করোনা সচেতনতা এখন বেঁচে থাকার উপায়

28

মো. কামরুল ইসলাম

পুরো পৃথিবী আজ করোনা আতংকে দিশেহারা। প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা এবং মৃত্যুর হার। বিজ্ঞান ও পুরো পৃথিবীর চিকিৎসা ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইতিমধ্যে করোনা পৃথিবীতে তার রাজত্ব কায়েম করেছে। বর্তমানে আমাদের দেশে এই ভাইরাসে প্রায় ১৭ হাজারের অধিক আক্রান্ত হয়েছে এবং মৃত্যুবরণ করেছে তিনশতাধিক। সংক্রমণ প্রতিদিন বাড়ছে। পরিস্থিতি দিন দিন অবনতি হচ্ছে। সরকার জনসাধারণকে সচেতন করার চেষ্টা করছে। এরপরও জনবহুল এই হতদরিদ্র দেশে অভাবের তাড়না ও খানিকটা স্বভাবগত দোষে মানুষ অযথা রাস্তায় চলাফেরা করছে। বিশেষ করে শহরের মানুষ যতটা সচেতন সেই তুলনায় গ্রামের জনসাধারণ এই করোনা বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে অবাধে যত্রতত্র যাতায়াত করছে। এই দেশের বেশিরভাগ মানুষ বর্তমানে এই পরিস্থিতিতে গ্রামে অবস্থান করছে তারা যদি সচেতন না হয় তাহলে এই করোনা থেকে এই দেশ কখনও মুক্তি পাবে না। ইতিমধ্যে মুসলমানদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজসহ সকল ইবাদত শর্ত সাপেক্ষে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মসজিদে আদায় করা যাবে-মর্মে সরকার কর্তৃক জানানো হয়েছে তা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য বটে তবে এই ক্ষেত্রে যাতে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় সেই দিকে নজর দিয়ে ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ প্রত্যেক মুসল্লীকে সচেতন করা যায় সেই শিক্ষা মসজিদ থেকে নিতে হবে। স্বাধীনতাকালীন সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হয় এবং দীর্ঘ একটানা নয় মাস যুদ্ধ করে পরবর্তীতে স্বাধীনতা লাভ করে ঐ যুদ্ধকালীন সময়ে যে অস্থিরতা যে অনিশ্চয়তা ছিল তার চেয়ে আজ শত কোটি গুণ অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে অজানা, অদেখা করোনা ভাইরাসের কারণে। করোনা ভাইরাস গত কয়েক মাসে বদলে দিয়েছে মানুষের জীবন ব্যবস্থা। গত বছরের শেষ দিকে চীনে এই ভাইরাসে প্রথম আক্রান্ত হয় ঐ দেশের নাগরিক। চীন ভাইরাস সম্পর্কে প্রথমে তথ্য গোপন করেছে বলে ইতিমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম জানিয়েছেন। তিনি এই ভাইরাসটিকে চীনা ভাইরাস হিসাবে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে চীন এইটিকে দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য বলে উল্লেখ করেন। বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য এইটি চীনের আরেকটি কৌশল বলে অনেকে মনে করেন। যাইহোক পৃথিবীতে এর আগেও যত বিপর্যয় এসেছে সবটাই মানুষেই মোকাবেলা করে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। মানুষ যদি মানবিক হয় ও একে অপরকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় আগামীতে আবার নতুন এক পৃথিবীর জন্ম হবে বলে অনেকের ধারণা।এই অবস্থায় যেমনি করে মানুষের জীবন ধারার পরিবর্তন হয়েছে তেমনি চিন্তা ভাবনার পরিবর্তন হবে, মানুষ মানুষকে ভালবেসে নতুন এক পৃথিবী সৃষ্টি করবে।
মানুষ আজ বড্ড দিশেহারা, কিংকর্তব্যবিমুঢ়। এই মুহূর্তে মানুষ কাউকে জড়িয়ে ধরে যে কান্না করবে, এমন কি কারও বাসায় গিয়ে খানিকটা আশ্রয় নিবে, ছোট ছোট শিশুদের মাথায় হাত বুলিয়ে তৃপ্তি লাভ করবে তার ও সুযোগ নেই কারণ নয় মাসের ছোট্ট শিশুটি ও ঘাতক এই রোগে আক্রান্ত। তাকে ছোঁয়া মানে নিজে,নিজের পরিবারসহ পুরো সমাজ ও দেশকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া। যারা শহরের স্থায়ী বা অস্থায়ী ভাবে বসবাস করে তারা যেমন বাসা থেকে বের হতে পারছে না আবার যারা করোনা আতংকে গ্রামে গিয়ে ও করোনার কবল থেকে নিজকে,পরিবারকে রক্ষা করতে পারছে না। অনেকে গ্রামে গিয়ে, অন্যের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে বাসায় একা বসে থেকে হাপিয়ে উঠছে মাঝে মাঝে নিজ কক্ষের জানালার পাশে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা অনন্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকছে। এইভাবে কি বেঁচে থাকা যায়।মানুষ জানে না এর থেকে পরিত্রাণের নির্দিষ্ট সন বা তারিখ। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী গত দু মাস যারা বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত তারা সহ যারা সচেতন নাগরিক তারা স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজ ঘরে নিজকে আবদ্ধ করে রেখেছে। ইতিমধ্যে তারা চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে তাদের আজ বেঁচে থাকা দূর্বিষহ হয়ে পড়েছে।ঘরে বসে থাকলে এই করোনা ভাইরাস থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব এইটি যদিও সত্য তবে বাস্তবতা ও জীবিকার প্রয়োজনে মানুষকে ঘর হতে বের হতে হয়। অন্যদিকে সরকারের পক্ষে এই জনবহুল দেশে প্রত্যেক জনগোষ্ঠির খাদ্যের নিশ্চয়তা দেওয়া কোন অবস্থায় সম্ভব নয়।এই ভাইরাসের কবলে পড়ে পৃথিবীর শক্তিধর দেশগুলো আজ বড়ই অসহায়। এর কোন প্রতিষেধক টিকা বা ঔষধ আবিষ্কৃত হয়নি।চেষ্টা চলছে,সময় বলবে আগামিতে কি হবে আমরা কিভাবে এর মোকাবেলা করব।
একদিকে সামাজিক দূরত্বের কথা বলা হলে ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ ব্যবস্থা ও বিভিন্ন বাজারের অবস্থা ও মানুষের কেনাবেচা রীতিমত অবাক হওয়ার মত। ইতিমধ্যে দেশে করোনার প্রভাব বাড়তে থাকায় মসজিদে জামাতে নামাজ পড়ার ক্ষেত্রে যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল তা বাতিল করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ইতিমধ্যে মসজিদে নামাজ আদায় করা যাবে এমন ঘোষণায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা খুশি হয়েছে। মুসলমানদের দাবি হয়ত পূরণ হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে মসজিদে যাওয়ার পর ও অনেকে আক্রান্ত হতে পারে তার যথেষ্ট সম্ভাবনা ও রয়েছে এই অবস্থায় যদি রাষ্ট্র কর্তৃক সন্তোষজনক ব্যবস্থা না করা হয় তাহলে মৃত্যুর শংকা বাড়বে তাতে কোন সন্দেহ নেই। যদিও মসজিদ হচ্ছে মুসলমানদের দলবদ্ধভাবে নামাজ পড়ার জন্য নির্মিত স্থাপনা। যার আভিধানিক অর্থ শ্রদ্ধাভরে মাথা অবনত করা অর্থাৎ সিজদাহ করা। সাধারণভাবে, যেসব ইমারত বা স্থাপনায় মুসলমানেরা একত্র হয়ে প্রাত্যহিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন, তাই মসজিদ। আবার যেসব বড় আকারের মসজিদগুলো নিয়মিত নামাজের সাথে সাথে শুক্রবারের জুম’আর নামাজ আদায় হয় এবং অন্যান্য ইসলামিক কার্যাবলী যেমন : কোরআন শিক্ষা দেওয়া সেগুলো জামে মসজিদ নামে অভিহিত। মসজিদে সাধারণত একজন ইমাম বা নেতা থাকেন যিনি নামাজের ইমামতি করেন বা নেতৃত্ব দেন। মসজিদ মুসলমানদের বিভিন্ন ধর্মীয় কার্যাবলীর প্রাণকেন্দ্র। এখানে প্রার্থনা করা ছাড়াও শিক্ষা প্রদান, তথ্য বিতরণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়। অন্যদিকে এই পবিত্র মসজিদে নামাজ বা সালাত আদায় করা হয়। নামায বা সালাত হল ইসলাম ধর্মের প্রধান উপাসনাকর্ম। নামাজ আদায় করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যক বা ফরজ। নামায ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। ঈমান বা বিশ্বাসের পরই নামাযই ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। নামায রাসালাত”-এর আভিধানিক অর্থ দোয়া, রহমত, ক্ষমা প্রার্থনা করা ইত্যাদি। পারিভাষিক অর্থ: ‘শরী‘আত নির্দেশিত ক্রিয়া-পদ্ধতির মাধ্যমে আল্লাহর নিকট বান্দার ক্ষমা ভিক্ষা ও প্রার্থনা নিবেদনের শ্রেষ্ঠতম ইবাদতকে ‘সালাত’ বলা হয়। ধর্মপ্রান মুসলমান গন মনে করেন এই অবস্থায় নামাজ ও দোয়ার মাধ্যমে এই ভাইরাস থেকে মহান রবই মুক্তি দিতে পারেন। সেই ক্ষেত্রে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে আদায়,সিয়াম পালন স্বাস্থ্যবিধি মানা যতটা সম্ভব অন্যদিকে ঈদকে সামনে রেখে বিভিন্ন সাজ পোশাক ক্রয়ে বিপনী বিতানে যাওয়া, অনেক দিন ঘরে বন্দীদশা থেকে নিজকে মুক্তি নেওয়ার যে আনন্দ তা নিজকে, পরিবারকে,দেশকে নির্ঘাত মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া যা কখনও কাম্য নয়। এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের নমনীয় এই সিদ্ধান্ত সাধারণ জনগণের কাম্য ছিল না তা কিন্তু বলার অপেক্ষা রাখে না। যে দেশের বেশির ভাগ মানুষ মুসলিম সেই দেশের মুসলিম ধর্মীয় অনুভুতিকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে সচেতন করতে হবে। কারণ এটি একটি বৈশ্বিক মহামারি। তাই ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্মীয় মূল্যবোধকে কাজে লাগিয়ে মানুষকে সচেতন করে মানবতা ও মানুষকে সবার আগে বাঁচাতে হবে। সকলের সার্বিক সহযোগিতায় করোনা নির্মূল হোক। সচেতনতাই পারে একমাত্র মানুষকে এই মহামারি থেকে বাঁচাতে। আগামীতে মানুষ যেন ফিরে পায় ভালবাসার ও মানবতার নতুন এক পৃথিবী।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও মানবাধিকার কর্মী