দুই বছর ধরে লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ

কক্সবাজারজুড়ে চলছে সাড়ে ৯ হাজার ‘অবৈধ’ ট্যাক্সি

রাসেল চৌধুরী, কক্সবাজার

15

কক্সবাজারে জেলা সদরসহ আট উপজেলার ৩৪ রুটে লাইসেন্সবিহীন সাড়ে ৯ হাজার সিএনজিচালিত ট্যাক্সি চলছে। এতে সরকার শুধু লাইসেন্স বাবদ রাজস্ব হারিয়েছে ১১ কোটি ৪৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা। লাইসেন্স দেয়া হলে এসব সিএনজি ট্যাক্সি হতে বাৎসরিক নবায়ন ফি ৬ কোটি ৪৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা রাজস্ব পাওয়া যেত। ২০১৭ সাল হতে আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি (আরটিসি) কর্তৃক কক্সবাজারে সিএনজি অটোরিক্সার লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, সরকার রাজস্ববঞ্চিত হলেও সড়কে না চলে বসে নেই কোন ট্যাক্সি। আবেদন করে লাইসেন্স না পেলেও ট্রাফিক অফিস, সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ কিংবা কোন গ্রূপকে ম্যানেজ করেই সড়কে, উপসড়কে চলাচল অব্যাহত রেখেছে সিএনজিগুলো। এতে নাম্বারহীন ট্যাক্সি ব্যবহারে অপরাধ বাড়ছে বলে দাবি করেছেন বিভিন্ন থানার অফিসার ইনচার্জগণ। ফলে অনেক স্পর্শকাতর অপরাধের ক্লু উদঘাটনও মুখথুবড়ে পড়ে আছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। যদি লাইসেন্সই না দেয়া হয় তাহলে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) কক্সবাজার সার্কেল অফিসের কার্যক্রম চালু রেখে কাজ কি? এমন প্রশ্ন ভুক্তভোগীদের।
কক্সবাজার বিআরটিএ অফিস সূত্রমতে, জেলা সদরসহ আটটি উপজেলার মহাসড়ক ও ৩৪টি অভ্যন্তরীণ রুটে বৈধ ও অবৈধ মিলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করছে প্রায় ১৬ হাজার। এর মাঝে ২০০০ সাল হতে ২০১৬ সালের শেষ সময় পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশন পেয়েছে ৬ হাজার ৪৭টি সিএনজি অটোরিকশা। এসব অটোরিক্সার মাঝে ফিটনেসহীন হয়েছে প্রায় দুই হাজার। আর অকেজো হয়ে আছে আরো দেড় হাজারের মতো। কিছু অটোরিক্সা রয়েছে, মেয়াদ শেষ হলেও বছরের পর বছর নবায়ন করছেন না মালিকরা। সব মিলিয়ে ২ হাজার ২শ’ পর্যন্ত বৈধ সিএনজি অটোরিক্সা বিআরটিএ অফিসের সাথে যোগাযোগে থাকলেও সড়কে চলাচল রয়েছে প্রায় ১৩ হাজার সিএনজি।
কক্সবাজার জেলা সিএনজি অটোরিক্সা-অটোটেম্পু মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদ সভাপতি মুহাম্মদ ছিদ্দিক জানান, কক্সবাজার শহরের বাজারঘাটা, ভোলাবাবুর পেট্রল পাম্প, লালদীঘিরপাড়, কোর্ট বিল্ডিং, কলাতলির মোড় স্ট্যান্ড থেকে ১০টি অভ্যন্তরীণ রুটে সহস্রাধিক সিএনজি অটোরিকশা জেলার বিভিন্ন উপজেলায় যাতায়াত করছে। এসব ছাড়াও রামু, উখিয়া, টেকনাফ, চকরিয়া, পেকুয়া, সদরের ঈদগাঁও, কুতুবদিয়া ও মহেশখালী উপজেলায় অভ্যন্তরীণ ২৪টি রুটে ১০ থেকে ১২ হাজার সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করছে। প্রতি উপজেলার ইউনিয়নসমূহে পরিবেশবান্ধব দ্রুতগামী যান হিসেবে সিএনজি অটোরিক্সার কদর বেশি। কারণ এসব উপসড়কে কোন মিনিবাস চলাচলের সুযোগ নেই। সুতরাং চাহিদার কারণে নিত্যদিন নতুন সিএনজি রাস্তায় নামছে। কিন্তু রেজিস্ট্রেশন বন্ধ থাকায় অবৈধ উপায়ে চলাচল অব্যহত রাখতে হচ্ছে। সূত্রমতে, কক্সবাজারের সিএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান উত্তরা মটরস, টিভিএস, র‌্যাংগস ও এনআই সিন্ডিকেট, কেডিএম এন্টারপ্রাইজ, বাজাজ শোরুম, এম এস এন্টারপ্রাইজ নামের প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই ২০১৭ সাল হতে ২০১৯ সালের চলতি সময় পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৯ হাজার সিএনজি অটোরিকশা বিক্রি হয়েছে। চট্টগ্রামের নিকটবর্তী পেকুয়া ও চকরিয়া উপজেলার শেষপ্রান্তে চট্টগ্রামের বিভিন্ন শো-রুম হতে আনা হয়েছে আরো বেশ কিছু সিএনজি অটোরিক্সা। শো-রুম থেকে আনার পর পরই সড়কে চলাচল শুরু করা হলেও এসব সিএনজি অটোরিকশার এখনো পর্যন্ত লাইসেন্স হয়নি। শো-রুম কর্তৃপক্ষ সূত্রমতে, অবৈধ হিসেবে চলাচলরত এসব সিএনজি অটোরিকশাগুলো রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনা গেলে, সরকার লাইসেন্স বাবদ রাজস্ব পেত প্রায় ১১ কোটি ৪৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা। আর নবায়ন হিসেব করলে বিগত তিন বছরে আরো বাড়তি রাজস্ব আদায় হতো প্রায় ১৭ কোটি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সিএনজি অটোরিক্সা মালিক এবং চালক জানিয়েছেন, যানজট সৃষ্টির অজুহাতে ২০১৭ সাল হতে আটিসির নির্দেশনায় রেজিস্ট্রেশন দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে কক্সবাজার বিআরটিএ অফিস। রেজিস্ট্রেশন বন্ধ থাকায় নতুন সিএনজিগুলোতে ‘কক্সবাজার-থ-১১-’ সিরিয়াল নাম্বার দিয়ে বাকিটা খালি রেখে চালানো হচ্ছে সিএনজি অটোরিক্সাগুলো। সড়কে সমস্যা এড়াতে মাসিক ২২০০ থেকে তিন হাজার টাকায় ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশের টোকেন কিংবা উপজেলাভিত্তিক ‘অটোরিক্সা মালিক-চালক সমিতি’ বা অন্যকোন সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে বিনা বাধায় চলাচল করছে এসব সিএনজি অটোরিক্সা। ফলে বিআরটিএ অফিসে যাওয়ার প্রয়োজনও মনে করছেন না তারা।
মহাসড়কগুলোতে রামু তুলাবাগান হাইওয়ে ক্রসিং থানা, কক্সবাজার শহর ট্রাফিক অফিস, ডুলাহাজারা মালুমঘাট হাইওয়ে ফাঁড়ি, চিরিংঙ্গা হাইওয়ে ফাঁড়ি হতে টোকেন সরবরাহ দেয়া হয়। উপজেলা ও ইউনিয়নভিত্তিক উপসড়কে সমিতির তদারকিতে চলাচল করে সিএনজিগুলো।
চালক-মালিকদের মতে, পুলিশের মাসিক টোকেনটাই বড় লাইসেন্স। বৈধ লাইসেন্স থাকলেও বিভিন্ন সময় এটা-সেটা বলে যানবাহন ধারায় মামলা ও জরিমানা দিয়ে হয়রানি করা হয়। কিন্তু টোকেন থাকলে অপরাধ করলেও কোন মাথা ব্যথা থাকে না।
তবে চালক-মালিকদের এসব অভিযোগ অস্বীকার করে কক্সবাজার ট্রাফিক বিভাগের সহকারি পুলিশ সুপার বাবুল চন্দ্র বণিক বলেন, অবৈধ সিএনজি অটোরিকশাসহ যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে। অবৈধ যানবাহন পেলেই যানবাহন নিয়ন্ত্রণ আইনের ধারায় মামলা দিয়ে জরিমানা করা হয়। এতে সরকার লাখ লাখ টাকা রাজস্ব পাচ্ছে।
বিআরটিএ কক্সবাজার সার্কেল অফিসের মোটরযান পরিদর্শক আরিফুল ইসলাম টিপু বলেন, মহাসড়কে চলাচলের কোন বৈধতা না থাকলেও পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অনিয়মতান্ত্রিক ভাবে লাইসেন্স নিয়ে সবসড়কে চলাচল করছে ইজিবাইক (টমটম)। কক্সবাজার পৌরসভা থেকে আড়াই হাজার লাইসেন্স নিয়ে অন্তত ৮ হাজার টমটম শহরে চলাচল করছে। অন্যসড়কে চলছে আরো কয়েক হাজার। এসবের কারণে কক্সবাজার পৌরশহরসহ মহাসড়কেও যানজটের মূল কারণ টমটমই। কিন্তু যানজটের অজুহাতে ২০১৭ সাল হতে পরিবেশবান্ধব সিএনজি অটোরিক্সার লাইসেন্স দেয়া বন্ধ ঘোষণা করেছে কক্সবাজার আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি (সিবিআরটিসি)।
বিআরটিএ কক্সবাজার সার্কেলের সহকারী পরিচালক উথোয়াইনু চৌধুরী বলেন, লাইসেন্স না পেলেও সড়কে চলাচল থেকে বিরত নেই শো-রুম থেকে কেনা সিএনজি অটোরিক্সাগুলো। অবৈধ হলেও যেকোন ভাবে চলার চেয়ে বিআরটিএ’র লাইসেন্স দেয়া গেলে সরকার কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পাবে। নবায়নেও মিলবে ফি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। দেশের স্বার্থে রেজিস্ট্রেশন চালু দরকার বলে মন্তব্য করেন তিনি।