কবি আল মাহমুদ এর লোক-লোকান্তর

ড. শ্যামল কান্তি দত্ত

109

অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হক সম্পাদিত একাদশ-দ্বাদশ ও আলিম শ্রেণির পাঠ্য সাহিত্যপাঠ (২০১৪) গ্রন্থে মধ্যযুগের কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তী থেকে শুরু করে আধুনিক কবি মহাদেব সাহা পর্যন্ত আঠাশ জন কবির কবিতা সংকলিত হয়েছে। এঁদের মধ্যে চব্বিশ জন কবিই তখন লোকান্তরিত। তখন (২০১৪) ঐ সংকলনভুক্ত বেঁচে থাকা মাত্র চার জন কবির অন্যতম কবি আল মাহমুদ (১৯৩৬-২০১৯)। তাঁর প্রথম কাব্য ‘লোক-লোকান্তর’ (১৯৬৩) এর নামকবিতা-ই এতে সংকলিু ও পাঠ্যসূচির অন্তর্গত তেরোটির একটি। সে কারণে উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থী-অধ্যাপকবৃন্দের নিকট তিনি ‘লোক-লোকান্তর’ এর কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত। অন্যদিকে, লোক মানে মানুষ, জনসাধারণ, একই ঐতিহ্যের ক্ষুদ্র গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়, ভুবন, জগৎ, বিশ্ব ; পৌরাণিক শাস্ত্র মতে স্বর্গ-মর্ত্য-পাতালের সমন্বয়ে গঠিত ত্রিলোক। লোকান্তর মানে ভিন্ন জগতের, লোকান্তরণ, ইন্তেকাল, মৃত্যু (জামিল, ২০১৬: ১২১২)। গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে সত্তরের দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত আল মাহমুদ বাঙালি লোক-ঐতিহ্য ধারণ করে লোক-জগতের কবি হিসেবে ‘কবিতার বিজয়’ ঘোষণা করে পাঠক নন্দিত হন। অথচ, সত্তর দশকের শেষার্ধে তিনি ‘মহাগ্রন্থ’ বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন আর ইন্তেকাল ভাবনায়-ভয়ে লোকজগৎকে অস্বীকার করে লোকান্তর ভাবনায় বিভোর হয়েছেন একটি গ্রন্থকে পৃথিবীর একমাত্র মান্য মনে করেছেন। এতে করে তিনি প্রাণে বেঁচে থেকেও প্রগতিশীল পাঠক সমাজের পাঠ্য তালিকা থেকে লোকান্তরিত হয়েছেন। আর তাই আমাদের আলোচনায় লোক ও লোকান্তর পদদুটির সমন্বয়ে বিপরীতার্থক দ্ব›দ্ব সমাসযোগে গঠিত শব্দ লোক-লোকান্তর এর কবি আল মাহমুদ। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে আজ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে সম্ভবত সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত ও উপেক্ষিত কবি আল মাহমুদ। লোক-লোকান্তর কাব্যে সন্ধানী আলো ফেলে আমরা আবিস্কার করতে চাই কবি আল মাহমুদের বিশেষত্ব-বৈশিষ্ট্য।
আল মাহমুদ কাব্য-অভিযাত্রায় আবির্ভূত হন ‘লোক-লোকান্তর’ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে ; তাঁর নিজের ভেতরের ‘শিশু আর পশুর বিরোধ’ (বিষয়ে দর্পণে আমি/ লোক-লোকান্তর) অনুভব করে। এ বিরোধ কবিতার স্বধর্মে বিশ্বাসী কবি আল মাহমুদের সাথে পৃথিবীর সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থে বিশ্বাসী ধার্মিক লোক আল মাহমুদের। অথচ অচিরেই “এই দ্ব›দ্ব অবসিত হয়ে তাঁর এক রৈখিক ‘বিশ্বাসের চর’ জেগে ওঠায় শিল্পও অন্তর্হিত” (আবিদ, ২০১৫)। ‘লোক-লোকান্তর’ গ্রন্থের নাম-কবিতায় যেখানে কবি সগৌরবে ঘোষণা করেন ‘কবিতার আসন্ন বিজয়’। অপর এক কবিতায় বলেন: ‘অথচ ধার্মিক নই আমি / পৌঁছার আকাক্সক্ষা নেই কোনো সত্যে’ (আমি / লোক-লোকান্তর )। কিংবা, ‘সোনালি কাবিন’ কাব্যে যেমন বলেন: ‘মরণের পরে শুধু ফিরে আসে কবরের ঘাস। / যুক্ষণ ধরো এই তাম্রবর্ণ অঙ্গের গড়ন / তারপর কিছু নেই, তারপর হাসে ইতিহাস।’ (সোনালি কাবিন-৪)। অথচ, জীবনের দ্বিতীয়ার্ধের কাব্যে এসে কবিকে পাওয়া যায়: মৃত্যুচিন্তায় আচ্ছন্ন-কাতর। এবার আল্লাহর স্তুতি-ভক্তিতে নিবেদিত আল মাহমুদ বলেন: ‘ভুলে গেছি নিজের কী নাম / কী নামে ডাকতো লোকে,’ (বিশ্বাসের চর/ অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না)। এভাবে আশাবাদী-সৃষ্টিশীল কবি হয়ে ওঠেন অদৃষ্টবাদী। কারো কারো ভাষায় ‘মৌলবাদী’। কেউ আবার প্রমাণ করতে প্রয়াস পেয়েছেন এই বলে যে, সোনালি কাবিন-পরবর্তী আল মাহমুদের মিথিক্যাল চিন্তা তাঁর নিজস্ব ও দেশের অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর শ্রেয় বিশ্বাস ও নৈতিকতাকে ধারণ করেছে (কমরুদ্দিন, ২০১৫: ৩৭)। তবে অধিকাংশ যে সর্বাংশ নয় সে কথা বলাই বাহুল্য। আবার সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় নৈতিকতা যে সংখ্যালঘুর ন্যায্য নৈতিকতা নাও হতে পারে সে কথা উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। হুমায়ুন আজাদ সম্পাদিত আধুনিক বাঙলা কবিতা (১৯৯৪) সংকলিু হয় জীবনানন্দ দাশ থেকে হুমায়ুন কবির পর্যন্ত ৪৪ জন কবির কবিতা নিয়ে, যেখানে পরিত্যক্ত হন আল মাহমুদ। কেননা, হুমায়ুন আজাদ মনে করেন: বাংলাদেশের প্রগতিবিরোধী ধারার কবিদের মধ্যে নিজের বিশ্বাস অকপটে প্রকাশ করেছেন শুধু আল মাহমুদ। প্রগিতিশীল থেকে তিনি মৌলবাদীতে পরিণত হয়েছেন এবং তা প্রকাশ করেছেন। প্রগতি বিরোধীদের মধ্যে তিনিই একমাত্র ভালো কবি। তবু তিনি সামরিক একনায়কত্ব ও মৌলবাদে দীক্ষা নিয়েছেন বলে মানুষ ও আধুনিকতার বিপক্ষে চলে গেছেন (হুমায়ুন, ১৯৯৪: ১৪)। যদিও, অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ লিখেন: আল মাহমুদের কবিতা বিশ্ব পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে, সা¤্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা বাহিনী গড়তে প্রত্যাশী এবং এ কারণেই যে তিনি চোখ ফিরিয়েছেন লোকজীবন ও গ্রামঢু জনপদে, তথ্য হিসেবে এটা অণ্যন্ত তাৎপর্যবহ। সোনালি কাবিন (১৯৭১) কাব্য পর্যন্ত তাঁর কবিতা মিলিু বাঙালির কবিতা, হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সম্মিলিু লোকজীবনের কবিতা। মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো (১৯৭৬) কাব্য থেকে আল মাহমুদের দ্বিতীয় প্রত্যাবর্তনের শুরু। এই প্রত্যাবর্তন মূলু অধ্যাত্ম বিশ্বাসে অবগাহন। এই বিশ্বাস দিয়েই তিনি ঠেকাতে চেয়েছেন পুঁজিবাদী ধস ও মানবিকতার পচন উৎস।
তবু থেমে নেই, আল মাহমুদের কবিতা নিয়ে বাংলা কবিতার পাঠক-সমলোচকের মধ্যে বিতর্ক। কবি আবিদ আনোয়ার মনে করেন: “আল মাহমুদ তাঁর প্রবেশলগ্নের দেশজতা, মানবিকতা, সাম্যবাদ ও এতে লগ্ন থাকার আকুতি দিয়েই আকৃষ্ট করেছিলেন পাঠককে। … তিনি ‘মানবিক নির্মাণের প্রতি আস্থা’ হারিয়ে ফেলেছেন বলে ঘোষণা দিয়ে কিছু ‘ইসলামি’ কবিতা লেখার প্রয়াস পান, যা কাব্যরসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণে ব্যর্থ হয়েছে। … এর মূল কারণ তাঁর প্রবেশলগ্নের কবিতার শিল্প-সফলুা এগুলোতে প্রতিফলিু হয়নি। … সম্ভবত, বয়স বাড়ার কারণেই কবিত্বশক্তিও হ্রাস পেয়েছে,” (আবিদ, ২০১৫)। ড. সালাহউদ্দীন আইয়ুব মনে করেন যে, বিষয়বদল সত্তে¡ও উত্তরকালীন আল মাহমুদ বাংলা কবিতাকে বঞ্চিত না করে সমৃদ্ধ করেছেন। আল মাহমুদের উত্তরকালীন কবিতার আলোচনায় দর্শনের প্রসঙ্গ এড়ানো যায় না। আল মাহমুদের অদৃষ্টবাদ মুসলিম ঐতিহ্যবাহিত। এখানে অ-দৃষ্ট আর মেটাফিজিক্স সমার্থক। আল মাহমুদের ফিজিক্স থেকে মেটাফিজিক্সে যাত্রার সূত্রপাত ঘটে তাঁর কারাবাসের অভিজ্ঞতায়। প্রথমদিকের কাব্যে উত্থাপিত ভাটিবাঙালির জীবনবোধ, আর পরবর্তী কাব্যগুলোতে প্রতিফলিু ভাটিবাংলার বাঙালি মুসলমানের মানসলোক (সালাউদ্দীন, ২০১৯)। যদিও দ্বিতীয় দলের আলোচক আল মাহমুদ এর কবিতার আলোচনায় তাঁর প্রথম-পর্বের কবিতার উদাহরণ ব্যবহার করেন দ্বিতীয় পর্বের কবিতার তিনগুণের বেশি; তবুও আমরা আপাতত সে বিতর্কে পা বাড়াবো না।
ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার মৌড়াইল গ্রামের কৃষক পরিবারের সন্তান মির আবদুস শুকুর আল মাহমুদ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পড়াশোনা করেই ঢাকায় পড়ি জমান (১৯৫৪)। চাকুরি নেন ইত্তেফাক পত্রিকার প্রুফ রিডার হিসেবে। বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত কবিতা পত্রিকায় কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে আল মাহমুদের কবি খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দুই বাংলায়। তখনও দেশের প্রকাশকগণ তরুণ কবিদের কবিতা বই প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিলেন। কবি আসাদ চৌধুরী জানান: মুহম্মদ আখতার এর নেতৃত্বে তিনি ও ইত্তেফাকের সাংবাদিক-শিল্পী কয়েক জন মিলে চাঁদা দিয়ে কপোতাক্ষ প্রকাশনা সংস্থা গঠন করে ‘লোক-লোকান্তর’ প্রকাশ করা হয়। বইটির প্রকাশনা উৎসবে ঢাকসু মধুর ক্যন্টিনের মধুদা (মধুসূদন দে) বাকিতে সিংগাড়া, চা আর সন্দেশ দিতে রাজি হন। ‘লোক-লোকান্তর’ প্রকাশের পর রাতারাতি আল মাহমুদ তরুণদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। এভাবে ‘লোক-লোকান্তর’ (১৯৬৩) ও ‘কালের কলস’ (১৯৬৬) মাত্র এই দুই কাব্যগ্রন্থ লিখেই তিনি দেশে সাহিত্যের সর্বোচ্চ সম্মান বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬৮) পেয়ে যান। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান নিয়ে লিখেন সাড়া জাগানো ছড়া: ‘‘ট্রাক ! ট্রাক ! ট্রাক !/ শুয়োরমুখো ট্রাক আসবে / দুয়োর বেঁধে রাখ।/ কেন বাঁধবো দোর জানালা / তুলবো কেন খিল ? / আসাদ গেছে মিছিল নিয়ে / ফিরবে সে মিছিল। / ট্রাক ! ট্রাক ! ট্রাক ! / ট্রাকের মুখে আগুন দিতে / মতিয়ুরকে ডাক। / কোথায় পাবো মতিয়ুরকে / ঘুমিয়ে আছে সে ! / তোরাই তবে সোনামানিক / আগুন জ্বেলে দে।’’। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান থেকে পালিয়ে কলকাতায় আশ্রয় নেন। কথাসাহিত্যিক দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ও নেতৃত্বে গঠিত হয় বাংলাদেশ লেখক-বুদ্ধিজীবী-শিল্পী সহায়ক সমিতি। সমিতির সহায়তায় আল মাহমুদ আশ্রয়-আপ্যায়ন গ্রহণ করেন ‘নাস্তিক’ ও ‘সাম্যবাদী’ অমিতাভ দাশগুপ্তের বাসায়। সৃষ্টি হয় তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি সোলালি কাবিন নামক সনেটগুচ্ছ।
মুক্তিযুদ্ধের পর আওয়ামী লীগের শরীর ভেদ করে বেড়ে ওঠা জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দেয়। তাঁদের সম্মেলনে প্রধান অতিথি হন কবি। জাসদের মুখপত্র দৈনিক গণকণ্ঠ এর সম্পাদকও কবি আল মাহমুদ। ১৭ মার্চ ১৯৭৪ পত্রিকাটি বাজেয়াপ্ত হয় এবং সম্পাদক আল মাহমুদ গ্রেফতার হয়ে জেলে যান। ৯ মার্চ ১৯৭৫ জেল থেকে মুক্তি পেলে বঙ্গবন্ধু তাকে ডেকে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরেন। জাতির জনক তাঁর পকেটে তিন হাজার টাকা গুঁজে দেন আর চাকুরি দেন শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশন বিভাগের সহপরিচালক পদে। পরে এই বিভাগের পরিচালক-রূপে অবসর গ্রহণ করেন (১৯৯৩)। এরশাদের আমলে পান একুশে পদক (১৯৮৬)। নব্বইয়ের দশকে কিছুদিন একটি ডানপন্থী দলের পত্রিকা দৈনিক কর্তফুলী সম্পাদনা করেন চট্টগ্রাম থেকে। সরকার পরিবর্তনের পর আবার ফিরে যান ঢাকায়। গত ১৫ ফেব্রæয়ারি ২০১৯ তিনি মুত্যুবরণ করেন। কবি আল মাহমুদের নাগরিক শোকসভায় যোগদিয়ে জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেন: ‘আল মাহমুদ লোক-লোকান্তর, কালের কলস ও সোনালি কাবিন তিনটি কাব্যগ্রন্থ দিয়েই বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন।’ সোনালি কাবিন নিয়ে আলোচনা হলেও তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আরও আলোচনা আবশ্যক বলে আমাদের মনে হয়েছে।
আমাদের ভাবনার সমর্থন মেলে কবি শহীদ কাদরীর বক্তব্যে। তাঁর মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বাংলা কবিতার দ্রাঘিমা সনাক্ত করতে হলে যে সব বিরল গ্রন্থের কাছে বার বার ফিরে যেতে হবে বলা বাহুল্য আল মাহমুদের ‘লোক-লোকান্তর’ তার মধ্যে অন্যতম (উদ্ধৃত: নিযামুদ্দীন, ২০১৯: ২১৫)। লোক-লোকান্তর গ্রন্থের নামকবিতাই যেন কবির আত্মপরিচয়ের দ্যোতক। সমগ্র কাব্যের প্রতিনিধি স্থানীয় কবিতা। কবিতাটি আঠারো মাত্রার অক্ষরবৃত্ত ছন্দে রচিত। এখানে কবির চেতনা পূর্বনির্ধারিত বা নির্দেশিত পথের পথিক নয়, সে এক মুক্ত বিহঙ্গ বনের পাখি। তার চারপাশের প্রকৃতিও মুক্ত ও উদার। ওপর নিচে পানলুা দোলছে অর্থাৎ প্রকৃতি এখানে জীবন্ত। চোখের কোটরে কাটা সুপারির রং, কেননা কবি জানেন বাঙালি সংকর জাতি নানান বর্ণের জনজাতির সংমিশ্রণে তার উদ্ভব। পা এবং নোখের রং তো বাংলাদেশেরই জাতীয় পতাকার রং যেনো। যদিও তখনও তা আমাদের অর্জিত হয়নি তবু সবুজ আর লাল তো বিদ্রোহী বাঙালির প্রিয় রঙ। কবি সচেতন হয়ে যখন অনুভব করেন অনার্য-আর্য, মৌর্য, গুপ্ত, বৌদ্ধ, পাল, সেন ও তুর্কী-মোগল শাসনের হাত বেয়ে ইংরেজ উপনিবেশ ভেঙে আজকের বাঙালি। তখন বর্তমানের সামাজিক নিয়ম-কানুন তাঁর কাছে বড়ই ঠুনকো মনে হয়। এগুলো ভাবতে বা প্রকাশ করতে বিচিত্র প্রতিক‚লুা আছে। এসব ভেবেই কবির একটু যেন ভয় হয়। এরপরও কবি নিজের সৃষ্টির গরবে তিনি বলে উঠতে পেরেছিলেন, ‘মনে হয় কেটে যাবে, ছিঁড়ে যাবে সমস্ত বাঁধুনি / সংসার সমাজ ধর্ম তুচ্ছ হয়ে যাবে লোকালয়।’ তবু তাঁর কবিতায় গভীর অন্ধকারেও আশার আলো জ্বলে ওঠে। আর মনে হয় অন্ধকার অপসারিত হয়ে নতুন আশা নিয়ে প্রভাত প্রকাশিত হবে, প্রেম-আনন্দ ও কবিতা পুনর্বার দখল করে নেবে তাদের স্থান: ‘লোক থেকে লোকান্তরে আমি যেন স্তব্ধ হয়ে শুনি / আহত কবির গান। কবিতার আসন্ন বিজয়। (লোক-লোকান্তর) এমনকি এই বিজয়ের গর্বে আল মাহমুদ অনুভব করেছিলেন ‘হুড়মুড় শব্দে’ ভেঙে পড়ছে তাঁর ‘পাড়ার মসজিদ’ (আবিদ, ২০১৫)। আর তাই বাঙালির বীজমন্ত্র ‘সবার উপরে মানুষ সত্য / তাহার উপরে নাই।’ চতুর্দশ শতকের কবি চন্ডীদাসের বিখ্যাত উক্তিকে কবিতায় ধারণ করে বাঙালির প্রাণে ঠাঁই করে নেন কবি আল মাহমুদ।
লোক থেকে লোকান্তরে অর্থাৎ ইহলোকে ও কল্পলোকে কবি কবিতার বিজয় ঘোষণা করলেও তাঁর আক্ষেপ-আকুতি থেকে যায় এই বাংলার বাঙালিকে নিয়ে। তাইতো কবির হাহাকার প্রতিধ্বনিত হয়: ‘কবিতা বোঝে না এই বাঙলায় কেউ আর / দেশের অগণ্য চাষী, চাপরাশি / ডাক্তার উকিল মোক্তার / পুলিশ দারোগা ছাত্র অধ্যাপক সব / কাব্যের ব্যাপারে নীরব ! / স্মাগলার আলোচক সম্পাদক তরুণীর দল / কবিতা বোঝে না কোনো সঙ / অভিনেত্রী নটীনারী নাটের মহল / কার মনে কতোটুকু রঙ?/ ও পাড়ার সুন্দরী রোজেনা / সারা অঙ্গে ঢেউ তার তবু মেয়ে / কবিতা বোঝে না।’ (অবুঝের সমীকরণ / লোক-লোকান্তর)। পরবর্তী কাব্য ‘কালের কলসে’ও কবির হাহাকার প্রধান উচ্চারণ: ‘শুনুন, রবীন্দ্রনাথ, আপনার সমস্ত কবিতা / আমি যদি পুঁতে রেখে দিনরাত পানি ঢালতে থাকি / নিশ্চিত বিশ্বাস এই, একটিও উদ্ভিদ হবে না / আপনার বাংলাদেশ এমন নিষ্ফলা, ঠাকুর।’ (রবীন্দ্রনাথ)। এই নিষ্ফলা দেশে সোনা ফলানোর স্বপ্নেই সোনালি কাবিন। সেই স্বপ্ন সত্যি হলো, রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা…’ জাতীয় সংগীত হলো। ধর্মভিত্তিক মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের কাঠামো ভেঙে জন্ম নিল ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী বাঙালি রাষ্ট্র। যে রাষ্ট্রের গায়ে ধর্মের কোনো গন্ধ থাকবার কথা নয়। যাদের মন্ত্র নজরুলের ‘জয় বাংলা’। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সে দেশে বাঙালি কবিকে যেতে হল জেলে। কবি কলম রেখে পৃথিবীর সর্বশেষ ধর্মগ্রন্থ বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন। কদিন পরেই দেখলেন মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক সপরিবারে নিহত। রাইফেল হাতে রাষ্ট্রক্ষমতায় সেনাপতি; ধর্মীয় রাজনীতি চালু। সংবিধানের শীর্ষে সংযুক্ত সংখ্যাগরিষ্ঠদের ধর্মীয় বাণী। তারপর আবার সামরিক অভ্যুত্থান; আরেক সামরিকজান্তা আরেক ধাপ এগিয়ে সংবিধানে জুড়ে দিল রাষ্ট্রধর্ম ধর্মনিরপেক্ষতা রইলো কাগুজে কথা হয়ে। কবির কলম এবার রাষ্ট্রনায়কের বিপক্ষে যায়নি-তাই কি লেখে: ‘মায়াবী পর্দা দোলে ওঠো’? ভোগবাদী-ভন্ড সমাজকে কবি আর স্বপ্ন দেখাতে চাননি বলেই কি পরিবেশন করেন ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’? নাকি জেলের বেড়ি ছেড়ে এসে কবি বাস্তবতার বাঁশের বাঁশি ছেড়ে হাতে তুলে নিলেন জাদুর বাঁশি ? আগে যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ প্রতিজ্ঞা করেছিল: ‘এ অধমই তোমার মরদ।’(সোনালি কাবিন-১০)। এখন সে বৃদ্ধ, আর বৃদ্ধরাতো আবার শিশুর মতোই; তাইতো এবার সে কিশোর হয়ে আওড়ায় ‘জিহাদ জিহাদ বলে জেগে উঠি।’ (বখতিয়ারের ঘোড়া)। এ কারণেই মনেহয় সময় এবং রাজনীতি ‘কবির সাহিত্যিক সত্তাকে কীটদুষ্ট করেছে’ (হক, ২০১৫)। তবে প্রথম দিকের বাস্তবতা কবির লোকজ ঐতিহ্য বা ভ‚লোক আর ঐ মায়া বা জাদু তাঁর লোকান্তর। এদুয়ের মিলনেই কবি আল মাহমুদ। প্রায়শই তাঁর কবিতায় এদুয়ের মিশ্রণ ঘটেছে। ফলে লোকভাষা আর লোকান্তরের ভাবনা-চিন্তা ও শব্দগুচ্ছ মিলেই আল মাহমুদের কবিতার বিশেষত্ব। এভাবে আধুনিক বাংলা কবিতায় অনন্য এক জগৎ তৈরি করেন আল মাহমুদ। তাঁর কবিতার বিষয় গ্রামঢু লোকজীবন আর প্রাচীন ধর্মীয় জীবন ; তবে কাব্যভাষা আধুনিক একবির একান্ত নিজস্ব ব্যক্তিভাষা বা নিভাষা। তাই লোক আল মাহমুদ লোকান্তরিত হলেও তাঁর কবিতা আলোক ছড়াবে যুদিন রবে বাঙালি-মুলুক।
তথ্যনির্দেশ
আবিদ আনোয়ার, ‘কবি আল মাহমুদ: আধুনিকতায় লোকজ উপাদান’, কালি ও কলম, আবুল হাসনাত (সম্পা.), ঢাকা, মে ২০১৫।
কমরুদ্দিন আহমদ, আল মাহমুদ: কবি ও কথাশিল্পী, ঢাকা: চট্টগ্রাম নন্দন প্রকাশন, ২০১৫।
জামিল চৌধুরী (সম্পা.), আধুনিক বাংলা অভিধান, ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ফেব্রæয়ারি ২০১৬।
সালাহউদ্দীন আইয়ুব, ‘আল মাহমুদের কবিতা’, অবিনশ্বর, মুহাম্মদ নিযামুদ্দীন (সম্পা.) ঢাকা, ফেব্রæয়ারি ২০১৯।
সৈয়দশামসুল হক, সাক্ষাৎকার, দৈনিক আজকের কাগজ, ঢাকা, ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯২।
হুমায়ুন আজাদ (সম্পা.), আধুনিক বাঙলা কবিতা, ঢাকা: আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৪।