প্লাস্টিক বর্জ্য রপ্তানি করে আয়

এ শিল্পখাতে সরকারের সহযোগিতা জরুরি

7

পথে-ঘাটে প্রায় দেখা যায়, সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার পরিচ্ছন্ন কর্মী, পথশিশু আর ছিন্নমূল মানুষ রাস্তা বা উদ্যান থেকে ব্যবহৃত ও পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল সংগ্রহ করছেন। ময়লা কাপড়ে জরাজীর্ণ শরীর নিয়ে অনেক নারীকেও এ কাজ করতে দেখা যায়। একটি একটি করে প্লাস্টিকের বোতল কুড়িয়ে বস্তা পুরিয়ে নিয়ে যান পুরনো জিনিসপত্র বিক্রেতার কাছে। তারা ২০/২৫ টাকা কেজিতে বিক্রি করে মহাখুশিতে ভাঙা বাড়িতে ফিরে যান আর এ বিক্রেতা প্লাস্টিক রি-সাইক্লিং ফেক্টরিতে নিয়ে তা বিক্রি করেন ৪০/৫০ টাকা কেজিতে। এভাবে হাত বদল হয়ে এ প্লাস্টিক রি-সাইক্লিং-এর মাধ্যমে ফ্লেকস হয়ে রপ্তানি দ্রব্য হিসাবে বিদেশে যায়, বিনিময়ে আসে বিদেশি ডলার। উপকৃত হন মধ্যখানে পথশিশু, অভাবী মানুষ, পুরনো জিনিস বিক্রেতা, রি-সাইক্লিং শিল্পমালিক, রপ্তানিকারক ও দেশ। বাংলাদেশ পেট ফ্লেকস ম্যানুফ্যাকচারাস এন্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএফএমইএ)-এর এক তথ্য অনুযায়ী ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ খাত থেকে যথাক্রমে ৩৫ মিলিয়ন ডলার আয় করে বাংলাদেশ । একটি কথা আছে, প্রকৃতির সৃষ্টির কোন কিছুই ফেলনা নয়। মানুষ যা তাচ্ছিল্য করে ময়লার বক্সে নিক্ষেপ করছে তাতেই যদি দেশ ও দেশের মানুষ মিলিয়ন-বিলিয়ন ডলার আয় করে, তবে তাতে সরকার ও সিটি কর্পোরেশন বসে থাকবে কেন? বিভিন্ন সূত্রে আমরা জানতে পারি, পৃথিবীর উন্নত দেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যে নিয়ম ও শৃঙ্খলা তার পেছনেই রয়েছে রাষ্ট্রের বড় আয়। ফলে তারা পৌর এলাকা নয় শুধু দেশের প্রতিটি জনপদে বর্জ্য সংরক্ষণ এবং অপসারণের বৈজ্ঞানিক সূত্র ব্যবহার করে থাকে। প্রতিটি বাড়ি বা ঘরে কমপক্ষে তিন ধরনের ভিন ব্যবহার করে বর্জ্যগুলো স্থানীয় পৌরসভা বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পৃথক পৃথক জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়, এরপর ম্যানুফ্যাকচারিং এর মাধ্যমে তা দিয়ে বিভিন্ন জৈব সার, প্লাস্টিক জাতীয় বস্তু তৈরি করে থাকে। বাংলাদেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এতোদিন এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় কিংবা সিটি কর্পোরেশনের কোন উদ্যোগ দেখা না গেলেও ব্যক্তি উদ্যোগে বর্জ্যকে দ্রব্যে পরিণত করে তা বিক্রি বা রপ্তানির ব্যবস্থা আমাদের আশাবাদী করে তুলেছে। রবিবার দৈনিক পূর্বদেশে ‘বর্জ্য কুড়িয়ে বৈদেশিক আয়’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) হিসেবে বছরে প্রায় ১ লাখ ২৩ হাজার ১১৮ টন প্লাস্টিকবর্জ্য সংগ্রহ করে সংস্থাটি। এসব অন্যান্য বর্জ্যেের সাথে ফেলে দেওয়া হয় ময়লার ভাগাড়ে। তবে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকবর্জ্য ব্যক্তি উদ্যোগে রিসাইক্লিং করে রপ্তানি করা হচ্ছে। এতে আয় হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা। নগরীতে এরকম প্রায় অর্ধশত ‘প্লাস্টিক রিসাইক্লিং’ কারখানা রয়েছে বলে জানা গেছে। প্রতিবেদক এ বিষয়ে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি পূর্বদেশকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমি নিজেই খোঁজ নিব। যদি লাভজনক হয়, অবশ্যই আমরা এ খাতে উদ্যোগী হব। তিনি স্বীকার করেছেন, প্লাস্টিকবর্জ্য নিয়ে এমন ধারণা আগে আর কেউ দেয়নি। আমাদের এখানে লাখ লাখ টন প্লাস্টিকবর্জ্য ভাগাড়ে ফেলে দেওয়া হয়। যেহেতু ফ্লেকস তৈরির প্রক্রিয়াটা সহজ, তাই আমাদের বিদ্যমান জনবল দিয়ে নতুন কিছু করা যাবে। তাছাড়া আমরা ডোর টু ডোর বর্জ্য সংগ্রহে নতুন পরিকল্পনা নিয়েছি। যেখানে প্রতিটি বাড়িতে দুইটি ডাস্টবিন থাকবে। একটি লাল রংয়ের আরেকটি সবুজ রংয়ের। লাল ডাস্টবিনটিতে প্লাস্টিক জাতীয় বর্জ্য ফেলা হবে। এতে সহজেই প্লাস্টিকবর্জ্য আলাদা করা যাবে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিটি কর্পোরেশন এ শিল্পে দু’ভাবে জড়িত হতে পারে। প্রথমত সংগৃহীত প্লাস্টিকবর্জ্য কারখানাগুলোতে সরবরাহ করা। আবার কর্পোরেশন নিজেই এমন কারখানা করে আয় বাড়াতে পারে। আমরা মনে করি, চসিক পরিকল্পিতভাবে এ জাতীয় শিল্প গড়ে তোলা বা প্লাস্টিকদ্রব্য সংরক্ষণ করে তা বিক্রির উদ্যোগ নিলে একদিকে চসিকের আয় যেমন বাড়বে অপরদিকে পরিবেশ দূষণ ও জলাবদ্ধতা থেকেও নগরী অনেকটা মুক্তি পাবে।
উল্লেখ্য যে, সম্ভাবনাময় এ শিল্পকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রায় ১৫০টি কারখানা গড়ে উঠেছে। কর্মসংস্থান হচ্ছে হাজার হাজার মানুষের। গত বছর প্লাস্টিক বর্জ্য রপ্তানি করে প্রায় ৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে দেশ। নতুন করে অনেক দেশ প্লাস্টিকের বর্জ্য আমদানি করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। রপ্তানিকারক সংগঠন বাংলাদেশ পেট ফ্লেকস ম্যানুফ্যাকচারাস এন্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএফএমইএ) মতে, সরকারি সহযোগিতা পেলে অর্থনীতিতে বড় ধরনের অবদান রাখবে এ খাত।