ওজলরঙে আঁকা বঙ্গবন্ধু

তুফান মাজহার খান

24

আদি ছবি আঁকতে খুব পছন্দ করে। পারুক আর না পারুক ছোটবেলা থেকেই সারাক্ষণ সে রং পেন্সিল নিয়ে পড়ে থাকে। স্কুলের ফাঁকে, ঘুমের আগে, ছুটির দিনে যখনই সুযোগ মেলে তখনই আঁকতে বসে যায়। আদির বাবা ছেলের ছবি আঁকার প্রতি এত ঝোঁক দেখে খুব অল্প বয়সেই আর্ট স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। আস্তে আস্তে আদি ফুল, ফল, পাখি, মাছ, গ্রামের দৃশ্যসহ অনেক কিছু আঁকতে শিখে যায়।
একদিন আদির স্কুলে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। প্রতিযোগিতার আগেরদিন সবার উদ্দেশ্যে ঘোষণা করা হয় আগামিকাল সবাই যেন প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি নিয়ে এসে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। পরদিন সকালে যথাসময় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা শুরু হয়। প্রথমে ঘোষণা করা হয় সবাই যেন তার পছন্দমত কিছু আঁকে এবং সেটা সে কেন এঁকেছে তা তাকে বলতে হবে। আঁকার জন্য সবাই এক ঘন্টা সময় পেল। অঙ্কন শেষ হলে সবার খাতা জমা নেওয়া হয়। সামনে চার জন শিক্ষক-শিক্ষিকা বসে আছেন। প্রধান শিক্ষক, সালাম স্যার, মুনিরা ম্যাডাম আর নাদিরা ম্যাডাম। একে একে চিত্র অঙ্কনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের ডাকা হবে। সবার আঁকা চিত্র এবং তাৎপর্য শুনে যারটা বিচারকদের কাছে সেরা মনে হবে তাকে প্রথম পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। ছাত্র-ছাত্রীরা অধীর আগ্রহে বসে আছে। সবার মন অজানা আতঙ্কে ধুক ধুক করছে। নাদিরা ম্যাডাম প্রথমে একজনের চিত্র হাতে নিলেন এবং ডাকলেন, তাসনুভা কে?
তাসনুভা হাত তুলল।
ম্যাডাম তাসনুভাকে সামনে ডেকে নিলেন। তাসনুভা এঁকেছে একটি শাপলা ফুল। ম্যাডাম চিত্রটি উঁচু করে সবাইকে দেখালেন। সবাই করতালির মাধ্যমে তাসনুভাকে অভিবাদন জানাল। তারপর ম্যাডাম তাসনুভাকে এ চিত্র অঙ্কনের কারণ জিজ্ঞেস করলেন। তাসনুভা বলল,
শাপলা আমাদের জাতীয় ফুল। আর এটি আঁকাও সহজ। তাই আমি এটি এঁকেছি।
তারপর এল রাইয়ান। রাইয়ান এঁকেছে বড় একটি মাছ। সালাম স্যার জিজ্ঞেস করলেন রাইয়ান এটা কী মাছ? রাইয়ান বলে, এটা জাতীয় মাছ ইলিশ। স্যার জিজ্ঞেস করলেন তুমি এটি কেন এঁকেছ? রাইয়ান বলে, ইলিশ খুব সুস্বাদু মাছ। তাছাড়া আমি ইলিশ খেতে খুব পছন্দ করি। তাই আমি এটি এঁকেছি। সালাম স্যার মুদু হাসলেন। কেননা রাইয়ানের মাছটিকে কোনোক্রমেই ইলিশ বলা চলে না। অনেকটা পাঙ্গাশ মাছের মত দেখতে। তবুও সালাম স্যার রাইয়ানকে সাবাস জানালেন। তারপর এল ইরিনার পালা। ইরিনা এঁকেছে একটি বড় তালগাছের ছবি। মুনিরা ম্যাডাম জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তালগাছ কেন এঁকেছ? ইরিনা বলল, তালগাছ অনেক সুন্দর আর অনেক উঁচু হয়। তাল খেতেও খুব মিষ্টি। তালের তৈরি পিঠাও আমার খুব ভালো লাগে। আমাদের বাসায় একটি তালগাছ আছে। তাই আমি তালগাছ এঁকেছি।
এভাবে কেউ গোলাপ, কেউ ঘুড়ি, কেউ গ্রামের দৃশ্যসহ আরও অনেককিছু অঙ্কন করেছে। সবাই সবার মত করে অঙ্কনের কারণ ব্যাখ্যা করেছে। কেউ জল রং, কেউ মোম রং আবার কেউ এঁকেছে পেন্সিল রঙে। সর্বশেষ ডাকা হল আদিকে। আদি এঁকেছে একজন মানুষের ছবি। ম্যাডাম আদির জলরঙে আঁকা মানুষের ছবিটা উঁচু করে ধরল। সাদা পাঞ্জাবীর উপরে একটি কালো কোর্তা পরা একজন ভদ্রলোক। চোখে বড় আর কালো ফ্রেমের চশমা। ছবিটি উপরে তুলে ধরতেই সবাই চিনে ফেলল। সবাই একসাথে বলে ওঠলো বঙ্গবন্ধু। আদি মুচকি হাসল। রফিক স্যার জিজ্ঞেস করলেন, আদি তুমি বঙ্গবন্ধুর ছবি আঁকলে কেন? আদি বলল, আমি বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আমার বাবার কাছে গল্প শুনেছি। বঙ্গবন্ধু আমার মত বয়স থেকেই নাকি মানুষের দুঃখ, কষ্ট দেখে কষ্ট পেতেন। গরীব-দুঃখীদের সাহায্য করতেন। প্রয়োজনে নিজের গায়ের জামা, নিজের পছন্দের ছাতাও নাকি মানুষকে দিয়ে সাহায্য করতেন। আস্তে আস্তে তিনি বড় হতে থাকলেন। দেশের প্রতি তার মায়া বাড়তে লাগল। দেশের মানুষের কষ্ট, যন্ত্রনা, পাকিস্তানিদের শাসন এসবের শৃঙ্খলে আবদ্ধ মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করতে থাকলেন। পাকিস্তানিদের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে তিনি তার সকল ধ্যান, জ্ঞান কাজে লাগাতে থাকেন। তার প্রতিবাদী কণ্ঠের কারণে তাকে বহুবার কারাবরণ করতে হয়। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার সাথে সাথেই তিনি আবার প্রতিবাদ আর আন্দোলনে ব্রতী হতেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে তিনি জাতির উদ্দেশ্যে এক জ্বালাময়ী ভাষণ দেন। যা ইতিহাসে বিরল। তার এ ভাষণ শুনে লাখো বাঙালি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রয়াস পেয়েছিল। বঙ্গন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পর পাকিস্তানিদের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে তারা যুদ্ধে নামে। লাখো লাখো মানুষ শহীদ হলেও অবশেষে আমরা ফিরে পাই আমাদের স্বাধীন দেশ। বাংলাদেশ।
যুদ্ধ শেষ হলেও বঙ্গবন্ধু থেমে থাকেননি। বরং যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের কাজে তিনি আত্মনিয়োগ করেন। আস্তে আস্তে দেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শুরু করে। দেশের মানুষের মনে সুখ আর আনন্দের জোয়ার বইতে থাকে। দেশের মানুষের সুখ দেখে বঙ্গবন্ধুর মনেও বইতে থাকে এক মহানন্দের জোয়ার। কিন্তু এ আনন্দ পাকিস্তানি দোসরদের চোখে যেন কাঁটার মত বিঁধতে থাকে। বাঙালির সুখ তাদের সহ্য হয় না। ১৯৭৫ সালে এই দিনে ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়।
বলতে বলতে আদির চোখে যেন জল আসে। স্যার এবং ম্যাডামগণ দৃশ্যটি দেখে তারাও আবেগ সামলাতে পারেননি। তাদের চোখের কোণেও মনের অজান্তেই জল চলে আসে আর আদির এ স্বল্প বয়সের প্রজ্ঞা দেখে সবাই বিস্মিত হয়। স্কুলের সবাই আদির প্রজ্ঞা আর জলরঙে আঁকা বঙ্গবন্ধুর চিত্রটির বেশ প্রশংসা করতে থাকে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক আদির ছবিটিকে সেরা ছবি হিসেবে ঘোষণা করেন এবং আদির হাতে প্রথম পুরস্কার তুলে দেন। প্রধান শিক্ষক নিজ দায়িত্বে আদির জলরঙে আঁকা বঙ্গবন্ধুর ছবিটিকে বাঁধাই করে আদিদের ক্লাসের দেয়ালে ঝুলিয়ে দেন।