কবি ও বিজ্ঞানী

স্বদেশ দত্ত

50

[একুশ]

ছয় সাত দিনের টানা বর্ষণ শেষে আকাশ এখন খানিকটা ক্লান্ত। গত দুইদিনে তেমন কোন বৃষ্টি হয় নাই। বর্ষার মেঘমুক্ত আকাশে আকাশগঙ্গা উত্তর থেকে দক্ষিণে চলে গেছে।

বর্ষার জলভরা বিল থেকে ভেসে আসছে ব্যাঙের ডাক। জোনাকিরা আলো জ্বেলে উড়ে চলেছে।

ইমরান শেখর আর বাসুদেব মন্ডল পুকুর ঘাটের আমগাছ তলে বসেছেন।

ইমরান শেখর পশ্চিম আকাশে কিছু একটা খুঁজছেন।

বাসুদেব মন্ডল জিজ্ঞেস করলেন-চাতকের মতন আকাশে কী খুঁজছেন?

-সন্ধ্যাতারা।

-সন্ধ্যাতারা? এখনতো পাবেন না।

-কেনো?

-এখন সন্ধ্যাতারা শুকতারা হয়ে গেছে। ভোর বেলা পূর্বাকাশে উঠে।

-ও, তাই না কী? জানতাম না তো। শুকতারাটার আরেকটা নাম আছে। জানেন না কী?

-না।

-ডাকাত তারা। শুকতারা যখন উঠে তখন নাকি ডাকাতরা ডাকাতি সেরে আস্তানায় ফিরে যায়। তারা বুঝতে পারে রাত শেষ হতে আর দেরি নাই।

এমন সময় একটা পেঁচা ডেকে উঠল।

ইমরান শেখর বললেন-পেঁচার ডাক না?

-হ্যাঁ। তাইতো মনে হয়।

-এটা কোথা থেকে ডাকছে জানেন? কদমের ডাল থেকে।–

-কদমের ডাল থেকে কেন?

-জীবনানন্দ দাশ ‘রূপসী বাংলা’য় বলেছেন। ইমরান শেখর আবৃত্তি করে গেলেন,

“কদমের ডালে আমি শুনেছি যে ল পেঁচা গেয়ে গেছে গান

নিশুতি জ্যোৎস্নার রাতে,- টুপ্ টুপ্ টুপ্ টুপ্ সারারাত ঝরে

শুনেছি শিশিরগুলো,-স্নান মুখে গড় এসে করেছে আহবান”

ইমরান শেখর একটুখানি থেমে বললেন-কবি আরেকটি কবিতায় বলেছেন,

“সাজায়ে রেখেছে চিতা ঃ বাংলার শ্রাবণের বিস্মিত আকাশ

চেয়ে রবে, ভিজে পেঁচা শান্ত স্নিগ্ধ চোখ মেলে কদমের বনে

শোনাবে লক্ষীর গল্প-ভাসানের গান নদী শোনাবে নির্জনে।”

বাসুদেব মন্ডল হেসে বললেন-তা কদমের ডাল থেকে কেন? শিমুলের ডাল থেকেও হতে পারে। কবিতো শিমুলের ডালের কথাও বলেছেন, “হয়তো শুনিবে এক ল²ীপেঁচা ডাকিতেছে শিমুলের ডালে।”

ইমরান শেখর হেসে বললেন-আশেপাশে কী শিমুল আছে? কিন্তু কদম ঠিকই আছে। পুকুরের ঐ পাড়ে কদম দোল খাচ্ছে।

দুই জনই কদম গাছের দিকে তাকালেন। এমন সময় পেঁচা আবার ডেকে উঠল। দুইজনের চোখ কদম থেকে সরে এসেছে। শব্দটা ওখান থেকে নয় পাশের কোথাও থেকে। কাছে একটা খড়ের গাঁদা।

বাসুদেব মন্ডল খড়ের গাঁদার দিকে তাকিয়ে বললেন-পেঁচাতো খড়ের গাঁদা থেকে ডাকছে।

ইমরান শেখর খড়ের গাঁদার দিকে তাকালেন।

একটা পেঁচা গোলগোল চোখে তাকিয়ে আছে। পেঁচাটি চেঁচিয়ে উঠল।

দুই জনই একটুখানি ভয় পেলেন। যে রকম ভয় অনেকেই অহেতুক পেয়ে থাকেন।

পেঁচা মনেহয় বিষয়টি বুঝতে পেরেছে। সে পাখা ঝাপটিয়ে নিজেকে সরিয়ে নিল। মনে হলো কদম গাছের দিকে উড়ে গেল।

দুই জনই হেসে উঠলেন। তাঁরা তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে। আকাশে শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ উঠেছে।

বাসুদেব মন্ডল বললেন-আর দুই দিন পরেই চাঁদ একেবারে গোল হয়ে উঠবে।

ইমরার শেখর কথার পিঠে কথা চড়ালেন-তার মানে পূর্ণিমা? আষাঢ়ী পূর্ণিমা।

-হ্যাঁ, হ্যাঁ। আষাঢ়ী পূর্ণিমা। এরকম পূর্ণিমার রাতে রাজপুত্র গৌতম গৃহত্যাগ করেছিলেন। কোন কোন পূর্ণিমার আকর্ষণ ক্ষমতা একেবারেই অন্যরকম। ঘর থেকে টেনে বের করে আনে।

-আসলেই। এই নিয়ে ‘হুমায়ুন আহমদ’ তাঁর ‘কবি’ উপন্যাসে খুব সুন্দর একটা কবিতা লিখেছেন।

বাসুদেব মন্ডল কিছু বলার আগেই ইমরান শেখর আবৃত্তিটি শুরু করে দিলেন-

প্রতি পূর্ণিমার মধ্যরাতে একবার আকাশের দিকে তাকাই

গৃহত্যাগি হবার মত জোছনা কি উঠেছে?

বালিকা ভুলানো জোছনা নয়।

যে জোছনায় বালিকারা ছাদের রেলিং ধরে ছুটাছুটি করতে করতে বলবে-

ও মাগো, কি সুন্দর চাঁদ।

নব দম্পতির জোছনাও নয়।

যে জোছনা দেখে স্বামী গাঢ় স্বরে স্ত্রীকে বলবেন-

দেখো দেখো নীতু চাঁদটা তোমার মুখের মত সুন্দর।

কাজলা দিদির স্যাঁতস্যাতে জোছনা নয়।

যে জোছনা বাসি স্মৃতিপূর্ণ ডাস্টবিন উল্টে দেয় আকাশে।

কবির জোছনা নয়।

যে জোছনা দেখে কবি বলবেন-

কি আশ্চর্য রূপার থালার মত চাঁদ।

আমি সিদ্ধার্থের মত গৃহত্যাগি জোছনার জন্য বসে আছি।

যে জোছনা দেখা মাত্র ঘরের সমস্ত দরজা খুলে যাবে-

ঘরের ভিতর ঢুকে পড়বে বিস্তৃত প্রান্তর।

প্রান্তরে হাঁটব, হাঁটব আর হাঁটব-

পূর্ণিমার চাঁদ স্থির হয়ে থাকবে মধ্য আকাশে।

চারিদিক থেকে বিবিধ কণ্ঠ ডাকবে-আয়, আয়, আয়।

বাসুদেব মন্ডল মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিলেন। আবৃত্তি শেষেই বলে উঠলেন-অসাধারণ, অসাধারণ। খুবই সুন্দর।

এরপরই হাসতে হাসতে বললেন-দুইটাই সুন্দর। এখন আর জিজ্ঞেস করতে পারবেন না, কোনটা সুন্দর আবৃত্তি? না, কবিতা?

এমন সময় একটা উল্কা উড়ে গেল। কথা নেই বার্তা নেই ইমরান শেখর উঠেই দৌঁড় দিলেন। আবার কিছুক্ষণ পর ফিরেও এলেন।

বাসুদেব মন্ডল জিজ্ঞেস করলেন-হঠাৎ দৌঁড় দিলেন যে?

ইমরান শেখর বসতে বসতে বললেন-দেখলেন না? একটা উল্কা উড়ে গেল। সেটা ধরতে দৌঁড় দিয়েছিলাম।

-ও মা, উল্কা আবার ধরা যায় নাকি? এটাতো মাটিতে পড়ার আগেই পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

-তা তো আমিও জানি। ছোট বেলার অভ্যাস। উল্কা দেখে দৌঁড় দিতাম। এখনও দিই। চলে যাব ভাবছিলাম। আবার ভাবলাম, এভাবে চলে যাওয়া ঠিক হবে না। আপনি কী ভাববেন? লোকটা পাগল নাকি? কথাবার্তা ছাড়া হঠাৎ দৌঁড় দিল। তাছাড়া আকাশ দেখা এখনও শেষ হয় নাই। আপনার সাথে গল্প করে আকাশ দেখার মজাই আলাদা।

-ভালই হয়েছে। চলে এসেছেন। গল্পের সাথে আপনার আবৃত্তি খুবই চমৎকার।

ইমরান শেখর বসতে বসতে বললেন-তাই নাকি?

-তা তো অবশ্যই। হাজার হোক সাহিত্যের মানুষ। সাহিত্যিকরা স্বপ্নবান হয়।

-বিজ্ঞানীরাও হয়। বিজ্ঞানীরা এই পৃথিবী ছেড়ে অন্য কোথাও ঘর বাঁধার স্বপ্ন দেখেন। বিজ্ঞানীরা শুধু স্বপ্ন দেখেন না, স্বপ্ন ধরার জন্য কাজও করে যান।

বাসুদেব মন্ডল প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাচ্ছেন। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন-কী সুন্দর আকাশ? এই আকাশের দিকে তাকালে মন ভাল হয়ে যায়।

-কবি হতেও ইচ্ছা করে। আপনার কখনও করে নাই? বিশেষ করে ভাবি সাথে থাকলে হাতে হাত রেখে নিজের কবিত্ব জাহির করা। একটু নিচু স্বরে বলে যাচ্ছেন, ওখানে বাঁধিব ঘর/ যেখানে জ্বলিছে তারা/ সেখানেতে কেউ নেই/ তুমি আমি ছাড়া।

বাসুদেব মন্ডল হেসে বললেন-বা! আপনি তো ভাই খুব রোমান্টিক মানুষ। এখনও আমিতুমিতে আছেন। খুব সুন্দর করে অন্যকে দিয়ে নিজের কথা প্রকাশ করলেন।

তারপর একটু থেমে বললেন-তবে আকাশের দিকে তাকালে মাঝেমাঝে ভাবনাগুলো ছন্দে ধরা দেয়। এক চাঁদনী রাতে আপনার ভাবিকে নিয়ে আকাশ দেখছি। মাথার মধ্যে বিশ্ব সৃষ্টি নিয়ে নানান প্রশ্ন খেলা করতে লাগল। হঠাৎ খেলো প্রশ্ন ছন্দে ধরা দিল। আমি বলে গেলাম-

সে কোন মহাবিস্ফোরণ ঘটেছিল বিশ্বডিম্বে?

গ্রহ তারা সবকিছু ছুটিতেছে অন্তরীক্ষে।

অপার বিষ্ময়ে তাকাই আকাশের পানে।

কোথা শুরু, কোথা শেষ? কেবা তাহা জানে?

ইমরান শেখর বললেন-দেখি, লাইনগুলো আবার আবার শুনান তো।

বাসুদেব মন্ডল আবার শুনালেন।

ইমরান শেখর সাথেসাথে বলে উঠলেন-আপনিতো দাদা একেবারে ‘রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম’ এর কথা মনে করিয়ে দিলেন। শুনবেন নাকি একটা?

-একটা কেন? কয়েকটাই শুনান।

-ভাল জিনিস কম খাওয়াই ভাল। আজ বরং একটাই শুনাই। নজরুল ইসলামের অনুবাদ থেকেই বলি,

আমরা পথিক ধূলির পথের, ভ্রমি শুধু একটি দিন,

লাভের অঙ্ক হিসাব করে পাই শুধু দুখ, মুখ মলিন।

খুঁজতে গিয়ে এই জীবনের রহস্যেরই কূল বৃথাই

অপূর্ণ সাধ আশা লয়ে হবই মৃত্যুর অঙ্কলীন।

দুই জনই কিছুক্ষণের জন্য মৌন রইলেন। নিরবতা ভেঙ্গে বাসুদেব মন্ডল বললেন-এই আকাশ দেখতে গেলেই আমার বারবার মনে হয়,

আকবর বাদশার সঙ্গে

হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই।

বাঁশির করুণ ডাক বেয়ে

ছেঁড়া ছাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে

এক বৈকুণ্ঠের দিকে।

বাসুদেব মন্ডল থামলেন। ইমরান শেখর কবিতার বাকিটুকু টেনে নিলেন,

এ গান যেখানে সত্য

অনন্ত গোধূলিলগ্নে

সেইখানে

বহি চলে ধলেশ্বরী

তীরে তমালের ঘন ছায়া;

আঙিনাতে

যে আছে অপেক্ষা করে, তার

পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর।

ইমরান শেখর হেসে প্রসঙ্গ পাল্টালেন। তিনি হেসে বললেন-আমেরিকার কবি জন আপডাইক এর একটি কবিতা শুনবেন নাকি?

-কোন কবি?

-জন আপডাইক। ‘মহাবৈশ্বিক যন্ত্রণা’ কবিতায় তিনি লিখেছেন,

নিউট্রিনো-এগুলি খুবই ছোট কণা

যাদের কোন আধান নেই, কোন ভরও নেই

এবং নেই তাদের কোন বিক্রিয়া।

পৃথিবীটাই তাদের কাছে একটা নিরেট পিÐমাত্র

যা তারা সহজেই করে ভেদ।

বাতাস ভরা ঘরে ঝাড়–দারণীর মতো তারা

অথবা কাচের পাতের ভেদকারী ফোটনের মতো।

নিশীথে তারা চলে যায় নেপালে

প্রেমিক প্রেমিকার মাঝ দিয়ে

বিছানার নিচ দিয়ে।

এটাকে আপনি আশ্চর্যজনক ব্যাপার ভাবেন,

আমি বলি এটা খুবই স্থূল।

 

বাসুদেব মন্ডল অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন-আপনি এই কবিতা কোথায় পেলেন?

-বাংলা একাডেমীর ‘বিজ্ঞান অভিধান’ এর পঞ্চম খন্ডে। সেখান থেকে জেনেছি, নিউট্রিনো দুর্বল কেন্দ্রীণ বলের মাধ্যমে বিক্রিয়া করে। ইলেকট্রন ও নিউট্রিনো এই দুইটি মৌলিক কণিকা দুর্বল কেন্দ্রীণ বলের মাধ্যমে একসাথে জড়িয়ে থাকে।

-বাংলা একাডেমীর বিজ্ঞান অভিধান?

-হ্যাঁ।

একেবারে সহজ সরল ভাবে লেখা। বিজ্ঞান ক্লাবে এক সেট দান করব। সাথে হুমায়ুন আজাদের ‘মহাবিশ্ব’ বইটাও দিব।

এমন সময় একটা উল্কা উড়ে যেতে লাগল। ইমরান শেখর সেইদিকে দৌঁড় দিলেন।

ইমরান শেখর আসবেন এই আশায় বাসুদেব মন্ডল বেশকিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। কিন্তু তিনি এলেন না।

বাসুদেব মন্ডল উঠে দাঁড়িয়েছেন।