সদ্য প্রয়াত কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দী

19

সদ্য প্রয়াত কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দী। তিনি গেয়েছেন- ‘দিন যায় কথা থাকে’, ‘পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই’, ‘পাহাড়ের কান্না দেখে’, কত যে
তোমাকে বেসেছি ভালো’র মতো কালজয়ী সব গান। তার কণ্ঠেই বাংলা ভাষাভাষী মানুষ শুনেছে ‘আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়/তবু কেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়’। সেই কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেল। লাখো ভক্তের বুকে পাহাড়সম বেদনা দিয়ে তিনি হারিয়ে গেলেন। দু’চোখে ছল ছল পানি আর পাথরের মতো ব্যথা নিয়েই তাকে জানাতে হবে বিদায়। বাংলা আধুুনিক গানের কিংবদন্তি শিল্পী সুবীর নন্দী আর নেই। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টায় সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর। তিনি স্ত্রী পূরবী নন্দী, মেয়ে ফাল্গুনী নন্দীসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, প্রিয়জন, বন্ধুবান্ধব, ভক্ত, শুভাকাক্সক্ষী রেখে গেছেন।
সুবীর নন্দী গত ১৪ এপ্রিল হার্ট অ্যাটাক করার পর ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ৩০ এপ্রিল তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়।
এরপর তিনি শনি, রবি ও সোমবার পরপর তিন দিন হার্ট অ্যাটাক করেন। মঙ্গলবার ভোররাতে সবাইকে কাঁদিয়ে সুবীর নন্দী মৃত্যুকে বরণ করে নিলেন। শেষ হল বাংলা আধুনিক গানের উজ্জ্বলতর এক অধ্যায়। সুবীর নন্দী দীর্ঘদিন ডায়াবেটিসসহ নানা সমস্যায় ভুগছিলেন।
জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটের জাতীয় সমন্বয়ক অধ্যাপক সামন্ত লাল সেন যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ সময় আজ (মঙ্গলবার) ভোর সাড়ে ৪টায় সুবীর নন্দী মারা গেছেন। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরপর তিনবার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন সুবীর নন্দী। এর আগে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও একবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল তার। তিনি আরও বলেন, বারবার হার্ট অ্যাটাক হওয়ায় চিকিৎসকরা যে আশা করেছিলেন, তা-ও ক্ষীণ হয়ে যায়। সুবীরের মাল্টিপল অরগান ফেইলিয়র হয়েছে।
সিঙ্গাপুর থেকে সুবীর নন্দীর মরদেহ আজ বুধবার সকালে ঢাকায় আনা হচ্ছে। দেশের বরেণ্য এই সংগীতশিল্পীর পরিবারের পক্ষ থেকে সমন্বয়ক প্রফেসর সামন্ত লাল সেন যুগান্তরকে জানান, আজ সকাল ৬টা ১০ মিনিটে রিজেন্ট এয়ারওয়েজের একটি উড়োজাহাজে সুবীর নন্দীর মরদেহ ঢাকায় এসে পৌঁছাবে। বিমানবন্দর থেকে তার মরদেহ আনা হবে ২৫সি গ্রিন রোডের গ্রিন ভিউ অ্যাপার্টমেন্টে।
বেলা ১১টায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য সুবীর নন্দীর মরদেহ নেয়া হবে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। এরপর রামকৃষ্ণ মিশনে। দুপুরে সবুজবাগে বরদেশ্বরী কালীমন্দির ও শ্মশানে একুশে পদক পাওয়া সঙ্গীতশিল্পী সুবীর নন্দীর শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে।
দেশবরেণ্য সঙ্গীতশিল্পী সুবীর নন্দীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা, সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। আরও শোক প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এমপি, তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ, জাকের পার্টির চেয়ারম্যান পীরজাদা মোস্তফা আমীর ফয়সল প্রমুখ। শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, সুবীর নন্দীর মৃত্যু দেশের সঙ্গীত জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। রাষ্ট্রপতি সুবীর নন্দীর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য এই শিল্পীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত এই জনপ্রিয় শিল্পী তার কর্মের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এক শোক বার্তায় বলেন, সুবীর নন্দী ছিলেন বাঙালিদের ভালোবাসার গানের পাখি। আধুনিক বাংলা গানে সুবীর নন্দী যা দিয়েছেন তা অসাধারণ। অসংখ্য হৃদয়স্পর্শী গানে কণ্ঠ দিয়ে তিনি কোটি মা নুষের অন্তর জয় করেছিলেন।
সুবীর নন্দী গত ১২ এপ্রিল পরিবারের সবাইকে নিয়ে মৌলভীবাজারে আত্মীয়ের বাড়িতে যান। সেখানে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ১৪ এপ্রিল ঢাকায় ফেরার পথে ট্রেনে অসুস্থ হয়ে পড়লে একজন চিকিৎসকের পরামর্শে সুবীর নন্দীকে নিয়ে পরিবারের সদস্যরা ঢাকার বিমানবন্দর স্টেশনে নেমে যান। ওই রাত ১১টার দিকে তাকে ঢাকা সিএমএইচে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয়। সিএমএইচে থাকাকালীন সুবীর নন্দীর চিকিৎসার খবরাখবর নিচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার নির্দেশেই পরে ৩০ এপ্রিল তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরের জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই তার চিকিৎসা চলছিল।
সুবীর নন্দী ‘মহানায়ক’, ‘শুভদা’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘মেঘের পরে মেঘ’ ও ‘মহুয়া সুন্দরী’ চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের জন্য পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। ২০১৯ সালে পেয়েছেন একুশে পদক। প্রায় পাঁচ দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে আড়াই হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন। তিনি শুধু সঙ্গীতশিল্পী নন, অসংখ্য গানের গীতিকার ও সুরকার তিনি।
১৯৫৩ সালের ১৯ নভেম্বর এই শিল্পী জন্মগ্রহণ করেন হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং থানায় নন্দীপাড়ার এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ পরিবারে। বাবা সুধাংশু নন্দী একজন মেডিকেল অফিসার ছিলেন। তার মা পুতুল রানী খুবই চমৎকার গান করতেন। বাবার চাকরিসূত্রে তার শৈশব কেটেছে চা বাগানেই। পাঁচ-ছয় বছর বয়স পর্যন্ত বাগানেই ছিলেন। সেখানের একটি স্কুলেই প্রথম হাতেখড়ি। ১৯৬৩ সালে তৃতীয় শ্রেণি থেকেই গান গাওয়া শুরু করেন সুবীর নন্দী। এরপর ১৯৬৭ সালে তিনি সিলেট বেতারে গান করেন। তার গানের ওস্তাদ ছিলেন গুরু বাবর আলী খান। লোকগানে ছিলেন বিদিত লাল দাশ। ভাই তপন কুমার নন্দীর কাছেও সুবীর নন্দী গানের তালিম নিয়েছেন। সুবীর নন্দীর স্কুল ও কলেজজীবন দুটোই হবিগঞ্জে। সুবীর নন্দী ঢাকা রেডিওতে সুযোগ পান ১৯৭০ সালে। তখন তিনি নজরুলগীতি গেয়ে রেডিওর অডিশনে পাস করেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা পরিবারসহ আগরতলায় চলে যান। সুবীর নন্দীর প্রথম রেকর্ড করা গান ‘যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়’। গানটি লিখেছেন মোহাম্মদ মুজাক্কের, সুরারোপ করেন ওস্তাদ মীর কাসেম। এটি রেকর্ড করা হয় ১৯৭২ সালে। একই বছর তিনি জনতা ব্যাংকে চাকরি নেন। ২০১০ সালে অবসর নেয়ার আগ পর্যন্ত জনতা ব্যাংকেই কর্মরত ছিলেন। চলচ্চিত্রে প্রথম প্লেব্যক করেন ১৯৭৪ সালে আবদুস সামাদ পরিচালিত ‘সূর্যগ্রহণ’ চলচ্চিত্রে। বিভিন্ন সময় সুবীর নন্দীর কথা বলা ও সাক্ষাৎকার নেয়ার সুযোগ হয়েছিল এ প্রতিবেদকের। প্রথম জনপ্রিয় গান প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, সেদিক থেকে বললে ‘দিন যায় কথা থাকে’ প্রথম গান যেটি আমাকে জনপ্রিয়তা এনে দেয়। এরপর একে একে হাজার মনের কাছে, বন্ধু হতে চেয়ে তোমার- এমন অসংখ্য গান সৃষ্টি হল। আমাদের সঙ্গীতের গুণীজনদের সান্নিধ্যে আমি অনেক কিছু শিখেছি। আবদুল আহাদ শিখিয়েছেন গান শেখার চেয়ে গান গাওয়ার টেকনিকগুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ, খান আতাউর রহমান শিখিয়েছেন গানে কীভাবে চিত্রায়ণটা আনতে হয়। কারণ, চিত্রকল্প তৈরি না হলে গানটা আসলে হয় না। অজিত রায় বলতেন, গান গাইবার আগে অবশ্যই কথাগুলো যেন অন্তত ৫০ বার পড়ি। তাহলে গানটা ভেতরে প্রবেশ করবে। ১৯৮১ সালে পূরবী নন্দীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সুবীর নন্দী। তাদের একমাত্র সন্তান ফাল্পুনী নন্দী। একই বছর তার একক অ্যালবাম ‘সুবীর নন্দীর গান’ ডিসকো রেকর্ডিংয়ের ব্যানারে বাজারে আসে। এখন পর্যন্ত ২৮টি একক অ্যালবাম প্রকাশ হয়েছে সুবীর নন্দীর।
২০০২ সালে তপন চৌধুরী গাওয়া একটি নাটকের গানে সুবীর নন্দী প্রথম সুর দেন। পরবর্তী সময়ে শাকিলা জাফরের একটি অ্যালবামে অনেকগুলো গানের সুর করেন তিনি। ২০০৪ সালে প্রথম গান লেখেন। তারপর লিখেছেন আরও অনেক গান। বেতার, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র মিলিয়ে প্রায় আড়াই হাজার গান তিনি গেয়েছেন। সুবীর নন্দীর গাওয়া অসংখ্য জনপ্রিয় গানের মধ্যে ‘আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়’, ‘পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই’, ‘পাহাড়ের কান্না দেখে’, ‘দিন যায় কথা থাকে’, ‘আশা ছিল মনে মনে’, ‘হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে’, ‘বন্ধু তোর বরাত নিয়া’, ‘তুমি এমনই জাল পেতেছ’, ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার’, ‘কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো’, ‘আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি’, ‘কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায়’, ‘একটা যে সোনার কইন্যা’, ‘ও আমার উড়াল পঙ্খিরে’ মানুষের মুখে মুখে ফেরে।