করোনায় এমন হোক দাম্পত্য জীবন, এমন হোক ঘরে থাকা

16

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে চলছে লকডাউন কিংবা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম-কানুন। ফলে ঘরবন্দি মানুষের জীবন। এই ঘরবন্দি জীবনের ফলে বাইরে দৈনন্দিন ব্যস্ততায় ছন্দপতন ঘটেছে। বাস্তবতা হলো এভাবেই আরও কয়েকদিন ঘরবন্দি থাকতে হবে আমাদের। এরপর একদিন সত্যিই সবকিছু হবে আগের মতো।
অনির্দিষ্টকাল এইভাবে ঘরবন্দি জীবনযাপনের ফলে একঘেঁয়েমি লাগতে পারে, বিষাদ আসতে পারে মনে। দাম্পত্য জীবনকেও বিতৃষ্ণা মনে হতে পারে কখনও কখনও। এ সব ঝেড়ে ফেলে ঘরবন্দি দিনকালকে করতে হবে উপভোগ্য, সুখকর। ঘরে থেকেও নিজে পরিবারের জন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে পারেন। চাইলে দাম্পত্য জীবনকেও দারুণ করে গড়ে তুলতে পারবেন এই সময়েও।
গত চার মাসে গোটা বিশ্ব স্থবির। চারদিকে থমথমে পরিবেশ। সব মিলিয়ে ভয়, আতঙ্ক, উদ্বিগ্নতা, দুশ্চিন্তা, অস্বস্তিকর অনুভূতি, অসহায়ত্ব বিরাজ করছে আমাদের মনে। কোভিড-১৯ নামক ভয়ঙ্কর এক সংক্রামক ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থমকে দিয়েছে পুরো বিশ্বকে। সারা বিশ্বের মানুষ আজ ঘরে আবদ্ধ আছি। অর্থ, প্রাচুর্য, ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি, ডিজিটাল যুগের সুব্যাবস্থা, উন্নত প্রযুক্তি, উন্নত চিকিৎসা কোনকিছুই আর পেরে উঠছে না। নিয়তি আমাদের ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুমুখে। মহামারী রূপে করোনাভাইরাস গ্রাস করছে মানব জীবন। অনাকাঙ্ক্ষিত এই পরিস্থিতি আমাদের মেনে নিতেই হচ্ছে।
চীনের উহান থেকে সূচনা হয়ে এখন সারা বিশ্বে সংক্রমিত হয়ে পড়েছে মানবঘাতী এই ভাইরাস। মার্চের ৮ তারিখ বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী ধরা পড়ে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ২৬ মার্চ থেকে সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয় যা দুই দফা বাড়িয়ে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে প্রায় সবধরণের সরকারি বেসরকারি অফিস বন্ধ। স্কুল-কলেজসহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো মার্চের শুরু থেকেই বন্ধ। এই ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আমাদের সরকার থেকে ঘরে থাকতে বলা হচ্ছে।
থাকতে হবে কিন্তু ঘরেই: আমার সঙ্গে নিশ্চয়ই সবাই একমত হবেন যে, করোনা নিয়ন্ত্রণে ঘরে থাকার বিকল্প নেই। নিজেকে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা আমাদের দায়িত্ব। তাই ঘরে থাকলেও নিরাপদে থাকতে হবে। এখন প্রশ্ন আসে, আমরা কি ঘরেও নিরাপদে আছি? করোনা ভাইরাসের জীবাণু আমাদের আশেপাশে নেই সেই ব্যাপারে নিশ্চয়তা আছে? এই রোগের উপসর্গ প্রকাশ হবার বেশ আগেই ভাইরাসটি দেহে প্রবেশ করে নিশ্চুপে বসে থাকে। তাই যারা বাইরে কাজে বা জরুরি কেনাকাটা করতে বের হচ্ছি তারা একরকম বিপদেই আছি।
আমেরিকা ও বেইজিং এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিড-১৯ আক্রান্ত শতকরা ৫০ ভাগ রোগীর করোনা উপসর্গ লোপ পাওয়ার ৮ দিন পরও এই জীবাণু বহন করে।
ঘরে থাকায় সুবিধা অনেক: লকডাউন পরিস্থিতির জন্য আমরা সবাই একসঙ্গে ঘরে আছি। কর্মব্যস্ততা কমায় শিশুদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া বাড়ির বয়স্কদের মতামত নিতে পারছি। ঘরের কাজগুলো সবাই ভাগাভাগি করে করছি। ঘরে রান্না খাবার খাচ্ছি। একইসঙ্গে দম্পতিরাও একে অপরকে ভালো সময় দিতে পারছেন। ফলে দুজন দুজনকে বোঝার একটা সময় এসেছে। মন খুলে কথা বলার ও শোনার সুযোগও হয়েছে। অর্থাৎ আন্তরিকতা আরও গভীর হচ্ছে। তবে এ সময়ে শারীরিক ঘনিষ্ঠতার ক্ষেত্রে আরেকটু সতর্কতা মেনে চলা জরুরি।
মুহূর্তগুলো দারুণ, দরকার তবুও সতর্কতা: ঘরবন্দি থাকার কারণে একসঙ্গে অনেক মুহূর্ত কাটছে দম্পতিদের। এ কারণে দাম্পত্য সম্পর্কে ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যেতে পারে। রোমান্টিক চাহিদার কাছে হার মানতে পারে দুশ্চিন্তা। যৌন আকাঙ্ক্ষা একটি সাবলীল জৈবিক প্রক্রিয়া যা মূলত মনোদৈহিক চাহিদা। একত্রে দীর্ঘসময় থাকায় সঙ্গত কারণেই দাম্পত্য সম্পর্কে যৌন আকাঙ্ক্ষা বেড়ে যেতে পারে। এটি অস্বাভাবিক কোন বিষয় নয়।
কিন্তু আমরা যদি একটু খেয়াল করি, বর্তমান মারণব্যাধি করোনা দমনে সবার আগে সচেতন হতে হবে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার প্রতি। যে কারণে আমরা সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ঘরে আবদ্ধ আছি, সেইরকম দূরত্ব বজায় রেখে আমরা কি ঘরে চলছি? যেখানে বারবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, হাত ধোয়ার কথা বলা হচ্ছে এবং করমর্দন-কোলাকুলি নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেখানে দম্পতিদেরও মেলামেশার ক্ষেত্রে এ ধরনের বিধি-নিষেধ পালন করা জরুরি। অর্থাৎ এই চরম ক্রান্তিকালে বর্তমান পরিস্থিতি মেনে নিয়ে বিনোদনের জন্য আকাঙ্ক্ষা বা রোমান্টিকতাকে প্রাধান্য না দিয়ে বরং নিজে ও সঙ্গীকে সুরক্ষা করা একান্ত মানবিক দায়িত্ব। পাশাপাশি পরিবারের সদস্য ও শিশুদের সুরক্ষার জন্য অবশ্যই সংযত হতে হবে। বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। একে অপরকে বোঝাতে হবে, ধৈর্যশীল হতে হবে।
উপায়গুলো হতে পারে সুখের মন্ত্র: এ সময়ে কাছে যাওয়া, আলিঙ্গন করা, যৌন সম্পর্ক থেকে সাময়িক বিরত থাকা আপনার নিজের ও জীবনসঙ্গীর সুস্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এসময় শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে আমরা মূলত আত্মিক সম্পর্ক অর্থাৎ মনের মিল তৈরিতে বেশি মনোযোগী হতে পারি। কী করে পারস্পরিক সম্পর্ক সুষ্ঠ ও সুখের হতে পারে তার চর্চা করতে পারি। মন খুলে ইচ্ছা-অনুভূতি ও চাওয়া-পাওয়াগুলো ব্যক্ত করতে পারি। এতে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও আস্থা বাড়বে। ভালোবাসার বন্ধন আরও দৃঢ় হবে। একে অপরের ভালো গুণগুলোর দিকে দৃষ্টি দিতে পারি। সেই গুণের বিষয়ে একে অপরের প্রশংসা করতে পারি, স্বীকৃতি দিতে পারি। এতে সৌহার্দ্য বাড়বে এবং ভালোবাসার বন্ধন দৃঢ় হবে।
মনেরও যত্ন নিন: নির্দিষ্ট কোন বিষয় থেকে চিন্তা বা মনোযোগের পরিবর্তন করতে চাইলে এই অনুশীলন করা যেতে পারে। এর নাম ‘৫-৫-৫ অনুশীলন বা খেলা’। একে ৫ ঞরসবং মধসব ও বলা হয়। কোন চিন্তা, অস্থিরতা ও অস্বস্তিবোধ কমাতে এই অনুশীলনটি করুন এভাবে-
স্থির হয়ে বসে আপনার চারপাশে যা কিছু দেখতে পাচ্ছেন সেখান থেকে ৫ টি বিষয়ে নজর দিন। ৫ টি জিনিসের নাম বলুন। আকৃতি খেয়াল করুন। রঙ খেয়াল করুন। নিশ্বাস নিন, প্রশ্বাস ফেলুন।
চারপাশে যে শব্দগুলো শুনতে পাচ্ছেন সেগুলোর মধ্যে ৫টি শব্দ মনোযোগ দিয়ে শুনুন। নিশ্বাস নিন, প্রশ্বাস ফেলুন।
স্থির হয়ে আপনার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অনুভব করুন। ৫ টি অঙ্গ নাড়ুন; যেমন দুই হাতের আঙুল, কাঁধ, মুখ, চোখ, পায়ের আঙুল। নিশ্বাস নিন, প্রশ্বাস ফেলুন।
চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণের মাধ্যমে আমরা নিজেদের চালনা করি। প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও আত্ম নিয়ন্ত্রণ-ই আমাদের সংযত হতে প্রেরণা দেয়। আশা করি এই ক্রান্তিকালে প্রতিকূলতা পেরিয়ে আমরা উত্তরণের পথে অগ্রসর হতে পারব। নিজের ওপর আস্থা ও আত্মবিশ্বাস রাখুন। করোনা নিধনে নিয়মনীতি মেনে সাবধানে থাকুন।
দরকার মানসিক প্রশান্তিও: কমবেশি সবাই জানি করোনা সংক্রমণ থেকে মুক্তি পেতে আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। আর শরীর ঠিক রাখতে হলে আমাদের মানসিক প্রশান্তি প্রয়োজন। করোনাভাইরাস আতঙ্কে আমরা সবাই কম বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। এ ক্ষেত্রে আমাদের মানসিক সুস্থতার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। বর্তমান ক্রান্তিকাল মোকাবিলায় যৌক্তিক চিন্তা ও চেতনা জাগ্রত হতে হবে। মন শান্ত রেখে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। আসুন দেখে নেই এই দুঃসময়ে আমাদের আচরণ কেমন হবে
* পরিবারের সকলের আচার-আচরণ শান্ত হতে হবে
* পারস্পারিক শ্রদ্ধা ও সমঝোতা থাকতে হবে। একে অন্যের প্রতি সহমর্মি হতে হবে, ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে
* দ্ব›দ্ব কলহ থেকে বিরত থাকতে হবে
* বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় পরিকল্পনা থাকতে হবে
* দ্ব›দ্ব তৈরি করতে পারে অতীতের এমন কোন ঘটনার আলোচনা করা যাবে না
আসুন দেখে নেই এই সময়ে মানসিক সুস্থতার জন্য কোন কাজগুলো করা যায়-
* সারাদিনের কার্যক্রমের নির্দিষ্ট তালিকা করা ও গঠনমূলক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করা
* দূরত্ব বজায় রেখে এক সঙ্গে মুভি দেখা লুডু, ক্যারাম, মনোপলির মত বিভিন্ন ঘরোয়া খেলার মাধ্যমে বিনোদনে থাকা
* পুরনো অ্যালবামের আনন্দময় ছবি দেখে স্মৃতি রোমন্থন করা
* নিয়মিত শরীরচর্চা, ব্রিদিং এক্সারসাইজ বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, শিথীলায়ন, যোগব্যায়াম চর্চা করা
* উদ্বিগ্নতা দূর করতে সৃজনশীল কাজ যেমন সৃজনশীল লেখালেখি, সেলাই, ছবি আঁকা, সংগীতচর্চা, নিজের পছন্দ বা শখের কাজ করা
* পরিবারের সবাই মিলে ধর্মীয় এবাদত করা যাতে মনে প্রশান্তি আসে
* দির্ঘদিন ধরে জমে থাকা কাজগুলো গুছিয়ে নেওয়া
* বিপদের সময় একে অপরের প্রতি আস্থা রাখা
* নিজেকে পর্যবেক্ষণ করুন। নিজের শরীর ও মনের সঙ্গে কথা বলুন
* কোন কোন বিষয়ে এই মুহূর্তে আমাদের সচেতন হওয়া দরকার, কী কী বিষয় নিজের আয়ত্তে আছে সেটা খেয়াল করুন। নিজের ক্ষমতা ও যোগ্যতাগুলোর দিকে নজর দিন। সেগুলোর স্বীকৃতি দিন। নিজেকে বিশ্বাস করুন মনে-প্রাণে
* আমরা ঘরে থাকি এবং সংযত থাকি। নিজেকে সুরক্ষিত রাখি। পরিবার, সমাজকে সুরক্ষিত রাখি। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশের মানুষের প্রাণ বাঁচাই। আঁধারের পর আলোর নিশানা আসবেই।
আমার মুক্তি আলোয় আলোয়… ভালো থাকুন সবাই, সুস্থ থাকুন, নিরাপদে থাকুন।