করোনার কারণে সীমিত করা হয়েছে হজ পালন স্বাভাবিক হলে আগামীবারের প্রত্যাশা

13

সুনামি যখন আসে তখন মসজিদ-মন্দির, ভালো-খারাপ কেউ রেহাই পায়না। ঘরে আগুন লাগলে ধর্মগ্রন্থেও তাপ লাগে। মহামারীও অনুরূপ। কারো দোষে প্রকৃতির তাÐব শুরু হলে তাতে দোষী-নির্দোষী সকলেই ক্ষতির সম্মুখিন হন। সম্প্রতি করোনার ছোবল মানুষের জীবন-জীবিকায় আঘাত লাগেনি শুধু, ধর্ম-কর্ম, আচার-আচরণ সবকিছুই স্তব্ধ করে দিয়েছে। বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের প্রাণের ঘর কাবা শরীফ ও মদিনা শরিফের মসজিদে ইবাদত ও তাওয়াফ বন্ধ রাখতে হয়েছে। একই সাথে বিশ্বের দেশে দেশে মসজিদ-মন্দিরেও ইবাদত-উপাসনা সীমিত করা হয়েছে। সম্প্রতি এ অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন ঘটলেও করোনা মহামারির কারণে চলতি বছর সৌদি আরবের বাইরে বিশ্বের মুসলমানদের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে হজ পালন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি সরকার। তাদের এই সিদ্ধান্তের ফলে বাইরে থেকে কেউ সৌদি আরবে পবিত্র হজ পালনের জন্য যেতে পারবেন না। অন্য দেশের যেসব নাগরিক বর্তমানে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন, তাঁরাই শুধু এ বছর হজ পালন করতে পারবেন। এর ফলে বাংলাদেশ থেকে হজে যাওয়ার জন্য যে ৬৫ হাজার মুসল্লি নিবন্ধন করেছিলেন, তাঁদের কেউই হজে যেতে পারছেন না। তবে নিবন্ধিত এই হজ গমনেচ্ছু মুসল্লিরা আগামী বছর হজে যাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। আর যেসব নিবন্ধিত মুসল্লি তাঁদের অর্থ ফেরত নিতে চাইবেন, তাঁদের অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া হবে। সে ক্ষেত্রে তাঁদের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে এবং আগামী বছর হজে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা অগ্রাধিকার না-ও পেতে পারেন।
অনেক অনিশ্চয়তার মধ্যেই বাংলাদেশে গত ২ মার্চ শুরু হয়েছিল হজের নিবন্ধন। এরপর কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে গত ৩০ এপ্রিল নিবন্ধন শেষ করা হয়। অপেক্ষায় থাকতে হয় সৌদি সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য। অবশেষে সৌদি হজ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সোমবার রাতে বাংলাদেশকে সর্বশেষ এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়। এর আগে গত ২৬ ফেব্রæয়ারি বিদেশিদের ওমরাহ পালনের অনুমতি দেওয়া স্থগিত করা হয়। পরে পর্যটন ভিসা নিয়ে সৌদি আরবে প্রবেশ এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচলও বন্ধ করা হয়। তার পরও আশা করা হয়েছিল, সীমিত পরিসরে হলেও হজ অনুষ্ঠিত হবে এবং বাংলাদেশের সব নিবন্ধিত হজ গমনেচ্ছু মুসল্লি না যেতে পারলেও কিছুসংখ্যক মুসল্লি যেতে পারবেন। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় সৌদি সরকারকে এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
অনেক গবেষকই এমন আশ্বাস দিয়েছিলেন, মে মাসের শেষ দিক থেকে করোনার প্রকোপ অনেকটাই কমে আসবে। কিন্তু তাঁদের সব আশ্বাস ভুল প্রমাণিত হয়েছে। জুন মাসের শেষ দিকে এসেও বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই করোনার প্রকোপ কেবলই বাড়ছে। সৌদি আরবে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ৬৪ হাজার ছাড়িয়েছে। মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩৪৬-এ। এমন প্রেক্ষাপটে দেশটির এই সিদ্ধান্ত নেওয়া মোটেও অযৌক্তিক নয়। কারণ বিশ্বের বৃহত্তম এই ধর্মীয় সমাবেশে, যেখানে লাখ লাখ মানুষের সমাগম হয়, সেখানে হাজার হাজার করোনা পজিটিভ মুসল্লির আগমন ঘটতেই পারত। এতে সংক্রমণ আরো ব্যাপক হতো। তাতে সৌদি আরবেও সংক্রমণ অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়তে পারত। আমরা মনে করি, করোনা মহামারির কারণে হজে যেতে না পারায় অনেক মুসল্লি মনকষ্টে ভুগবেন। অনেকের জীবনে হয়ত এবারই শেষ হজ হতে পারত। কিন্তু নিয়তির উপর করো হাত নেই। আমরা আশা করি, এ অবস্থা বেশিদিন স্থায়ী হবে না, অন্ধকার শেষে আলো আসবেই। আমরা ফরিয়াদ করি, যারা এবার হজের নিয়ত করেছেন আগামী বছরের হজ পর্যন্ত আল্লাহর রহমতে তাঁরা সবাই সুস্থ থাকবেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে যেভাবে বলা হচ্ছে, হজে নিবন্ধনের টাকার ফেরতের সহজ ব্যবস্থাসহ যারা আগামী বছর যেতে চাই, তাঁদের হজ আদায়ের সব আয়োজন আগেভাগেই নিশ্চিত করা হোক।