কবি ও বিজ্ঞানী

স্বদেশ দত্ত

10

বাইশ
টি টেবিলটা কাছে টেনে নিয়ে বাসুদেব মন্ডল সোফায় পা তুলে বসেছেন। পা তুলে বসা বাসুদেব মন্ডলের পুরানো অভ্যাস। শর্মিলা বাসায় থাকলে এরকম নিশ্চিন্তে পা তুলে বসা হতো না। বসলেও একটা সতর্ক দৃষ্টি থাকত, যেন পাছে ধরা পড়ে না যান। ধরা পড়লে এমন ভাব করেন- যেন ভুল হয়ে গেছে, আর হবে না। অবশ্য বাসুদেব মন্ডল মাঝেমাঝে ইচ্ছা করেই এই কাজটা করেন। মজা করার জন্যই করা।
সোফায় পা তোলার ক্ষেত্রে শর্মিলার আপত্তির কারণটা বেশ পরিষ্কার। সোফা পা তুলে বসার জায়গা না। সোফা নষ্ট হয়ে যায়। আর পা তুলে বসতে হলে খাটে বসাই ভাল। ওখানে বসা যায়, শোয়া যায় যেমন ইচ্ছা তেমন করা যায়।
বাসুদেব মন্ডল প্রথমে তিন জনের সোফায় বসেছিলেন। সেখান থেকে সরে একজনের সোফায় চলে এলেন। এখন পা নামিয়ে বসেছেন।
বাসুদেব মন্ডল একটা বড় কাগজকে ছুড়ি দিয়ে কেটে দশ-বার টুকরা করলেন। ছুড়িটা আজকে ধার দিয়ে এনেছেন। বেশ চকচক করছে।
পাশের টেবিলের ড্রয়ারে তাসের একটা প্যাকেট আছে। সেই প্যাকেটের তাস দিয়ে বাসুদেব মন্ডল মাঝেমাঝে যাদু চর্চা করেন। বাসুদেব মন্ডল উঠে তাসের সেই প্যাকেটটা আনলেন। ইমরান শেখর আসলে একটা তাসের খেলা দেখাবেন, সেই চিন্তা থেকেই তাসের প্যাকেটটা কাছে আনা। কাগজ কেটে ছুড়ির ধার পরীক্ষা করতে গিয়ে তাসের খেলাটা মাথায় আসল।
কাটা কাগজের টুকরাগুলি ঝুড়িতে ফেলতে গিয়েও ফেললেন না। তাসের প্যাকেটের সাথে ছুড়ি আর কাটা টুকরাগুলো একটা খালি টিসু বাক্সে রেখে দিলেন।
বাসুদেব মন্ডল কুশনটা কোলের উপর রেখে সোফায় হেলান দিলেন। চোখের পাতা আলতো করে বাঁধা। তিনি বিদ্যালয়ে আজ কি কি ঘটেছে তা ভাবতে থাকলেন। চোখের সামনে সারা দিনের কিছু খন্ডচিত্র ভেসে আসতে থাকল।
প্রথম খন্ডচিত্রটা হচ্ছে- ইমরান শেখর শিক্ষক রুমে নিহারিকা ম্যাডামের সাথে কিছু একটা বিষয়ে আলোচনা করছেন। সাথে কাগজ কলমও আছে। ইমরান শেখর বাসুদেব মন্ডলকে ডাক দিলেন। ক্লাশের তাড়া থাকায় ডাকে সাড়া দেওয়া হলো না।
ইংরেজির সুফিয়া খাতুন, ইমরান শেখর আর সুরুজ আলী এই তিনজনকে একসাথে দুইবার লাইব্রেরিতে দেখা গেছে। সুফিয়া খাতুন আর ইমরান শেখর দুইজনই সুরুজ আলীর বই সম্পাদনার দায়িত্বে আছেন।
বাসুদেব মন্ডলের চোখের সামনে দ্বিতীয় খন্ডচিত্র ভেসে এল। যেখানে লাইব্রেরির দুইটি চিত্রই পরপর চলে এসেছে।
প্রথমবার মধ্যাহ্ন বিরতীর আগে। সেবার বাসুদেব মন্ডল লাইব্রেরির চৌকাঠ থেকে ফিরে এসেছেন। সেই সময় সুরুজ আলী বাসুদেব মন্ডলকে দেখেই দাঁড়িয়ে গেল। সুফিয়া খাতুন ডাক দিলেন-আসেন স্যার। বাসুদেব মন্ডল হেসে বললেন-আপনাদের আলোচনায় ডিস্টার্ব করাটা ঠিক হবে না। ইমরান শেখর বললেন-আলোচনার বিষয়ে আপনিও আছেন। বাসুদেব মন্ডল সাথেসাথে বললেন-তাহলে তো একেবারেই আসা যাবে না। ইন্টারফেয়ার করার যথেষ্ঠ সম্ভাবনা আছে। ইমরান শেখর কিছু একটা বলছিলেন। কিন্তু শুনা হয় নাই। কারণ বাসুদেব মন্ডল ততক্ষণে ফিরছিলেন।
দ্বিতীয়বার ক্লসে যাওয়ার সময় মধ্যাহ্ন বিরতীর পরে।
চোখের সামনে খন্ডচিত্র আসা থেমে গেছে। বাসুদেব মন্ডলের হঠাৎ করে মনে হলো, ইমরান শেখরের সাথে সুরুজ আলীও আসতে পারে। তিনি টিসু বাক্স থেকে কয়েকটি কাটা কাগজ বের করে আনলেন। সেগুলোতে লিখলেন, সুরুজ আলী আসবে। তারপর কাগজগুলিকে হোমিওপ্যাথির পুরিয়া বাঁধার মত ভাঁজ করলেন। এখন অবশ্য হোমিওপ্যাথিক ডাক্তররা সুগারে ঔষধ মিশিয়ে পুরিয়া বাঁধেন না। ডিস্টিল ওয়াটার অথবা লঘু ইথানলে ঔষধ মিশান। অর্গানন অফ মেডিসিনের সূত্র মতে একই ঔষধের ক্ষেত্রে প্রতিবারই পাওয়ার বাড়াতে হয়। পাওয়ার বাড়ানোর কাজ সুগার দিয়ে হয় না। বাসুদেব মন্ডল ভাঁজ করা কাগজগুলিকে টিসু বাক্সে রাখলেন।
ইমরান শেখর চলে এসেছেন। তবে বাসুদেব মন্ডল যা ভেবেছিলেন তা হলো না। সুরুজ আলী আসে নাই। তাই ছোট একটা ধাক্কার মতন খেলেন।
ইমরান শেখর তিন জনের সোফায় বসেছেন। বসেই জিজ্ঞেস করলেন-একটা শুভঙ্করী আর্যা শুনবেন ?
-এটা আবার কী?
-ছড়ায় ছড়ায় গণিতের ধাঁধাঁ। খুবই চমৎকার। আলোচনায় না হয় পরেই গেলাম। আগে একটা শুনুন।
ইমরান শেখর বলে গেলেন-
আছিল দেউল এক বিচিত্র গঠন,
ক্রোধে জলে তুলে ফেলে পবননন্দন।
অর্ধেক পঙ্কেতে আর তেহাই সলিলে.
দশম ভাগের ভাগ শেওলার জলে।
উপরে এগার হাত দেখি বিদ্যমান,
করহ সুবোধ শিশু দেউল প্রমাণ।
আর্যা শেষে ইমরান শেখর বললেন-এখন যে আর্যাটা বললাম তার নাম ‘অস্থিত পঞ্চক’। এখানে চারটা তথ্য দেওয়া আছে, পাঁচ নম্বরটা বের করতে হবে। পাঁচ নম্বরে দৈত্যটা দৈর্ঘ্যে কত হাত তা বের করতে হবে।
বাসুদেব মন্ডল কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, তার আগেই ইমরান শেখর বললেন-শুধু সমস্যার ছড়া নয়, সমস্যা সমাধানের ছড়াও আছে। তেমনি একটি ছড়া হচ্ছে বৃত্তের ক্ষেত্রফল নির্ণয়ের। ইমরান শেখর ছড়াটি বলে গেলেন-
ব্যাসার্ধকে তাই দিয়া পূরণ করিবে
ফলের বাইশ গুণ লইতে হইবে
পাইবে যে অঙ্ক তাকে সাত দিয়ে হর
শিশুসবে এই ভাবে বৃত্তকালি কর।
ছড়া শুনে বাসুদেব মন্ডল বেশ পুলকিত। ছড়া শেষ হওয়ার সাথে সাথে তিনি উৎফুল্ল চিত্তে বলে উঠলেন-এতো খুব সুন্দর ছড়া। এই সুন্দরের টানেই শিশুরা গণিতের জগতে ঢুকে পরবে।
ইমরান শেখর হেসে বললেন-তা তো অবশ্যই। শিশুকে তো বটেই, আমার মতো মধ্য বয়ষ্ককেও মজিয়ে ফেলেছে। এবার আরেকটা বলি।
ইমরান শেখর বলে গেলেন,
অল্প দিনে রথ দিতে মন কৈল যায়,
চারি কারিগর এল রাজ্যের সভায়।।
কেহ বলে পারি আটচল্লিশ দিবসে,
কেহ কহে পারি আমি দিবস চব্বিশে।।
কেহ বলে ষোল দিনে যদি পাই কাঠ,
অন্য বলে তবে মোর লাগে দিন আট।।
একেবারে দিল রাজা সহস্্েরক ধন,
একযোগে কর্মেতে লাগিল চারিজন।।
কত দিনে রথখানি তৈয়ার হইবে,
বল দেখি কেবা কত বেতন পাইবে।।
বাসুদেব মন্ডল পুরোপুরি মুগ্ধ। তিনি কিছুই বলছেন না।
ইমরান শেখর বললেন-কিছু বলছেন না যে ? ভাবছেন ? আমি কেন সাহিত্য ছেড়ে গণিত নিয়ে কচকচাচ্ছি ?
বাসুদেব মন্ডল এবারও কিছু বললেন না। ইমরান শেখর হেসে বললেন-আমি কিন্তু সবসময় সাহিত্যেই আছি। যেখানেই গল্প কবিতা সেখানেই ইমরান শেখর। হোক গণিত কিম্বা বিজ্ঞান।
বাসুদেব মন্ডল হেসে বললেন-তা তো অবশ্যই। আপনি গণিতে মজে নেই আপনি ছড়া-কবিতায় মজে আছেন। আমি ভাবছি অন্য কথা। আপনি এই আর্যার সন্ধান পেলেন কোথায়?
-আজকেই পেয়েছি। নিহারিকা ম্যাডাম থেকে?
-কিভাবে? ম্যাডাম এম্নি এম্নি আর্যার সন্ধান দিয়ে দিল ?
– না, না। এম্নি এম্নি হতে যাবে কেন ? ম্যাডামের সাথে প্রথমে একটু গল্প জুড়ে দিলাম। তারপর কথা প্রসঙ্গে আপনার ১৫৫ অংকের প্রাইম লেখার ছড়াটা শুনিয়েছিলাম। ছড়াটা শুনার সাথে সাথে ম্যাডাম বলে উঠলেন, এতো দেখি আরেক শুভঙ্করী আর্যা। আমি বললাম এটা কী? তারপর তিনি একটা ছোটখাট লেকচার দিলেন। যার মূলকথা হচ্ছে, ভৃগুরাম দাস নামে একজন পন্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। যিনি অষ্টাদশ শতকের প্রথমদিকে বর্ধমান জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গণিতের কিছু জটিল বিষয়কে সহজভাবে কবিতায় প্রকাশ করেন। এইসব কবিতা গণিতবিদ্যা চর্চার জন্য বেশ উপকারী ছিল। তাই লোকজন ভৃগুরাম দাসের উপাধি দেন ‘শুভঙ্কর’। সেখান থেকে এই কবিতাগুলোর নাম হয়ে গেল শুভঙ্করী আর্যা।
-ছোটখাট বক্তৃতার পরই ম্যাডাম কিছু আর্যা শুনিয়ে দিলেন?
-হ্যাঁ, হ্যাঁ। যে তিনটা আর্যা শুনালাম, সেই তিনটাই।
-আপনি একবারেই তিনটা আর্যা মুখস্ত করে ফেললেন!
-আরে না না। আপনি কী আমাকে একেএম ফজলুল হক পেয়েছেন ? একবার পড়ে বা শুনে সব মুখস্ত করে ফেলতে পারব ? আর্যা শুনানোর পর তিনটা বই দিলেন। তিনটাই গণিতের। একটা কাজী মোতাহের হোসেনের ‘গণিতের ইতিহাস’, আরেকটা জিয়াউর রহমান ও মোস্তাফিজুর রহমানের ‘গণিতের মজার ভুবন” এবং শেষেরটা পঞ্চানন বিশ্বাসের ‘শুভঙ্করী আর্যা’। বইগুলি থেকে আর্যা তিনটি খুঁজে বের করলাম। তারপর বেশ কয়েকবার পড়ে মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দিলাম।
বাসুদেব মন্ডল হেসে বললেন-আপনার এই শুভঙ্করী আর্যা শুনে ছোট বেলাকার একটি ধাঁধাঁ মনে পড়ে গেল। ক্লাস সিক্সে থাকার সময় মা বলেছিলেন। কাঁঠাল গাছে একটা তোতা পাখি বসে আছে। তার পাশ দিয়ে এক ঝাঁক তোতা পাখি উড়ে যাচ্ছে। তাদের দিকে তাকিয়ে গাছে বসা তোতা পাখিটা বলল, কোথায় যাও রে শতক ভাই? তার উত্তরে দলনেতা বলছে, এখানে তো শতক নাই/ যত আছি তত চাই/ তার আধা তার পাই/ তোমায় নিয়ে শত পুরাই। ধাঁধাঁটার উত্তর মিলাইতে দশদিন লেগেছিল। সেই উত্তর খুঁজে পাওয়ার আনন্দটা বলে বুঝানো যাবে না। আনন্দের কথা মনে পড়ায় আপনাকে একটু আনন্দ দিই। একটা যাদু দেখাই?
-যাদু দেখাবেন ? দেখান। তবে তার আগে ধাঁধাঁটার উত্তর বলে দেন।
-ধাঁধাঁর উত্তর আপনি নিজেই বের করতে পারবেন। শুভঙ্করী আর্যার অস্থিত পঞ্চকের মতই। মনেকরি তোতার সংখ্যা এক্স (ী)
ইমরান শেখর হাসলেন।
বাসুদেব মন্ডল টিসু বক্স থেকে তাসের প্যাকেট আর ছুড়ি বের করে আনলেন। প্যাকেট থেকে তাসগুলো বের করে ইমরান শেখরকে শাফল করতে দিলেন।
শাফল করা তাসগুলো টি টেবিলে রাখা হয়েছে। সেখান থেকে এক ভাঁজ তাস নিয়ে ইমরান শেখর নিচের তাসটি দেখে নিলেন। বাসুদেব মন্ডল অবশিষ্ট তাসের ভাঁজের উপর ছুড়িটা রাখলেন। ইমরান শেখর তার হাতে রাখা তাসের ভাঁজকে ছুড়ির উপর রাখলেন।
বাসুদেব মন্ডল ছুড়িটা বের করে এনে বললেন, রুইতনের টেক্কা।
ইমরান শেখর অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন-কীভাবে বললেন?
বাসুদেব মন্ডল হেসে বললেন-এটাই তো যাদু।
যাদুটা আরো দুইবার করা হলো। বাসুদেব মন্ডল দুইবারই ঠিকঠাক মতন বললেন।
ইমরান শেখর বেশ অবাক। তিনি বাসুদেব মন্ডল থেকে ছুড়িটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলেন। তেমন কোন বিশেষত্ব নেই। নরমাল একটা ছুড়ি। খালি উজ্জ্বলতা একটু বেশি।
ইমরান শেখর তাসগুলো নিজের কাছে নিয়ে বললেন-আমি একটু চেষ্টা করে দেখি। আপনি এই ফাঁকে সুরুজ আলীর বিজ্ঞান আর্যা পড়েন।
-সুরুজ আলীর বিজ্ঞান আর্যা ?
ইমরান শেখর ‘হ্যাঁ’ বলে পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করে নিয়ে বাসুদেব মন্ডলকে দিলেন।
বাসুদেব মন্ডল কাগজটি নিয়ে ভাঁজ খুললেন। খুলে দেখেন ছোট ছোট পাঁচটা কবিতা। তিনি বিড়বিড় করে প্রথম কবিতাটি পড়লেন-
ইলেকট্রনটা ঋণাত্মক প্রোটন বিপরীত
তবু তারা এটম মাঝে শূন্যের গায় গীত
এবার বল কেমনে সৃষ্টি হলো এই গান?
পারলে তবে হৃদয় মাঝে বইবে সুখের বান।
বাসুদেব মন্ডল কবিতাটা পড়েই বললেন-এতো দেখি চমৎকার আর্যা। প্রথমে একটা তথ্য, তার উপর ভিত্তি করেই প্রশ্ন। ইলেকট্রনের চার্জ ঋণাত্মক, প্রোটনের চার্জ ধণাত্মক। পরমাণুতে যতটা প্রোটন থাকে ঠিক ততটা ইলেকট্রন থাকে। তাহলে পরমাণুর লব্ধ চার্জের মান শুন্য। এতো খুব চমৎকার আর্যা !
ইমরান শেখর ‘পড়ে যান মজা পাবেন’ বলে তাস নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
বাসুদেব মন্ডল মনেমনে দ্বিতীয় কবিতাটি পড়ছেন,
চার্জযুক্ত পরমাণুর নাম হলো আয়ন
কেমনে সৃষ্টি হবে তা ? কিবা তার কারণ?
বাসুদেব মন্ডল মনেমনে ভাবলেন-পরমাণুতে ইলেকট্রন আসলে ঋণাত্মক চার্জ বেড়ে যাওয়ায় ঋণাত্মক আয়ন সৃষ্টি হয়। পরমাণু থেকে ইলেকট্রন চলে গেলে প্রোটন সংখ্যা ইলেকট্রন থেকে বেশি হওয়ায় ধণাত্মক আয়ন সৃষ্টি হয়। বাসুদেব মন্ডল এবার তৃতীয় কবিতায় চলে গেলেন,
হাইড্রোজেন ক্লোরিনে কোন সে বন্ধন হয়?
সোডিয়াম ক্লোরিনে সমযোজী ক্যান নয়?
বাসুদেব মন্ডল মনেমনে বললেন-এখানে তো কোন তথ্য দেওয়া নাই। থাকলে ভাল হতো।
বাসুদেব মন্ডল একটুখানি চিন্তা করলেন। ছন্দোবদ্ধ দুইটি লাইন মাথার মধ্যে খেলা করে গেল।
অধাতু আর অধাতু সমযোজী ভাই
ধাতুর সাথে অধাতু আয়নিকে যায়
বাসুদেব মন্ডল ভাবলেন, সুরুজ আলী আসলে এই বিষয়ে আলোচনা করা যাবে।
বাসুদেব মন্ডলের মাথায় নতুন খেয়াল জাগল। তিনি ইমরান শেখরের দিকে তাকালেন। ইমরান শেখর তাস-ছুড়ি নিয়ে ব্যস্ত আছেন।
বাসুদেব মন্ডল টিসু বক্স থেকে বেশক’টা কাটা কাগজ বের করে আনলেন। কাগজগুলিতে কিছু একটা লিখলেন। তারপর কাগজগুলির পুড়িয়া বাঁধলেন। আগের পুড়িয়া করা কাগজগুলোও টিসু বক্স থেকে বের করলেন। তারপর একভাগে নতুন পুড়িয়াগুলো আরেকভাগে পুরাতন পুড়িয়াগুলো রেখে গলা খাঁকারি দিলেন।
ইমরান শেখর আগের মতই তাস-ছুড়ি নিয়ে ব্যস্ত আছেন। সেই অবস্থাতেই জিজ্ঞেস করলেন-কিছু বলবেন?
বাসুদেব মন্ডল বললেন-এই যে কাগজের পুড়িয়ার দুইটি ভাগ রাখা আছে। প্রত্যেক ভাগ থেকে একটা করে পুড়িয়া নেন।
ইমরান শেখর বিনাবাক্য ব্যয়ে প্রত্যেক ভাগ থেকে একটা করে পুড়িয়া নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন-খুলব?
-এখন না। যখন বলব তখন।
-তবে পুড়িয়া দুইটি পকেটে রেখে দিই।
-রাখেন। তবে হাতেরটাতে এক লেখেন। আর টেবিলে যেটা আছে সেটাতে দুই লেখেন।
ইমরান শেখর বাসুদেব মন্ডলের কথা মতো এক দুই লিখে পকেটে রেখে দিলেন। তারপর আবার তাস-ছুড়ি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
বাসুদেব মন্ডল টেবিলে থাকা কাগজের পুড়িয়াগুলো টিসু বাক্সে রেখে সুরুজ আলীর বাকী বিজ্ঞান আর্যায় মন দিয়েছেন। তিনি কাগজের চার নম্বর কবিতাটি মনেমনে পড়ছেন,
অ¤øটা টকটক,
ক্ষারে ভোতা মুখ।
দোঁহে মিলে কিবা হয়?
পারলে পাবে সুখ।
বাসুদেব মন্ডল বেশ মজা পেলেন। তিনি নীরবে বলে গেলেন-দোঁহে মিলে নুন হয়, সাথে থাকে পানি/ স্বাদে হবে হবে নোনতা, এটাই তো জানি।
বাসুদেব মন্ডল পাঁচ নম্বর কবিতায় চলে গেলেন,
লিটমাস পেপারে কিবা ফল কার?
লাল নীল কোথা হয়?
নীলে লাল কোথা?
রঙ থাকে ঠিকঠাক নাম বল তার।
বাসুদেব মন্ডল এবারও বেশ মজা পেলেন? তিনি মনেমনে ভাবলেন-এটাতো ‘এনী ক্ষালা’ র গল্প। এসিডে নীল লিটমাস লাল হয়। ক্ষারে লাল লিটমাস নীল।
রঙ ঠিকঠাকের ব্যাপারটা ভাবতে ভাবতেই বাসুদেব মন্ডল বিড়বিড় করে বললেন-পিএইচ(ঢ়ঐ) যেথা হয় সাত, রঙ ঠিকঠাক/লবণ কিম্বা জলের মাঝে বাজে এই ঢাক।
এমন সময় সুরুজ আলী এসে উপস্থিত। সালাম দেওয়ার সাথে সাথে ইমরান শেখর জিজ্ঞেস করলেন-ওহ, তুমি চলে এসেছ ?
বাসুদেব মন্ডল হেসে বললেন-আসতে বলেছেন, আসবে না ?
ইমরান শেখরের চোখে মুখে একটা ইতস্তত ভাব চলে এসেছে। এইভাব লুকানো গেল না। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন-পুড়িয়া দুইটি খুলব?
কিছুক্ষণ আগে যেইভাব ইমরান শেখরের মধ্যে কাজ করছিল, তা এখন বাসুদেব মন্ডলের মধ্যে চলে এসেছে। নিজেকে সামলে নেওয়ার জন্য একটু সময় নিলেন। সেই সময়ে তড়িৎ কিছু চিন্তা ভাবনা মনের মধ্যে খেলা করে গেল-আপনি তো ধরতেই পেরেছেন। যার একটাতে লেখা আছে ‘সুরুজ আলী আসবে’। আরেকটাতে লেখা আছে ‘সুরুজ আলী সাথে করে বিজ্ঞান আর্যা নিয়ে আসবে’। এখন আর কোন বিষ্ময় কাজ করবে না। বরং বাসায় গিয়েই দেখুক। এতে দুই কূলই রক্ষা পাবে। ধরতে না পারলে বিষ্ময় কাজ করবে। আর ধরতে পারলে নিজের বোকা বোকা চেহারা ইমরান শেখরকে দেখাতে হবে না।
বাসুদেব মন্ডল ভাবনা মতই বললেন-এখন না। বাসায় গিয়ে খুলবেন।
ইমরান শেখর হেসে বললেন-তাইই হবে। তিনি সুরুজ আলীর দিকে তাকিয়ে বললেন-দাঁড়িয়ে কেন? বস। তোমাকে যাদু দেখাই।
ইমরান শেখর তাসের সেই খেলাটা দেখাচ্ছেন, যে খেলাটা বাসুদেব মন্ডল দেখিয়েছেন।
সুরুজ আলী তাসের একটা ভাঁজ নিয়ে নিচের তাসটি দেখে নিল। ইমরান শেখর তাসের বাকি ভাঁজের উপর ছুড়িটা রাখলেন।
সুরুজ আলী ছুড়ির উপর তার হাতে রাখা তাসের ভাঁজটি রাখলেন।
ইমরান শেখর ছুড়িটা কায়দা করে বের করে এনে বললেন-হরতনের বিবি। সুরুজ আলী সাথে সাথে বলে উঠল-হ, একেবারে ঠিকঠাক হরতনের বিবি।
ইমরান শেখর বেশ মজা পাচ্ছেন। তিনি বাসুদেব মন্ডলের দিকে তাকিয়ে হাসছেন। বাসুদেব মন্ডল কিছুই বলছেন না। শুধু মুখে একটি হাসি হাসি ভাব ধরে রেখেছেন।