেনা তলে জোনাকির ওড়াউড়ি। মাঝে মাঝে সুযোগ পেলে একটা দুটো ধরে এনে বোতলে কিম্বা জামার পকেটে রাখতাম। জোনাক পোকা ধরলে মা বকা দিতেন। বলতেন, ‘জোনাক পোকা ধরলে রাতে ছেলেরা বিছানায় পেশাব করে’। সত্য-মিথ্যা যাচাই করার সুযোগ হয় নি, বা চেষ্টা করিনি। বার্ষিক পরীক্ষার পর সন্ধ্যায় লেখাপড়ার চাপ থাকে না। তখন বড়দের সাথে কর্ণফুলীর নদীর পাড়ে সান্ধ্য ভ্রমণে গেলেই জোনাকি ধরার খেলা চলত। পরবর্তীতে গ্রামে যখন বেড়াতে যেতাম-তখনও জোনাকির মেলা দেখে অবাক হয়ে যেতাম। রাশি রাশি জোনাকি পোকা বন-বনানীর আবছা আধারে ঘুরে বেড়াত। বলা যায়, অতি শৈমব থেকে জোনাকি পোকার সাথে সখ্যতা। তবে কবি যন্ত্রীন্দ্রমোহন বাগচীর ‘কাজলা দিদি’ কবিতা পড়ার সময় জোনাকি দিদির বেদনাবিধুর গল্প অন্তরে গেঁথে যায়। কবিতা বাবা পড়াচ্ছিলেন, তাঁর দরাজ কণ্ঠের আবৃত্তি এবং ভাবপ্রকাশ আমাকে আপ্লুত করে। দিদির জন্য মায়ায় আমার চোখে জল এসে যায়। বাবা আমার মনের অবস্থা আন্দাজ করে পুকুর পাড়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেজনা গাছের তলে শান বাঁধানো পুকুর পাড়ে আমরা বসেছিলাম। তখন অনেক অনেক জোনাকি আমার প্রাণভরে দিয়েছিল। যতীন্দ্রমোহন বাগচীর কবিতাটি উদ্ধৃতি দেয়া যাক। ‘বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই,/মাগো আমার শোলক-বলা কাজলা দিদি কই?/পুকুর ধারে লেবুর তলে/থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে/ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না একলা জেগে রই-/মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই?

বাংল সাহিত্যে জীবনানন্দ, আল মাহমুদ, বুদ্ধদেব বসুসহ অনেকের কবিতায় জোনাকি প্রসঙ্গ এসেছে। কিন্তু আমার যতীন্দ্রমোহন বাগচীর কবিতার জোনাকি বেশি ভাল লেগেছে। যা আমার প্রাণ ছুঁয়ে যায়। বাংলা সাহিত্যের গল্প কবিতা উপন্যাস গানে জোনাকির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। বিশ্ব সাহিত্যে জোনাকিরা এসেছে বিভিন্নভাবে। এই ক্ষুদ্র পতঙ্গটি বরাবরই মানুষের ভালোবাসা পেয়েছে। সে তার জীবন দিয়ে এলেও মানুষকে আনন্দ দিয়ে গেছে। পথ প্রদর্শন করে গেছে অনেক সাহসী মানুষকে। কিন্তু এ পতঙ্গটি একটি কঠিন সময় পার করছে। তাঁর অস্থিত্ব আজ সংকটের সম্মুখীন।
আমার জানা মতে, পৃথিবীর প্রায় সকল দেশে জোনাকি দেখা যায়। তবে উত্তর মেরু আর মরুভূমির কথা জানি না। রাতের আঁধারে তারা ঝোপঝাড়ের আশেপাশে উড়ে বেড়ায়। অনাদিকাল থেকে তারা উড়ে আসছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিজ্ঞানিরা বলছেন এই ক্ষুদ্র পতঙ্গটি এখন অস্তিত্ব সঙ্কটে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগরায়ন যেভাবে উন্মুক্ত প্রকৃতি কেড়ে নিচ্ছে, মানুষ যেভাবে নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহার করছে এবং দূষণ যেভাবে বাড়ছে, তা করে জোনাকির দুই হাজার প্রজাতিই পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হওয়ার অপেক্ষায়। বলা যায়, প্রচÐ ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। এছাড়া এ পতঙ্গের জন্য একটি বড় শত্রæ হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃত্রিম আলো। কৃত্রিম আলোর কারণে তাদের প্রজনন ও জীবন প্রক্রিয়া হুমকীর সম্মুখীন।
বিজ্ঞান সাময়িকী বায়োসায়েন্স এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এমন তথ্যই তুলে ধরেছেন গবেষকরা। ওই গবেষক দলের প্রধান টাফটস ইউনির্ভাসিটির জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক সারা লুইস সিএনএনকে জানান, ‘নগরায়নের প্রভাবে অনেক প্রাণী প্রজাতিই নিজেদের আবাসস্থল হারাচ্ছে। ফলে তাদের অস্তিত্ব ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে’। এর মধ্যে বেশ কয়েক প্রজাতির জোনাকিও আছে। জীবনচক্র পুরো করার জন্য আশপাশের পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরনত বলা যায়, মালয়েশিয়াতে এক প্রকার জোনাকি আছে, যারা প্রজন্ন ঘটায় ম্যানগ্রোভ গাছ গাছালির এলাকায়। কিন্তু পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির বাদাবনগুলো সব দাম তেলের কারখানা আর মাছের খামারে পরিণত হয়েছে। ফলে ঐ প্রজাতির জোনাকি টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। এছাড়া বিশ্বের জোনাকির জন্য দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হুমকি হয়ে উঠেছে রাতের বেলার কৃত্রিম আলো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত একশত বছরে নগরায়নের সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম আলোর ব্যবহার বেড়েছে গুণাত্বক হারে। আর এত আলোর অত্যাচারে জোনাকির বংশ বিস্তার কঠিন হয়ে পড়েছে। সাধারণত: পুরুষ জোনাকি প্রজননের জন্য স্ত্রীদের আলোর সংকেত দেয়। স্ত্রী এতে সাড়া দেয় নির্দিষ্ট আলোর সংকেত দিয়ে। কৃত্রিম আলো এই প্রজননের আলোকে গতিরুদ্ধ করে দেয়। ফলে জোনাকির প্রজনন বাধাগ্রস্ত।
জোনাকির পেটের নিচের অংশে যে আলো জ্বলতে নিভতে দেখা যায়, তার উৎস হল লুসিফারিন নামের এক ধরনের রাসায়নিক উপাদান। জোনাকির শরীরের এনজাইম লুসিফারেজের উপস্থিতিতে ওই লুসিফারিন অক্সিজেন, এটিপি আর ম্যাগনেশিয়াম আয়রনের সঙ্গে মিশলেই জোনাকির দেহ থেকে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটে। বিজ্ঞানিরা এই রাসায়নিক প্রক্রিয়ার নাম দিয়েছেন রায়োলুমিনেন্স। কতটা আলো কতক্ষণ ধরে জ্বলবে, তা নির্ধারণ করে কী পরিমাণ অক্সিজেন জোনাকির শরীর সরবরাহ করবে তার উপর। এই আলোর সংকেতই হল জোনাকির প্রেমের ভাষা। প্রজাতির পুরুষেরা অপরপক্ষকে এই আলো জ্বেলে সংকেত দেয়। মেয়েরা তাদের সাড়া দেয় ছন্দবদ্ধ আলোর সংকেতে। এভাবে প্রকৃতিতে সকল প্রাণী তার নিজ নিজ ভাষায় বা অঙ্গভঙ্গিতে তাদের প্রেম/প্রজনন কাজ সম্পন্ন করে থাকে।
কিন্তু মানব জাতির নগরায়নে কারণে এই যোগাযোগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। অর্থাৎ ঘরবাড়ি, সড়কবাতি, বিলবোর্ড ইত্যাদির উজ্জ্বল আলো এই বাধার জন্য দায়ী। আর নগরের আলো আকাশে যে দ্যুতি তৈরি করে তার প্রভাব অনেকদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এই দ্যুতি পূর্ণিমার আলোর চেয়ে প্রখর। এতেকরে জোনাকির আলোর সংকেত তাতে হারিয়ে যায়। অধ্যাপক সারা লুইসের গবেষণা বলছে, রাতের বেলা ২৩ শতাংশ জায়গা এই কৃত্রিম আলোয় আলোকিত থাকছে। টাফটস ইউনিভার্সিটিতে জীববিজ্ঞানে গবেষণায়রত আভালন ওয়েনস সি এন এনকে বলেন, এই আলোক দূষণ জোনাক পোকার প্রজননে রীতিমত ছন্দপতন ঘটাচ্ছে। এছাড়া আরও একভাবে জোনাকির স্বাভাবিক জীবনচক্রের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে মানুষ। জাপান, তাইওয়ান মালয়েশিয়ার মত দেশে রাতের বেলা জোনাক পোকার মিটিমিটি আলোর খেলা দেখার বিষয়টি পর্যটকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রতি বছর দুই লাখ পর্যটক এই জোনাকী পর্যটনে অংশ নেয়ার তথ্য আছে। তাতে করে এই জোনাকির জীবন আর স্বাভাবিক থাকছে না। সেসব এলাকায় জোনাকির সংখ্যাতেই এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এই বিশ্বের সকল সৃষ্টি পরস্পর পরস্পরের তরে। মহান আল্লাহতায়ালা বিনা প্রয়োজনে কিছুই সৃষ্টি করেন নি। সকল প্রাণী একটি শৃঙ্খলের মধ্যে আবদ্ধ। খাদ্য শৃঙ্খল জীব শৃঙ্খলের একটি যদি কোন কারণে বিচ্যুত হয়, তবে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। আমরা মানব জাতি নিজেদের ভোগ-বিলাসিতার জন্য এই মহাবিশ্বের অনেক ক্ষতি সাধন করে চলেছি। উদাহরণত বিদ্যুৎ তরঙ্গের কথা বলা যেতে পারে। বিদ্যুৎ তরঙ্গের কারণে প্রকৃতিতে মৌমাছি ক্রমশ বিলুপ্তির পথে এগুচ্ছে। অথছ বিশ্বের কৃষিজ উৎপাদনের ৭০ শতাংশের পরাগায়ন সম্পন্ন হয় মৌমাছির মাধ্যমে। একইভাবে বৈদ্যুতিক আলোর প্রতিফলনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে জোনাকির জীবনচক্র। সম্প্রতি অস্ট্রেরিয়ায় পানি সংকট হতে বাঁচার জন্য ১০ হাজার উট গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনে বৈশ্বিক উষ্ণতা দিন দিন বাড়ছে। ফলে বিভিন্ন দেশে দাবানলের ঘটনা বেড়েই চলেছে। আমরা জানি না প্রকৃতি হতে জোনাকি পোকা ধ্বংস হয়ে গেলে, জোনাকি পোকা থেকে যে উপকার পাওয়া যায়, তা কিভাবে পূরণ হবে? পর্যটন করার জন্য মানুষ জোনাকি পোকার আলোই দেখবে কোত্থেকে? হালে অবশ্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, প্রতিবাদ সভায় অন্যান্য অনুষ্ঠানে রাতের বেলা স্মার্ট ফোন জ্বালিয়ে আলোর প্রতিফলন দেখানো হয়। কিন্তু স্মার্টফোনের আলো কি জোনাকির আলোর বিকল্প হতে পারে?
সভ্যতার অগ্রগতির ফলে মানুষের ভোগ-বিলাস যেমনি বেড়েছে, তেমনি মানুষ কোন কোন ক্ষেত্রে শ্রমবিমুখ হয়ে উঠছে। কর্পোরেটপ্রেমি মানুষের চাহিদাকে উসকে দিয়ে প্রকৃতি থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। মানুষের মুখের স্বাদও বদলে যাচ্ছে। দেশি মুরগির বদলে উৎপাদন বাড়ছে হাইব্রীড পোল্ট্রী মোরগের চাহিদা। জাঙ্গফুড বাজার দখল করে আছে। তারপরও কি আমরা ভুলতে পেরেছি ঝাল ভর্তার কথা? পহেলা বৈশাখে পান্তা ইলিশ! তাই আমাদের প্রকৃতির কাছে ফিরে আসতে হবে। জোনাকিকে থোকায় থোকায় জ্বলতে দিতে হবে। তাহলে কী কবির ভাষায় বলবো; দাও ফিরে সে অরণ্য লও এ নগর!
লেখক : কবি, নিসর্গী ও ব্যাংক নির্বাহী (অব:)