কবি মহাদেব সাহা

আবু আফজাল মোহা. সালেহ

124

প্রেমের কবি মহাদেব সাহা ১৯৪৪ সালের ৫ আগস্ট পাবনা জেলার ধানঘরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান এ কবি ২০১৬ সালে কানাডা প্রবাসী হন। তিনি মূলত প্রেমের কবি। রোমান্টিক গীতিকবিতার জন্য তিনি ব্যাপক জনপ্রিয়। তিনি সাংবাদিক হিসাবেও বেশ দক্ষ ছিলেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৯৩ টি। যার বেশিরভাগই কাব্যগ্রন্থ। এছাড়া কিছু প্রবন্ধগ্রন্থও রচনা করেছেন। শিশুসাহিত্যে তাঁর বেশ অবদান রয়েছে। টাপুর টুপুর মেঘের দুপুর, ছবি আঁকা পাখির বাসা, আকাশে ওড়া মাটির ঘোড়া, সরষে ফুলের নদী, আকাশে সোনার থালা, মহাদেব সাহার কিশোর কবিতা(সংকলন) ইত্যাদি শিশুদের জন্য সুখপাঠ্য। ১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমী পুরুষ্কার, ২০০১ সালে একুশে পদক পান রোমান্টিক এ কবি। এছাড়া আলাওল সাহিত্য পুরুষ্কার(১৯৯৫), জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরুষ্কার(২০০৮ সালে) পান তিনি। বাংলা সাহিত্যের কীটস বলা যেতে পারে মহাদেব সাহাকে। রোমান্টিক কাব্যে এনেছেন নতুনত্ব। যোগ করেছেন নতুন নতুন উপাদান। সহজ-সরল ভাষায় প্রেমিক-প্রেমিকার সরলোক্তি তুলে ধরেছেন তাঁর কবিতায়। তাঁর আগে বাংলা সাহিত্যে এরকম উপাদান খুব কমসংখ্যকই ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন ধরা যায়-
‘মেসেজ কেন?
আমি তোমার হাতের লিখা চিঠিখানা চাই
ভুল বানান, বাঁকা অক্ষর,
কিছু ক্ষতি নাই’ – চমৎকার অভিব্যক্তি।
ছন্দরীতিকে ভাঙতে চান কবি। বিশেষকরে প্রেমের ক্ষেত্রে। তাঁর ভাবনা প্রেম বা পৃথিবীর যত ভালো কিছু আছে সেখানে ধরাবাঁধা ছন্দ নেই। ছন্দের ফ্রেমে বাঁধতে গিয়ে কবিতার সৌন্দর্যহানি করতে চান না তিনি। কিটসকে বলা হয় সৌন্দর্যের কবি। সুন্দরের কবি। মহাদেব সাহাকে বাংলা সাহিত্যের কিটস বলা যেতে পারে। কেননা প্রেম তো সৌন্দর্যের প্রতিক। প্রেমের কবিতার ক্ষেত্রে মহাদেব সাহা যেসব নতুন নতুন চিত্রকল্প আর উপাদান(শব্দাবলি) তা এককথায় অতুলনীয়।
‘তোমাদের কথায় কথায় এতো ব্যকরণ
তোমাদের উঠতে বসতে এতো অভিধান,
কিন্তু চঞ্চল ঝর্ণার কোনো ব্যাকরণ নেই
আকাশের কোনো অভিধান নেই, সমুদ্রের নেই।
ভালোবাসা ব্যাকরণ মানে না কখনো
হৃদয়ের চেয়ে বড়ো কোনো সংবিধান নেই
হৃদয় যা পারে তা জাতিসঙ্ঘ পারে না
গোলাপ ফোটে না কোনো ব্যাকরণ বুঝে।
প্রেমিক কি ছন্দ পড়ে সম্বোধন করে?
নদী চিরছন্দময়, কিন্তু সে কি ছন্দ কিছু জানে,
পাখি গান করে কোন ব্যাকরণ মেনে?
তোমারাই বলো শুধু ব্যাকরণ, শুধু অভিধান!
বলো প্রেমের কি শুদ্ধ বই, শুদ্ধ ব্যাকরণ
কেউ কি কখনো সঠিক বানান খোঁজে প্রেমের চিঠিতে
কেউ কি জানতে চায় প্রেমালাপ স্বরে না মাত্রায়?
নীরব চুম্বনই জানি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ছন্দরীতি।’ (ছন্দরীতি মহাদেব সাহা)
প্রেমের কাঙাল কবি কী অসাধারণ আকুতি করলেন প্রেমিকার কাছে-
‘করুণা করে হলেও চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও
আক্সগুলের মিহিন সেলাই
ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,
এটুকু সামান্য দাবি, চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো
অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।
চুলের মতন কোনো চিহ্ন দিও বিস্ময় বোঝাতে যদি চাও
বর্ণনা আলস্য লাগে তোমার চোখের মতো চিহ্ন কিছু দিও’ – (চিঠি দিও )
মানুষ ক্রমেই যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছে। বিবেক, বোধ বা সহযোগিতা কিংবা সহমর্মিতা উঠে যাচ্ছে সমাজ থেকে। সে কথাও লিখলেন কবি মহাদেব সাহা তাঁর কবিতায়-

‘এখানে মানুষ থাকে, এই নির্দয় নি®প্রাণ দেশে,
এই লৌহপুরীতে?
এই শহরের ভিড়ে পাখিদের ওড়াউড়ি নেই,
গাভীর হাম্বা রব কখনো শুনি না;
শুধু অচেনা মানুষের কোলাহল, গাড়ির কর্কশ শব্দ
………………………………………………

এবার আপন মানুষদের কাছে ফিরে যাবো, গলা
ছেড়ে ডাকবো বাহার কাকা,
কানু ভাই তোমরা কোথায়?
ছি, এখানে মানুষ থাকে, এই সোনার খাঁচায়, ইটের জঙ্গলে,
বন্দিশালায় – ( সংক্ষেপিত, আপন মানুষদের কাছে ফিরে যাবো)

অথবা ‘কে চায় তোমাকে পেলে’ কবিতায় কবি বললেন-
‘বলো না তোমাকে পেলে কোন মূর্খ অর্থ-পদ চায়
বলো কে চায় তোমাকে ফেলে স্বর্ণসিংহাসন
জয়ের শিরোপা আর খ্যাতির সম্মান,
কে চায় সোনার খনি তোমার বুকের এই স্বর্ণচাঁপা পেলে? ’-(সংক্ষেপিত)
‘কবিতা বাঁচে ভালোবাসায়’ কবিতায় প্রেমিকের প্রতি কী অদ্ভুত টান তা লক্ষ্য করা যায় –
‘তোমার কাছে আমি যে কবিতা শুনেছি
এখন পর্যন্ত তা-ই আমার কাছে কবিতার সার্থক আবৃত্তি;
যদিও তুমি কোনো ভালো আবৃত্তিকার নও, মঞ্চেও
তোমাকে কেউ কখনো দেখেনি,
তোমার কণ্ঠস্বরও এমন কিছু অসাধারণ নয়
বরং তুমি অনেক সাধারণ শব্দই হয়তো এখনো ভুল উচ্চারণ করো
যেমন ৃৃ না থাক, সেসব তালিকা এখানে নি¯প্রয়োজন,
অনেক কথাতেই আঞ্চলিকতার টান থাকাও অস্বাভাবিক নয়
কিন্তু তাকে কিছু এসে যায় না,
– – – – – – – –
এর চেয়ে ভালো আবৃত্তি আর কিচু হতে পারে না
তোমার সেই সলজ্জ গোপন আবৃত্তির মধ্যেই
স¤পূর্ণ ও সফল হয়েছিলো কবিতাটি;
কবিতা বাঁচে ভালোবাসায়, কেবল ভালোবাসায়।’ (সংক্ষেপিত)

ভালোবাসার জন্য পিপাসিত কবি মহাদেব সাহা লিখেছেন নিখুতভাবে- তাঁর ‘একবার ভালোবেসে দেখো’ কবিতায়-
‘তুমি যদি আমাকে না ভালোবাসো আর
এই মুখে কবিতা ফুটবে না,
এই কণ্ঠ আবৃতি করবে না কোনো প্রিয় পঙ্ক্তিমালা তাহলে শুকিয়ে যাবে সব আবেগের নদী।
আমি আর পারবো না লিখতে তাহলে
অনবদ্য একটি চরণ, একটিও ইমেজ হবে না রচিত,
তুমি যদি আমাকে না ভালোবাসো তবে
কবিতার পান্ডুলিপি জুড়ে দেখা দেবে ঘুরে ঘুরে অনাবৃষ্টি, খরা।’ৃৃৃ…
আরও বলেন চমৎকারভাবে-
‘কাছে আসো, সম্মুখে দাঁড়াও
খুব কাছে, যতোখানি কাছে আসা যায়,
আমি আপাদমস্তক দেখি তোমার শরীর
যেখাবে মানুষ দেখে, প্রথম মানুষ।
দেখি এই কান্ড আর ডালপালাখানি, ভিতর-বাহির
কতোটা পেয়েছে মাটি, কতোটা বা এই জলবায়ু
পায়নি শিকড়খানি, পেয়েছে কি তোমার প্রকৃতি?
কাছে আসো আরো কাছে, সহজেই যেন চোখে পড়ে
তোমার সূ² তিল, আঙুলের সামান্য শিশির
যেন দেখি তোমার সজল চোখ, তোমার মদির সলজ্জতা’ – (সংক্ষেপিত/কাছে আসো, সম্মুখে দাঁড়াও)
আমি মনে করি বাংলা সাহিত্যের কিটস তিনি। যদিও কিটস ছিলেন সৌন্দর্যের কবি। সুন্দরের পূজারি। প্রেমও তো সুন্দরের। তাই মহাদেব সাহাকে প্রেমের কবি বা বাংলা সাহিত্যের কিটস বলাই যেতে পারে।