ওস্তাদ মিহির নন্দী স্মরণ আনন্দধ্বনির পঞ্চ কবির গান

রুবেল দাশ প্রিন্স

16

গত ৬ জুলাই ছিল উপমহাদেশের বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী ও সূর শ্রষ্ঠা পন্ডিত মিহির নন্দীর ২য় প্রয়াণ দিবস। শুদ্ধ সুরের এই সাধক ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম কণ্ঠ সৈনিক। একাত্তরে যুদ্ধের ভয়াল দিনগুলোতে কণ্ঠে তুলেছেন উদ্দীপনামূলক সূর। ঘুরেছেন ভারতের শরনার্থী শিবিরগুলোাতে। মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে গান গেয়ে বাংলার স্বাধীনতাকামী মুক্তি সংগ্রামীদের করেছেন উজ্জীবিত। দেশমাতৃকার প্রয়োজনে ওস্তাদ মিহির নন্দী জীবন বাজি রেখে অংশগ্রহণ নেন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে। শুধু তাই নয় সাংস্কৃতিক বিপ্লবে তাঁর অবদান দেশ ও জাতি শ্রদ্ধাবনতচিত্তে স্মরণ করে।
চট্টগ্রামে শুদ্ধ সংঙ্গীতের প্রসার ও নতুন শিল্পী তৈরীতে প্রতিষ্ঠা করেন সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আনন্দধ্বনি। দেশের সঙ্গীতাঙ্গনে অনবদ্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি শিল্পকলা পদকে ভূষিত করা হন। সঙ্গীত অঙ্গনে তাঁর হাতে গড়া অসংখ্য গুণি শিক্ষার্থীরা সংগীতাঙ্গনে অঙ্গনে ছড়াচ্ছেন আলোকদ্যুতি। ওস্তাদ মিহির নন্দী তার বর্ণাঢ্য সঙ্গীত সাধানায় চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছেন। দেশের প্রতিটি প্রান্তে রবীন্দ্র সঙ্গীতকে আলোর ধারায়, সূরের ধারায় উচ্ছসিত রেখেছেন।
ওস্তাদ মিহির নন্দী ১৯৬৪ সালে চট্টগ্রাম বেতারের তালিকাভুক্ত হন। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ও রবীন্দ্র সঙ্গীতে শিক্ষকতা শুরু করেন ১৯৬৪ সালে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগের খন্ডকালীন শিক্ষক ও বাংলাদেশ বেতার এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিশেষ শ্রেনীর শিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক, সুরকার ও বিচারকমন্ডলীর অন্যতম সদস্য ছিলেন। রবীন্দ্র সঙ্গীত মিহির নন্দীর ধ্যান জ্ঞান হলেও আধুনিক, নজরুল ও অতুল প্রসাদ ছাড়াও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে বিশেষ দক্ষতা রয়েছে তাঁর। তিনি ছিলেন আনন্দধ্বনীর অধ্যক্ষ, রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের সহ-সভাপতি।
১৯৪৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার কেউচিয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন সুরস্রষ্টা ওস্তাদ মিহির নন্দী। পিতা ফনীন্দ্র লাল নন্দী। মাতা মল্লিকা রানী নন্দী। লেখাপড়ায় হাতেখড়ি বাজালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল মডেল হাইস্কুল এরপর চট্টগ্রাম সিটি কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। চাকরি জীবনে তিনি বিসিআইসির একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ছিলেন। সঙ্গীতে হাতেখড়ি অবশ্য বাবার কাছে। এরপর তালিম নেন রবীন্দ্র শিক্ষাগুরু ওয়াহিদুল হক ও আচার্য শৈলদা রঞ্জন মজুমদারের কাছে। বেহালা শিখেছেন ওস্তাদ নিরোধ বরণ বড়ুয়া, পন্ডিত অশোক দাশগুপ্তের কাছে। তার ধ্রুপদ শিক্ষাগুরু সঙ্গীতাচার্য সৌমিত্র লাল দাশ গুপ্ত। তবলা, সেতার ও এসরাজে হাত পাকিয়েছেন ওস্তাদ আদিত্য নারায়ণ দাসের কাছ থেকে। ৫২ বছরের সঙ্গীত জীবনে ওস্তাদ মিহির নন্দী বহু সঙ্গীত বিষয়ক প্রতিষ্ঠান গড়েছেন।
যুক্ত রয়েছেন সাংস্কৃতিচর্চার অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের সাথে। অনন্য এই সঙ্গীত সম্রাট মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় সঙ্গীত বিষয়ক কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি চট্টগ্রামে গণ-আন্দোলনে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের প্রথমসারির একজন সংগঠক। ছিলেন চট্টগ্রামে প্রথমবার পহেলা বৈশাখ উদযাপনের আয়োজক। ১৯৭৪ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন সংঙ্গীত শিল্পী ভালোবাসার মানুষ নন্দিতা নন্দীর সাথে। এই দম্পতির এক ছেলে প্রয়াত সুতনু নন্দী বাবুন ছিলেন প্রখ্যাত গীটারবাদক। রয়েছে একমাত্র মেয়ে সুহা। তার রয়েছে দু’টি সন্তান বুবুন ও বুনন। ২০১৭ সালের ৬ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠসৈনিক ওস্তাদ মিহির নন্দীর ২য় প্রয়াণ বার্ষিকীতে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় তাঁরই প্রতিষ্ঠিত সংগীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আনন্দধ্বনির শিক্ষার্থীরা পরিবেশন করে পঞ্চ কবির গান। শুরুতে শিল্পীর প্রতিকৃতিতে মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা করা হয়।
আবৃত্তিজন অঞ্চল চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন অতিথি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ড. কুন্তল বড়ুয়া ও সহকারী অধ্যাপক অসীম দাশ। অনুষ্ঠানে শিল্পীরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অতুলপ্রসাদ সেন, রজনীকান্ত সেন, ডি এল রায়, কাজী নজরুল ইসলাম এই পাঁচ কবির গান পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন গোপা দাশ গুপ্তা, কাবেরী দাশ গুপ্তা, কান্তা দে, অনুরীনা চৌধুরী (তুলি), শ্রাবণী দেব বর্মন, রুপশ্রী হোড়, সোমা বড়ুয়া, অনন্যা চৌধুরী (পিউ), দেবদ্যুতি ভট্টাচার্য, পাপিয়া দে, অপর্ণা চৌধুরী, শ্যামলী সেনগুপ্তা, অনামিকা মল্লিক, বর্ষা দে ও অনির্বাণ চৌধুরী। সংগীত পরিচালনায় আনন্দধ্বনির পরিচালক নন্দিতা নন্দী।
মানের দিক থেকে আয়োজনটি ছিলো অনন্য। নতুন নতুন গানের স্বাদ পেয়েছে দর্শকরা। এর জন্য পরিচালক সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। সুর-তাল-লয় সবকিছুতে আনন্দধ্বনি তার ঐতিহ্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে দীর্ঘ উপস্থাপনায় দর্শকদের প্রায় ধৈয্যচ্যুতি ঘটার মত অবস্থা হলেও খুবই সন্তর্পণে উপস্থিত শিল্পীদের নাম উচ্চারণ করা হয়নি একটিবারও। যে কোন সঙ্গীতানুষ্ঠানে শিল্পীরাই প্রাণ। তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে কীসের এত হীনমন্যতা তা বোধগম্য হয়নি করো। ভালো লেগেছে মঞ্চথেকে বেছে বেছে যন্ত্রীদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার পর্বটি। আর একটি বিষয় দু’একজন আলোচক মিহির নন্দীর বৈচিত্র্যময় ও বহুমাত্রিক সাফল্যগাঁথাকে ডিঙিয়ে কে তাঁকে কোথায় কোন পদে আসীন হতে সহযোগিতা করেছেন তা প্রকাশ করতে ব্যস্ত ছিলেন যা শ্রুতিকট‚ লেগেছে।