করোনাকালে এক অন্য রকম ঈদ ভাবনা

41

এম.কামরুল হাসান চৌধুরী

‘নিজে সুস্থ থাকি, অপরকে সুস্থ রাখি’ এ স্লোগান নিয়ে আমরা চলছি আজ প্রায় তিন মাস। এর কারণ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা। মহান আল্লাহ পাকের সৃষ্টি জগতের মানব সভ্যতার ইতিহাসে এতো বড় মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন আর হতে হয়েছে কিনা সম্ভবত কারো জানা নেই। সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ করোনা ভাইরাস এক আতঙ্কিত দানবে রূপ নিয়ে মর্মান্তিক মৃত্যুপুরীতে পরিণত করছে দেশের পর দেশ। প্রতিদিনই আক্রান্ত হচ্ছে হাজারো হাজার। আর মৃত্যুবরণ করছে হাজার হাজার মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যানে পৃথিবীতে এই পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে প্রায় সাড়ে ৫২ লাখের কাছাকাছি এবং মৃতের সংখ্যাও প্রায় ৩ লক্ষ ৩৩ হাজার। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা সনাক্তের পর দিনে দিনে বেড়ে চলছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিভিন্ন সূত্রের তথ্যানুযায়ী আজ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ২৯ হাজারের কাছাকাছি। মৃত্যুবরণ করছে প্রায় ৪ শতাধিক। আর প্রতিদিন নতুন করে গড়ে আক্রান্ত হচ্ছে প্রায় ১৫ শত জনের অধিক। আর মৃত্যু হচ্ছে ২০ জন করে। এছাড়াও করোনা উপসর্গ নিয়ে আরো মারা যাচ্ছে প্রায় ২৫/ ৩০ জন। যা সরকারি হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে। তবে এই হিসাবের হার দিনের পর দিন বেড়ে চলছে।
এমন এক কঠিন পরিস্থিতির মাঝে পৃথিবীর মুসলমানদের অতীব গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদা সম্পন্ন পবিত্র রমজানের দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনা শেষে উপস্থিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। মূলত, এই দিনটি বিশ্ব মুসলিমদের জন্য হয়ে থাকে বছরের সেরা খুশির দিন। পৃথিবীর অন্য দেশের তুলনায় ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের মুসলমানদের মাঝে ঈদের আমেজের আনন্দের মাত্রা একটু বেশি। এদেশের সা¤প্রদায়িক স¤প্রীতির বন্ধনের সুবাদে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও আমাদের ঈদ আনন্দের উৎসবে সামিল হয়। তাই প্রতি বছর এই বহু আকাক্সিক্ষত দিনকে ঘিরে যেমন আমাদের আশা – আকাঙ্খার শেষ থাকেনা তেমনি চাহিদা, প্রত্যাশা, প্রাপ্তির অফুরন্ত আয়োজনের মাঝে যেন ঈদ আনন্দেরও সীমা নেই। যার উল্লেখ্য ঈদ উপলক্ষে সকল শ্রেণি ও বয়সের নারী পুরুষের জন্য কেনাকাটার ধুম, বাড়ি ঘরের সাজ- সজ্জা, ঈদের দিন সকালে পাক পবিত্র হয়ে আতর গোলাপ সুগন্ধি মেখে নতুন জামা, কাপড়, বিশেষত পাঞ্জাবী, পাজামা পরিধান করে দলবদ্ধভাবে ঈদগাহে নামাজ পড়তে যাওয়া, নামাজ শেষে ছোট বড়, ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে পরস্পর সালাম বিনিময়ের মাঝে হাত মিলিয়ে কোলাকুলিতে মেতে ওঠে , ঘরে ঘরে সেমাই, মিষ্টি, বিরানি আপ্যায়ন স্বাদের তৃপ্তি মিটানো, ছোটদের ঈদ সেলামী নেওয়া , পাড়া, প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, আনন্দ বিনোদন, খেলাধুলা, প্রীতি ম্যাচ, চড়ুইভাতি সহ আরো কত রকমের মনোমুগ্ধকর আয়োজনের কোলাহলের সমারোহ।
বিশেষ করে, প্রিয় গ্রামের চিরায়ত উৎসবের উপভোগ্য আনন্দ অনুভূতির কোন তুলনাই নেই। যাতে সৌহার্দ্যপূর্ণ স¤প্রীতির ভ্রাতৃত্ববোধের আর এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে থাকে। তবে, বৈশ্বিক মহামারীর দুর্বিসহ ক্রান্তিকালে এক বিমর্ষ বেদনায় ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আজ মনে হয় অতীতের সেইসব যেন এক নীরব সুখ স্মৃতিই শুধু !
বর্তমান কঠিন বাস্তবতার দুর্বিসহ পরিস্থিতিতে আমাদের এই বছর এক মানবীয় বিবেক বোধের তাগিদে একটু অন্যরকম পরিবেশে এই বছর ঈদ উদ্যাপন করতে হবে। যা কল্পনা করাই কঠিন। তারপরও কিছু করার নেই। পরিবেশ পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে অবশ্যই অধিক সতর্কতা অবলম্বন করে সচেতনতার বিকল্প নেই। তাই প্রত্যেকে সংযত হয়ে শালীনতার মধ্যে ত্যাগী মনোভাবে, সীমিত আকারে ঈদ উদ্যাপন করতে হবে। বিশেষ করে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, তাকবির পাঠ করা, খুতবা শ্রবণ করা, ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করা ইত্যাদি গুরুত্ববহ ফাজিলতপূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন করা জরুরি। তবে, শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে পরস্পর সালাম বিনিময় করা এবং পারিবার কেন্দ্রীক ঈদ উদযাপন করতে হবে। সর্বোপরি, স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা আবশ্যক। ব্যক্তি সচেতনতা বোধ থেকে অন্য সব আনুষ্ঠানিকতা থেকে বিরত থাকা বাধ্যতামূলক। অতঃপর সবক্ষেত্রে কঠোর সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা খুবই জরুরি। যা, আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। মূলত, সকল মুহূর্তে সরকারের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সব নির্দেশনা বাধ্যতামূলকভাবে মেনে চলতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন যে, এই মুহূর্তে আমরা মহান আল্লাহ পাকের এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছি। একমাত্র আল্লাহ পাকের দয়ার রহমতের আশায় আমাদের অনেক বেশি ধের্য্য ধারণ করতে হবে। অন্যথায় অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে !
তাই আমাদেরকে যে কোন মূল্যে জাতির সুস্থ ও নিরাপদ ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে হবে। যা, দেশের যে কোন সচেতন নাগরিকের জন্য একান্ত অপরিহার্য্য বিষয় বলে মনে করি। এই জন্য দেশ ও জাতির কল্যাণের লক্ষ্যে আমাদের একমাত্র সহজ সাধ্য বড় কাজ হলো হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা, বিশেষ করে ঈদ উপলক্ষে যাঁরা দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আপনালয়ে ফিরে এসেছেন তাঁরা হোমকায়ারেন্টাইন মেনে চলা বাধ্যতামূলক। নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে অবশ্যই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।
যদিও আসন্ন পবিত্র ঈদ উপলক্ষে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক জীবন মান ও নিত্য প্রয়োজনীয় চাহিদার কথা বিবেচনা করে সরকার গত ১০ মে থেকে মার্কেট, শপিং মল, গণপরিবহন সহ সবকিছু সীমিত আকারে চালু করার ঘোষণা দিয়েছে। তাই আমাদের বিপদের সমূহ সম্ভাবনা আরো বেড়ে গেছে। করোনা আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যাও দৈনন্দিন বেড়ে চলছে। তবে আশার কথা হলো, ইতিমধ্যে দেশের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ শহর এলাকার বড় বড় মার্কেট গুলো না খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁদের এই সময়োপযোগী মানবিক কঠিন সিদ্ধান্তের জন্য অবশ্যই সাধুবাদ জানাতে হবে। তারপরও শহরে কিংবা মফস্বলের বাজারে বিচ্ছিন্ন বিপনি বিতান, দোকান গুলোতে এখনও ঈদের কেনা কাটা চলছে এবং দিনদিন বাড়ছে। ক্রেতা সমাগমও হচ্ছে প্রচুর। এরপর ও যদি প্রশাসন আরও কঠোরভাবে আরো অধিক সতর্কতা অবলম্বন করা না করে তাহলে চীন, ইতালি ও যুক্ত রাষ্ট্রের মতো আমাদের দেশে আক্রান্ত মানুষের অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যর মিছিল টেকানো সম্ভব হবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আমাদের চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের সুপারিশক্রমে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থেকে নিরাপদ থাকতে হলে আমাদের হোম কোয়ারেন্টাইন মেনে চলা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এই মুহূর্তে একান্ত অপরিহার্য্য। তারপরে ও বিশেষ প্রয়োজনে বাহিরে যেতে হলে জনসমাগম এড়িয়ে চলে, সম্পূর্ণরূপে স্বাস্থ্য বিধি মেনে জীবন যাপনে অভ্যস্থ হতে হবে। জরুরি প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ কিংবা শরণাপন্ন হওয়া অনিবার্য। তাই জনসাধারণকে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করে সার্বক্ষণিক সচেতন থাকা বাঞ্ছনীয়। এতে নিজে সুস্থ থাকবেন, পরিবারকে সুস্থ রাখবেন এবং অপরকে সুস্থ রাখতে সহযোগি হবেন। তাই আসুন আমরা এবারের পবিত্র ঈদ কে একটু অন্য রকম পরিবেশে ভিন্ন মাত্রায় উদযাপন করুন। মার্কেটিং বা কেনাকাটা সম্পূর্ণ রূপে বর্জন করুন। ব্যায় সংকোচন করে মিতব্যয়ী হোন। ধর্মীয় অনুশাসন পরিপূর্ণ মেনে চলুন। সাধ্যনুযায়ী এই অর্থ গুলো অসহায়, গরীবদের মাঝে দান করে দিন। ইসলামী বিধি মোতাবেক নির্ধারিত ফিতরা কিংবা যাকাত সঠিকভাবে ভাবে আদায় করুন। মূলতঃ এতে পরিপূর্ণ কল্যাণ ও সমৃদ্ধি নিহিত আছে। অবসরে বেশি বেশি সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ পাকের দয়া ও রহমত কামনায় দোয়া ও প্রার্থনার মাঝে ইবাদতে সময় ব্যয় করুন। মনে রাখা প্রয়োজন মানবিক বিপর্যয়ের কঠিন এই স্পর্শকাতর মুহূর্তে আপনি ঘরে থাকা মানে, অলসতা কিংবা বেকারত্ব নই বরং দেশ ও মানবতার প্রয়োজনে কঠিন ত্যাগ স্বীকার করা। জাতির এই দুঃসময়ে গরীব, দুঃখী ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অসহায় মানুষকে সাধ্যমতো সাহায্যে সহযোগিতা করা সমাজের বিত্তবানদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। তাই সামর্থ্যনুযায়ী যাকাত কিংবা অনুদানের ত্রাণ সামগ্রী দেওয়ার প্রয়োজনে আপনার প্রতিবেশী ও ঘনিষ্ট আত্মীয় স্বজনদের কাছে নিজ দায়িত্বে সাহায্য সহায়তা পৌঁছে দিন, অতিরিক্ত থাকলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করুন। তবে, স্মরণ করতে হবে যাকাত বা ত্রান সামগ্রী প্রদানের নামে বেশি লোক জড়ো করে ফটোসেশন করা কোনভাবেই কাম্য নয়। সর্বোপরি, দেশের সরকারের ঘোষিত সময়পোযোগী নির্দেশনা সঠিকভাবে মেনে চলুন। পাশাপাশি প্রশাসনের আইন শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে বিধি- নিষেধ সমুহ যথাযথ পালন করে সুনাগরিকের পরিচয় দিন। আপনার পরিবার, প্রতিবেশী তথা একটি দেশ ও জাতির নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য একজন দায়িত্ববান নাগরিক হিসেবে দেশের জন্য গর্বিত অবদান রাখুন। পবিত্র ঈদ সকলের জন্য সুস্থ, সুন্দর, কল্যাণ ও সমৃদ্ধির মাঝে নিরাপদ সুখকর হোক। এই প্রত্যাশায়-সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।

লেখক : শিক্ষানুরাগী, সমাজকর্মী ও সংগঠক