কবিতার নিপুণ চাষি

মীম মিজান

110

কবিতা জীবনের বাহক। কবিতা জীবনের ধারক। কবিতায় যিনি যাপন করেন জীবন। কবিতার ভাষায় যিনি করেন বাচন। তিনিই জাকির আবু জাফর। সদালাপী, মিষ্টভাষী, মিশুক, কবিতার মতই আপন ও শিল্পিত এই মানুষটি জন্মেছেন ফেনী জেলায়। মুক্তির স্বাদ আস্বাদন করবে বাঙালি। তাই ঝাপিয়ে পড়েছে হানাদারদের বিরুদ্ধে। নেই তেমন প্রশিক্ষণ। অস্ত্র ক’য়েকটি। নয় সময়োপযোগী। তবুও হিম্মত বুকে নিয়ে এগিয়ে চলল সেই যুদ্ধের প্রায় পাঁচমাস। ঝনঝনানি সেই যুদ্ধের আবহে পৃথিবীর নাগরিক হয়ে এলেন শিশুকবি। ঝনঝনানি, রক্তের ত্যাগ, মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময় দিয়ে যে স্বাধীনতা সমাগত সেই স্বাধীনতার কাব্যমালা আগামী প্রজন্মকে শোনাবেন যে কবি সে কবি পয়লা জুলাই কেঁদে উঠলেন রক্তাক্ত বাংলার জমিনে।
স্থানীয় প্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষে বাংলাদেশের প্রধানতম বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন। যিনি কবি হবেন তাঁর কি প্রয়োজন পড়ে কোন পাঠের গন্ডির ? কাগুজে সনদের মান কি তাকে উচ্চকিত করবে? তিনি তো পাঠ নিবেন প্রকৃতি থেকে। তিনি পাঠ নিবেন গ্রামের সদ্যবিবাহিতা বধূয়ার নথ নাড়া দেখে। তিনি পাঠ নিবেন বৃষ্টির মুশলধারার মাঝে ব্যাঙের ডাক থেকে। নদীর কুলুকুলু বয়ে চলা বারি থেকে। সন্ধ্যেবেলা ঝিঝির ডাক থেকে। নিষুতি রাতে কুহুকুহু ডাক থেকে। বিহানবেলার দূর্বাঘাসের ডগায় স্ফটিক শিশিরকণা থেকে।
এই পাঠে তিনি নিজেকে করেছেন স্বশিক্ষিত। কতজনই তো তার সহপাঠী ছিল। কই তাদের কলমতো কোনদিন কেঁদে উঠলো না কারো উপর খড়গে। বেরুলো না এক লাইন কোন নদী বা নারীর শৈল্পিক বর্ণনায়। সে হিশেবে কবি স্বশিক্ষিত। নিজ মননকে শানিত করেছেন। মোহ মায়া সবকিছুর হাতছানি উপেক্ষা করে তিলে তিলে নিজেকে করেছেন কবিতার উপযোগী। নব্বইয়ের দশকে নিজেকে পরিচিত করে তুলেছেন কবিতাঙ্গনে। যেমনি জনপ্রিয় কবি। তেমনি তিনি হৃদয়স্পর্শী গীতিকার। কিশোর রহস্য উপন্যাসে সিদ্ধহস্ত। ছড়ার গাড়ির বিজ্ঞ চালক। সম্পাদনার নিপুন কারিগর। কথাশিল্পী হিশেবে ঋদ্ধ। সবমিলিয়ে এ পর্যন্ত তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা চল্লিশের অধিক। তবে সিংহভাগই কাব্যগ্রন্থ।
জাকির আবু জাফর তাঁর কবিতায় এনেছেন আধ্যাত্নিকতা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, রােমান্টিকতা, দেশপ্রেম, নারীর অনুষঙ্গ, প্রকৃতির নান্দনিক উপস্থাপন, স্বদেশীয় সার্বভৌমত্বের কথা, দেশের নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর রক্তক্ষরিত বাচ্য, নদীর উপস্থাপন, ইতিহাস-ঐতিহ্য, প্রকৃতির উপর মানুষের খড়গহস্ততা, মেকি মানবের গোপন খবর, সাম্যের আহŸান, মননকে ইতিবাচক করে তোলার উপকরণ ইত্যাদি।
তাঁর কবিতা ও কোবিদ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত কবি আসাদ চৌধুরী বলেছেন, ‘‘জাকির অসম্ভব সৎ ছেলে ও কবি। কবিতাও তার সৎ।’
বিশ্ব আজ এগিয়ে চলছে। তুমুল গতি। পেছনে ফিরে তাকানোর নেই ফুরসৎ। কিন্তু এই গতিই তো আজ কেড়ে নিল মতি। আমরা নিজেকে বনে নিয়েছি পাষন্ড রূপে। আমাদের চাই রাতে ঘুমুবার স্থান। চাই আরো গগনচুম্বী দালান। ব্যবসার ঝলকে আমরা দিলখোশ পলকে পলক। লতা-পাতা, বৃক্ষাদির ধ্বংস করে সেখানে সাজাও বিপণী। মেঠোপথ বা আলপথ নেই। নেই গরুরগাড়ি চলার কোন কাদাযুক্ত পথ। ফুল নেই। নেই ফুলকানন থেকে ছড়িয়ে পড়া সুরভী। নগরের সয়লাব। বসবাসযোগ্য নেই আর এই প্রিয় মাতৃকা। কবির ভাষায়,
‘নেই মহামগ্ন পলাশগন্ধ্যার সমূহ স্নিগ্ধতা
পিচঢালা পথগুলো মৃতনদীর মতো শুয়ে দিনরাত
যন্ত্রের মিছিল বুকে কাতরায়।’
(নগর চশমাঃ জাকির আবু জাফর)
মানুষ ঐ সবকিছুকে বিলাসিতার উপকরণ বানিয়ে বিপর্যয় সৃষ্টি করে এই ধরায়। যে ডিনামাইট আবিষ্কার হলো মানুষের কল্যাণের তরে। সেই ডিনামাইটে মানুষের প্রাণ ঝরে। আর কায়েমি শক্তিগুলো তো উঠেপড়ে লেগেছে গোটা বিশ্বকে করতে গ্রাস। তাইতো বর্ণচোরা সনেটার নামক জনৈক কবি বলেছেন, ‘আমি আজ ক্ষুধার্ত। গোটা বিশ্ব খেয়ে ফেলবো। ক্ষুধার্ত পেটের একেকটি মোচড় সিডর তোলে ভূপৃষ্ঠে।’ কী সাংঘাতিক আমাদের চাওয়া পাওয়ার সীমা পরিসীমা! আমরা কিছুতেই নই তুষ্ট। আমার চাই চাই। আরো চাই। আরো চাই। এজন্যই সুখ ছেড়ে পালিয়েছে আজ। আমরা হাপিত্যেশ করে মরি। মানবিকতার গুণকে লালনকারী কবি তাই আমাদের এসব ছেড়ে দিতে সনির্বদ্ধ আবেদন জানিয়েছেন। আক্ষেপ করে বলেছেন,
‘তাই কি চাওয়ার শেষ হয় না হায়রে কপাল’
(অধরাকে ধরার লোভেঃ জাকির আবু জাফর)
চাওয়ার শেষ নেই। নেই শেষ নিজের ক্ষমতা জাহিরের উন্মাদনার। আমার এইখানে আমিই সর্বেসর্বা। কারো পোদ্দারি চলবে না। অন্যেরা কেউ থাকলে কেউকেটা। থাকবে নিশ্চুপ। অন্যের ধন লুটে নিব। শুষে খাব সক্কলকেই। একটু নড়াচড়া দিলেই সাঙ্গ করে ফেলি তাদের। রাতের আঁধার কিম্বা দিনের স্বচ্ছ আলোয় বধ করি প্রতিপক্ষকে। রঞ্জিত হয় কর ও কৃপাণ। আবার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে করি উল্লাস। এসব খবর পড়তে পড়তে মানুষ হয়েছে অভ্যস্ত। পত্রিকার পাতায় পাতায় গলিত লাশের ছবি। ফ্লাটে জোড়াখুন, ঘাতকের উল্লাস দেখেছে বেবি। এমনই এক খুনরাঙ্গা স্বদেশের ছবি এঁকেছেন কবি।
‘খুনের খবর হাতে চাররঙা দৈনিকগুলো দোরখোলে প্রতিদিন
ভোরের কোমল দেহে রক্তদাগ বড় কষ্টের প্রতিদিন
অক্ষরগুলো শব্দগগুলো নীরব বেদনায় কাঁদে প্রতিদিন
ঘৃণা ও ঘৃণিতের ক্রন্দনের বন্ধনের খবর প্রতিদিন
লুটেরাদের হাত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ হবার খবর প্রতিদিন’
(প্রতিদিন বাংলাদেশঃ জাকির আবু জাফর)
খুনে রঞ্জিত হচ্ছে স্বদেশ। আর এই স্বদেশের মুমূর্ষু অবস্থায় অনেককে দেখা যায় ফেনিল হতে। করে হম্বিতম্বি। দেখে যেন মনে হবে দেশের কল্যাণে তারা নিবেদিত প্রাণ। বুলি আওড়ায় নিরপেক্ষতার। বুলি আওড়ায় স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি কিম্বা প্রগতিশীলতার। আসলে এরা মুখোশ মানুষ। কঠিন স্বার্থসিদ্ধ। গোপনে লেনদেন করে চেতনার। এরকম চেতনার ব্যবসায়ীদের করতে হবে করুণা। আর তেমনটিই ইঙ্গিত করে প্রকৃত দেশপ্রেম ধারণের আহŸান জানিয়েছেন কবি।
‘ও বিব্রত জনপদ ঐতিহ্যের বোরখা খুলে
চেতনার জামদানী পরে যারা তাদের করুণা করো
কেননা ওরা অন্ধ ওরা বধির ওরা স্বার্থজালে বন্দি
ওরা চেতনা জলের জীব’
(আধুনিকার গোপন পতাকাঃ জাকির আবু জাফর)
গভীর বোধসম্পন্ন কবি জাকির আবু জাফর। জীবনের পরতে পরতে আছে তাঁর সু²দর্শী বোধ। নানাদিক, নানা বিষয় তিনি জীবনের গভীর থেকে তুলে ধরেছেন। টানাপোড়ন কিম্বা দুঃখগাথা। সবি প্রোজ্জ্বল তাঁর কাব্যে। মানুষের জীবনে যদি দুঃখ না থাকতো তবে সে জীবনের স্বাদ খুব বেশী থাকতো না। দুঃখ আছে বলে জীবনকে উপভোগ করা যায়। যায় জীবনের অর্থ বুঝা। এবং এই দুঃখই মানুষের সবথেকে কাছের অনুষঙ্গ। সুখগুলো দ্রুত হারিয়ে যায়। দুঃখই মানুষকে মহৎ করে। কবির গভীর বোধের পঙক্তিমালা,
‘বেদনা যদি না থাকতো সত্যি কি একগেঁয়ে
হতো জীবনের সব উপভোগের দিন
সুখে সুখে ত্যাক্ত হতো কি সকল মানুষ
জানি না সে কথা
কিন্তু জানি মানুষের জীবনে দুঃখের মতো বিশ্বস্ত সংগী আর নেই
দুঃখই মহৎ করে সকল প্রাণ’
(দুঃখনদী পেরিয়েঃ জাকির আবু জাফর)
আমার এ সবুজ দেশ। শ্যামলিমায় ভরপুর। আর সেই শ্যামলিমা, সবুজ, গাঁও গ্রাম, পল্লীবালার নানা অনুষঙ্গে ভরপুর পল্লীকবি জসীমউদদীনের কাব্য। কবি জাকির আবু জাফর পল্লীকবির সেই কাব্যমালার সারাৎসার এঁকেছেন তাঁর ‘বাংলাদেশের হৃদয় থেকে’ নামক কবিতায়। কবি নিজেও একই চিন্তার মানুষ। কাব্য জমিন তাঁর ঋদ্ধ পল্লীর চিত্রে। কবিতাটি পল্লীকবিকে নিবেদিত। কয়েকটি ছত্র হচ্ছে,
‘তার কবিতায় ঘাসের সুবাস, মাছের সুবাস
ধানপাতা ও নিমের সুবাস
কাঁচা মাটির গন্ধভরা পাটের সুবাস
বনবাদাড়ে শীতল হাওয়ায় সরষে ফুলের হলুদ সুবাস
ডালিম ডালে নেতিয়ে পড়া বিকেল সুবাস’
(বাংলাদেশের হৃদয় থেকেঃ জাকির আবু জাফর)
পল্লীকবির কাব্যে যেমন সকল গ্রামীণ বিষয়াদি আচরিত। সেই গ্রামীণ চিরচেনা সবুজ, মেঠোপথ, গাছ, পাখপাখালি জাকির আবু জাফরকে টানে। সেগুলোর প্রতি কবির গভীর মমত্ববোধ। নাগরিকতার ছোবল থেকে বাঁচাতে চান তাঁর বেড়েওঠা গ্রামকে। তিনি কৈশোরসুলভ হাসতে হাসতে লাফ দিতে চান পুকুরে। এক লাফে উঠতে চান কোন পেয়ারগাছে। অথবা মাচানে ঝুলে থাকা শশা ছিঁড়ে বসাবেন কামড়। নস্টালজিয়ায় ভাসানো কাব্য করেছেন কবি। যেন ভাসছে সবার চোখের সামনে।
‘উন্মুক্ত মাঠ পেরুলেই আমার ঘর
আমার মৌমাছি দিন ঝুলে আছে কাঁঠালের ডালে’
(বুনো বাতাসের ঘ্রাণঃ জাকির আবু জাফর)
মানব জীবন আনন্দ বেদনা, বিরহ-মিলনের সমাহার। কবি বিরহকে তাঁর কবিতার মূখ্য বিষয় করেননি। তবে অনুষঙ্গ হিশেবে জ্বলজ্বল করছে কাব্য জমিনে। তাঁর বিরহী আখ্যান শিল্পিত। আবেগমতিথ। কবি বিরহ তাঁর কাব্যে বুনেছেন নিম্নভাবে।
‘তুমি যখন বৃষ্টি দেখো আমি দেখি মন
তোমার ভেতর বৃষ্টি কেনো ঝরছে সারাক্ষণ
মন কী তবে ঝড়ের আকাশ মন কী তবে রাত
তুমুল ধারা নামে মনে তাই কি অকস্মাৎ।’
(বৃষ্টি তোমার চোখেঃ জাকির আবু জাফর)
জাকির আবু জাফরের একজন ‘চিন্তক কবি’র অভিধা ন্যায্য প্রাপ্য। দেশ, জাতি, সমাজ, মানুষ নিয়ে কী তাঁর ভাবনা! দেশকে তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা বিকিয়ে খাচ্ছে। যেমন একজন অপ্রকৃতস্থ সন্তানের জনক তার সন্তানকে দেখিয়ে মানুষের করুণা আদায় করে ভূরিভোজন করে। তেমনি দেশের ভুখা নাঙাদের দেখিয়ে বড়বড় বুদ্ধিজীবী, সংস্থা, সংগঠন, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বিদেশের উচ্ছিষ্ট ভোগ করছে। আর যারা গরীব তাদের ভাগ্যাকাশে উঠে না কখনো কিঞ্চিৎ সুখ জোসনালোক। কবি তাই আক্ষেপভরা মনে তাদের গোপন তসরুপ লিপিবদ্ধ করেছেন।
‘তাদের বোগলে থাকে ভূখা নাঙা চোখ এবং বহুবিধ
বস্তির বাজেট
ক্ষুধাতুর চোখগুলো বিক্রি হয় উঁচু বাজেটের ডলারে
অথচ এসব চোখের ক্ষুধায় জেগে থাকে কালোরোদের মিছিল
মানবতাবাদী মার্সিডিজ বেঞ্জ উন্নয়ন ব্যাংকের সুশীল বাতাস
উড়িয়ে যায়। দিয়ে যায় বস্তির ইংগিত’
(কালোরোদ থেকে সাদা অন্ধকারঃ জাকির আবু জাফর)
বর্গীরা নেই। কিন্তু আছে আজ নব্য বর্গী। তাদের রূপ কর্পোরেট। এই কর্পোরেট, আর কর্পোরেট পুঁজির কাছে ধরাশায়ী সব। কী শিল্প। কী সাহিত্য। কী বুদ্ধিজীবী। কী গরীব। সবাই জো হুকুম, জো হুকুম করছে। বর্গীরূপী কর্পোরেটের কালো থাবার নখরের বিস্তৃতি সুদূর। যারা আজীবন পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লিখেছেন, বলেছেন, সংগ্রাম করেছেন তারাই দেখি এখন পুঁজিবাদের অন্যতম বড় পৃষ্ঠপোষক। তাই কবি আক্ষেপ নিয়ে কবিতার খেরোখাতায় পঙক্তির আশ্রয়ে ধিক্কার জানিয়ে লিখছেন,
‘বাণিজ্যিক শব্দের ঠোঁটে পুঁজিবাদি লিপস্টিক
ভোগের সকল মাল-মসলা এবং বর্গীকাজলাশ্রিত মানবাধিকার বুলির সিল সেঁটে
সাফল্যের গল্প রচে বসিয়েছে প্রহসনের বাজার’
(বহুজাতিক অভিধানঃ জাকির আবু জাফর)
মানুষ আশায় বেঁচে থাকে। আর আশাহীন হলে তখনই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সেই সত্তা। জীবন ঝামেলা বা কুহকময়। অন্ত্য নেই এই জটিলতার। শত ঝঞ্ঝার মধ্যেও দেখতে হয় নব স্বপ্নের দিগন্ত। নইলে যে পরাজয়। আর পরাজয় মানে না কোনো বীর। আর বীরের স্বপ্ন নিয়ে কাব্য করে আমাদের আশায় বাঁধতে বলেছেন বুক। স্বপ্ন দেখতে বলেছেন। স্বপ্ন কখনওই নিঃশেষ হয় না। কেউ না কেউ তা পূরণ করে। কবির ভাষায়,
‘তবুও দাঁড়াতে হয় তবুও ভাঙতে হয় অন্ধকারের সমস্ত দেয়াল
দেখতে হয় স্বপ্নের মতন স্বর্গের সিঁড়ি
কেননা স্বপ্নেরা মরে না
কেননা স্বপ্নের পরাজয় নেই
কেননা স্বপ্নের সমাপ্তি নেই
এবং জীবনেরও নেই কোনো সমাপ্তির বিশ্রাম’
(মধ্যবর্তী অন্ধকারঃ জাকির আবু জাফর)
উন্নাসিক জাতিতে পরিণত হয়েছি আমরা। চরম এক উন্নাসিকতার মধ্যদিয়ে যাপিত হচ্ছে জীবন। বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী কারো প্রতি নেই যেন আমাদের কোনো দায়বদ্ধতা। তাড়াতাড়ি ফললাভের প্রত্যাশাও আমাদের ভিতরকার স্থিরতাকে গিলে ফেলেছে। দেখে না দেখার ভান। চোখ থাকতেও প্রায় অন্ধ আমরা। এভাবে চলতে থাকলে জাতি একদিন নানাদিক থেকে লুপ্তের পথ বেছে নিবে। দূরদর্শী কবি তাই আমাদের উদাসিনতার বিষয়গুলো ধরিয়ে দিয়ে সজাগ হবার কথা লিখেছেন। আমাদের উদাসিনতার কথাগুলো কবির ভাষায়,
‘চোখ নেই যার সে অন্ধ একথা মানি শতবার
কিন্তু চোখ আছে যার সে কি দেখে সব?
অথবা যা কিছু দেখে তার সমস্তটা সত্যের সঙ্গী হয়ে ওঠে?’
(সেই অন্ধঃ জাকির আবু জাফর)
রাজনীতি সচেতন কবি তিনি। তিনি সবকিছুর চেয়েছেন সমাধান। রাজনৈতিক দলগুলো যেন একজন আরেকজনের সতীন। কথা বলাতো দূরের মুখ দেখাও যেন হারাম। এরকম সংস্কৃতি আমাদের কী উপহার দিয়েছে? দিয়েছে মেরুদন্ডহীন কোনো বিরোধী পক্ষ। আর দূর্দান্ড প্রতাপশালী ক্ষমতাধর শক্তি। তাই দেশের গণতন্ত্র মুমূর্ষু। মানুষ কণ্ঠ স্বাধীনতা কল্পনাও করতে পারে না। পারে না জানাতে নিজেদের দাবী। তার পূর্বেই মুখ থুবড়ে দেয়া হয় তাদের। এরকম এক পরমত সহিষ্ণুতা খরার কালে কবি এক যুগান্তকারী আহব্বান জানিয়েছেন রাজনৈতিক সকল শক্তিকে। কাদা ছোড়াছুড়ি না করে প্রেম প্রীতির বাহুডোরে বাঁধতে বলেছেন সকলকে। কবির আকুতি,
‘ভিন্ন পক্ষ সেও আমাদের প্রতিবেশী হোক
মতভেদ হোক গণতন্ত্রের পুষ্ট খাবার
সমালোচনার তীর হোক আজ রঙিন তুলি
যেখানে চিত্র আঁকা হবে শুধু ভবিষ্যতের।’
(সুখতন্ত্র ইশতেহারঃ জাকির আবু জাফর)
কবির কবিতাগুলো ছন্দময়। ছন্দের সম্যক পাঠ তাঁর জানা। আছে সুর লহরী। লয়। তাল। ঝংকার। যেন ঝরনাধারা পতনোন্মুখ। শব্দের ব্যবহার মেদবহুল নয়। নিজের এক কণ্ঠস্বর তিনি তৈরি করে নিয়েছেন কাব্যে। নিজস্ব এক ঢঙ তাঁর কাব্যে পরিলক্ষিত হয়। স্বাধীনতা যেমন সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রায় উপনীত। তেমনি কবির কাব্যও মানের দিক থেকে নিজস্ব উচ্চতায় আসীন। খাঁটি বাংলা শব্দের এক উৎকর্ষ ক্ষেত্র তাঁর কাব্যমালা। দৈবাৎ কয়েকটি বিদেশী শব্দের সাক্ষাৎ মেলে। তবে তা চাপিয়ে দেয়া নয়। কাব্যের প্রয়োজনে। অপাংক্তেয় নয়। শেষ করছি কবির চমৎকার কয়েকটি ছত্র দিয়ে। বুঝে নিবেন কবির সর্বোত্ত কী আহব্বান!
‘এই স্যাঁতস্যাঁতে প্রতিবেশে আমাদের সাহস ভিজে গেছে
রোদ তুমি এসো-
আমাদের সাহসগুলো বেঁধে দেবো তোমার ডানায়’
(নিখোঁজ সংবাদঃ জাকির আবু জাফর)