কধুরখীল উচ্চবিদ্যালয় এখন সরকারি প্রতিষ্ঠান

বৃটিশ আন্দোলনের পুণ্যভমি ও কবি সুকান্তের স্মৃতিবিজড়িত স্থান

লিটন দাশ গুপ্ত

77

“ক্ষুধার্ত বাতাসে শুনি এইখানে এক নাম-
চট্টগ্রাম : বীর চট্টগ্রাম!
বিক্ষত বিধ্বস্ত দেহে অদ্ভুত নিঃশব্দ সহিষ্ণুতা
আমাদের স্নায়ুতে স্নায়ুতে
বিদ্যুৎ প্রবাহ আনে, আনে আজ চেতনার দিন,
এ তোমার নিশ্চিত বিশ্বাস,
তোমার প্রতিজ্ঞা তাই আমার প্রতিজ্ঞা চট্টগ্রাম!
আমার হৃৎপিণ্ডে আজ তারি লাল স্বাক্ষর দিলাম”।
কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্য তাঁর ‘চট্টগ্রাম ১৯৪৩’ নামক বিখ্যাত কবিতাটি যে স্থানে বসে লিখেছিলেন সেই স্থানটির নাম হলো কধুরখীল উচ্চ বিদ্যালয়। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের চারণভূমি ও কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের স্মৃতি বিজড়িত স্থান হওয়ায় বিদ্যালয়টি আলাদা মর্যাদা পেয়েছে। এখন আবার এই কধুরখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের নামে খানিক পরিবর্তন আসায় বিদ্যালয়টির মর্যাদা আরো বহুগুন বৃদ্ধি পেল। অর্থাৎ বিদ্যালয়ের নামের মাঝখানে ‘সরকারি’ শব্দটি যুক্ত হয়েছে। এখন থেকে কধুরখীল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় নামে অধিকতর পরিচিত হচ্ছে। সেই হিসাবে শিক্ষক শিক্ষার্থী, বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, এলাকাবাসী সবার কাছে তুলনামূলকভাবে এটির গুরুত্ব আরো বৃদ্ধি পেয়েছে এতে কোন সন্দেহ নেই।
চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার কধুরখীল গ্রামে ১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই বিদ্যালয়টি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সমগ্র পৃথিবী যখন সামগ্রিক ক্ষেত্রে প্রায় অচল হয়ে পড়ে, ঠিক তখনই ১৯১৭ সালে গ্রামের বিদ্যুৎসাহী ব্যক্তি বিধুভূষণ চৌধুরী ৭ম ও ৮ম শ্রেণির জন্যে টিন বাঁশবেষ্টিত দুটি কক্ষ নির্মাণ করে বিদ্যালয় হিসাবে পরিচালনা করতে থাকেন। এর দুই বছর পর এলাকার দানবীর প্রাণকৃষ্ণ চৌধুরী ও তাঁর পরিবারের সদস্যগণ বিদ্যালয়ের জন্যে বর্তমান বিশাল এলাকাজুড়ে জায়গাটি দান করেছিলেন। প্রতিষ্ঠালগ্নে অর্থাৎ পাঠদান কার্যক্রমের ১ম বছরে ৭ম শ্রেণিতে ১৫ জন এবং ৮ম শ্রেণিতে ১২ জন ছাত্রছাত্রী ভর্তি হলেও বর্তমানে প্রায় ১২০০ ছাত্রছাত্রী শিক্ষা গ্রহন করছে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে।
শুরুরদিকে যে কথা বলছিলাম, বৃটিশ আন্দোলনের চারণভূমি ও কবি সুকান্ত ভট্টচার্যের স্মৃতি বিজড়িত এই স্কুলের কথা। তবে এই টুকুতেই শেষ নয়, আছে প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্যের সাক্ষী চিহ্ন ও আধুনিক যুগের কিছু প্রাপ্তি। যেমন- বিদ্যালয়টির মূল ভবনটি হচ্ছে জাতীয় ঐতিহ্যের অনুপম নিদর্শন শতাব্দীর প্রাচীন মৃৎ ভবন। এই ভবনের দৈর্ঘ্য ২০৩ ফুট ও প্রস্থ ৪৫ ফুট, অর্থাৎ ক্ষেত্রফল ৯১৩৫ বর্গফুট। আর এই ভবন তৈরীতে ব্যবহার করা হয়েছে কেবল মাটি বাঁশ গাছ শন। জানা যায় তখনকার সময়ে সুদুর বার্মা (বর্তমান পরিবর্তিত নাম মায়ানমার) থেকে উন্নত প্রজাতির বাঁশ ও গাছ সংগ্রহ করে আনা হয়েছিল বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের জন্যে উপকরণ হিসাবে। সম্পূর্ণ বৃটিশ স্থাপত্যশৈলী এত বড় মাটির ভবন দেশে আর কোথাও নেই বলে উল্লেখ করেন স্থপতি ড. মোবশ্বের আলীর নেতৃত্বে পরিদর্শনে আসা পরিদর্শন টীম। এই সময় প্রত্ততত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ তালিকায় নেওয়ার সনদ প্রদান করেন প্রত্ততত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলতাফ হোসেন সাহেব। সেই হিসাবে জাতীয় ঐতিহ্যের ধারক বাহক এই মৃৎভবনটি সংরক্ষণের অংশ হিসাবে ২০১৫ সালের সংস্কার কাজের উদ্বোধন করেন সেই সময়ের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী জনাব আসাদুজ্জামান নূর। ঐ সময় কয়েকটি কক্ষ পূর্ববর্তী ডিজাইন অক্ষন্ন রেখে সংস্কার ও মেরামত কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। কিছুদিন বিরত থাকার পর কাজ আবার শুরু হয়েছে যা এখনো চলমান রয়েছে।
এইতো গেলো বৃটিশ ঐতিহ্যের স্থাপত্যের সাক্ষ্য এই মৃৎভবনের কথা। এবার আসি পাকিস্থানের আমলের দিকে। ভারত ভেঙ্গে পাকিস্তান সৃষ্টির পর, পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান তথা বাঙ্গালী-অবাঙ্গালীর মধ্যে চরম বৈষম্য সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে বাঙ্গালীদের উপর নেমে আসে অত্যাচার অনাচার শোষণ নির্যাতন। শুরু হয় ভাষা আন্দোলন, শহীদ হন সালাম রফিক জব্বার সহ আরো অনেকেই। এই ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে পূর্ববঙ্গে নব জাতীয় চেতনার উপর ভিত্তি করে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান সরকার ক্ষুব্ধ হয়ে এক সময় রবীন্দ্র সঙ্গীত-সাহিত্য নিষিদ্ধসহ বাঙ্গালী ইতিহাস ঐতিহ্যের উপর আঘাত হানতে থাকে। ঠিক তখনই প্রতিকূল পরিবেশে এই বিদ্যালয়ের ছাত্ররা অনেকবাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে ১৯৬২ সালে শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। যা দেশব্যাপী বিদ্যালয় পর্যায়ে প্রথম শহীদ মিনার হিসাবে স্বীকৃত। উল্লেখ্য এই সময় শহীদ মিনার নির্মাণের দায়ে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বিদ্যালয়ের সরকারি বরাদ্ধ বাতিল করে দেয় এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের স্থায়ীভাবে স্কুল থেকে বহিস্কার করে।
এছাড়া প্রকৃতিগত ভাবে বিদ্যালয়ের পরিবেশ অত্যন্ত চমৎকার। যেমন- বিদ্যালয় প্রবেশ পথে রয়েছে সুবিশাল মাঠ। আর বিদ্যালয়ের এক পাশে রয়েছে বিশাল এলাকাজুড়ে পার্বতী চরণ দীঘি। এতবড় দীঘি চট্টগ্রাম জেলায় অন্য কোন বিদ্যালয়ে আছে কিনা সন্দেহ! এই দিঘী এলাকায় ও বিদ্যালয়ের বিশাল প্রান্তরজুড়ে হাজার হাজার বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে স্কুল পরিবেশকে করেছে ছায়াসুনিবিড় সুশীতল শান্তির নীর, নিরব নিস্তব্ধ যেন সাধু সন্ন্যাসীর তপস্যার এক আশ্রমিক পরিবেশ। তবে স্কুল চলাকালীন সময়ে পাকখালীর কলকাকলী আর ছাত্রছাত্রীর কলকন্ঠ, স্কুল এলাকা হয়ে যায় একাকার। উল্লেখ্য এখানে স্কুল নিয়ে বৃটিশ আমলের শতাব্দীর প্রাচীন মৃৎভবনের কথা বলেছি, পাকিস্তান আমলে বিদ্যালয় পর্যায়ে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণের ঘটনা বলেছি, এবার বাংলাদেশ সময়ে কিছু প্রাপ্তির কথা বলতে হয়। আগেই বলেছি বিদ্যালয়ের পার্বতী চারণ দীঘি, বিশাল এলাকাজুড়ে ভূমি সম্পদ ও বৃক্ষরোপণের কথা। বিদ্যালয়ের এই বিস্তির্ণ এলাকাজুড়ে রোপণ করা হয়েছে হাজার হাজার ফলদ বনজ ও ঔষধি সহ নানা প্রজাতির গাছ। অসংখ্য বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে ২০০৯ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে জাতীয় বৃক্ষরোপণ পুরুষ্কারে পুরুস্কৃত হয়েছে এই বিদ্যালয়টি। সেই হিসাবে বাংলাদেশ সময়ে স্কুলটি সরকারিকরণের সাথে প্রধানমন্ত্রীর হাত হতে প্রাপ্ত জাতীয় পুরুষ্কারও এক প্রকার প্রাপ্তি হিসাবে বলা যেতে পারে।
যাই হোক, এখানে প্রাপ্তির কথা অনেক বললাম, এবার আসি অন্য প্রসঙ্গে। বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধানশিক্ষক ছিলেন বিধু ভূষণ চৌধুরী। তিনি মাঝের বছর তিনেক ছাড়া, ১৯১৭ সাল থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় কর্মরত থেকে বিদ্যালয়টিকে প্রতিটি ক্ষেত্রে গৌরবজ্জোল ইতিহাস সৃষ্টিতে অনন্য ও অনবদ্য ভূমিকা পালন করে, নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। ১৯১১ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রধানশিক্ষক পদে কর্মরত আছেন বিশ্বজিৎ বডুয়া। সুপ্রাচীন এই প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষায় তিনিও বদ্ধপরিকর বলে উল্লেখ করেন। সুন্দর সুশৃঙ্খল স্বনামধন্য সুপ্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক বাহক এমন বিদ্যালয়টির ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় আমার বাড়ি না হলেও বিদ্যালয় থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত আমার গ্রাম কানুনগো পাড়া। সেই হিসাবে ঐতিহ্যবাহী এই বিদ্যালয়টি সরকারি হওয়ায় আমিও আনন্দিত ও গর্বিত। বিদ্যালয়টি সার্বিকভাবে আরো সমৃদ্ধ হোক এটা আমিও প্রার্থনা করি।
এখানে বিদ্যালয়ের আরো ইতিহাস ঐতিহ্য সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উপাত্ত, প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীর বর্তমান অবস্থা, বিদ্যালয়ের বিগত বছরগুলোতে সার্বিক ফলাফল ইত্যাদি সম্পর্কে জানার কৌতুহল ও আগ্রহ ছিল। কিন্তু বিদ্যালয় পরিদর্শনের দিন প্রধানশিক্ষক ব্যস্ত থাকাতে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহে ব্যর্থ হলাম। তাই বিদ্যালয় সম্পর্কে যা বলা হল, তার চেয়ে বেশী না বলাই রয়ে গেল। হয়ত কোন এক সময় গিয়ে কৌতুহল নিবারণে আরো তথ্য জেনে বিস্তারিত উপস্থাপন করব এই প্রত্যাশা রেখে, আর বিদ্যালয়ে আবারো সমৃদ্ধি কামনা করে শেষ করলাম আজকের এই লেখা।

লেখক : শিক্ষক ও সাহিত্যিক