করোনায় কী হারালাম, কীইবা অর্জন

11

মুশফিক হোসাইন

অদৃশ্য শত্রæ মহামারী করোনার দাপটে সারা বিশ্বে এখন ত্রাহি ত্রাতি অবস্থা। আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার দুটোই বেড়ে চলেছে লাফিয়ে লাফিয়ে। সংখ্যাতত্ব দিতে চাই না, এ সংখ্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা একমাত্র যারা বেঁচে থাকবেন তারাই বলতে পারবেন। তবে সান্ত্বনার বিষয় এই যে, মৃত্যুর হারের চেয়ে সুস্থতার হার বেশি। অতএব হলফ করে বলা যায়, বেঁচে থাকবেন মানুষেরা। মানুষ আল্লাহর শ্রেষ্ঠ জীব। তাঁরা বেঁচে থাকার লড়াইয়ে জিতবেন। এর আগে বিশ্ববাসী মহামারী ও যুদ্ধ দেখেছেন। তারপরও মানুষ বেঁচে ছিল। বেঁচে থাকার একটা উপায় বিজ্ঞান বের করবেই। মহান আল্লাহ মানুষকে জ্ঞান ও মেধা দিয়েছেন। সেই মেধার জোরেই তারা আবিষ্কার করবেন বেঁচে থাকার উপায়। আবার নতুন সূর্য উঠবে, পাখির কলকাকলীতে প্রকৃতি হাসবে। নতুন স্বপ্নে মানুষ ভালোবাসবে। এবারের করোনায় আমারা কী হারালাম কীই বা অর্জন করলাম। ইতিহাসবিদ, কথা সাহিত্যিক এবং সম্মুখ যোদ্ধা চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের গবেষণা। গ্রন্থে তা নিশ্চিতভাবে লেখা থাকবে। রচিত হবে কালজয়ী গল্প উপন্যাস ও কবিতা। ইতিহাসের খেরোখাতায় রচিত হবে জয়ের ইতিহাস। তারপরও মানুষ শুধু বিজয়ীদের স্মরণে রাখে না পরাজিতের কথাও আসে প্রসঙ্গক্রমে। আমাদের বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ বিশ্ববাসীর মতো এই অসম যুদ্ধে নিয়োজিত। প্রতিদিন দেশে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা সাথে মৃত্যুও। সঠিকভাবে এই মহামারীতে কী হারালো তার একটা খসড়া দেয়া যাক। ভবিতব্য প্রজন্ম তা থেকে শিক্ষা যেন নিতে পারে।
প্রথমঃ আসে মৃত্যুর প্রসঙ্গ: এ নশ্বর পৃথিবীতে কে মরতে চায়? চাই সে শিশু, যুবক কিংবা প্রবীণ। সকলেই বাঁচতে চায়। বেঁচে থাকার লড়াইয়ে সকলেই উম্মুখ। কতিপয় বিপদগামী এবং চির হতাশ ব্যক্তিগণ আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। তাদের সংখ্যা অতি নগন্য। ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। যাই হোক, আমাদের নিকটজন বা পরিচিতজন যারা মারা গেলেন, বলা যাবে তারা অসময়ে চলে গেলেন। যিনি হারান তার বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজন বোঝেন, হারানোর কী অপরাসীম বেদনা, একটি মানুষ চলে যাওয়ায় একটি পরিবার, সংসার তথা জাতির যে ক্ষতি হয় তা অপরিমেয়। আমরা জানি মৃত্যু ধ্রæব সত্য, জন্মালে মৃত্যু অনিবার্য। তাই বলে অসময়ে আপদের মৃত্যু কাম্য নয়Ñ কারোরই। আমরা কতো জ্ঞানী গুণী, শিক্ষাবিদ, ডাক্তার, নার্স, পুলিশসহ সাধারণ মানুষকে অকালে হারিয়েছি। এ শূন্যতা পূরণ হবার নয়। সকলের জন্য প্রার্থনা তারা জান্নাতবাসী হোন।
দ্বিতীয়তঃ অর্থনৈতিক কর্মকাÐে স্থবিরতা, বাংলাদেশে প্রথম করোনায় আক্রান্ত সনাক্ত হয় ৮ই মার্চ। তারপর েেক দেশে প্রতিদিন সংক্রমণ অল্প অল্প করে বাড়তে থাকে। বিশ্বে করানো প্রথম ধরা পড়ে চীনে উহান প্রদেশে ডিসেম্বর ২০১৯ সালে। তর তিন মাস পরে বাংলাদেশে আক্রান্তের সংবাদ পাওয়া যায়। মার্চের সতের তারিখ থেকে সারাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করা হয়। ২৬ মার্চ হতে শিল্প কারখানা, অফিস আদালত ও গণপরিবহন ছুটি বন্ধের আওতায় আসে। সেই থেকে দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাÐ স্থবির হয়ে পড়ে। বিগত দুই দশক বাংলদেশ যেভাবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল। লকডাউনের ফলে তাতে মন্দাভাব দেখা দেবে। করোনা জনিত কারণে শিল্প করখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। অন্যদিকে, বিদেশি ক্রেতারা সরবরাহ আদেশ রহিত, পেছানো বা সাময়িক বন্ধ রাখায় রপ্তানি বাণিজ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ কমে যাবে। সকল প্রকার যোগাযোগ (বিমান, ট্রেন, স্থলপথ) সাময়িক বন্ধ থাকার কারণে উৎপাদিত পণ্য চলাচলে বিঘœ ঘটে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য ক্ষেত্রেই পড়ে থাকে। দেশে সকল কার্যক্রম স্থবির হয়ে থাকায় মুদ্রা গুর্ণন (মানি সার্কুলেশন) কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক মন্দা দেখো যেতে পারে। বিশ্ব সংস্থার মতে, করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বে ৩০০ কোটি মানুষ দাবিদ্রতায় আক্রান্ত হবে। বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ যেমন পরিবহন শ্রমিক, রিকশা ও ভ্যান চালক, হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কামার কুমার, মুচি, জেলে, কৃষকসহ সর্বস্তরের নিম্ন আয়ের মানুষ কর্মের অভাবে আরো দরিদ্র হতে পারে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে ৬ কোটি মানুষ আরো দরিদ্র হয়ে পড়বে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সেক্টরে প্রণাদনা ঘোষণা করা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে আসল ভুক্তভোগীরা কতটুকু উপকার পাবে তা নিয়ে সংশয় আছে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, দেশের সংস্কৃতি হলো তেলা মাতায় তেল দেওয়ার। দেশে সরকারের ধনীক শ্রেণীর প্রতিনিধি বেশি। তারা তাদের স্বার্থ বেশি বিবেচনা করা স্বাভাবিক।
তৃতীয়তঃ প্রবাসীদের ফিরে আসা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় সোয়া কোটি বাংলাদেশি বৈধ ও অবৈধভাবে কর্মরত আছে। তারা বিভিন্ন চ্যানেলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা ভাÐারে মুদ্রা যোগানের প্রধান উৎস প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ। বিশ্বে করোনা মহামারী দেখা দেওয়ার পর ইতিমধ্যে প্রায় দুই লক্ষ প্রবাসী দেশে এসেছেন। মধ্যপ্রাচ্যসহ কতিপয় দেশ নিজ নিজ দেশ থেকে বৈধ/অবৈধ শ্রমিকদের ফেরত পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। কাতার, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিরা বেশি অবস্থান করে। এই প্রবাসীদের ফেরত আসা মানে রেমিটেন্স কমে যাওয়া। আবার বিশ্বব্যাপী সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বিদেশে কর্মযজ্ঞ কমে যাবে। ফলে যারা আছেন, তাদের বেতন হ্রাস, বা কর্মচ্যুতি হতে পারে। মোদা কথায় আগামী দিনগুলোতে প্রবাসীর প্রেরিত মুদ্রা প্রবাহ কমে যাবেই। যার আঘাত আমাদের অর্থনীতিতে লাগবে। ফলে মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাবে।
চতুর্থতঃ কর্মহীনতা: দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাÐ স্থবির হওয়ার ফলে অনেক মানুষ বেকার হতে পারে। অর্থনৈতিক প্রবাহ হ্রাস পেলে কর্মসৃষ্টি হ্রাস পাবে। সমগ্র বিশ্বে যখন মন্দা দেখা দেবে বিভন্ন দেশের সরকার ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করবে আগেই বলেছি, মুদ্রা প্রবাহ কমে গেলে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পাবে। নিম্ন আয়ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যারা সামান্য পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করতো, করোনাকালে তারা কর্মহীন ও আয়হীন থাকার কারণে নিজের স্বল্প পুঁজি ভাঙ্গিয়ে দিন যাপন করেছেন। ফলে তাদের পূর্বের কাজে ফিরে যাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। ইতিমধ্যে লক্ষ্যকরা যাচ্ছে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ কর্মীদের অর্ধেক বেতন ভাতা, ছাটাই প্রক্রিয়া শুরু করেছে। অন্যদিকে, দেশে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হলেও করোনাকালে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বন্ধ থাকার কারণে কৃষকের রবিশস্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক ফসল বিক্রি হয়েছে ন্যুনতম দামে। কাক্সিক্ষত দাম না পাওয়ায় তারা পরবর্তী ফলন বোনার ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হয়ে কর্মহীন হওয়ার সম্ভাবনা। তেমনি ডেইরী, পোল্ট্রী ও মৎস্য খামারের অবস্থাও তথৈবচ। ক্ষতি পুষিয়ে তারা আবার উৎপাদনে যেতে পারবে কিনা সন্দেহ। এক্ষেত্রে ও কর্মহীনতা দেখা দেবে। সামগ্রিকভাবে দেশে কর্মসৃষ্টি করতে ব্যর্থ হলে ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে।
পঞ্চমতঃ নীতি ও মানবিতার অভাব : সকল দেশে সকল জাতিতে মৃত মানুষের সৎকার করার নির্দিষ্ট নীতি প্রচলিত আছে। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা তাদের নিজ নিজ ধর্মানুসারে মৃত ব্যক্তিদের সৎকার করে থাকেন। এবারের মহামারী যেহেতু ছোঁয়াছে। সেহেতু বাজারে গুজবের ডালপালা মহীরুহ হয়ে গেছে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে জানা যায়, পিতা করোনায় মারা যাওয়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুত্রকে লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য বারবার টেলিফোন করার পরও পুত্র লাশ তো নিতে যায় নি। বরঞ্চ আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম লাশ দাফন করার সময়ও পুত্র যায়নি। লাশ পবিরহনের সময় করোনায় মৃত জেনে মৃত মায়ের লাশ এবং মায়ের জীবিত পুত্রকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়ার সংবাদও ভাইরাল হয়ে গেছে। সবচেয়ে দুঃখজন কোন কোন গ্রামে করোনায় মৃত ব্যক্তির লাশ দাপন না করার জন্য গ্রামবাসী রুখে দিয়েছে। এ ধরনের বিভিন্ন অমানবিক ও নীতি বহির্ভুত কার্যকলাপের সংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চাউর হয়ে গেছে। একটি সভ্য সমাজে এটা কোন অবস্থায় কাক্সিক্ষত হতে পারে না। এটা সত্য জন্মিলে সকল জীবকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। তা হলে কেন আমরা এ ধরনের আচরণ করছি?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে এই মহামারী করোনা ভাইরাস পৃথিবী থেকে চিরতরে বিলুপ্ত হবে না। এর সাথে সহঅবস্থানে বসবাস করতে হবে মানবজাতিকে। জন্ম-মৃত্যু যেহেতু চির সত্য, সেহেতু বুদ্ধিজ্ঞানসম্পন্ন মানব জাতিকে এই চির সত্যকে মেনে নিয়ে বসবাস করতে হবেÑএর কোন বিকল্প নেই। তবে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে আজ পর্যন্ত মৃত্যুর হার ৭ শতাংশ এবং সুস্থতার হার ৯৩ শতাংশ। এখানেই আশার ধ্রæবতারা মিটিমিটি জ্বলছে। বিশ্বে যত বড় বিপদ ও মহামারী আসুক না কে, মানুষ তাকে জয় করেছে অতীত ইতিহাস তাই বলে। অতএব ৯৩ শতাংশ মানুষ সুখে থাকলে আল্লাহ রহমতে ভয়ের কিছু নেই। অতএব বিষণœতা কাটিয়ে আসুন সকলে সচেতন হই। ঐক্যবদ্ধ সচেতনতার কোন বিকল্প দেখি না। করোনায় যা হারালাম তা নিয়ে হা-হতাশ না করে মহামারীর কারণে কী অর্জন হলো তা বিবেচনায় এনে আমাদের শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে। সেভাবে আমাদের এগিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। করোনায় আমাদের অর্জন নিয়ে পরবর্তীতে লেখা হবে। (চলবে)
লেখক: কবি নিস্বর্গী ও প্রাক্তন ব্যাংক নির্বাহী (অব.)