করোনাকালে বেড়েছে নারী নির্যাতন: প্রয়োজন ধর্মীয় চর্চার

10

ইমরান এমি

সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে হানা দিয়েছে কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস। এরপর থেকে মানুষ ধীরে ধীরে ঘরমুখী হতে থাকে। আনুষ্ঠানিকভাবে ২৬ মার্চ সারাদেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে সরকার। করোনা মহামারী ধারণ করলে কঠোর অবস্থানে থেকে প্রশাসন রেড জোন, লকডাউনসহ নানাভাবে মানুষকে নিরাপদে রাখার জন্য ঘরে অবস্থান করার জন্য আহবান জানিয়ে আসছে। সম্প্রতি একটি জরিপে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ তথ্য। করোনাকালীন এ সময়েও থেমে থাকেনি নারী নির্যাতন। সারদিন ঘরে বসে থাকার কারণে উল্টো বেড়েছে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর সংখ্যা। বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন দেশের ২৭টি জেলায় এপ্রিল মাসে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা নিয়ে একটি জরিপ পরিচালনা করে। জরিপ অনুসারে ২৭টি জেলায় এপ্রিল মাসে চার হাজার ২শ ৪৯ জন নারী এবং ৪শ ৫৬টি শিশু নিজ ঘরেই সহিংসতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে স্বামীর হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৮শ ৪৮ নারী, মানসিক নির্যাতনের শিকার ২ হাজার ৮জন, যৌন নির্যাতনের শিকার ৮৫ এবং অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৩শ ৮ জন নারী। উত্তর দাতা চার হাজার ২শ ৪৯ শিশুর মধ্যে ৪শ ২৪ জন পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া এক হাজার ৬শ ৭২ জন নারী এবং ৪শ ২৪টি শিশু আগে কখনো নির্যাতনের শিকার হয়নি। শিশুদের মধ্যে শতকরা ৯২ ভাগ তাদের মা-বাবা ও আত্মীয়দের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছে। আর নারীরা বেশির ভাগই নির্যাতনের হয়েছেন স্বামীর হাতে। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো এ করোনাকালীন সময়েও থেমে ছিল না বাল্য বিবাহ। বাল্য বিবাহর শিকার হয়েছেন ৩৩ জন কিশোরী। অপর এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ২৬ মার্চ সারা দেশে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর থেকে ১২ এপ্রিলের মধ্যে জাতীয় জরুরি হেল্প লাইনে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা সম্পর্কিত ৭শ ৬৯টি ফোন কল এসেছে, যা স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও বেশি। এ থেকে ধারণা করা যায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় করোনাকালীন সময়ে নারী নির্যাতন ব্যাপক হাওে বেড়েছে। আর এ নির্যাতনের পিছনে রয়েছে অর্থনৈতিক সমস্যা, ঘরবন্দী থাকার কারণে মানসিক সমস্যা তৈরি। দীর্ঘ ছুটিতে ঘরবন্দি হয়ে আছে পরিবারের আয়ের পুরুষটি, তাতে করে আয়ের পথ বন্ধ হলেও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি ব্যয় হচ্ছে এ সময়ে। যার কারণে অর্থনৈতিক সমস্যা বৃদ্ধির কারণে সারাদিন নানা বিষয় নিয়ে স্বামী স্ত্রীর মাঝে কথা কাটাকাটি, ঝগড়া থেকে নির্যাতনের সূত্রপাত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অপরদিকে স্কুল কলেজসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে সারাদিন ঘরে বসেই কাটাতে হচ্ছে কোমলতি শিশু-কিশোরদের। এতে করে মা-বাবাসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে তৈরি হচ্ছে নিত্য নতুন সমস্যা। করোনাকালে নারী নির্যাতন ও সহিংসতারোধে প্রয়োজন পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ধর্মীয় চর্চা। ধর্মীয় নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা, তার থেকে যদি শিক্ষা নেওয়া যায় তাহলে অনেকাংশে কমে আসতে পারে নারী নির্যাতন ও সহিংসতার হার। এছাড়াও সাংসারিক কাজে পরিবারের নারী সদস্যদের পাশাপাশি পুরুষ সদস্যদের সহযোগিতা করা, অবসর সময়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘরে বসে টেলিভিশনসহ নানা মাধ্যমে বিনোদন দেওয়া। শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্য বইয়ের বাইরে এ সময়ে ধর্মীয় শিক্ষা, গল্প, উপন্যাসসহ পাঠচর্চা করা অত্যন্ত জরুরি। পরিবারের সকল সদস্যদের মধ্যে সাম্যতা ও সৌহার্দ্যবোধ বজায় থাকলে নারী ও শিশু নির্যাতন অনেকাংশে কমে আসবে।

লেখক: সাংবাদিক